স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরিদর্শনের কদিন পরেই হবিগঞ্জ হাসপাতাল আগের অবস্থায়
হাসপাতালের নোংরা পরিবেশ এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, চলাফেরার সময় বিভিন্ন স্থানে নাক চেপে ধরতে হয় বলে অভিযোগ রোগী ও স্বজনদের।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সর্দার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের আকস্মিক পরিদর্শনের পর হবিগঞ্জ সদর হাসপাতাল কয়েক দিন পরিপাটি থাকলেও আবারও আগের অবস্থা দেখা গেছে।
হাসপাতালের নোংরা পরিবেশ এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, চলাফেরার সময় বিভিন্ন স্থানে নাক চেপে ধরতে হয়। চিকিৎসা সেবায় অবহেলার অভিযোগও এনেছেন রোগী ও স্বজনরা।
তবে এসব ঘটনায় চিকিৎসক ও জনবল সংকটকে সামনে এনেছেন হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক আমিনুল হক সরকার।
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, ১০ টাকা দিয়ে জরুরি এবং পাঁচ টাকা দিয়ে বহির্বিভাগে টিকিট নিয়েও হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না। গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ বাহির থেকে কিনতে হয়।
এ ছাড়া রক্ত পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাম, এক্সরে ও ইসিজি ছাড়া সব পরীক্ষা বাহির থেকে করতে হয়। অনেক সময় এসব পরীক্ষা করতে গিয়েও রোগীদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। প্রায় সময়ই বিকল হয়ে পড়ে এসব পরীক্ষার যন্ত্রপাতি।
স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় বারান্দায় ও মেঝেতে বসে চিকিৎসা নিতে হয় রোগীদের। হাসপাতালের ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় ময়লা-আবর্জনা থাকায় সৃষ্টি হচ্ছে নোংরা পরিবেশ। বাথরুম ব্যবহারে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ঠিকমতো ব্যবহার করতে না পেরে ক্ষুব্ধ রোগী ও তাদের স্বজনরা।
বুধবার রাতে হাসপাতালে ভর্তি হন শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার লেঞ্জাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা নুরুল হক। বলেন, “ভর্তি হওয়ার পর ওষুধ পাচ্ছি না। নিজ খরচে বাহির থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। প্রয়োজন পড়লে নার্সদের ডাকতে হয়। এ ছাড়া তারা সাড়া দেন না।”
আট দিন আগে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত সন্তানকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন পার্শ্ববর্তী কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার আদমপুরের বাসিন্দা রিনা বেগম।
তিনি বলেন, “এখানে ভর্তির আগে প্রাইভেট হাসপাতালে বাচ্চার চিকিৎসা করাই। সেখানকার প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী এখানে চিকিৎসা করা হয়। আমার বাচ্চার কোনো উন্নতি হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে রোববার হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়েছি।”
বানিয়াচং উপজেলার ইকরাম গ্রামের সালমা বেগম বলেন, “আমার মেয়েকে পাঁচ টাকা দিয়ে টিকিট কিনে ডাক্তার দেখালে কিছু পরীক্ষা দেয়। হাসপাতালে এসব পরীক্ষা না থাকায় বাহির থেকে করি। পরে বৃহস্পতিবার বাচ্চারে ভর্তি দেয়। প্রতিদিন সকালে হাসপাতাল থেকে শুধু একটা ইনজেকশন দেওয়া হয়। বাকি সব বাহির থেকে কিনতে হয়।”
জেলা শহরের ইনাতাবাদ এলাকার বাসিন্দা এম সজলু মিয়া বলেন, সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনের পর কয়েকদিন হাসপাতালটি পরিপাটি ছিল। সেবার মানও মোটামুটি ভালো হয়ে ওঠে। কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই আবারও যেই সেই অবস্থা।
“নোংরা পরিবেশের জন্য হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে অনেক রোগীরাই অনীহা প্রকাশ করেন। এ ছাড়া মাঝে মধ্যে ডাক্তার ও নার্সদের আচরণে রোগীরা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন”, বলেন তিনি।
এর আগে ২৯ অগাস্ট দুপুরে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তখন তিনি হাসপাতালের মেডিসিন স্টোর, শিশু ওয়ার্ড, জরুরি বিভাগ, প্যাথলজি বিভাগ এবং রান্নাঘর ঘুরে দেখেন।
সেই সময় ফার্মেসিতে গিয়ে রিগান আহমেদকে অনুপস্থিত পাওয়ায় তাকে তাৎক্ষণিক সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরে বদলির আদেশ দেন মন্ত্রী। এ ছাড়া হাসপাতালের পরিবেশ নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর দেখে মন্ত্রী তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
পার্শ্ববর্তী জেলার হাসপাতালের তুলনায় এখানকার পরিবেশ অনেক বেশি নোংরা বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। পরিদর্শনকালে তিনি সাধারণ ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা রোগীদের খোঁজখবর নেন এবং ভোগান্তির কথা শোনেন।
চিকিৎসক ও জনবল সংকট নিয়ে পরবর্তীতে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন মন্ত্রী। সেখানে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও শয্যা বাড়ানোর আশ্বাস দেন তিনি।
মন্ত্রীর এসব কার্যক্রমের পর কয়েকদিন হাসপাতালটি পরিপাটি থাকলেও এখন আবারও আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। এতে সচেতন মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
হবিগঞ্জ প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মনসুর আহমেদ ইকবাল বলেন, “জেলাবাসীর একমাত্র ভরসা এই হাসপাতালটি। কিন্তু হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা দেখে হতাশা হতে হয়। রোগীদের অনেক পরীক্ষা বাহির থেকে করতে হচ্ছে।
“নোংরা পরিবেশ এমন অবস্থা যা খুবই দুঃখজনক। এ বিষয়ে দ্রুত কর্তৃপক্ষকে নজর দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আমিনুল হক সরকার বলেন, “আমরা রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে জনবল সংকট থাকায় কিছুটা হিমশিমে পড়তে হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে, সব সমস্যা সমাধান হবে বলে আশা করছি।”
