১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

শাহজালাল মাজারে একসঙ্গে ইফতার, ঘুচে যায় ‘দূরত্বের দেয়াল’

সিলেট ছাড়াও সারাদেশের অনেক মানুষও ইফতারে শরিক হন।

বিডিনিউজ২৪

নুর আলম. শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি.

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 20 Mar 2026, 09:12 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:12 PM

বিকাল গড়াতেই ভিড় জমতে শুরু করে সিলেটের হযরত শাহজালাল (রঃ) মাজার প্রাঙ্গণে। আসরের নামাজের পর নারীদের উপস্থিতি বেশি থাকলেও সময় গড়াতেই পুরুষদের উপস্থিতি বাড়ে। মাগরিবের আজানের ক্ষণিক আগে মাজার চত্বর কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে।

কেবল সিলেটের স্থানীয়দের উপস্থিতি নয়, বরং চোখে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের মুখ। কেউ ঢাকা থেকে ট্রেন বা বাস ধরে ভোরে পৌঁছেছেন, কেউ এসেছেন আশপাশের জেলা থেকে। সবার উদ্দেশ্য একটাই- মাজারের ইফতার এবং কবর জিয়ারত করা।

বৃহস্পতিবার বিকালে শাহজালাল মাজার ঘুরে দেখা যায়, গণইফতারের উদ্দেশে মাজারের ফটক দিয়ে মানুষ ছুটে আসছেন। প্রথমে শাহজালালের কবর জিয়ারতে গেছেন, কেউ পুকুরে অজু করছেন। আবার কেউবা মাজার ঘুরে দেখছেন। 

ইফতারের প্রায় এক ঘণ্টা আগে থেকেই দস্তরখানা বিছিয়ে দেন স্বেচ্ছাসেবকরা। নারীরা মাজারের পূর্ব পাশে দস্তরখানা ধরে কাতার করে বসে পড়েন। বেশিরভাগ পুরুষ তখনও মাজারের দিক-সেদিক ঘুরছেন। তবে ইফতারের আধঘণ্টা আগে সবাই বসে পড়েন জায়গা দখলের তাগিদে।

ইফতার করতে আসা কেউ কেউ তাদের পরিবার নিয়েও এসেছেন। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন পাটি, চাদর ও ইফতার। তেমনি একটি পরিবারকে মাজারের পুকুর পাড়ের পশ্চিম পাশে বসতে দেখা যায়। 

পরিবারের কর্তা লোকমান মিয়া। তিনি তার পরিবারের চার সদস্যকে নিয়ে টাঙ্গাইল থেকে এসেছেন। রমজান মাসে শাহজালাল পীরের কবর জিয়ারত, মাজারে ইফতার ও নফল নামাজ পড়তে আসছেন বলে জানান লোকমান মিয়া।

এদিকে মানুষজন কাতার করে বসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাজারের স্বেচ্ছাসেবকরা ইফতার বিতরণ শুরু করেন। কেউ পানি দিচ্ছেন, কেউ শরবত, কেউবা ইফতারের প্লেট বা প্যাকেট। অনেককে বাসা থেকে বাটি করে ইফতার নিয়ে আসতে দেখা যায়। কেউ সঙ্গে করে ইফতারের প্যাকেট কিনে নিয়ে আসেন।

মাজারের ইফতার সামগ্রীর মধ্যে সাধারণত খেজুর, শরবত, ছোলা, পেঁয়াজ, বেগুনি, জিলাপি, আলুর চপ থাকে। এ ছাড়া সিলেটের ঐতিহ্যবাহী আখনি (বিরিয়ানির মত; যা মুরগি/গরু বা খাসির মাংস দিয়ে বানানো হয়) কিংবা ভুনা খিচুড়ি মূল উপকরণ হিসেবে দেওয়া হয় বলে জানান মাজারের স্বেচ্ছাসেবকরা।

তারা বলেন, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারে ইফতারের সময় মানুষের উপস্থিতি তুলনামূলক অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি হয়। সিলেট ছাড়াও ধনী-গরিব নির্বিশেষে সারাদেশের অনেক মানুষ ইফতারে শরিক হন। 

ইফতার আয়োজনের আর্থিক যোগান মাজারের তহবিল থেকে দেওয়া হয়। তবে কোনো কোনো দিন ব্যক্তিগত উদ্যোগ বা বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও ইফতারের আয়োজন করা হয় বলে জানান মাজারের খাদেম।

ঢাকার সাভার থেকে মাজারে ইফতার করতে আসা পেশায় ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান বলেন, “এখানে আমি মাঝেমাঝেই আসি। মোটামুটি সব মাজারেই যাই। শাহজালাল, গোলাপ শাহ, কেল্লা শাহ, শাহ আলী, সুলতান আওলিয়ার মাজারসহ অনেক মাজারেই যাই। মেয়ের কল্যাণ কামনার উদ্দেশ্যে এখানে আসছি।”

সিলেটের টুকেরবাজার থেকে আসা আবদুল আহাদ বলেন, “টিফিন বাটি করে ইফতার নিয়ে আসছি। মাজারে একসঙ্গে ইফতার করা ও চার রাকাত নফল নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে আসছি।

“আমি মাজারে প্রায়ই আসি। কখনো যাওয়ার পথে ইফতারের সময় হয়ে গেলে মাজারে এসে ইফতার করি। আমার শরীরটা ভাল না। সুস্থতার উদ্দেশ্যেই আসছি।”

মাজারের স্বেচ্ছাসেবক বাবুল মিয়া (৩৭) বলেন, “আমার মামা, চাচারা কাজ করেন। আমিও মাজারে কাজ করি মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্যে। আমার দাদা, চাচা মাজারের ঝাড়ুদার ছিলেন। এখন আমি, আমার বাবা কাজ করি। বাবা ৪০ বছর ধরে আছেন।

“আমি পেশায় রং মিস্ত্রি। রংয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করি। পাশাপাশি মাজারে সময় দেই। কাজ করতে অনেক ভাল লাগে। এতে আমার কোনো বেতন নেই। সওয়াবের উদ্দেশ্যে করতেছি। ২৪ বছর ধরে আমি কাজ করি এখানে। ভাল লাগে বিধায় এক হাজার টাকার ইনকাম বাদ দিয়ে এখানে আসি।”

মাজারের বাবুর্চি মো. সোহেল বলেন, “আমি পাকিস্তান আমল থেকে মাজারের কাজ করে যাচ্ছি। মাজারের সব রান্নাবান্না আমি করি।”

মাজারের খাদেম সামুন মাহমুদ খান বলেন, “এখানে রমজানে প্রতিদিনই গণইফতারের আয়োজন করা হয়। আজকে টার্কিশ একটা সংস্থা ইফতারের আয়োজন করেছে। এভাবে প্রায়ই কেউ না কেউ ইফতারের আয়োজন করে। মাজারের অর্থ দিয়েও আয়োজন করা হয়।”