Published : 12 Oct 2025, 07:14 PM
জুলাইযোদ্ধাকে হেনস্তার অভিযোগে গ্রেপ্তার শ্রমিকের মুক্তি, ইউনাইটেড পরিবহনের ১৬ বাস বন্ধের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ময়মনসিংহ অঞ্চলের পাঁচ জেলা থেকে ঢাকাগামী বাস চলাচল বন্ধে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন যাত্রীরা।
রোববার সকাল থেকে ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, শেরপুর, জামালপুর ও কিশোরগঞ্জের (আংশিক) শ্রমিকরা পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেন। চার জেলার বাসও ময়মনসিংহ হয়েই ঢাকায় আসতে হয়। ফলে নেত্রকোণা, শেরপুর, জামালপুর ও কিশোরগঞ্জ থেকেও কোনো বাস ছাড়েনি।
ফলে ভোগান্তি শুরু ঢাকাগামী যাত্রীদের হচ্ছে না; বরং বাকি জেলাগুলো থেকে বিভাগীয় শহর ময়মনসিংহে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন যাত্রীরা। তাদেরকে বাসের বিকল্প যানে চলাচল করতে হচ্ছে। অনেককে ভেঙে ভেঙে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে।
শনিবারও ঢাকাগামী যাত্রীদের প্রায় সারাদিনই এই ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। তবে বিকালের পর ইউনাইটেড সার্ভিস ও সৌখিন পরিবহন ছাড়া ময়মনসিংহ থেকে অন্যান্য বাস চলাচল করেছে। বাকি চার জেলার বাসও ঢাকায় যাতায়াত করেছে। কিন্তু রোববার সকাল থেকে সব বাস বন্ধ হয়ে গেছে।
এর মধ্যেই বিকালে ময়মনসিংহে সংবাদ সম্মেলনে করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যদি রাত ৮টার মধ্যে এই অচলাবস্থার নিরসন না হয় তাহলে তারা কঠোর পদক্ষেপ নেবেন।
শুক্রবার রাতে নগরীর মাসকান্দা বাসস্ট্যান্ডে জুলাইযোদ্ধা আবু রায়হান এবং ইউনাইটেড বাস কাউন্টারের লাইম্যান অরুণ বিশ্বাসের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। এর জেরে ওই দিন রাত থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বাস কাউন্টারের সামনে অবস্থান নেন। এরপর পরিবহন শ্রমিক অরুণ বিশ্বাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার প্রতিবাদে পরিবহন শ্রমিকরা নগরীর বাসপাসে গিয়ে অবরোধ তৈরি করে রাখেন।
শনিবার বিকালে বৈঠকের পর উভয়পক্ষ নিজেদের অবস্থান থেকে সরে যান। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ সাগর হত্যা মামলার আসামি ও আওয়ামী লীগের জেলার সহসভাপতি আমিনুল হক শামীমকে গ্রেপ্তার ও তার মালিকানাধীন ইউনাইটেড সার্ভিসের ১৬টি বাস বন্ধের ঘোষণা পরিবহন শ্রমিকরা মেনে নেননি। তারপরই তারা ‘পরিবহন ধর্মঘটের’ ডাক দেন।
‘টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য এটা হচ্ছে’
পূর্ব ঘোষণা ছাড়া বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সকালে বাসস্ট্যান্ডে এসে বিপাকে পড়েন শত শত যাত্রী। পুনরায় তাদের ফেরত যেতে হয় বাসায়।
ঢাকাগামী যাত্রী হরেণ চন্দ্র বলেন, “বয়স হয়েছে খুব বেশি চলাচল করতে পারি না। সকালে মাসকান্দা বাস টার্মিনালে এসে বাস বন্ধ পাই। পরে মেয়ে এবং মেয়ের জামাইকে নিয়ে পুনরায় বাসায় চলে যাই। এটা একটা ভোগান্তি।”
আরেক যাত্রী আনোয়ার হোসেন বলেন, “ঢাকা যাব বলে নালিতাবাড়ি থেকে ময়মনসিংহ শহরে ভেঙে ভেঙে এসেছি। এসে দেখি বাস চলছে না। খুব প্রয়োজন ছিল ঢাকায়। পূর্ব ঘোষণা ছাড়া হুটহাট করে বাস বন্ধ মেনে নেওয়ার মত নয়।”
চাকরিচ্যুত ইউনাইটেড সার্ভিসের ব্যবস্থাপক রতন পণ্ডিত বলেন, “৩২ বছর ধরে মাসকান্দা বাস টার্মিনালে আছি। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির সময় পার করেছি। কিন্তু এমন পরিস্থিতির শিকার কখনো হয়নি।
“হেনস্থা এখানে মুখ্যবিষয় নয়। একটি পক্ষ বাস টার্মিনাল তাদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য এমন করছে। ১৬টি বাস বন্ধ হলে কয়েকশ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে। তাদের দায়ভার কে নেবে? বাসস্ট্যান্ডকে রাজনীতির উর্ধ্বে রাখতে হবে। অন্যথায় এই সমস্যার সমাধান হবে না।”
বাস চালক রায়হান বলেন, “আমরা আওয়ামী লীগ-বিএনপি বুঝি না। কাজ করে পরিবারের মুখে আহার দেই। তারা যে দাবি করছে বাস বন্ধের সেটা কোনো ভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। তাহলে সারা বাংলাদেশের সব বাস বন্ধ করতে হবে। বাসস্ট্যান্ডে এনসিপির নিয়ন্ত্রণ চলবে না।”
ময়মনসিংহ জেলা মোটর মালিক সমিতির সভাপতি ও জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলমগীর মাহমুদ আলম বলেন, “দুর্ভোগ নিরসনে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। বাস বন্ধ থাকার কারণে সবার সমস্যা হচ্ছে। আশা করছি, খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটি সুন্দর সমাধানে যেতে পারব।”
জেলা প্রশাসক মো. মফিদুল আলম বলেন, “আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা নিরসনের চেষ্টা চলছে। আমরা একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছি। তারা দেখছে, সেখানে ‘ফ্যাসিস্টের’ গাড়ি চলে কি-না? ‘ফ্যাসিস্টের’ কেউ চাকরি করছে কি-না? তারপরই সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
‘‘ফ্যাসিস্টদের’ বাস চলবে না’
রাত ৮টার মধ্যে বাস চলাচল স্বাভাবিক না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ ও আহত সেলের ময়মনসিংহ বিভাগের নেতারা।
বিকালে ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে ‘বাস চলাচলে সিন্ডিকেট বিরোধী জরুরি সংবাদ সম্মেলন’ করে তারা এই হুঁশিয়ারি দেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শহীদ ও আহত সেলের ময়মনসিংহ বিভাগের সমন্বয়কারী আল নূর আয়াস।
এতে বলা হয়, “ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসরদের কোনো বাস ময়মনসিংহ বিভাগে চলাচল করতে পারবে না। আওয়ামী দোসর নিয়ে যারা সিন্ডিকেট চালাচ্ছে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।
“উন্নত বাসের ব্যবস্থা করে যাত্রী সেবা বাড়াতে হবে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা সরকারি ছুটিতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ করতে হবে। শ্রমিকদের চিকিৎসা, সাপ্তাহিক ছুটি এবং জীবন মানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে জুলাই শহীদ সাগরের বাবা আসাদুজ্জামান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা কমিটির সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক বোরহান সুলতান মুগ্ধ, সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব আরিফ হাসান তমাল, মো. সাইফ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন:
জুলাইযোদ্ধা লাঞ্ছিত, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে ময়মনসিংহ-ঢাকা সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত