Published : 17 Aug 2026, 06:05 PM
গ্যাস সংকটের কারণে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড-আরপিসিএলের ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ২৬ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে।
এ ছাড়া এ অঞ্চলের অন্য দুটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনও অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে বিভাগজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। এতে জেলা শহরে দৈনিক আট থেকে ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। তবে গ্রামের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ বলে দাবি গ্রাহকদের।
গ্যাস সরবরাহ পেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কথা বলেছেন ময়মনসিংহ আরপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এইচ এম রাশেদ।
আরপিসিএল থেকে জানা গেছে, ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে শম্ভুগঞ্জে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২১০ মেগাওয়াটের এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ খাতের প্রতিষ্ঠান রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড-আরপিসিএল।
এ প্রকল্পে গ্যাস সরবরাহের জন্য যে পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে, সেটি বাস্তবায়ন করেছে সঞ্চালন সংস্থা গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড-জিটিসিএল। সম্প্রতি গ্যাস সংকটের কারণে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন শূন্যে নেমে এসেছে।
কেন্দ্রটির উৎপাদন ২৬ দিন ধরে বন্ধ হয়ে আছে। এতে ময়মনসিংহ বিভাগজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। কারখানায় উৎপাদন থেকে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ময়মনসিংহ অঞ্চলে ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয় মূলত ওই অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে। সেই সঙ্গে এলাকাটি শিল্পাঞ্চলে রূপান্তরিত হবে এমন লক্ষে বিদ্যুৎ চাহিদার প্রাক্কলনও ছিল। ১৯৯৭ সালে কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়।
তিন ধাপে এই প্রকল্পে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়। কিন্তু কেন্দ্রটি বছরের পর বছর গ্যাস সংকটে ভুগছে। বিশেষ করে ২০০৭ সালের পর দেশে গ্যাস সংকট বৃদ্ধি পেলে কেন্দ্রটিতে গ্যাসের সরবরাহ কমতে থাকে।
আরপিসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না। এ পরিস্থিতি চলছে বছরের পর বছর। গ্যাস সংকটের কারণে কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ উৎপাদনের নাজুক পরিস্থিতিও উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রতিবেদন চিত্রে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরপিসিএলের ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মাসভিত্তিক উৎপাদন কোনো কোনো মাসে ৪০ মেগাওয়াটের নিচেও নেমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্লান্ট ফ্যাক্টর ছিল ৪৫ শতাংশ।
এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্লান্ট ফ্যাক্টর ছিল ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে। অর্থাৎ গ্যাস সংকটের কারণে অব্যাহতভাবে কেন্দ্রটির উৎপাদন হ্রাস পায়। এভাবে এতদিন চলছিল। কিন্তু এর মধ্যে গ্যাস সংকটের কারণে ২৬ দিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ময়মনসিংহ বিভাগে লোডশেডিং অনেক বেড়ে গেছে। গ্রামাঞ্চলে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা এবং জেলা শহরে তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে প্রতিদিন। এতে খামারিরা ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বয়স্ক এবং শিশুরাও।
দিন-রাত মিলে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না বলে অভিযোগ গ্রাহকদের।
ভোগান্তির কথা জানিয়ে ময়মনসিংহ নগরীর কাঁচিঝুলি এলাকার বাসিন্দা ও নারী উদ্যোক্তা শেফালী আক্তার বলেন, আগে তো এক থেকে দুবার লোডশেডিং ছিল। এখন প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত চার থেকে পাঁচবার লোডশেডিং দেওয়া হয়। একইভাবে রাতেও হচ্ছে লোডশেডিং।
তিনি বলেন, “প্রতিবারই এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং হয়। এর সঙ্গে বাসায় গ্যাস সংকট লেগেই আছে। একদিকে লোডশেডিং অন্যদিকে গ্যাস নেই। কীভাবে রান্নাবান্না করব। কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। এই সংকট কবে শেষ হবে, কেউ কিছু বলছেও না। কোনও ভালো খবরও পাচ্ছি না। এভাবে বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, ময়মনসিংহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিং দেওয়া হয়। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের এই কথা মিথ্যা বলছেন নগরের বাসিন্দারা। তারা বলছেন, শহরে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। তিন থেকে চার ঘণ্টা লোডশেডিং দেওয়া হলে তাদের এত ভোগান্তি হতো না।
আরপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদ বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে ২৬ দিন ধরে ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে আছে। উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘাটতির কারণে এর প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ খাতে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ বিভাগে লোডশেডিং অনেক বেড়ে গেছে।
গ্রাহকদের ভোগান্তির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “সাধারণ মানুষ রান্নাবান্নাও করতে পারছে না। অনেক সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। মানুষের কষ্ট হচ্ছে খুব। তবে সমস্যার সমাধান হলে আমরা যদি গ্যাস সরবরাহ পেয়ে যাই, তাহলে আবারও উৎপাদন শুরু করতে পারব।”