টাঙ্গাইলে সেতুতে রডের বদলে বাঁশ: এবার প্রকৌশলীকে ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’
মরাগাঙ্গী নদীর ওপর ৯০ দশমিক শূন্য ছয় মিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ১০ কোটি নয় লাখ ৯২ হাজার টাকা।
টাঙ্গাইলের বাসাইলে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনায় উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে কাজী ফাত্তাউরকে বাসাইল উপজেলা থেকে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়।
প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান নিজেই স্ট্যান্ড রিলিজের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অফিস আদেশে বলা হয়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কাজী ফাত্তাউরকে স্ব-বেতন স্কেলে বদলি করা হইল। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাকে অবমুক্ত হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে।
সেইসঙ্গে আর্থিক ক্ষমতাসহ উপজেলা প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্ব (ষষ্ঠ গ্রেডভুক্ত উপজেলা প্রকৌশলী পদায়ন না করা পর্যন্ত) প্রদান করা হয়।
সেতুতে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনাটি এখন সারা দেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দফায় দফায় চলছে তদন্ত। এ ঘটনায় মামলার পর সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এখন পর্যন্ত একজন উপ-সহকারীকে বরখাস্ত এবং নির্বাহী প্রকৌশলীসহ দুই প্রকৌশলীকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিস দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে অভিযানে নেমেছে দুদক।
বুধবার দুদক টাঙ্গাইলের কার্যালয় থেকে সেতুটিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. বিপ্লব হোসেন।
দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক বিপ্লব হোসেন বলেন, “প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, এখানে দুর্নীতি হয়েছে। আমরা ফুটপাত স্ল্যাব ও রেলিংয়ের পিলার ভেঙে দেখেছি। এখানে রডের পরিমাণটা কম রয়েছে। রড ততটুকু থাকা দরকার, সেটুকু নেই।
“সরেজমিনে যে প্রতিবেদন তৈরি করেছি, সেটা আমাদের এক্সপার্ট আছে, ওনারা সরেজমিন প্রতিবেদন দেবে। সেটার ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিক সত্যতা পেলে কমিশনকে বিস্তারিতভাবে জানাব। তারপর কমিশন থেকে যে নির্দেশনা দেবে আমরা পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করব।”
বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া এলাকায় মরাগাঙ্গী নদীর ওপর ৯০ দশমিক শূন্য ছয় মিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণ করা হচ্ছিল। এতে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১০ কোটি নয় লাখ ৯২ হাজার টাকা। কাজটি করছে মেসার্স ইউনুছ আল মামুন ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ নামের যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া কাজটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। তবে নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় সময় বাড়ানো হয়। বর্তমানে সেতুটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন সেতুর ফুটপাতের স্ল্যা তৈরিতে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার করে ঢালাই শুরু করেন। স্থানীয়রা বিষয়টি দেখে বাধা দিলে কাজ বন্ধ রাখা হয়। এ সময় ঘটনাটি মোবাইলে ধারণ করেন কেউ কেউ।
স্থানীয়রা চলে যাওয়ার পর রাতে আবার ঢালাই শেষ করা হয়। পরে স্থানীয়দের ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ালে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এ খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেতুটি পরিদর্শন ও তদন্তের উদ্যোগ নেয়।
এলজিইডির অফিস আদেশে বলা হয়, নির্মাণসামগ্রীর পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করায় সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ কারণে বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
এ ছাড়া দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে টাঙ্গাইল জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানারা পারভীন এবং বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
ঘটনার তদন্তে বাসাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইকবাল হোসেনের স্বাক্ষরে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত) মো. আহাদি হোসেনকে আহ্বায়ক এবং বাসাইল পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রবিউল আলম ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেনকে সদস্য করা হয়েছে।
