নাটোরে ৩ নারীকে জুতার মালা পরিয়ে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল, ‘যুবদল কর্মীর’ বিরুদ্ধে অভিযোগ
একই ঘটনায় একটি ঘরে আটকে রেখে ফাঁকা স্ট্যাম্পে জোর করে ‘স্বাক্ষর নেওয়া’ ও ‘মারধরের’ অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা।
নাটোরের গুরুদাসপুরে ‘কালো জাদু’ করার অপবাদ দিয়ে একই পরিবারের তিন নারী সদস্যকে তুলে এনে জুতার মালা পরিয়ে প্রকাশ্যে সড়কে ঘোরানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
গুরুদাসপুর পৌরসভার গাড়িষাপাড়া এলাকায় ঘটা এ ঘটনার পেছনে স্থানীয় যুবদল কর্মী জিয়াউর রহমান জিয়া ও তার ভাই ইয়ারুল ইসলামের নাম এসেছে।
এ হেনস্তার দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই জেলা জুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
জিয়াউর রহমান যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয়রা দাবি করলেও তার কোনো দলীয় পদ-পদবি নেই বলে জানিয়েছেন জেলা যুবদলের সভাপতি এ হাই তালুকদার ডালিম।
একই ঘটনায় একটি ঘরে আটকে রেখে ফাঁকা স্ট্যাম্পে জোর করে ‘স্বাক্ষর নেওয়া’ ও ‘মারধরের’ অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সোমবার বিকালে গুরুদাসপুর পৌরসভার গাড়িষাপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটলেও রাত ১২টার দিকে বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে বলে জানিয়েছেন গুরুদাসপুর থানার ওসি মো. আব্দুল হান্নান।
অভিযোগের মুখে থাকা জিয়াউর রহমান জিয়া ও তার ভাই ইয়ারুল ইসলাম গাড়িষাপাড়ার আকবর আলী সরদারের ছেলে।
এ ঘটনার একটি ভিডিও এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়-তিন নারীর গলায় জুতার মালা পরিয়ে গাড়িষাপাড়া এলাকার একটি পাকা সড়কে ঘোরানো হচ্ছে। তাদের পেছনে উৎসুক মানুষের ভিড়; কেউ কেউ হৈ-হুল্লোড় করছেন।
ভিডিওটির অন্য অংশে জিয়াউর রহমান জিয়ার বাড়ির একটি কক্ষে তিন নারীকে আটকে রাখা অবস্থায় দেখা যায়। সেখানে স্থানীয় ছাবলু নামের এক ব্যক্তি স্থানীয় সংবাদকর্মীদের উপস্থিতিতে তাদের কাছ থেকে ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিচ্ছেন। এ সময় পাশে মোবাইল ফোন হাতে জিয়াউর রহমান জিয়াকেও দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ওই তিন নারী ‘কুফরি কালাম’ ও ‘কালো জাদু’ করে জিয়াউর রহমান জিয়ার ভাতিজি ও ইয়ারুল ইসলামের মেয়েকে ‘বান’ মেরেছেন অভিযোগে তুলে তাদের ধরে আনা হয়।
পরে জোর করে জুতার মালা পরিয়ে সড়কে ঘোরানো হয়। তাদের কাছ থেকে ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া এবং ‘হালকা মারধর’ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
ভুক্তভোগীদের বিবরণ অনুযায়ী- জিয়াউর রহমান জিয়া (স্থানীয়ভাবে জিয়ারুল নামে পরিচিত), রাতুল, তৌহিদ ও মোমিনসহ একদল ব্যক্তি একত্রিত হয়ে ভুক্তভোগী নারী, তার মেয়ে এবং বয়স্ক মায়ের ওপর এই বর্বর নির্যাতন চালায়। চক্রটি অমানবিক উপায়ে তাদের চুল ধরে টানাটানি করে এবং লাথি, কিল-ঘুষি ও চড় মেরে গুরুতর রক্তাক্ত করে। তাদের চোখে কাঁচা মরিচ ডলে দেওয়া এবং গায়ে গরম পানি ঢেলে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অপরাধ ‘স্বীকার করানোর’ চেষ্টা চালায়।
পরবর্তীতে ভুক্তভোগী তিন নারীকে জোরপূর্বক জুতার মালা পরাতে বাধ্য করা হয় এবং এলাকা জুড়ে ঘোরানো হয়। এ সময় তাদের কাছে থাকা স্বর্ণালঙ্কার ও চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
তাদের ভাষ্য, নির্যাতনের এক পর্যায়ে জোর করে সাদা কাগজ ও স্ট্যাম্পে তাদের কাছ থেকে টিপসই ও স্বাক্ষর আদায় করে নেওয়া হয়। পাশাপাশি ঘটনাটি কাউকে জানালে বসতবাড়িতে আগুন দেওয়া এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে জানান, তাদের বিরুদ্ধে বানোয়াট অভিযোগ আনা হয়েছে। সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে।
ন্যায়বিচারের আশায় তারা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তারের জোর দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে যুবদল কর্মী জিয়াউর রহমান জিয়ারও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কথা বলেছেন তার ভাই ইয়ারুল ইসলাম।
ইয়ারুল ইসলাম বলছেন, “আমার ছোট ভাই যুবদল করে। আমার মেয়েকে ওরা ‘বান’ মেরেছে। এক হুজুর আমাদের জানিয়েছেন যে, ওরা বান মেরেছে। আমার মেয়ে তখন মুমূর্ষু অবস্থায় বলে সে মারা যাওয়ার পর হলেও যেন ওদের বিচার করি।”
তিনি বলেন, “আমার মেয়ে কান্নাকাটি করে এলাকার মানুষকে বিষয়টি জানালে এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে ওই তিন নারীকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসে। পরে তারা হাত ধরে মাফ চেয়ে সাদা স্ট্যাম্পে সই করেছেন, আর এ ধরনের কাজ করবেন না বলে জানিয়েছেন। এলাকার লোকজনই ওই তিন নারীকে জুতার মালা পরিয়ে এলাকায় ঘুরিয়েছে।”
ফিরোজ সরকার নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেছেন, “ওই তিন নারী আমাদের বাচ্চাকে বান মেরেছে। ওরা ওইসব খারাপ কাজকর্ম করে। এলাকার মানুষ সবাই অতিষ্ঠ। এই খারাপ কাজ যেন এরা আর না করতে পারে।”
ওসি মো. আব্দুল হান্নান বলেন, “তিন নারীকে জুতার মালা পরিয়ে সড়কে ঘোরানোর বিষয়ে এখন কোনো অভিযোগ পায়নি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ ঘটনায় যুবদল কর্মীর নাম আসার প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নাটোর জেলা যুবদলের এ হাই তালিকদার ডালিম বলেন, “চব্বিশের ৫ অগাস্টের পরে অনেকেই দলে এসে ভিড় জমিয়েছেন। যেহেতু তার (জিয়াউর রহমান জিয়া) কোনো পদ পদবী নেই, তার কোনো দায় দলের নেই। এরকম কোনো কাজ যদি সে করে থাকে, তাহলে পুলিশ প্রশাসন আইনগত ব্যবস্থা নেবে।”
