নেত্রকোণার হাওরের অধিকাংশ ধান কেটে স্বস্তিতে কৃষক
জেলায় ১১ লাখ ৬৫ হাজার ১৬৫ টন ধান উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
সম্ভাব্য দুর্যোগ থেকে রক্ষায় হাওরের বোরো ফসল দ্রুত ঘরে তুলতে এক হাজারেরও বেশি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও রিপার মেশিন ব্যবহার করায় অনেকটাই স্বস্তিতে থাকার কথা জানিয়েছেন নেত্রকোণা হাওরপাড়ের কৃষকেরা।
জেলার স্থানীয় প্রশাসন উদ্যোগ নেওয়ায় বুধবার নাগাদ হাওরের মাঠে ৭০ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। মেশিনে দ্রুত ধান কাটার পাশাপাশি খরচও অনেকটা কম হচ্ছে- বলছেন চাষীরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নুরুজ্জামান জানান, ধান উদ্বৃত্ত জেলা নেত্রকোণার ১০ উপজেলায় হাওরাঞ্চল, সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চল মিলিয়ে এবার বোরো আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ছয় উপজেলার হাওরাঞ্চলে উফশি, হাইব্রিড ও স্থানীয় জাত মিলিয়ে আবাদ হয়েছে ৪০ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে।
এর মধ্যে আগামী ২৩ এপ্রিল আগাম বন্যার শংকার কথা মাথায় রেখে কৃষকদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ৮০ শতাংশ ধান পাকলেই সেই ধান যেন কাটা হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা নুরুজ্জামান এই নির্দেশনার কথা জানিয়ে বলেন, “ধানের শীষটির আগা থেকে গোড়া নাগাদ পাঁচ ভাগের চার ভাগ পাকলেই ধান কাটার সম্পূর্ণ উপযুক্ত হয়। এই অবস্থাটিকেই আমরা ৮০ ভাগ পাকা বলছি।”
আগাম বন্যা, শিলাবৃষ্টির মতো সম্ভাব্য দুর্যোগের কবলে কৃষকের ক্ষতি এড়াতেই যন্ত্রের সাহায্যে দ্রুত ধান কাটার উদ্যোগ নেয় স্থানীয় প্রশাসন।
নুরুজ্জামান জানান, সরকারি ভর্তুকি মূল্যে জেলায় ৭৭৬টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার, ১২১টি রিপার মেশিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও জেলার বাইরে থেকে আরো অন্তত দুইশোটি মেশিন আনা হয় ব্যক্তি উদ্যোগে। সব মেশিনই এখন দিন রাত হাওরের মাঠে ধান কাটায় ব্যস্ত রয়েছে।
“হাওরের ধান কাটা তিন থেকে চার দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। পরে সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চলের ধান পাকতে শুরু করবে। তখন হাওরের মেশিনগুলোই সেখানে ধান কর্তন শুরু করবে।”
ধান কর্তন ও শংকা নিয়ে সর্বশেষ তথ্য
নুরুজ্জামান বলেন, “একটি কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিনে আড়াই হেক্টর ও একটি রিপার মেশিন দিনে গড়ে ১ হেক্টর জমির ফসল কাটা হচ্ছে। এছাড়া কৃষকেরাও হাতে ধান কাটছেন। এতে করে বুধবার নাগাদ হাওরাঞ্চলের ৭০ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়ে গেছে।
“শুক্রবার নাগাদ আশা করছি ৯০ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে। তাছাড়া হাওরের নীচু এলাকার প্রায় সব ধানই কাটা শেষ হয়ে গেছে। বাকি হাওরের ১০ শতাংশ ধান সেটা উঁচু জমিতে। ওই ধানটাও এরই মাঝে কাটা হয়ে যাবে। ”
৩০ এপ্রিলের মধ্যে হাওরের সম্পূর্ণ ধান কর্তনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, “সম্ভাব্য আগাম বন্যা হলেও নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলে বোরো ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নাই বললেই চলে। এর পরেও মাঠ পর্যায়ে আমরা সতর্ক আছি, যেন আগাম বন্যা হলে যাতে এক ছটাক ধানের ক্ষতি না হয়।”
সোনার ধান গোলায় ভরে কৃষকের হাসি
এদিকে বোরো ধানে নেত্রকোণায় কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। হাওরে পানি আসার আগেই ধান কাটা প্রায় শেষের দিকে থাকায় কৃষকেরা আনন্দিত। ধানের ফলনও ভাল হয়েছে। এলাকার সব বয়সের মানুষেরাই মাঠের পাকা ধান কাটা, মাড়াইয়ে কাজ করছেন। তারা পার করছেন ব্যস্ত সময়। কাঠা প্রতি ছয়-সাত মণ করে ধান পাচ্ছেন বলে জানান কৃষকরা।
কৃষকেরা বলছেন, মেশিনে ধান কাটতে খরচ, সময় সবই কম হয়। এতে যেমন প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা মিলবে তেমনি লাভবানও হবেন তারা।
হাওর উপজেলা খালিয়াজুরীর বোয়ালি গ্রামের কৃষক রহিস উদ্দিন। তিনি এবার ৪৮ কাঠা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। তিনি প্রায় সব জমির ধানই কেটে শেষ করে ফেলেছেন।
রহিস উদ্দিন বলেন, “আমরার গ্রামে ৮টা মেশিন আইছে। আগে এসব আছিল না। এখনতো আমরা পানি আওয়ার আগেই তাড়াতাড়ি ধান কাইট্যা বাড়ি নিয়া আইয়াম।”
একই গ্রামের আরও অন্তত ১০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা হয়েছে। সবারই একই ধরণের কথা।
এদের মধ্যে মিলন আক্তার একজন। তিনি আবাদ করেছেন ৭৮ কাঠা। এর মধ্যে ব্রি-২৮ আবাদ করেছিলেন ২৮ কাঠা জমিতে। বাকি ৫০ কাঠাতে আবাদ করেছিলেন সুরভি জাতের ধান। ধান কাটা শেষ করেছেন তিনিও।
তিনি বলেন, “আগে হাতে ধান কাটাইলে খরচ বেশি হইছে। কাঠা প্রতি ১ হাজার ২০০ টাকা করে লাগতো। এখন মেশিনে অনেক কম টাকা লাগছে। কাঠা প্রতি ৫০০ টাকা কাটায় খরচ। তাড়তাড়ি ধানও কাটন যাইতাছে। খরচও কম। সবদিক দিয়াই আমরার লাভ।”
কৃষক আয়েন উদ্দিন বলেন, “প্রথমে সপ্তাহ খানেক আগে আগাম জাতের ধান পাকছে। এই ধান কাটছি। নিচের এই জমির ধান কাটতে কাটতে টানের জমিও কাটা লাগছে। এই জমিও কাটা প্রায় শেষ। আইজ কাইলের মধ্যে আমার ধান কাটা শেষ অইয়া যাবো।”
কৃষক জমির উদ্দিন বলেন, “এইবার ধান ভালাই হইছে। পানি, সার, বীজের সমস্যা হয় নাই। দিন রাইত ধান কাটতাছি। মাড়াইতাছি। রইদও আছে। ধানও শুকাইতাছি।
“আমরার অহন আনন্দ। কিছু ধান বেচন লাগতাছে। কিছু রেনাদেনা (ঋণ) আছিল। এইতা দেওন লাগতাছে। কাচা ধান মাঠেই রাইখ্যা বেইচ্যালতাছি। ৮৫০ ট্যাহা মণ দরে বেচ্ছি। ”
বোয়ালি গ্রামের সামনের হাওরের মাঠে কাঁচা ধান কিনছেন শহীদুল নামের এক পাইকার ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, “মাঠ থেকে সরাসরি কাঁচা ধান ৮১০ থেকে ৮৫০ নাগাদ মণ দরে কিনতাছি।”
এদিকে এবার হাওরে ধানের ভাল ফলন হয়েছে জানিয়ে মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বলেছেন, জেলায় এবার বোরো ধানের আশাতীত উৎপাদন হবে। জেলায় এক লাখ ৩৯ হাজার ৬৬ হেক্টর উফশি, ৪৫ হাজার ৪৯৫ হেক্টর হাইব্রিড আর ১৭৪ হেক্টর স্থানীয় জাতের বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এতে ১১ লাখ ৬৫ হাজার ১৬৫ টন ধান উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।
