কক্সবাজার সৈকতে দেবীকে বিদায়, লাখো মানুষের ঢল
সৈকতের লাবণী পয়েন্টে অন্তত ৪০০টি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় বলে ভাষ্য আয়োজকদের।
কক্সবাজার সৈকতে তখনো মানুষের ঢল। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে, বিসর্জনও শেষ হয়েছে। এর মধ্যেই সড়কের ভিড় ঠেলে সৈকতের দিকে এগিয়ে আসছিল ইন্দ্রসেন দুর্গাবাড়ির প্রতিমা।
শহরের সবচেয়ে পুরোনো পূজামণ্ডপগুলোর একটি ইন্দ্রসেন দুর্গাবাড়ির অন্যতম সংগঠক বিপুল সেন বলছিলেন, প্রতিবছরই প্রতিমা বিসর্জন দেখতে সৈকতে প্রচুর মানুষ আসেন। তবে গত কয়েক বছরের মধ্যে এবার মানুষের সমাগম তার চোখে সবচেয়ে বেশি।
“এবার এত মানুষ হয়েছে, যেদিকে চোখ যাচ্ছে, তত দূর পর্যন্ত শুধু মানুষ,” বলছিলেন তিনি।
বিপুল সেনের মত আয়োজকদের কাছে এবারের বিসর্জন ছিল জনসমাগমের দিক থেকে ব্যতিক্রমী। দুপুর থেকে শুরু হওয়া আয়োজন গড়ায় সন্ধ্যা পর্যন্ত। সড়কে মানুষের ভিড়ে ইন্দ্রসেন দুর্গাবাড়ির প্রতিমা সৈকতে আনতেও কিছুটা বেগ পেতে হয় তাদের।
দিনভর তীব্র গরমও যেন উৎসবে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার কক্সবাজারে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেই গরম উপেক্ষা করেই লাবণী পয়েন্ট ও আশপাশের সৈকতে ভিড় করেন মানুষ।
বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে কক্সবাজারে শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। দেশের অন্যতম বৃহৎ এই বিসর্জন আয়োজনে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে।
সিঁদুরে বরণ, ঢাক-ঢোল আর উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান ভক্তরা। তাদের প্রার্থনা- অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে আগামী বছর আবারও ফিরে আসবেন দেবী।
চার শতাধিক প্রতিমা, লাখো মানুষের সমাগম
আয়োজকদের হিসাবে, কক্সবাজার সৈকতের লাবণী পয়েন্টে অন্তত ৪০০টি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। এ আয়োজন দেখতে তিন থেকে চার লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল বলে ধারণা তাদের।
কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও বান্দরবানের লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে প্রতিমা নিয়ে আসেন পূজারীরা। তবে চকরিয়া ও পেকুয়ার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয় মাতামুহুরী নদীতে।
বিসর্জন ঘিরে লাবণী পয়েন্ট থেকে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পর্যটকেরাও এই আয়োজনে অংশ নেন।
দুর্গাপূজা ও প্রবারণা পূর্ণিমার ছুটি ঘিরে কক্সবাজারের লাবণী, সুগন্ধা, হিমছড়ি ও ইনানীসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রেও ছিল দর্শনার্থীদের ভিড়।
জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু বলেন, প্রশাসনের সহযোগিতায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই বিসর্জন আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি বলেন, এবার কক্সবাজারে ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৫টিতে প্রতিমাপূজা এবং ১৬৯টিতে ঘট পূজা হয়।
সম্প্রীতি ও নাগরিক অধিকারের আশ্বাস
বিসর্জন অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন।
বক্তব্যে তিনি বলেন, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা সরকারের লক্ষ্য।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বী, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, মুসলমান ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীসহ সব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে স্থানীয়দের জমি ও জায়গা দখলের অভিযোগের প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। এ ধরনের অভিযোগের প্রতিকারের আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, নাগরিকদের ন্যায্য দাবিগুলোর বিষয়ে প্রশাসনের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, পূজামণ্ডপে সরকারি সহায়তার পরিমাণ বাড়ানো এবং দুর্গাপূজার ছুটি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদাহরণ।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, বিসর্জন উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। পর্যটকদের হয়রানি বন্ধ ও সেবা নিশ্চিত করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালতও মাঠে ছিল।
