Published : 12 Jul 2025, 09:50 PM
কক্সবাজার সৈকতে গোসলে নেমে নিখোঁজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অরিত্র হাসানের সন্ধান মেলেনি পাঁচ দিনেও। ছেলেকে খুঁজে পাওয়ার আশায় বিভিন্ন পয়েন্টে ছুটে বেড়াচ্ছেন মা জেসমিন আক্তার।
শনিবার সকাল থেকে সৈকতের উপকূলে ড্রোন উড়িয়ে বিমান বাহিনীর একটি দল নিখোঁজ শিক্ষার্থীর অনুসন্ধান চালিয়েছে বলে জানান কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন।
এর আগে মঙ্গলবার হিমছড়ি সৈকতে গোসলে নেমে তিন বন্ধুসহ নিখোঁজ হন অরিত্র। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
ঘটনার দিন এক বন্ধু ও পরদিন অন্য শিক্ষার্থীর মৃতদেহ উদ্ধার হলেও এখনো খোঁজ নেই অরিত্রের।
ছেলেকে হারানোর শোকে পাথর হয়ে গেছেন মা জেসমিন। চোখে ঘুম নেই, মুখে ভাষা নেই। কেবল একটা আশায় বুক বেঁধে আছেন, একমাত্র সন্তানকে হয়তো সাগরের ঢেউ ফিরিয়ে দেবে।
মৃদু কণ্ঠে জেসমিন আক্তার বলছিলেন, “ছেলেটাকে এই অথৈ সাগরে রেখে বাসায় একটা মুহূর্তও থাকতে পারব না। যেকোনো অবস্থাতেই হোক আমার ছেলেটাকে ফিরে পেতে চাই। আর কিছুই চাইনা।” বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
তিনি বলেন, “এখন একটাই আশা, ছেলেকে পাব। ছেলেকে ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত যেতে পারব আমি? আমার ছেলেকে এখানে রেখে যেতে পারব আমি? আমার ছেলেটা আমার বুকে ফিরে আসুক।”
শেষবার সাগরে নামার আগে মাকে একটা ছবি পাঠিয়েছিলেন অরিত্র। সেই স্মৃতি জানিয়ে জেসমিন আক্তার বলেন, “ছবিটা দেখে আমি শুধু ছোট্ট একটা ম্যাসেজ দেই। ওই ম্যাসেজটা সে রিসিভ করতে পারেনি।
“রাতে একটু রাগারাগিও করেছি ছেলেটার সঙ্গে। বলেছি, যে বাবা তুমি না জানাইয়া সেখানে গেছো, একটু সাবধানে থাক। ছবি তুলো কিন্তু উপকূলে থেক।”
প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষে সোমবার কক্সবাজার বেড়াতে যান অরিত্র হাসানসহ পাঁচ বন্ধু। এর মধ্যে তিনজন মঙ্গলবার সকাল ৭টায় হিমছড়ি সৈকত এলাকায় গোসলে নেমে পানিতে ভেসে যান। এর কিছুক্ষণ পর সহপাঠী সাদমান রহমানের মরদেহ ভেসে আসে। একদিন পর নাজিরারটেক পয়েন্টে ভেসে আসে আসিফ আহমদের লাশ।
অরিত্রের বাবা সাকিব হাসান একজন সাংবাদিক। ঢাকার ইংরেজি দৈনিক নিউ এজে কাজ করেন তিনি। যিনি সারাজীবন মানুষের কষ্ট নিয়ে লিখেছেন, আজ তিনি নিজেই অসহায়। অভিযোগ করলেন কক্সবাজারের পর্যটন ঘিরে নানা অব্যবস্থাপনার।
সাকিব হাসান বলেন, “যে রিসোর্টকে কেন্দ্র করে আমার ছেলে এখানে আসছে। সেই রিসোর্টের নিজস্ব কোনো নিরাপত্তা নাই, লাইফ গার্ড নাই, কিচ্ছু নাই। আর কত এমন মৃত্যু হবে? আর কত বাবা-মায়ের বুক খালি করলে এই রিসোর্ট মালিকরা ব্যবস্থা নেবে?”
সাকিব হাসানের অভিযোগ, “১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্র সৈকতে মানুষ বিমোহিত হবেই! আমার না হয় বয়স হয়েছে, আমি এই সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েও নিজের আবেগকে ধরে রাখতে পারব। কিন্তু একটা ২১ বছরের ছেলে তা পারবে না। সে তো নামতে চাইবে, বিচরণ করতে চাইবে এই সৌন্দর্য।”
‘এইসব রিসোর্ট ব্যবসায়ীরা শুধুমাত্র তাদের ব্যবসার কথা চিন্তা করে কোনো রকম নিরাপত্তা ছাড়াই বাচ্চাদের সমুদ্রে নামতে দিয়েছে। যদি এই পয়েন্ট অনিরাপদ হয়, ঝুঁকিপূর্ণ হয় তাহলে কেন এখানে লাল পতাকা টাঙানো হলো না। প্রশাসনের কাছে আমি এই প্রশ্ন করতে চাই। আর কোনো মা-বাবা যেন সন্তানহারা না হয়”, বলেন তিনি।
রাজধানীর বাসাবোর নন্দীপাড়া এলাকায় থাকেন অরিত্রের পরিবার। স্বজনরাও এসেছেন কক্সবাজার। প্রার্থনা করছেন, ফিরে আসুক পরিবারের এই নিকটজন।
অরিত্রের ফুফু বলেন, “ছেলেটা আমাদের চোখের মনি। আমাদের পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে মাত্র ৮টা সন্তান। এমনিতেই সন্তান সংখ্যা অনেক কম। ছেলেটা আমাদের খুব আদরের। যেকোনো অবস্থাতেই ছেলেটাকে চাই, তার শরীরটা হলেও চাই। না পাওয়া পর্যন্ত কক্সবাজার থেকে যাচ্ছি না।”
পঞ্চম দিনে এসে ড্রোন ব্যবহার করে নিখোঁজের সন্ধানে নেমেছে উদ্ধারকারী দল। সি-সেইফ লাইফ গার্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বিমান বাহিনীর একটি দল। তারা জানান, উপকূলজুড়ে উদ্ধার অভিযান চলছে।
সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উদ্ধারকাজ চলছে জানিয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, “দুই দিন স্পিড বোট (দ্রুত জলযান) নিয়ে বিভিন্ন মোহনায় অভিযান চলেছে। আজকে থেকে ড্রোন যুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন দলে ভাগ করে উদ্ধার অভিযান চলছে।”
উদ্ধারে অংশ নেওয়া সি-সেইফ লাইফ গার্ডের আঞ্চলিক পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, শুক্রবারের মত শনিবারেও সৈকতে তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে। মহেশখালী থেকে শুরু করে সব উপকূলীয় এলাকায় খোঁজ লাগানো হয়েছে।