১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

নারায়ণগঞ্জে বিএনপির দুপক্ষের দ্বন্দ্বে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে প্রাণ গেল ২ জনের

শনিবার রাতে উপজেলার বন্দর রেললাইন ও পাশের শাহী মসজিদ এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে।

নারায়ণগঞ্জে বিএনপির দুপক্ষের দ্বন্দ্বে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে প্রাণ গেল ২ জনের
আব্দুল কুদ্দুসের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে শনিবার রাতে নিহতের স্বজনরা মদনগঞ্জ-মদনপুর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 22 Jun 2025, 02:38 PM

Updated : 26 Aug 2026, 01:14 PM

আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় বিএনপি সমর্থকদের দুপক্ষের দ্বন্দ্বে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুজন নিহত হয়েছেন।

শনিবার রাতে উপজেলার বন্দর রেললাইন ও পাশের শাহী মসজিদ এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে বলে জানান জেলা পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার।

নিহতরা হলেন- হাফেজীবাগ এলাকার প্রয়াত সাদেক আলীর ছেলে আব্দুল কুদ্দুস (৭০) এবং পাশের শাহী মসজিদ এলাকার প্রয়াত আব্দুল জলিল মুন্সির ছেলে মেহেদী হাসান (৪২)।

কুদ্দুস পেশায় রাজমিস্ত্রি এবং মেহেদী বন্দর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।

স্থানীয়দের বরাতে বন্দর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাইফুল ইসলাম পুলিশ বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্য (বহিষ্কৃত) হান্নান সরকার এবং ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি আবুল কাউসার আশার মধ্যে সখ্যতা থাকলেও তাদের অনুসারীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কয়েকমাস ধরেই দ্বন্দ্ব চলছিল। 

নিহতের স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও ইজিবাইক স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে বিভক্ত একটি পক্ষের নেতৃত্ব দেন স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী রনি ও জাফর এবং অপর পক্ষের নেতৃত্ব দেন মেহেদী হাসান, বাবু সিকদার, বাবু ওরফে জুয়াড়ি বাবু ও শ্যামল। 

কয়েকদিন আগে চুরির টিন বিক্রি নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে তর্কবিতর্ক হয়। এর জের ধরে শুক্রবার তাদের দুইপক্ষের মারামারিতে অন্তত আটজন আহত হন।

এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার বিকালে উভয়পক্ষ শাহী মসজিদ, বন্দর রেললাইন ও হাফেজীবাগ এলাকায় সশস্ত্র মহড়া দেন। 

পরে সন্ধ্যায় বন্দর রেললাইন এলাকার সড়কে আব্দুল কুদ্দুসকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাথাড়ি আঘাত করা হয় বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্তত দুজন প্রত্যক্ষদর্শী।

তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। 

নিহতের স্বজনরা বলেন, কুদ্দুসের সঙ্গে কারও কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। কিন্তু তার ছেলে পারভেজ রনি-জাফর পক্ষের কর্মী। পারভেজকে খুঁজতে এসে না পেয়ে তার বাবাকে ছুরিকাঘাত করে প্রতিপক্ষের লোকজন।

কুদ্দুসের ছোটভাই দুদু মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বড়ভাই চায়ের দোকানে ছিলেন। তারে ডাইকা নিয়া ‘পারভেজে কই’ জানতে চায়। পরে তারা ভাইরে এলোপাতাড়ি ছুরি দিয়া আঘাত করে। 

“ভাই নাকি বারবার তাগোরে কইছে, আমারে জানে মাইরো না। কিন্তু কিচ্ছু শোনে নাই। আমরা লাশ গিয়া পাইছি হাসপাতালে।”

এদিকে, আব্দুল কুদ্দুসের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা বাড়তে থাকে। রাতে নিহতের স্বজনরা মদনগঞ্জ-মদনপুর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভও করেন। এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এলাকায়। টহলে ছিল সেনাবাহিনীর সদস্যরাও। 

এর মধ্যে রাত ১০টার দিকে রনি ও জাফর পক্ষের লোকজন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মেহেদী হাসানকে ধরে নিয়ে যায়। পরে স্থানীয় একটি ক্লাবের সামনে নিয়ে গিয়ে তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। 

রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয় বলে জানিয়েছে বন্দর থানা পুলিশ।

মেহেদীর বোনের স্বামী মাহফুজুল হক সৌরভ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বন্দরে যখন মার্ডারটা হয় তখন মেহেদী ছিল বাড়িতে। ও থাকতো অন্তত এক কিলোমিটার দূরে আমিন আবাসিক এলাকায়। মার্ডারের পর প্রতিপক্ষের লোকজনকে খুঁজতে গেলে রাস্তায় মেহেদীরে পাইয়া যায়। 

“মেহেদীরে তখন তুইল্লা নিয়া সিরাজউদ্দোল্লা ক্লাবে নিয়ে বেধড়ক মারে। বুকে, মাথা আর মুখ একেবারে থেতলে দিছে। আমরা লাশ পাইছি হাসপাতালে।”

এদিকে, ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল কাউসার আশা বলেন, “রনি আর মেহেদীরা সব একই গ্রুপের লোক ছিল। ছাত্রদলের রাজনীতির সময় থেকেই দেখছি, তারা ছিল আপন দুই ভাইয়ের মতো। আওয়ামী লীগের আমলে দুইজনে একসঙ্গে জেলও খাটছে।

“কিন্তু গত ছয়মাস ধরে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুইপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল।”

তবে, এই দ্বন্দ্বে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে সাবেক এ কাউন্সিলর বলেন, “দুইজনই হান্নান সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিল। স্থানীয় কারণে দুইজনের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এইটার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। 

মেহেদী হাসান

মেহেদী হাসান

“মেহেদী ও রনি দু’জনই আমার ভাইয়ের মতো। আমার সঙ্গে হান্নান কাকারও কোনো দ্বন্দ্ব নেই। কিশোর গ্যাং ও মাদকের দ্বন্দ্বে রাজনৈতিক কারণে আমাকে জড়ানো হচ্ছে। এটি পলিটিক্যাল কোনো ব্যাপার না।”

তবে এ প্রসঙ্গে কথা বলতে হান্নান সরকারের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করেও তার সংযোগ পাওয়া যায়নি। খুদেবার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি তিনি।

কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হত্যার পর থেকে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। রোববার দুপুরেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বন্দর রেললাইন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন দেখা যায়। 

যদিও ঘটনার পর থেকে উভয়পক্ষের লোকজন এলাকাছাড়া বলে জানিয়েছে পুলিশের একটি সূত্র।

এর মধ্যে সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন জেলা পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার।

তিনি বলেন, “স্থানীয়ভাবে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড দুটি ঘটেছে। এই ঘটনা যারা ঘটাইছে এবং যারা নেপথ্যে আছেন তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।”

এ ঘটনায় পৃথক দুটি হত্যা মামলাও হবে এবং রাতেই র‌্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানে অন্তত তিনজনকে আটক করা হয়েছে বলে জানান জেলা পুলিশের শীর্ষ এ কর্মকর্তা।