একটা হুইলচেয়ার পেয়ে ১০ বছর পর ঘরের বাইরে এলেন জমেলা
স্বজন ও প্রতিবেশীরা বলছিলেন, কোমর থেকে নিচের অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ায় শরীরটুকুও নড়াচড়া করার ক্ষমতা নেই জমেলার।
শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার দীঘিরপাড় গ্রামের জমেলার বয়স ৭০ পেরিয়েছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার দিন কাটে একটি বিছানায়। আলোহীন ঘরের চার দেয়ালই যেন তার পৃথিবী।
১০ বছরের বেশি সময় ধরে এভাবেই কাটছে তার জীবন। এবার একটা হুইলচেয়ার পেয়ে তাতে বসে সেই বন্দিদশা কাটল জমেলা বেগমের।
স্বজন ও প্রতিবেশীরা বলছিলেন, কোমর থেকে নিচের অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ায় শরীরটুকুও নড়াচড়া করার ক্ষমতা নেই জমেলার। কারও সহযোগিতা ছাড়া তিনি বিছানা থেকেও উঠতে পারেন না। ফলে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এক বিছনাতেই শুয়ে অসহায়ের মত বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতেন।
কিন্তু মঙ্গলবার দুপুরটা জমেলার জীবনে যেন একটু অন্যরকম হয়ে আসে। শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন তার বাড়িতে গিয়ে একটি হুইলচেয়ার, ১০ হাজার টাকা ও এক ব্যাগ খাবার সহায়তা দেন।
পরে জমেলাকে বিছানা থেকে তুলে সেই হুইলচেয়ারে বসিয়ে ঘরের বাইরে আনা হয়। বাইরে এসে নির্বাক আর অবাক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চারপাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি। দীর্ঘদিনের বন্দিদশা থেকে মুক্তি আনন্দে তার চোখ সজল হয়ে ওঠে।
শুধু হুইলচেয়ার দেওয়া নয়। জমেলার জন্য একটি নিরাপদ ঘর তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানায় প্রশাসন। তার বসতভিটায় মাটি ভরাট, ঘর নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কথাও জানানো হয়।
এ সময় শেরপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব, শিক্ষা ও আইসিটি) সাইফুল ইসলাম কমল, ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল আমীন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. রাজিবুল ইসলাম, স্থানীয় ইউপি সদস্য ও সাংবাদিক মো. জাহিদুল হক মনির, স্বেচ্ছাসেবী ও সাংবাদিক মুজাহিদ উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৪০ বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছেন জমেলা। একমাত্র ছেলে বেঁচে থাকলেও নিয়মিত খোঁজ-খবর নেন না। প্রায় ২০ বছর আগে মারা গেছেন একমাত্র মেয়েও। ফলে জীবনের শেষ বয়সে এসে তার আপন বলতে আর তেমন কেউ নেই।
একসময় জোৎস্না নামে একটি মেয়েকে নাতনির স্নেহে লালন-পালন করেছিলেন। পরে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তিনি বাড়ির কাছেই জোৎস্নাকে বিয়ে দেন। তার অবস্থায়ও ‘দিন আনি দিন খাই’। কিন্তু এখন সেই জোৎস্নাই জমেলার জীবনের বড় অবলম্বন-আশ্রয়। প্রতিবেশীরাও এই বৃদ্ধাকে সাধ্যমত সাহায্য করেন।
অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার পেছনে একসময় নিজের ভিটার মাটিও বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। অর্থের অভাবে এখন প্রায় বিনা চিকিৎসাতেই দিন কাটছে তার।
স্থানীয়দের ভাষ্য, জমেলা কোনো সরকারি ভাতাও পান না।
জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, “জমেলা বেগমের অসহায়ত্বের বিষয়টি জানতে পেরে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তার পাশে দাঁড়িয়েছি। হুইলচেয়ার ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি তার জন্য একটি নিরাপদ ঘর, বিদ্যুৎ ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তার আওতায় তাকে আনারও উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
