২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

লালমনিরহাটে ‘প্রায় নিষ্ক্রিয়’ জাপা, ‘মুখোমুখি’ বিএনপি-জামায়াত

নির্বাচনী মাঠে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীরা তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা পরিস্থিতিসহ নানা বিষয় সামনে রেখে ভোটারদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।

লালমনিরহাট প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 24 Dec 2025, 09:34 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:23 PM

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে লালমনিরহাটে রাজনৈতিক তৎপরতা ক্রমেই জোরালো হয়ে ওঠছে। এক সময় জাতীয় পার্টির (জাপা) শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই জেলায় বর্তমানে দলটির সাংগঠনিক উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন এলেও জাতীয় পার্টি এখনো মাঠে সক্রিয় হতে পারেনি। ফলে লালমনিরহাটের নির্বাচনি সমীকরণে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে।

এদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি নতুন রাজনৈতিক দলও নিজেদের অবস্থান জানান দিতে মাঠে নামছে। সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগের মাধ্যমে তারা ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। এতে করে আসন্ন নির্বাচনে লালমনিরহাটের রাজনীতি আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে ওঠছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, লালমনিরহাট জেলার তিনটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৬২ হাজার ৬২৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার পাঁচ লাখ ২৪ হাজার ৫২২ জন, নারী ভোটার পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার ১০৬ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন আটজন।

জেলায় ৩৮৫টি ভোটকেন্দ্রের দুই হাজার ১৯৩টি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

এক সময় জাতীয় পার্টির (জাপা) শক্ত অবস্থান থাকলেও বর্তমানে দলটির অনুপস্থিতিতে জেলার রাজনৈতিক চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।

স্থানীয় রাজনীতিকদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে ‘সাংগঠনিক দুর্বলতা’ ও ‘নেতৃত্ব সংকটে’ ভুগছে জাতীয় পার্টি। এক সময় দলটির একাধিক সংসদ সদস্য থাকলেও বর্তমানে নেতাকর্মীদের তেমন কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা চোখে পড়ছে না।

নির্বাচনি মাঠে বিএনপি ও জামায়াত তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা পরিস্থিতি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য ও কর্মসংস্থানসহ নানা স্থানীয় ও জাতীয় ইস্যু সামনে রেখে ভোটারদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

লালমনিরহাট-১: ভোটের মাঠে ‘তিস্তা’

পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা উপজেলা নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-১ আসনে ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৯১ হাজার ৬২২ জন। প্রতি বছর বন্যা ও নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এই এলাকায় ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ এবার প্রধান নির্বাচনি ইস্যু হয়ে ওঠেছে।

লালমনিরহাট-১ আসনের জামায়াত প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম রাজু

লালমনিরহাট-১ আসনের জামায়াত প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম রাজু

এই আসনে জামায়াতে ইসলামী আগেই প্রার্থী ঘোষণা করেছে। দলটির শিল্প ও বাণিজ্য বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট আনোয়ারুল ইসলাম রাজু নিয়মিত ইউনিয়নভিত্তিক সভা ও হাট-বাজারে গণসংযোগ করছেন।

জামায়াত নেতারা বলছেন, কোভিডকালে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণে রাজু এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন।

এ আসনে বিএনপি প্রার্থী কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার হাসান রাজীব প্রধান বলেন, “এই অঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা তিস্তা ও বন্যা। স্থায়ী সমাধান ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়।”

তিনি বলেন, “প্রতিবছর হাতীবান্ধার ছয়টি ও পাটগ্রামের একটি ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মুফতি ফজলুল করীম শাহারিয়ার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সিহাব আহমেদও মাঠে রয়েছেন।

জামায়াত নেতা আনোয়ারুল ইসলাম রাজু বলেন, “জামায়াত একটি সুশৃঙ্খল দল। এই দলে কোনো ভেদাভেদ নেই। সবাইকে নিয়ে আগামীতে লালমনিরহাট-১ আসনকে একটি ‘মডেল আসন’ গড়ে তুলতে আমি বদ্ধপরিকর।”

লালমনিরহাট-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী হাসান রাজীব প্রধান

লালমনিরহাট-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী হাসান রাজীব প্রধান

এ ছাড়া হাতীবান্ধা-পাটগ্রাম উপজেলায় শিল্প কারখানা গড়ে এই এলাকার বেকার সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখবেন বলে জানান তিনি।

স্বতন্ত্র প্রার্থী শিহাব আহম্মেদ বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সবার পাশে দাঁড়িয়েছি। আশা করি, সাধারণ মানুষ আগামী নির্বাচনে আমাকেই বেছে নেবে।” 

লালমনিরহাট-২: বিএনপিতে ‘দ্বন্দ্ব’

এই আসনে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা না করায় কর্মী-সমর্থকদের মাঝে ‘অসন্তোষ’ রয়েছে। কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলা নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-২ আসনে ভোটার সংখ্যা চার লাখ ২১ হাজার ৯৯১ জন।

এই আসনে বিএনপির একাধিক নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশা করায় ‘অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা’ সবচেয়ে বেশি আলোচিত।

লালমনিরহাট-২ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী জাহাঙ্গীর আলম।

লালমনিরহাট-২ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী জাহাঙ্গীর আলম।

জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রোকন উদ্দিন বাবুল বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে নেতাকর্মীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মানুষ এবার ভোটের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায়।”

অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশী কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “দলের দুঃসময়ে কারা মাঠে ছিলেন এবং ত্যাগী নেতাদের জনগণ চেনে।”

এলাকায় তারেক রহমানের ঘোষিত ৩১ দফা নিয়ে গণসংযোগ চালাচ্ছেন বলে জানান জাহাঙ্গীর।

লালমনিরহাট-২ আসনের জামায়াতের প্রার্থী ফিরোজ হায়দার লাভলু

লালমনিরহাট-২ আসনের জামায়াতের প্রার্থী ফিরোজ হায়দার লাভলু

এ ছাড়া জিয়া পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ড. রোকনুজ্জামানও এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।

এই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জেলা সেক্রেটারি ফিরোজ হায়দার লাভলু বলেন, “আগে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করেছি, এবার আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি।”

তিনি দাবি করেন, “অতীতে বিএনপির প্রাপ্ত ভোটের বড় অংশ জামায়াতের সমর্থন থেকেই এসেছে।”

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মুফতি মাহফুজুর রহমান এবং নতুন রাজনৈতিক দল ‘জনতার দল’-এর চেয়ারম্যান সাবেক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম কামালও এই আসনে আলোচনায় রয়েছেন।

লালমনিরহাট-২ আসনে আলোচনায় আছেন ‘জনতার দল’-এর চেয়ারম্যান শামীম কামাল। 

লালমনিরহাট-২ আসনে আলোচনায় আছেন ‘জনতার দল’-এর চেয়ারম্যান শামীম কামাল।

শামীম কামাল লালমনিরহাট-২ (আদিতমারী-কালীগঞ্জ) আসনের টানা সাতবারের নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রয়াত মজিবুর রহমানের ছেলে।

লালমনিরহাট-৩: দুলুর ‘শক্ত অবস্থান’

লালমনিরহাট সদর আসনে ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৪৯ হাজার ৫৩৬ জন। এখানে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক উপমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন।

২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি যোগাযোগ এবং পরে খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সাম্প্রতিক সময়ে ‘তিস্তা বাঁচাও আন্দোলনের’ কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি আবারও আলোচনায় এসেছেন।

লালমনিরহাট-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী আসাদুল হাবিব দুলু

লালমনিরহাট-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী আসাদুল হাবিব দুলু

দুলু বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা, স্থলবন্দর উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান- এই বিষয়গুলো ছাড়া এ অঞ্চলের মানুষের জীবনমান বদলানো সম্ভব নয়।”

এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবু তাহের এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মোকছেদুল ইসলাম নিয়মিত জনসংযোগ চালাচ্ছেন।

ভোটারদের প্রত্যাশা ও বিশ্লেষণ

স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি প্রার্থীর কাজ ও গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আদীতমারী উপজেলার ভাটা ইনিয়নের কলেজ শিক্ষক আলীমুল ইসলাম বলেন, “মানুষ উন্নয়নমুখী ও সৎ নেতৃত্ব চায়।”

একই উপজেলার গৃহিণী রাহিমা আক্তার অভিযোগ করে বলেন, “দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন করে তুলেছে।”

কালিগঞ্জ উপজেলার চাপারহাট এলাকার তরুণ ভোটার জসিম উদ্দিন বলেন, “কর্মসংস্থান না হলে তরুণদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।”