১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩ কার্তিক ১৪৩৩

‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন ঝালকাঠির আরিফুর রহমান

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে এক অনুষ্ঠানের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে সম্মাননা গ্রহণ করেন তিনি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 18 Oct 2026, 11:29 PM

Updated : 18 Oct 2026, 11:29 PM

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, দুর্যোগে মানবিক সহায়তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সুবিচারে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ ‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ পেয়েছেন ঝালকাঠির আরিফুর রহমান।

এক দশকের বেশি সময় ধরে স্বেচ্ছাসেবামূলক ও সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।

শনিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে এ সম্মাননা গ্রহণ করেন আরিফুর রহমান। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়।

আরিফুর রহমান বর্তমানে ইয়ুথনেট গ্লোবালের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বরিশাল অঞ্চলের মান্তা জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, পরিবেশদূষণ রোধ, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তা এবং তরুণদের জলবায়ুবিষয়ক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার মতো বিভিন্ন উদ্যোগে যুক্ত রয়েছেন তিনি।

২০১৬ সালে বরিশালের মান্তা জনগোষ্ঠীর মানুষের জীবনসংগ্রাম কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তার স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের সূচনা করে। নৌকায় বসবাস করা এসব মানুষের জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে জটিলতা, চিকিৎসাসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং সন্তানদের শিক্ষার অনিশ্চয়তা তাকে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে।

মান্তা জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ

বরিশাল অঞ্চলের মান্তা জনগোষ্ঠীর অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম নৌকায় বসবাস করে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় এসব পরিবারের অনেক সদস্য নাগরিক পরিচয়পত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পেতে সমস্যায় পড়েন।

এসব সমস্যা সমাধানে প্রথমে স্বাক্ষরতা, স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি সহায়তামূলক কার্যক্রমে যুক্ত হন আরিফুর রহমান। পরে নাগরিক অধিকার, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বিষয়েও কাজ শুরু করেন তিনি।

ইয়ুথনেট গ্লোবালের ‘মান্তাকানেক্ট’ উদ্যোগের মাধ্যমে মান্তা জনগোষ্ঠীর জন্য ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক সাক্ষরতা ও সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরিতে কাজ করা হচ্ছে। এ উদ্যোগে কর্মশালা পরিচালনা ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন আরিফুর রহমান।

সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, তার সম্পৃক্ততায় ৩০০ মান্তা সদস্যকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার আওতায় আনা হয়। স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় এ জনগোষ্ঠীর জন্য কবরস্থানের জমির ব্যবস্থা নিয়েও অধিকারভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া হয়।

দুর্যোগে সহায়তা, জীবিকা উন্নয়নেও ভূমিকা

কোভিড-১৯ মহামারির সময় ২০২০ সালে কর্মহীন ও নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যসংকট মোকাবিলায় কাজ করেন আরিফুর রহমান। যুব রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমে যুক্ত থাকার সময় তরুণদের নিয়ে কমিউনিটি কিচেনের মাধ্যমে সংকটে থাকা পরিবারগুলোর কাছে রান্না করা খাবার পৌঁছে দেন তিনি।

এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও পরবর্তী বিভিন্ন বন্যায় ফেনী, সিলেট, কুড়িগ্রাম, চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও রংপুরের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে খাদ্য, চিকিৎসা ও জরুরি সামগ্রী বিতরণে অংশ নেন।

দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসন ও জীবিকার সুযোগ তৈরিতেও কাজ করছেন তিনি। ২০২২ সাল থেকে কুড়িগ্রামে ইয়ুথনেট গ্লোবালের ‘চর ইয়ুথনেট কমিউনিটি’ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত আছেন আরিফুর রহমান।

সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, এ উদ্যোগের মাধ্যমে চরাঞ্চলের ৯৫টি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের আশ্রয়, জীবিকা ও জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে কাজ চলছে।

পরিবেশ শিক্ষায় যুক্ত ২৫ হাজার শিক্ষার্থী

শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানোর কাজেও যুক্ত রয়েছেন আরিফুর রহমান। ইকো অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের বিভিন্ন কার্যক্রম আয়োজন ও সমন্বয়ে তার ভূমিকা রয়েছে।

আয়োজকদের হিসেবে, বরিশাল অঞ্চলে এসব কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশদূষণ ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ঝালকাঠির ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠা ইয়ুথ ক্লাইমেট ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ৩০০ শিক্ষার্থী ও ২০ জন শিক্ষক। ক্লাবগুলোর সদস্যরা বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্লাস্টিকদূষণ প্রতিরোধে কাজ করছে।

বরিশালে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং কীর্তনখোলা নদীর দূষণ রোধেও কাজ করছেন আরিফুর রহমান। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু সুবিচার ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের দাবিতে বিভিন্ন উদ্যোগেও ভূমিকা রয়েছে তার। ইয়ুথনেট গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, এসব কার্যক্রমে দেশের ৫০টি জেলার প্রায় ১৫ হাজার তরুণ-তরুণী যুক্ত হয়েছেন।

আরিফুর রহমান বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, তরুণরাই পারে সমাজ বদলাতে।” তার মতে, পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে কাজে লাগানো জরুরি। তরুণেরা যেন নিজেদের এলাকার সমস্যা চিহ্নিত করে স্থানীয় পর্যায় থেকেই সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারেন, সেটিই তার অন্যতম লক্ষ্য।

জলাভূমি সংরক্ষণ ও জলবায়ু সুবিচার

জলাভূমি পুনরুদ্ধার, জলবায়ু সহনশীল জীবিকা, নারীর অধিকার ও পরিবেশদূষণ প্রতিরোধের বিভিন্ন উদ্যোগেও যুক্ত রয়েছেন আরিফুর রহমান। ২০২৪ সাল থেকে ঢাকার নগর জলাভূমি পুনরুদ্ধারবিষয়ক ‘রি-ওয়েট’ প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় কাজ করছেন তিনি। প্রকল্পটিতে জলাভূমি সংরক্ষণের পাশাপাশি কড়াইলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের পরিবেশবান্ধব জীবিকার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ রয়েছে।

সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীদের জীবনসংগ্রাম তুলে ধরতে ইয়ুথনেট গ্লোবালের ‘টাইগার উইডো’ উদ্যোগেও ভূমিকা রেখেছেন তিনি।

পাশাপাশি ‘ইকো-মেন’ উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণ পুরুষদের মধ্যে ক্ষতিকর সামাজিক ধারণা পরিবর্তন, পরিবারের যত্নের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং নারীর নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন বাড়াতে কাজ করছেন।

শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর সিসাদূষণ প্রতিরোধেও যুক্ত রয়েছেন আরিফুর রহমান। ২০২৫ সালে ইউনিসেফ ও পিওর আর্থ বাংলাদেশের সহযোগিতায় ইয়ুথনেট গ্লোবাল দেশের ৬৪ জেলায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে।

সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, এসব কার্যক্রমে সরাসরি অংশ নেন দুই হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ এবং প্রশিক্ষণ পান তিন শতাধিক তরুণ সংগঠক।

স্থানীয় অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক আলোচনায়

স্থানীয় পর্যায়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় তুলে ধরার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছেন আরিফুর রহমান।

জলবায়ু অর্থায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা, স্থানীয় নেতৃত্বে অভিযোজন ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে ইয়ুথনেট গ্লোবালের বিভিন্ন উদ্যোগে তরুণদের সম্পৃক্ত করেছেন তিনি।

২০২৪ সালে ‘গ্লোবাল ডায়ালগ ফর ক্লাইমেট জাস্টিস’ উদ্যোগে বাংলাদেশসহ আট দেশের তরুণদের যুক্ত করার কাজে অংশ নেন আরিফুর রহমান। ঢাকায় জাতীয় যুব জলবায়ু সংলাপ আয়োজনেও তাঁর ভূমিকা ছিল। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দাবিকে জলবায়ু নীতিনির্ধারণী আলোচনায় তুলে ধরার চেষ্টা করছেন তিনি।

জাতীয় পর্যায়ে ‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ পাওয়ার আগে ২০২৫ সালে ঝালকাঠি জেলার শ্রেষ্ঠ যুব সংগঠক হিসেবেও স্বীকৃতি পান আরিফুর রহমান। বিবিএ সম্পন্ন করে বর্তমানে এলএলবি পড়ছেন তিনি। আইনের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা তার।

ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বলেন, আরিফুর রহমান মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে কখনো দয়া বা দান হিসেবে দেখেননি। তিনি কাজ করেছেন মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য। তার এই অর্জন তরুণদের সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার সম্ভাবনাকে তুলে ধরে।

তিনি বলেন, আরিফুর রহমানের এ স্বীকৃতি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সুবিচারের জন্য কাজ করা তরুণদের উৎসাহিত করবে। মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তার প্রচেষ্টা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।