১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

তেল নেই, আয় নেই: পাহাড়ে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালকদের দুর্দশা

“আগে যা আয় করতাম, এখন তার অর্ধেকও হচ্ছে না। জীবনে এমন এটা পর্যায়ে গেছে আমাদের চুরি করা ছাড়া উপায় নাই।”

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Apr 2026, 06:01 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:17 PM

পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে যেখানে বড় যানবাহনের চাকা ঘোরে না, সেখানে খাগড়াছড়িবাসীর যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল। কিন্তু বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে পাহাড়ের এই প্রধান গণপরিবহন ব্যবস্থা।

পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় একদিকে চালকদের আয় বন্ধ হওয়ার উপক্রম, অন্যদিকে সাধারণ যাত্রীরা পড়েছেন দিশেহারা অবস্থায়। কোন কোন চালক ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা করে পাচ্ছেন ১০০ টাকার তেল।

এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের ফিলিং স্টেশন মালিকদের দাবি, তাদের কাছে কোনো তেল মজুত নেই। ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত সামান্য পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, যা পাম্পে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় গ্রাহকদের বাধ্য হয়ে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছেন তারা।

খাগড়াছড়ি মোটরসাইকেল চালক সমবায় সমিতির সভাপতি ফরিদুল ইসমার সুমন বলেছেন, “জেলায় অন্তত পাঁচ হাজার ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক রয়েছে, যারা বর্তমানে এই সংকটের কারণে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন।”

সরেজমিনে দেখা গেছে, খাগড়াছড়ির নয় উপজেলার বিভিন্ন মোটরসাইকেল স্টেশনে দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের।

চালকদের অভিযোগ, আগে যেখানে প্রতিদিন ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা আয় হতো, এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত তেল না পাওয়া যাচ্ছে না।

তারা বলছেন, এই তেল দিয়ে একজন পেশাদার চালকের সারাদিনের আয় তো দূরে থাক, নিজের খরচ চালানোও অসম্ভব। ফলে সময় নষ্ট হচ্ছে, আয়ও কমছে।

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙার মোটরসাইকেল চালক মো. আলামিন সকালে ছয় ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে ১০০ টাকার তেল পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।     

তিনি বলেন, “এক লিটারও তেল পাই না। ভাড়া কীভাবে মারব?। এক মাস ধরে এই অবস্থা। এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে যাচ্ছি। কিন্ত তেল নাই। এটায় তো আমাদের জীবিকা। তেল সংকটে যাত্রী পরিবহন বন্ধ রেখেছি।”  

আরেক মোটরসাইকেল চালক মো. ইব্রাহিম বলেন, “আমরা ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাই। কিন্তু গাড়ি জায়গা থেকে নাড়াতে পারছি না। সকালে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে দুপুরেও তেল পাই না।

“দুর্গম পাহাড়ে গণপরিবহন চলে না। সেখানে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলও ভরসা। এখন দুর্গম এলাকার যাত্রীরাও বিপাকে পড়েছে।”

তিনি বলেন, “আগে যা আয় করতাম, এখন তার অর্ধেকও হচ্ছে না। এখন জীবন এমন একটা পর্যায়ে গেছে আমাদের চুরি করা ছাড়া উপায় নাই।”

ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক মো. ফরহাদ বলেন, “আগে আমরা দিনে হাজার, বারোশ, পনেরশ টাকা ইনকাম করতাম। এখন দুইশ টাকা কামাইতে পারছি না। কীভাবে সংসার চালাব।?

তিনি বলেন, “অনেকে হয়তো বাইক চালিয়ে কর্মস্থলে যায় বা প্রয়োজনীয় যাতায়াত করে। আর এটাই আমাদের মূল জীবিকা। কীভাবে বাঁচব তার তো কোন দিশা পাচ্ছি না।”

জ্বালানি তেলে সংকট তীব্র হওয়ার পেছনে মজুদ কারণ কি-না জানতে চাইলে খাগড়াছড়ির ‘কেসি ফিলিং স্টেশনের’ ব্যবস্থাপক রাজেশ দে বলেন, “আমরা কোনো তেল মজুত করছি না। ডিপো থেকে যা পাই, সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ করছি।”

পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, “যাদের একান্ত প্রয়োজন, বিশেষ করে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল ও চান্দের গাড়ির চালকদের তেল প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”