অশ্রু আর ভালোবাসায় বিসর্জনযাত্রা
বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে আসা প্রতিমা নিয়ে শুরু হওয়া এ যাত্রার গন্তব্য বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাট।
শঙ্খনাদ, উলুধ্বনি, ঢাকের বাদ্য আর চারদিকে ভক্তদের ‘বলো দুগ্গা মাই কি জয়’ ধ্বনির মধ্য দিয়ে আনন্দ ও বিষাদের মিশ্র অনুভূতিতে শুরু হয়েছে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের বর্ণাঢ্য বিজয়া শোভাযাত্রা।
বুধবার বিকাল ৪টায় রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির (পলাশী মোড়) থেকে এ যাত্রা শুরু হয়।
রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে আসা প্রতিমা নিয়ে জগন্নাথ হল, দোয়েল চত্বর, গুলিস্তান মোড়, নবাবপুর রোড ও রায়সাহেব বাজার হয়ে বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটে গিয়ে এই শোভাযাত্রা শেষ হওয়ার কথা। রাত ১০টার মধ্যে শোভাযাত্রা গন্তব্যে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার দিন ‘কন্যারূপে’ মর্ত্যে আসা দেবী দুর্গা টানা পাঁচ দিনের পূজার পর দশমীর দিন পিতৃগৃহ ছেড়ে কৈলাসে স্বামীগৃহে ফিরে যান। অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে দেবীর এই বিজয়ের কারণে দিনটি ‘শুভ বিজয়া’ হিসেবে উদযাপিত হলেও বিদায়বেলায় ভক্তদের হৃদয় বিষাদে আপ্লুত হয়।
দশমী বিহিত পূজা ও সিঁদুর খেলা
এদিন সকালে বিজয়া দশমীর শাস্ত্রীয় আনুষ্ঠানিকতা এবং দুপুরে সধবা নারীদের সিঁদুর খেলার মধ্য দিয়ে বিদায়পর্ব শুরু হয়।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সকাল ৭টায় দশমীর বিহিত পূজা শুরু হয়। সকাল ৯টায় দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে পূজার শাস্ত্রীয় সমাপ্তি ঘটে। এরপর সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলে বিজয়া দশমীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ—সিঁদুর খেলা।
স্বামীর দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনায় সধবা নারীরা দেবীর চরণে সিঁদুর নিবেদন করেন। এরপর তারা একে অপরের কপালে ও গালে সিঁদুর মেখে উল্লাসে মেতে ওঠেন।
বঙ্গভবনে শুভেচ্ছা বিনিময় ও ‘রাষ্ট্র সবার’
বিজয়া দশমী উপলক্ষে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের শুভেচ্ছা বিনিময়ের আয়োজন করা হয়। সেখানে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পূজা কমিটির প্রায় ১০০ সদস্য অংশগ্রহণ করেন।
মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশিষ কুমার বিশ্বাস সাধন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের মধ্যে যে সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে উঠেছে, তা ধরে রাখতে চাই। এ বন্ধনকে ধারণ করেই সামনের দিনে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চাই।”
সামাজিক কর্মসূচি ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন
দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে মন্দির প্রাঙ্গণে বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প চালানো হয়। এছাড়া বুধবার দুপুরে মন্দিরে প্রায় ৫০ বছর ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী রক্তদান কর্মসূচিও চলে।
নবমীর রাতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয় জানিয়ে শুভাশিষ কুমার বিশ্বাস বলেন, “বিশ্বের মধ্যে এটি বিরল যে এক ধর্মের অনুষ্ঠান সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে অন্য ধর্মের মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ভাইয়েরা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সহযোগিতা করেন।”
শোভাযাত্রায় ভক্ত ও শিল্পীর আবেগ
বিদায়বেলায় মণ্ডপে আসা ভক্ত ও কারিগরদের চোখেমুখে ছিল বিষাদের ছায়া।
পুরান ঢাকার ওয়ারীর বাসিন্দা কারিগর চন্দন চন্দ্র দাস বলেন, “মা দুর্গা আমাদের আরাধ্য দেবী। জগতের সব শক্তির উৎস তিনি। আজ আবার ধরাধাম থেকে তিনি মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ীতে চলে যাবেন। জগতের অশুভ শক্তি বিনাশ হোক— এই প্রার্থনা নিয়েই মাকে বিদায় জানাচ্ছি।”
লালবাগের বাসিন্দা শ্রাবণী দাস গত বছরের চেয়ে এবার বেশি আনন্দ করেছেন জানিয়ে বলেন, “আজ একটু কষ্ট হচ্ছে। আবার এক বছর পর মায়ের সঙ্গে দেখা হবে।”
তবে ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে এবার সিঁদুর খেলায় অংশ নিতে না পারার আক্ষেপও ঝরে তার কণ্ঠে।
শিক্ষক সীমা রানী পাল এবারই প্রথম ট্রাকে করে বিসর্জন শোভাযাত্রায় অংশ নিচ্ছেন।
শহর ও গ্রামের পূজার পার্থক্য টানতে গিয়ে তিনি বলেন, “শহরে উৎসবটা সবার হয়ে যায়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিম সহকর্মী ও তাদের সন্তানদেরও রাতে পূজা দেখতে আসতে দেখা যায়। এ কারণে শহরে সম্প্রীতির মেলবন্ধনটা বেশি।”
ঢাকেশ্বরীর ব্যতিক্রমী বিসর্জন
দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। তবে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের বিসর্জনে রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য। এখানকার মূল প্রতিমাটি বিসর্জন দেওয়া হয় না।
এ বিষয়ে শুভাশিষ কুমার বিশ্বাস সাধন বলেন, “ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দেবী দুর্গা স্বয়ং অধিষ্ঠিত। মন্দির প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঐতিহ্য রয়েছে, এই প্রতিমা আমরা এক বছর সংরক্ষণ করি। পরবর্তী পূজার আগে বিসর্জন দেওয়া হয়। এবার প্রতীকী হিসেবে সপ্তমী পূজার দিন প্রতিষ্ঠা করা কলাবউ বা কলাগাছটি বিসর্জন দেওয়া হবে।”
এ বছর রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জনের জন্য বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদের মোট ১১টি ঘাট নির্ধারণ করা হয়েছে। এবার ঢাকা মহানগরে ২৫৮টিসহ সারা দেশে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
