দুই বছর বন্ধ কসবার তারাপুর সীমান্ত হাট, ফিরতে চান ব্যবসায়ীরা

করোনার সংক্রমণ কমে আসার পরও হাট খুলে না দেওয়ায় হতাশার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 28 Sept 2022, 08:03 PM
Updated : 28 Sept 2022, 08:03 PM

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার তারাপুর সীমান্ত হাটটি করোনা মহামারীর কারণে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ আছে। বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়া ব্যবসায়ীরা দ্রুত বেচাকেনায় ফিরতে চান।

বাংলাদেশ-ভারত সরকারের যৌথ অর্থায়নে করা হাটটি ব্যবসার জন্য যতটা না চাঙা ছিল, তার চেয়ে বেশি সমৃদ্ধ ছিল দুই দেশের মানুষের সম্প্রীতির মেলবন্ধন তৈরিতে। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে হাট না বসায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সম্পর্কেও ছেদ পড়েছে খানিকটা।

ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সুবিধার্থে ২০১৫ সালের জুনে দুই দেশের যৌথ মালিকানায় যাত্রা শুরু হয় কসবা সীমান্ত হাটের। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সিপাহীজলা জেলার কমলাসাগর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার তারাপুর সীমান্তে এ হাটের অবস্থান।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাটে দুই দেশের ৫০টি করে মোট ১০০টি দোকান আছে। প্রতি রোববার সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলতো হাটের বেচাকেনা। মূলত সীমান্তের ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকার বাসিন্দাদের কেনাকাটার জন্যই প্রতি হাটবার এক হাজার মানুষকে হাটে প্রবেশের জন্য টিকিট দেওয়া হতো।

তবে সীমান্ত এলাকার বাইরের লোকজনও নিয়মিত আসতেন হাটে। তারা মূলত ভারতীয় পণ্য কিনে নিয়ে যেতেন। তাই হাটে ভারতীয় পণ্যের চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি।

কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব শুরু হলে ২০২০ সালের ১০ মার্চ থেকে হাটের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে দুই দেশের সীমান্ত হাট ব্যবস্থাপনা কমিটি।

করোনার সংক্রমণ কমে আসার পরও হাট খুলে না দেওয়ায় হতাশার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

হাট বন্ধ হওয়ার আগে ব্যবসায়ীদের কেনা বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী অবিক্রিত রয়ে গেছে; দীর্ঘদিন পড়ে থেকে নষ্ট হয়েছে অনেক পণ্য। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ রাখলেও ব্যবসায়ীদের জন্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থা করেনি হাট ব্যবস্থাপনা কমিটি।

বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা হাটটি দ্রুত খুলে দেওয়ার দাবি জানালেও কবে নাগাদ তা খুলবে সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছে না হাটের বাংলাদেশ অংশের ব্যবস্থাপনা কমিটি সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে প্রতি হাটবারে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের একেকজন ১০-২০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করতে পারতেন। আর ভারতীয় ব্যবসায়ীরা জনপ্রতি বিক্রি করতেন ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার পণ্য। ভারতীয় পণ্যগুলোর মধ্যে প্রসাধনী, শাড়ি, থ্রি-পিস ও শিশুদের ডায়াপারের চাহিদা ছিল বেশি। আর বাংলাদেশি পণ্যগুলোর মধ্যে বেশি বিক্রি হতো কাপড়, প্লাস্টিক ও লৌহজাত পণ্য এবং ক্রোকারিজ সামগ্রী।

হাট ব্যবস্থাপনা কমিটির দেওয়া তথ্য মতে, হাট বন্ধ হওয়ার আগে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে ২৬ লাখ ৯৮ হাজার টাকার বাংলাদেশি পণ্য বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া ২০২০ সালের জানুয়ারি ৩৭ লাখ ৭২ হাজার টাকার এবং ফেব্রুয়ারিতে ২০ লাখ ৭৭ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করেছেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা।

দীর্ঘদিন ধরে হাট না বসায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বিকল্প ভালো কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী অর্থকষ্টেও আছেন। হাটটিও ঝোপ-ঝাড়ে পরিণত হয়েছে।

হাটের বাংলাদেশি ব্যবসায়ী লিটন কর্মকার জানান, হাটে তিনি দা-বটিসহ গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করতেন। হাট বন্ধ হওয়ার আগে দোকানে দুই লাখ টাকার পণ্য তুলেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেইসব পণ্য নিয়ে বিপাকে পড়েন তিনি। পরে স্থানীয় বাজারে কম দামে কিছু পণ্য বিক্রি করেন; তবে এখনও বেশ কিছু পণ্য অবিক্রিত থেকে গেছে।

এ ছাড়া তার দোকানে যে দুইজন শ্রমিক কাজ করতেন, হাট বন্ধ হওয়ায় তারাও এখন কর্মহীন হয়ে অর্থকষ্টে আছেন দাবি করে তিনি জানান, হাট ব্যবস্থাপনা কমিটিও তেমন কোনো সাহায্য-সহযোগিতা করেনি।

ওয়ালিউল্লাহ সরকার নামে আরেক ব্যবসায়ী জানান, হাটে তার কাপড়ের দোকান ছিল; দোকানের অন্তত দেড় লাখ টাকার কাপড় নষ্ট হয়েছে। কারণ সেগুলো শীতের কাপড় ছিল। 

দীর্ঘ সময় ধরে হাট বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন জানিয়ে তিনি দ্রুত সীমান্ত হাট খুলে দেওয়ার দাবি জানান।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কসবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সীমান্ত হাট ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য মাসুদ উল আলম জানান, বিষয়টি দ্বিপাক্ষিক। তবে হাট খোলার ব্যাপারে তাদের (ভারত অংশের ব্যবস্থাপনা কমিটি) আগ্রহ আছে। দুই দেশের সরকারি সিদ্ধান্তে হাট খুলে দেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত হাট খোলার ব্যাপারে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। নির্দেশনা পেলে হাটের প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ শেষে খুলে দেওয়া হবে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক