আনন্দমোহন কলেজের নির্মাণকাজে চাঁদা দাবি, ম্যানেজারকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ
“ভাবতেও অবাক লাগে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আমাকে তুলে নিয়ে চাঁদা চাওয়া হয়েছে।”
ময়মনসিংহের আনন্দমোহন সরকারি কলেজে ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন লাইব্রেরি-কাম-অডিটোরিয়াম ভবনের নির্মাণকাজে বাধা ও চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে দুই দিন বন্ধ ছিল নির্মাণকাজ। এখনও আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নির্মাণকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
‘টিএই-বিবিসি-ডিসিএল’ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের অভিযোগ, গত ৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় ৮ থেকে ১০ জন ব্যক্তি তাদের ম্যানেজার মেজবাহ উদ্দিন সজলকে তুলে নিয়ে যান। প্রায় দুই ঘণ্টা আটকে রাখার পর মোটরসাইকেলে করে তাকে আবার কলেজে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
নির্মাণকাজে বাধা ও চাঁদা দাবির অভিযোগ তুলে কাজ বন্ধ রাখার বিষয়ে গত ১১ অক্টোবর কলেজ কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে লিখিত চিঠি দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।
ভুক্তভোগী মেজবাহ উদ্দিন সজল বলেন, “এমন পরিস্থিতির শিকার কোনো দিন হইনি। ভাবতেও অবাক লাগে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আমাকে তুলে নিয়ে চাঁদা চাওয়া হয়েছে। দুই ঘণ্টা আটকে রেখে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে।”
তবে যারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল তাদের নাম জানেন না জানিয়ে তিনি বলেন, “তারা প্রায়ই কলেজে ঘোরাফেরা করেন।”
ঘটনার বর্ণনায় সজল বলেন, “ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে ৮ থেকে ১০ জন কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন তাদের মধ্যে তিনজন আমাকে হুমকি দিয়ে কলেজ থেকে বাইরে নিয়ে যান। দশতলা ভবনের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখার পর মোটরসাইকেলে করে শহরের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়।
“এ সময় আমার কাছে টাকা দাবি করা হয়। আমি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার পরিচয় দিলে তারা মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে বলেন। অন্যথায় মেরে ফেলার হুমকি দেন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর মোটরসাইকেলে করে আমাকে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরে রাত ১২টার দিকে আবারও ৮ থেকে ১০ জন এসে বিষয়টি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখতে বলেন।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শ্রমিক বলছিলেন, “স্থানীয়রা এখানে যেভাবে এসে চাঁদা চায়, এভাবে কাজ করা সম্ভব নয়। কাজ বন্ধসহ মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। ম্যানেজারকে তুলে নিয়ে আঘাত করেনি। কিন্তু কি নিশ্চয়তা আছে যে, সামনে তার ক্ষতি করতে চাইবে না? আমরা চাই এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নিক।”
এদিকে সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার দিন সন্ধ্যার দিকে কয়েকজন যুবককে কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দেখা যায়।
কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, “যারা ম্যানেজারকে তুলে নিয়ে গেছে, তাদের কাউকে আমরা চিনি না।
“এমন ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা শঙ্কিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কথা বললেও শঙ্কা কাটছে না।”
এ বিষয়ে আনন্দমোহন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ এ কে এম সামসুজ্জামান বলেন, “ঘটনার দিন আমি ছুটিতে ঢাকায় ছিলাম। ঘটনাটি শোনার পর তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানালে তারা ঘটনাস্থলে আসে। এ ঘটনায় দুদিন কাজ বন্ধ থাকলেও এখন কাজ চলছে।”
বর্তমানে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলেও দাবি অধ্যক্ষের।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রাসেল মিয়া বলেন, “কাজ সুষ্ঠু ভাবে শেষ করতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। ঠিকাদারের ম্যানেজারের সাথে যা ঘটেছে তা অপ্রত্যাশিত। এমনটি পুনরাবৃত্তি হোক আমরা তা চাই না।”
এ ঘটনায় অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মুহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম বলেন, “শহরে চাঁদাবাজির কোনো সুযোগ নেই। তারা যদি আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দেয় তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি বলেন, “থানা, পুলিশ সুপার এবং ডিআইজি কার্যালয় থেকে হাঁটার পথ আনন্দ মোহন কলেজ, এখানে কেউ সন্ত্রাসী করে পার পাবেনা।”
শতবর্ষী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নকাজ ঘিরে এমন অভিযোগকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক শিক্ষার্থী ও জেলা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক এ কে এম আরিফুল হাসান।
তিনি বলেন, “দোষীদের বিচারের আওতায় আনা না হলে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
ময়মনসিংহের একটি সুপরিচিত নাগরিক সংগঠন ‘ময়মনসিংহ মঞ্চ’-এর মুখ্য সমন্বয়ক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “অভিযোগের দোহাই দিয়ে পুলিশ চাঁদাবাজদের চাঁদাবাচিতে সুযোগ করে দিচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।”
