হাইমচর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৪ চিকিৎসকের জায়গায় ৯, নেই এক্স-রে-ওটি
“শিশুসন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। প্রয়োজনীয় কয়েকটি পরীক্ষা এখানে করা যায়নি। সেগুলো বাইরে গিয়ে করাতে হয়েছে।”
চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক থাকার কথা ২৪ জন। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৯ জন।
কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুমোদিত ৯৫টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৪৩ জন। চিকিৎসকের পাশাপাশি অন্যান্য জনবলের ঘাটতিতেও ব্যাহত হচ্ছে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম।
শুধু জনবল নয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অবকাঠামোরও সংকট রয়েছে হাসপাতালটিতে। নেই এক্স-রে মেশিন, নেই অপারেশন থিয়েটার। চিকিৎসকদের বসার জন্যও পর্যাপ্ত কক্ষ নেই। দুটি কক্ষে একাধিক চিকিৎসককে বসে রোগী দেখতে হচ্ছে।
ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের প্রয়োজনীয় অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যেতে হচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা চাঁদপুর শহরে। গুরুতর রোগীদেরও অনেক ক্ষেত্রে চাঁদপুরে পাঠাতে হচ্ছে। নদীবেষ্টিত ও চরাঞ্চলের মানুষের জন্য এতে দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে রোগী, স্বজন ও হাসপাতালসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বারান্দায় রোগী দেখা
হাসপাতালে শয্যার সংকট থাকায় রোগীদের একটি অংশকে বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। হাসপাতালের বারান্দায় রোগীদের জন্য পাঁচটি ফ্যান লাগানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এতে রোগীদের ভোগান্তি পুরোপুরি কমছে না।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী বলেন, সংকটের মধ্যেই তাদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বেড না থাকলে বারান্দায় বসে বা শুয়ে থাকতে হয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার অনেক কিছুই হাসপাতালে করা যায় না। বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে হয়। গুরুতর রোগী হলে চাঁদপুরে নিয়ে যেতে বলা হয়।
আলগী দক্ষিণ এলাকা থেকে আসা রোগী আব্দুর রহমানের স্বজন আমিনুল ইসলাম বলেন, “হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিতে চাই। কিন্তু পরীক্ষা করানোর জন্য বাইরে যেতে হয়।
“আবার কোনো সমস্যা বেশি হলে চাঁদপুরে নিতে হয়। নদী পার হয়ে রোগী নিয়ে যাওয়া আমাদের জন্য খুব কষ্টের।”
শিশু রোগীদের ভোগান্তি বেশি
শিশুদের চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের স্বজনদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সুবিধার ঘাটতির কারণে তাদের বেশি দুর্ভোগে পড়তে হয়। বিশেষ করে অক্সিজেন দেওয়ার প্রয়োজন হলে সমস্যায় পড়তে হয় বলে জানান তারা।
আলগী এলাকার এক শিশুর স্বজন রাকিবুল ইসলাম বলেন, “শিশুরা অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা দরকার। এখানে এসে যদি অক্সিজেন বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়, তখন খুব ভয় লাগে। পরিস্থিতি খারাপ হলে চাঁদপুরে নিতে হয়।”
রোগীদের ভাষ্য, হাইমচরের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। নদী ও চরাঞ্চলের মানুষের জন্য উপজেলা পর্যায়ে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা না গেলে তাদের চাঁদপুর শহরে যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থ-দুটিই বেশি ব্যয় হয়।
২৪ চিকিৎসকের জায়গায় ৯ জন
হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহমুদুন নবী মাসুম জানান, হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ২৪টি। এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৯ জন। অর্থাৎ ১৫টি পদই শূন্য রয়েছে।
একইভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুমোদিত পদ রয়েছে ৯৫টি। কর্মরত আছেন ৪৩ জন। ফলে এই পর্যায়েও ৫২ জনের ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, “জনবল ঘাটতির কারণে চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। সীমিতসংখ্যক চিকিৎসককে বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে।”
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু ভবন নির্মাণ করলেই স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়বে না। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিশ্চিত না হলে নতুন অবকাঠামোরও পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাবে না।
নেই এক্স-রে, নেই ওটি
চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেই এক্স-রে মেশিন। ফলে দুর্ঘটনা, হাড়ের সমস্যা কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শে এক্স-রে প্রয়োজন হলে রোগীদের যেতে হয় বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা অন্য হাসপাতালে। এতে বাড়তি খরচের পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হয়।
শুধু এক্স-রে নয়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে নেই অপারেশন থিয়েটারও। অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হয়। অথচ দুর্ঘটনা কিংবা জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
নদীবেষ্টিত হাইমচরের মতো একটি উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসব মৌলিক সুবিধা না থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয়রা।
হাইমচরের গাজীপুর এলাকার বাসিন্দা খোরশেদ আলম বলেন, “অপারেশনের জন্য উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ায় আমাকে চাঁদপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে যেতে হয়েছে। হাইমচরে সেই চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই।”
অমেনা বেগম বলেন, “শিশুসন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। প্রয়োজনীয় কয়েকটি পরীক্ষা এখানে করা যায়নি। সেগুলো বাইরে গিয়ে করাতে হয়েছে।”
তাদের অভিযোগ, জরুরি অবস্থায় রোগীকে দ্রুত অন্য হাসপাতালে নেওয়া সব সময় সম্ভব হয় না। বিশেষ করে নদীপথ ও দূরত্বের কারণে চাঁদপুরে নিতে গেলে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ে। এতে জরুরি রোগীর চিকিৎসা পেতে দেরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ছয়বার সময় বাড়িয়েও শেষ হয়নি ভবনের কাজ
হাসপাতালের অবকাঠামোগত সংকট দূর করতে ২০১৯ সালে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ৫০ শয্যার জন্য নির্মাণাধীন চারতলা ভবনটির কাজ দীর্ঘ সময়েও শেষ হয়নি।
হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহমুদুন নবী বলছেন, আগের কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন করে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ভবনটির প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
নতুন ভবনের কাজ দ্রুত শেষ করে চালু করা গেলে হাসপাতালের বর্তমান সংকটের কিছুটা সমাধান হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বর্তমান ৩১ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন মাহমুদুন নবী।
তবে চারতলা নবনির্মিত ভবনটি ৫০ শয্যার জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে। ১০১ শয্যার হাসপাতাল করতে হলে ভবিষ্যতে আরও নতুন ভবন নির্মাণ করতে হবে।
আলগী এলাকার মো. শফিকুর রহমান, “এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে হাসপাতালের অবকাঠামো, জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।”
বিদ্যুৎ গেলে আইপিএসই ভরসা
জেনারেটরও নেই হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহমুদুন নবী মাসুম জানান, বিদ্যুৎ চলে গেলে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা চালিয়ে নিতে সমস্যায় পড়তে হয়।
বর্তমানে তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি আইপিএসের মাধ্যমে হাসপাতালের কিছু কার্যক্রম চালু রাখা হচ্ছে। তবে হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য জেনারেটরের মতো বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় তৈরি হচ্ছে ঝুঁকি।
বিশেষ করে জরুরি বিভাগ, শিশু রোগীর চিকিৎসা, অক্সিজেন সরবরাহসহ বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মাহমুদুন নবী মাসুম বলছেন, জরুরি মুহূর্তে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে এর প্রভাব রোগীর চিকিৎসায় পড়তে পারে।
হাইমচর উপজেলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম বলেন, “নদী ও চরাঞ্চলবেষ্টিত হাইমচরের মানুষের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি শুধু একটি হাসপাতাল নয়; জরুরি সময়ে এটিই তাঁদের সবচেয়ে কাছের ভরসা।
“সেই ভরসার জায়গাটিই যদি জনবল, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর সংকটে দুর্বল থাকে, তাহলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বেন প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র ও অসহায় রোগীরাই।”
