২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

সিলেটের বধ্যভূমিতে ৫০ বছর পর নির্মিত স্মৃতিসৌধ

এই বধ্যভূমিতে পাকসেনারা মুক্তিকামী বাঙালিদের ধরে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করত।

সিলেটের বধ্যভূমিতে ৫০ বছর পর নির্মিত স্মৃতিসৌধ

সিলেট সদরে ক্যাডেট কলেজের পাশে বধ্যভূমিতে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিসৌধ।

বাপ্পা মৈত্র

সিলেট প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 01 Dec 2022, 05:54 PM

Updated : 01 Dec 2022, 07:00 PM

স্বাধীনতার ৫০ বছর পর মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের স্মরণে সিলেট সদর উপজেলায় স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসজুড়ে যেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্প ছিল সেখানে এখন রয়েছে সিলেট ক্যাডেট কলেজ। কলেজের পেছনে পূর্বদিকের টিলার পাশে মুক্তিকামী বাঙালিদের ধরে নিয়ে পাকহানাদাররা চালাত নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ।

বধ্যভূমি সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে ক্যাডেট কলেজের পূর্বপাশে অবস্থিত বধ্যভূমিতে এই স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। 

ইতোমধ্যে স্মৃতিসৌধের কাজ শেষ হলেও সেখানে যাওয়ার রাস্তার কাজ শেষ না হওয়ায় যাতায়াত করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে অল্প সময়ের মধ্যে রাস্তা নির্মাণ কাজের প্রক্রিয়া শুরু করার কথা জানিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডি।

এদিকে স্মৃতিসৌধের পাশে ব্যক্তি উদ্যোগে একটি শহীদ মিনার নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।  

রোববার [২৭ নভেম্বর] সরেজমিনে বধ্যভূমি এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। এখন সেটির সৌন্দর্যবর্ধন কাজ চলছে। কয়েকজন শ্রমিক কাজ করছেন। পাশে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ কাজও চলছে।

Image

রাস্তা নির্মিত না হওয়ায় জঙ্গলময় পথ ধরে জনসাধারণের স্মৃতিসৌধে যাওয়া সম্ভব হয় না।

তবে বধ্যভূমির কোথাও কোনো নামফলক চোখে পড়েনি। বধ্যভূমির চারপাশে কোনো কবরও চোখে পড়েনি। পাশে শহীদ মিনারের কাজ করতে দেখা গেছে শ্রমিকদের। 

স্মৃতিসৌধের পাশে নির্মিত হচ্ছে শহীদ মিনারটি। সিলেট সেনানিবাসের সহযোগিতায় দুটি শহীদ পরিবারের উদ্যোগে শহীদ মিনরাটি নির্মিত হচ্ছে।

শহীদ মিনার নির্মাণ কাজ তদারক করছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আব্দুস সালাম।  

আব্দুস সালাম বীর প্রতীক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সিলেট সেনানিবাসের সহযোগিতায় শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদের ছেলে ডা. জিয়া উদ্দিন আহমদ ও আমার পরিবারের অর্থায়নে এবং সবার সহযোগিতায় শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ চলছে। শহীদ মিনারের কাজটি শেষ হলে নামফলক লাগানো হবে। আমি আশা করছি আগামী স্বাধীনতা দিবসের আগে এই বধ্যভূমিটি উন্মুক্ত করা হবে।”

Image

স্মৃতিসৌধের পাশে নির্মিত হচ্ছে শহীদ মিনার; ছবিতে নির্ময়মাণ শহীদ মিনারের কয়েকটি সিঁড়ি দেখা যাচ্ছে।

সিলেট গণপূর্ত বিভাগ জানায়, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ১৯৭১ সালের বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় জেলার পাঁচটি বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে টেন্ডার আহবান করা হয়। একই বছরের ডিসেম্বর মাসে কার্যাদেশ দেওয়া হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। বর্তমানে চারটি বধ্যভূমির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। 

সিলেটের এয়ারপোর্ট থানার কাকুয়ারপাড়ের স্থানীয় বাসিন্দা হুমায়ুন আহমেদ বলেন, আমাদের এলাকার আশপাশের লোকজনের কাছে ওই টিলাটি বধ্যভূমি টিলা হিসেবে পরিচিত। আমরা চাই এ বধ্যভূমি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক, যাতে করে নতুন প্রজন্ম এটির ইতিহাস জানতে পারে।”

তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো চিহ্নিত করে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মৃতিসৌধ প্রকল্পের সঙ্গে লাইব্রেরি, সেমিনার হল, মিউজিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। টিলার পূর্বদিকের রাস্তাটি হয়ে গেলে সহজে বধ্যভূমিতে যাওয়া হবে। তাই সরকারের কাছে দ্রুত রাস্তাটি নির্মাণ করার দাবি জানাই।”

একই এলাকার সুমন মিয়া বলেন, “আমাদের এলাকার অনেকেই জানে যে এখানে একটি বধ্যভূমি রয়েছে। আমরা শুনেছি মুক্তিযদ্ধের সময়ে টিলাটিতে বাঙালিদের ধরে নিয়ে মেরে ফেলত পাকিস্তানি মিলিটারিরা। অনেক মানুষকে মারা হয়েছে ওই টিলাতে।”

সিলেট মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক সভাপতি ভবতোষ রায় বর্মণ বলেন, বর্তমান প্রজন্মকে তার দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বীরত্বকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যে রাস্তাটি করে বধ্যভূমিটি উন্মুক্ত করা দরকার। নাম জানা না জানা অনেক শহীদ এখানে ঘুমিয়ে আছেন। তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে স্মৃতিসৌধ এলাকায় লাইব্রেরি, সেমিনার হল, মিউজিয়াম ইত্যাদি রাখার প্রয়োজন।

সিলেট জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সিলেট ক্যাডেট কলেজে ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প। কলেজের পিছনের পূর্বদিকের টিলায় নারী ও মুক্তিযোদ্ধাসহ মুক্তিকামী বাঙালিকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যার পর মরদেহ ফেলে দেওয়া হতো টিলার জঙ্গলে। মানুষের মরদেহগুলো হতো পশুপাখির খাদ্য। পড়ে থাকত কঙ্কাল। দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পরও এসব এলাকায় মানুষের হাড়, মাথার খুলি পড়ে থাকতে দেখেছেন স্থানীয়রা। 

“সিলেটের সকল বধ্যভূমি চিহ্নিত করে যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণ করার দাবি জানাই। তবে এখনও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বধ্যভূমি অরক্ষিত। সঠিকভাবে বধ্যভূমি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে আমরা পিছিয়ে রয়েছি।”

সিলেটের সকল বধ্যভূমি সংরক্ষণ করতে প্রশাসনের প্রতি আহবান জানান তিনি।

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ বলেন, বধ্যভূমির পূর্বদিকের রাস্তার কাজের বিষয়টি উপজেলা পরিষদ থেকে জেলা এলজিইডিকে জানানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুত বধ্যভূমি রাস্তার কাজটি করা হবে।”

সিলেট জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইনামুল কবীর জানান, বধ্যভূমির টিলার পূর্বদিকে রাস্তার কাজের প্রকল্পটি এলজিইডির সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। সদর দপ্তর থেকে অনুমোদন হলে গেলে দ্রুত টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষে কাজ শুরু হবে।