Published : 23 Oct 2024, 10:55 PM
বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত গভীর নিম্নচাপটি আরও পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’য় পরিণত হয়েছে।
এর প্রভাবে খুলনাসহ উপকূলীয় এলাকায় শুরু হয়েছে বৃষ্টিপাত।
ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’ আঘাতের পাঁচ মাস না যেতেই ফের উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে ‘দানা’।
খুলনা অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় বুধবার সকাল থেকেই ছিল মেঘাচ্ছন্ন। দুপুর ১২টার দিকে ভারি বৃষ্টি হয়েছে। পরে শুরু হয় গুঁড়ি গুঁড়ি।
খুলনা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিরুল আজাদ বলেন, “বুধবার দুপুর থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত খুলনায় ৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।”
বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী ঝড়ের মূলশক্তিটি ভারতের উড়িষ্যার ওপর দিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “এর বাংলাদেশের প্রভাবটি বৃহস্পতিবার রাতে উপকূল অতিক্রম করতে পারে। এ সময়ে উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টি আরও বাড়তে পারে।”
মোংলা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
এদিকে, ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়ার পর থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ নিয়ে উৎকণ্ঠা বাড়ছে উপকূলীয় এলাকার মানুষের।
বিশেষ করে, খুলনার কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা ও বটিয়াঘাটার কয়েক লাখ মানুষ।
উপকূলীয় মানুষদের আশঙ্কা, ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’র প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে নদ-নদীর জোয়ারের পানি বেড়ে দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে আবারও প্লাবিত হতে পারে এলাকা।
স্থানীয়রা জানান, খুলনার উপকূলীয় এলাকায় গত ২৬ ও ২৭ মে ঘূর্ণিঝড় ‘রিমালে’ ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ এখনও মেরামত করা সম্ভব হয়নি।
ফলে জোয়ারের পানির চাপে বাঁধ আরও দুর্বল হয়েছে। এরপর গত পাঁচ মাসেও তা সংস্কার না করায় বাঁধের অবস্থা জরাজীর্ণ।
কয়রার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুস সালাম খান বলেন, “তিন দিকে নদীবেষ্টিত কয়রার মূল সমস্যা নদী ভাঙন। যেকোনো দুর্যোগে নদীতে জোয়ারের চাপ বাড়লে কোথাও না কোথাও বাঁধ ভাঙে। ঝড়ের চেয়ে আমাদের বড় ভয় বেড়িবাঁধ।”
সালাম বলেন, “উপকূল সুরক্ষায় অর্ধশত বছরেরও আগে নির্মিত বেড়িবাঁধ এখন আর সামুদ্রিক ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা সামাল দিতে পারছে না। বারবার ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো বালুর বস্তা আর রিং বাঁধ দিয়ে কোনোরকম টিকিয়ে রাখা হয়েছে।”
স্থানীয় লোকজন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানা গেছে, খুলনার কয়রা উপজেলার দশহালিয়া, শিকারিবাড়ি, হোগলা, কালিবাড়ি, গুরিয়াবাড়ি, ৪, ৫ ও ৬ নম্বর কয়রা, মঠবাড়ি এবং কাটমারচর এলাকার প্রায় ৭ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
দাকোপ উপজেলার কাকড়াবুনিয়া, বানিশান্তা, নিশানখালি, আন্ধারমানিক, আড়াখালী, কালিবাড়ী, খলিশা, মৌখালি, রায়বাড়ি, তাঁতখালি ও তিলডাঙ্গা এলাকায় ৪ দশমিক ২৯ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
পাইকগাছা উপজেলার জামাইপাড়া, বাসাখালি, হারিখালি, বাইনতলা খেয়াঘাট, পশ্চিম কানাইমুখী, ননিয়াপাড়া, পাইশামারী, কুড়ুলিয়া, সেলেমানপুর, পুরাইকাটি এলাকার ৭ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
এ ছাড়া বটিয়াঘাটা উপজেলার বারোআড়িয়া, কড়িয়া, জব্বারখালি, ঠাকুরানবাড়ি, বুজবুনিয়া, দ্বীপ বরণপাড়া, কল্যাণশ্রীপুর, বটিয়াঘাটা বাজার এলাকার ৩ দশমিক ২২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অবস্থাও জরাজীর্ণ।
কয়রার মদিনাবাদ গ্রামের বাসিন্দা সোহাগ হোসেন বলেন, “উপজেলা পরিষদের পাশের মদিনাবাদ লঞ্চঘাটের দক্ষিণ পাশে নির্মাণাধীন বাঁধের প্রায় ৩০০ মিটার কপোতাক্ষ নদে ধসে পড়েছে। নদে জোয়ারের চাপ বাড়লে ওই স্থান ভেঙে উপজেলা পরিষদসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রাম লোনা পানিতে প্লাবিত হতে পারে।”
দাকোপের পানখালী ইউপি চেয়ারম্যান শেখ সাব্বির আহমেদ বলেন, “বাঁধ দীর্ঘদিন ঝুঁকিপূর্ণ থাকলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। শুক্রবার রাতে পানখালী লক্ষ্মীখোলার পিচের মাথার বাঁধে ২০০ মিটার জায়গা ধসে গেলে লোনাপানিতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।”
তিনি বলেন, “গ্রামবাসী ভেঙে যাওয়া বাঁধ কোনোমতে মেরামত করলেও শনিবার রাতে আবারও ভেঙে যায়। এতে লক্ষ্মীখোলা, কামারাবাদ, মৌখালী, জিরবুনিয়া, কাটাবুনিয়া, মোড়ারডাঙ্গা, খাটাইলসহ অন্তত সাতটি গ্রাম প্লাবিত হয়। জিও টিউব দিয়ে আবারও কোনোমতে তা মেরামত করা হয়েছে। তবে জায়গাটি এখনও ঝুঁকিপূর্ণ।”
উপজেলার পানখালী ইউনিয়নের লক্ষিখোলা পিচের মাথার বেড়ীবাঁধ শুক্রবার মধ্যরাতে জোয়ারের পানির চাপে ভেঙে যায়।
তাৎক্ষণিক পানখালী ইউনিয়নের লক্ষিখোলা ও কামারবাদ গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়। এরপর থেকে এলাকাবাসী বাঁধ আটকাতে তৎপর হয়।
তৎক্ষণাৎ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসমত হোসেন খবর পেয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বাঁধ সংস্কারে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।
পাইকগাছা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাজু হাওলাদার বলেন, “১৯ অক্টোবর রাতে পাইকগাছায়ও বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। উপজেলার লতার ইউনিয়নের নড়া নদীর তীরবর্তী রেখামারি স্থানে এ ভাঙন দেখা দেয়। পরে গ্রামবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামতের কাজ করেছেন।”
“এর আগে গত ২৩ অগাস্ট নদীর পানির প্রবল চাপে এ উপজেলার দেলুটি কালিনগর বাঁধ ভেঙে কালিনগর, সৈয়দখালী, হরিণখোলা, দারুলমল্লিক ও সেনেরবেড়সহ ১৩টি গ্রাম প্লাবিত হয়।”
পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনা-২ এর নির্বাহী মো. আশরাফুল আলম বলেন, “ঘূর্ণিঝড় রিমালে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত ১৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ইতোমধ্যে পুরোপুরি মেরামত সম্পন্ন হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ১০ কোটি টাকা। কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা ও বটিয়াঘাটার প্রায় ২৩ কিলোমিটার বাঁধ মেরামতের জন্য সম্প্রতি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ কোটি টাকা।”
তিনি বলেন, “দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এই ২৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ মেরামতের কার্যাদেশ দিতে মাস খানেক সময় লাগবে। এক মাস পর থেকে কাজ শুরু হবে।
“দুর্যোগে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আমাদের প্রস্তুতি আছে।”
এদিকে, বুধবার দুপুরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’ মোকাবিলায় খুলনায় ৬০৪টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখার কথা জানিয়েছেন ডিসি মো. সাইফুল ইসলাম।
এসব শেল্টারে তিন লাখের বেশি মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবককে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ নিজ কর্মস্থলে থাকার জন্য বলা হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে শুকনো খাবার ও ওষুধ।
স্বাস্থ্য বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড প্রস্তুত রয়েছে।
ডিসি সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, ৬০৪ সাইক্লোন শেল্টার মোট তিন লাখ ১৫ হাজার ১৮০ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। এছাড়া তিনটি মুজিব কিল্লায় ৪৩০ মানুষ আশ্রয় ও ৫৬০টি গবাদিপশু রাখা যাবে।
মোংলা বন্দরের হারবার মাস্টার কমান্ডার সাইফুর রহমান ভুইঁয়া বলেন, “বন্দর সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্কতা অবলম্বন এবং নিজ নিজ নিরাপত্তা বজায় রেখে কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বন্দরে আসা জাহাজসহ নৌযানকে নিরাপদ জায়গায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।”
খুলনা সার্কেলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো বলেন, “ঝড় হলে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন সুন্দরবনের কয়েকটি ক্যাম্পের স্টাফরা ঝুঁকিতে পড়েন। সেজন্য এবার প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের পাশের এলাকার ক্যাম্পে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।”