সেন্ট মার্টিনে পর্যটনের ঘোষণা ব্যবসায়ীদের স্বস্তি, নজরদারির তাগিদ
পর্যটকদের জন্য সাড়ে চার মাসের মৌসুম ঘোষণা করা হলেও আগের নির্দেশনার সব শর্ত বহাল রাখার কথা বলেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে ১ নভেম্বর থেকে পর্যটক যাতায়াত শুরুর ঘোষণায় ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি এসেছে।
কিন্তু মৌসুম শুরুর মাত্র ছয় দিন আগে এসেও জাহাজ চলাচলের প্রয়োজনীয় অনুমোদন, টিকিটের মূল্য এবং নভেম্বর মাসে পর্যটকদের রাতযাপনের সুযোগ থাকবে কিনা- এসব বিষয়ে স্পষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
পর্যটকদের জন্য সাড়ে চার মাসের মৌসুম ঘোষণা করা হলেও আগের নির্দেশনার সব শর্ত বহাল রাখার কথা বলেছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
সেই নির্দেশনায় নভেম্বরে দ্বীপে রাতযাপনের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। নতুন ঘোষণার সঙ্গে পুরোনো শর্তের সমন্বয় কীভাবে হবে, তা নিয়ে প্রশাসনের কাছেও এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নির্দেশনা পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী।
অন্যদিকে জাহাজ পরিচালনাকারীরা বলছেন, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহযোগিতা পেলে চার দিনের মধ্যে জাহাজ চলাচল শুরু করা সম্ভব। তবে একাধিক দপ্তরের অনুমোদন ও ছাড়পত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কত দ্রুত সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে তাদের।
রোববার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ-২ শাখা থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, আগামী ১ নভেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা সেন্ট মার্টিনে যাতায়াত করতে পারবেন। প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রত্যেক পর্যটককে দিতে হবে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি।
তবে পর্যটন শুরুর এই ঘোষণা বাস্তবে কতটা দ্রুত কার্যকর করা যাবে, তা নির্ভর করছে অনুমোদন, আগের নির্দেশনার ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রস্তুতির ওপর।
অনুমোদন পেতে একাধিক দপ্তরে যোগাযোগ
সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বর্তমানে তিনটি জাহাজ চলাচলের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এগুলো হলো- কর্ণফুলী, বার আউলিয়া ও এমভি টেকনাফ। তিনটি জাহাজে একসঙ্গে ২ হাজার ৩০০ পর্যটক পরিবহন করা সম্ভব।
তবে জাহাজ চলাচল শুরুর আগে পরিবেশ অধিদপ্তর, নৌপরিবহন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং জেলা পরিষদের অনুমতি ও ছাড়পত্র প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, “প্রক্রিয়াটি সহজ নয়। আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছি। পরিবেশ অধিদপ্তর আমাদের জানিয়েছে, এ বিষয়ে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের একটি চিঠি প্রয়োজন।”
প্রশাসনিক সহযোগিতা পেলে চার দিনের মধ্যে জাহাজ চলাচল শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী তিনি।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদন ও ছাড়পত্র পাওয়া সাপেক্ষে জাহাজের সংখ্যা শেষ পর্যন্ত প্রায় নয়টিতে পৌঁছাতে পারে। তবে বর্তমানে প্রস্তুত তিনটি জাহাজের একসঙ্গে যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা ২ হাজার ৩০০ জন, যা সরকারের নির্ধারিত দৈনিক সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটকের সীমার চেয়ে ১ হাজার ২০০ জন কম।
অর্থাৎ, পর্যটন মৌসুমের শুরুতেই প্রতিদিন নির্ধারিত সর্বোচ্চ সংখ্যক পর্যটক পরিবহনের ব্যবস্থা থাকবে কি-না, সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়।
জাহাজ পরিচালনাকারীরা এখনও টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করেননি।
সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হতে পারে।
নভেম্বরে রাতযাপন করা যাবে কি?
পর্যটন মৌসুমের সময়সীমা নিয়ে ঘোষণার পাশাপাশি দ্বীপে রাতযাপনের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
গত বছরের ২২ অক্টোবর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জারি করা নির্দেশনায় সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। সেই নির্দেশনার সব শর্ত বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে নতুন চিঠিতে।
আগের ব্যবস্থায় নভেম্বর মাসে পর্যটকদের দ্বীপে রাতযাপনের অনুমতি ছিল না। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাতযাপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সে সময় প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক দ্বীপে যাওয়া ও অবস্থানের সুযোগ পেয়েছিলেন।
নতুন ঘোষণায় ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটক যাতায়াতের কথা বলা হলেও রাতযাপনের ক্ষেত্রে আগের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে কি-না, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তারা এখনও এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা পাননি।
তিনি বলেন, “এখন আসলে পুরোটা তো আমরা ক্লিয়ারেন্স পাইনি। আমরা তো একটা রেজুলেশনে পেয়েছি। হয়তো প্রজ্ঞাপন হবে নতুন করে।”
অর্থাৎ, পর্যটকদের যাতায়াত শুরুর তারিখ ঘোষণা করা হলেও রাতযাপনের বিষয়ে প্রশাসনের কাছে চূড়ান্ত ব্যাখ্যা পৌঁছেছে কি-না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সেন্ট মার্টিনের সেন্ট্রিস বিচ রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী এবাদুল হকও এ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, পর্যটন মৌসুম শুরুর ঘোষণা ব্যবসায়ীদের জন্য আনন্দের হলেও সিদ্ধান্তটি হঠাৎ আসায় অনেকে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পাননি। জাহাজ চলাচল, টিকিটের মূল্য এবং আগের নির্দেশনার শর্তগুলো কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে তাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা রয়েছে।
এবাদুল হক বলেন, “সেন্টমার্টিন খুলে দিল এটা আমাদের আনন্দের বিষয়, তবে হুট করে সিদ্ধান্তটা আসছে। সব ব্যবসায়ী প্রস্তুত না।”
তিনি বলেন, অনেক ব্যবসায়ী ভেবেছিলেন, নভেম্বরের ১০ থেকে ১৫ তারিখের দিকে পর্যটন কার্যক্রম শুরু হতে পারে। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
পর্যটন মৌসুম শুরুর ঘোষণা আসার পর রোববার বিকালে সেন্ট মার্টিনে ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আনন্দ মিছিল করেন।
মারমেইড সেন্ট মার্টিন রিসোর্টের অন্যতম মালিক তৈয়ব উল্লাহ বলেন, নতুন সিদ্ধান্তে দ্বীপের ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তবে পর্যটকসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
তার মতে, পর্যটকদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দ্বীপের জলাভূমি, বালুচর ও বনাঞ্চল সংরক্ষণ করতে হবে। এসব জায়গা অধিগ্রহণ করে পর্যটন ও অবকাঠামো নির্মাণের বাইরে রাখার প্রস্তাবও দেন তিনি।
তৈয়ব উল্লাহ বলেন, পর্যটকদের কাছ থেকে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি নেওয়া হলে সেই অর্থ দিয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ করা যেতে পারে। তারা নিয়মিত দ্বীপের সড়ক, সৈকত ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার রাখবেন।
তিনি বলেন, শুধু পর্যটকের সংখ্যা কমিয়ে পরিবেশ দূষণ ঠেকানো যাবে না। প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও কার্যকর করতে হবে।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগের কথা জানান এই ব্যবসায়ী। তার মতে, দ্বীপের বিভিন্ন রিসোর্টে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম থাকলেও সেগুলো ব্যবহারের প্রশিক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দ্বীপে ফায়ার সার্ভিসের স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকাকেও তিনি বড় সমস্যা মনে করেন।
পরিবেশ সংরক্ষণ ফি আদায়ের ব্যবস্থা
নতুন নির্দেশনায় প্রত্যেক পর্যটকের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি আদায়ের কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১৬-এর ২৬ বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া বিআইডব্লিউটিএ ও নৌপরিবহন অধিদপ্তর সেন্ট মার্টিনে চলাচলের জন্য কোনো নৌযানকে অনুমতি দিতে পারবে না বলে নির্দেশনায় বলা হয়েছে।
পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, কক্সবাজার জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, পুলিশ সুপার ও ট্যুরিস্ট পুলিশকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
পরিবেশকর্মী ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, সেন্ট মার্টিনে পর্যটন নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেওয়া নির্দেশনাগুলো মোটামুটি সন্তোষজনক। তবে এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আগের নির্দেশনাগুলোর মধ্যে নভেম্বরে দ্বীপে রাতযাপন না করার শর্তও বহাল রয়েছে। পর্যটকের সংখ্যা নির্ধারিত সীমার বাইরে চলে গেলে পরিবেশের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তাই পর্যটকসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দেশনার কার্যকর বাস্তবায়নে সরকারকে নজরদারি জোরদার করতে হবে।
