১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘মা, হাসপাতাল এত দূরে কেন’, অ্যাম্বুলেন্সে দগ্ধ ছামীমের শেষ কথা

উত্তরার মাইলস্টোন কলেজের এই বিমান দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৭ জন।

‘মা, হাসপাতাল এত দূরে কেন’, অ্যাম্বুলেন্সে দগ্ধ ছামীমের শেষ কথা
শরীয়তপুরের গ্রামের বাড়িতে ছামীমের মা জুলেখা বেগমের আহাজারি।

বিডিনিউজ২৪

কে এম রায়হান কবীর, শরীয়তপুর প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 22 Jul 2025, 04:04 PM

Updated : 26 Aug 2026, 01:25 PM

মাত্র আট মাস আগে সৌদি আরবে কর্মরত অবস্থায় মারা যান স্বামী আবুল কালাম মাঝি। ছেলেমেয়েদের বুকে ছড়িয়ে ধরে সেই শোক কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছিলেন জুলেখা বেগম। কিন্তু তার আগেই ছেলে হারানোর শোক তার বুকে পাথরের মত চেপে বসল। 

সোমবার উত্তরার মাইলস্টোন কলেজে বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন জুলেখার আদরের ছোট সন্তান আব্দুল্লাহ ছামীম (১৪)। মঙ্গলবার সকালে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার ডিএম খালি মাঝিকান্দি এলাকার বাবার কবরের পাশেই ছামীমকে শায়িত করা হয়েছে।    

এ সময় আহাজারি করতে করতে পুত্রহারা জুলেখা বেগম বলছিলেন, “আমার বাবা বলছিল, মা, হাসপাতাল এতো দূরে কেন? কাছাকাছি হাসপাতাল হতে পারে না। আমাকে তোমরা চিকিৎসা করাতে বিদেশে নিয়ে যাও। আমার বাবা বাঁচতে চাইছিল। কেন আমার বাবা এভাবে চলে গেল?”

আবুল কালাম মাঝি ও জুলেখা বেগম দম্পতির তিন মেয়ে আর দুই ছেলের মধ্যে আব্দুল্লাহ ছামীম সবার ছোট। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছামীমের শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল মাদ্রাসায়। পরে তাকে উত্তরার মাইলস্টোন কলেজে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। ছামীমের স্বপ্ন ছিল সে চিকিৎসক হবে।  

এর মধ্যে ডিসেম্বরে সৌদি আরবে মারা যান বাবা আবুল কালাম মাঝি। সংসারে ছন্দপতন ঘটলেও জুলেখা আর অন্য ভাই-বোনেরা মিলে ছামীমকে পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন। জুলেখা পরিবারের সবাইকে নিয়ে উত্তরার দিয়াবাড়ীর খাল পাড়ে বসবাস করতেন। সেখান থেকে ছামীমের স্কুল কাছেই ছিল। 

পরিবার জানায়, প্রতিদিনের মত সোমবারও সহপাঠীদের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে ক্লাস করছিল ছামীম। টিফিনের তখন ১০ মিনিট বাকি। এর মধ্যে বিকট শব্দে বিদ্যালয়ের একটি ভবনে বিধ্বস্ত হয় বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান। সেই সময় গুরুতর আহত হয় ছামীম।

সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে স্বজনদের খবর দেয়। তখন তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। অবস্থা গুরুতর হওয়ার তাকে ভর্তি করা হয় বার্ন ইউনিটে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১১টার দিকে মারা যায় ছামীম।

ছামীমের মৃত্যুর খবর তার গ্রামে পৌঁছালে এলাকাজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। মঙ্গলবার সকালে মরদেহ গ্রামের বাড়ি ডিএম খালি মাঝিকান্দি এলাকায় নিয়ে আসা হয়। সকাল ৯টায় চরভয়রা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে তারা জানাজা হয়। 

ছামীমের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না স্বজন ও এলাকাবাসী। ছেলের মৃত্যুতে কিছুক্ষণ পর পর মূর্ছা যাচ্ছেন মা জুলেখা বেগমও। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা কেউ খুঁজে পাচ্ছে না। 

ছামীমের সঙ্গেই বড় হয়েছে তার মামাতো ভাই আব্দুল্লাহ হুসাইন। গ্রামে এলে দুজন একসঙ্গে সময় কাটাত। এমনকি ঢাকায় গেলে আব্দুল্লাহকেও বিভিন্ন জায়গা ঘুরিয়ে দেখাতো ছামীম। খেলার সাথীকে হারিয়ে কান্না থামছে না আব্দুল্লাহর।

ভাগ্নেকে ভীষণ ভালোবাসতেন মামা সাইফুল ইসলাম। ছোট ভাগ্নের এমন করুণ মৃত্যু যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি।

সাইফুল ইসলাম বলছিলেন, “ছোটবেলা থেকেই ভীষণ মেধাবী ছিল আমার ভাগ্নে। ওর স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে চিকিৎসক হবে। বাবার মৃত্যুর পর ওকে সবাই আগলে রেখেছিলাম। আজ ও আমাদের ছেড়ে বাবার কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় গেল। ওর চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল।”

ডিএম খালী গ্রামের আতাউর রহমান বলেন, “বিমান প্রশিক্ষণের জন্য খোলা ময়দান রয়েছে। কিন্তু ব্যস্ততম এলাকায় যেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল, সেই জায়গায় কীভাবে বিমান প্রশিক্ষণের জন্য দেওয়া হলো। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।”

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী আবরার হোসেন বলেন, “আমরা চাই, নিহতদের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ্যে আসুক। এ ছাড়া তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার কারণ বের হয়ে আসুক। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোনো ঘটনা না ঘটে, সেজন্য সরকার কঠিন পদক্ষেপ নেবে এটাই আশা করি। আর কোনোদিন যাতে এভাবে কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।”

ভেদরগঞ্জ সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত ইউএনও মোহাম্মদ মোজাহেরুল হক বলেন, “বিমান দুর্ঘটনার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আজ রাষ্ট্রীয় শোক পালন করছি। আমরা নিহতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। শোকসস্তপ্ত পরিবারের পাশে আমরা সব সময় থাকব।”

সোমবার দুপুরে উত্তরার দিয়াবাড়ির এই স্কুলের ক্যাম্পাসে বিমানবাহিনীর একটি এফ-৭ বিজিআই বিমান আছড়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী, স্কুলে মাঠে বিধ্বস্ত হওয়ার পর বিমানটি ছেঁচড়ে গিয়ে ধাক্কা খায় দোতলা হায়দার আলী ভবনে। অগ্নিগোলকে পরিণত হওয়া সেই বিমানের শিখা স্কুল ভবনটিকেও গ্রাস করে নেয়।

তখন স্কুল ছুটির সময়, অনেক অভিভাবকও ভিড় করেছিলেন ভবনটির কাছে। দুর্ঘটনার পর ভবনের প্রবেশ পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বের হতে পারছিলেন না কেউ।

উদ্ধার অভিযান শেষে জঙ্গি বিমানের পাইলটসহ ১৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ১৭১ জনকে ওই ভবন থেকে আবহ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়, তাদের অধিকাংশই মারাত্মকভাবে দগ্ধ, আর বেশিরভাগই শিশু।

আহতদের মধ্যে আরো দশজন রাতে হাসপাতালে মারা গেলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয় ২৭ জন। এখনো ৭৮ জন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তাদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

নিহতদের মধ্যে ২০ জনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলেও ছয়জনের মরদেহ এতটাই পুড়ে গেছে যে সেগুলো আর চেনার উপায় নেই।