১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘মালিক’ ফিরছেন রাকসু ভবনে, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো যাবে কোথায়?

“আমরা রাকসু ভবন ব্যবহার করলেও সব সময় চেয়েছি রাকসু নির্বাচন যেন নিয়মিত হয়। আমরা রাকসু ভবন ব্যবহার করেছি, কিন্তু এর মূল মালিকানা কখনোই দাবি করিনি। এটি রাকসুর জন্যই।”

পাভেল রহমান পাভেল রহমান

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 15 Oct 2025, 11:48 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:29 PM

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন ঘিরে প্রার্থীরা যখন শেষ মুহূর্তের প্রচারে ব্যস্ত, তখন রাকসু ভবনের সামনে হারমোনিয়ামসহ কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র রিকশা-ভ্যানে তুলছিলেন তিনজন সাংস্কৃতিককর্মী।

দৃশ্যটি অনেকটা ভাড়াটিয়াদের বাড়ি পাল্টানোর মত; এক ঠিকানা ছেড়ে অন্য ঠিকানায় যাওয়ার দৃশ্য।

মঙ্গলবার বিকেলে রাকসু ভবনের ভেতরে যেতেই চোখ কপালে ওঠার মতো অবস্থা। একযোগে প্রায় সকল সংগঠনের কক্ষে জিনিসপত্র গোছানোর তোড়জোড়। 

ভবনটির কয়েক দশকের বাসিন্দাদের ছাড়তে হচ্ছে তাদের কক্ষ। ভবনের মূল মালিকরা ফিরছেন তাদের ঠিকানায়। প্রশ্ন হল, এতদিন ভবনটিতে যারা ছিলেন, তারা এখন কোথায় যাবেন?

বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৫টি সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন রাকসু ভবনের বিভিন্ন কক্ষ থেকেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। চার দশকের বেশি সময় ধরে ভবনটিতে নাটকের মহড়া করে আসছিল অনুশীলন নাট্যদল। তাদেরও ছাড়তে হচ্ছে এ ভবন। 

অনুশীলন নাট্যদল এতদিন যে কক্ষটিকে তাদের মহড়া কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল, সেটি মূলত রাকসুর সাধারণ সম্পাদকের (জিএস) কক্ষ। সাড়ে তিন দশক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাকসু নির্বাচন না হওয়ার কারণে এই ভবনে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি সাংবাদিকদের সংগঠন ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটি’র অফিসও ছিল। তারা যে কক্ষটি ব্যবহার করছিল, সেটিই রাকসুর সহ-সভাপতির (ভিপি) কক্ষ।

ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, দুজন তরুণ নাট্যকর্মী দোতলায় অনুশীলন নাট্যদলের কক্ষে বিভিন্ন সরঞ্জাম গোছাতে ব্যস্ত। 

তদের একজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শেখ রাসেল মডেল স্কুলের’ পুরাতন টিনশেড ভবনের একটি কক্ষ তাদের অস্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। 

এতদিন রাকসু ভবনে থাকা বেশিরভাগ সংগঠনেরই আপাতত ঠাঁই হচ্ছে ওই টিনশেড ভবনের ছোট ছোট কক্ষ।

আশির দশকের গোড়া থেকেই ‘অনুশীলন’

অনুশীলন নাট্যদলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম সভাপতি অধ্যাপক মলয় ভৌমিক; যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক। নাট্যকার হিসেবেও দেশজুড়ে খ্যাতি রয়েছে তার।

অধ্যাপক মলয় ভৌমিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অনুশীলন নাট্যদল ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠার পরের বছর থেকে রাকসু ভবনের জিএস এর কক্ষটি ব্যবহার করেছে। রাকসুতে ১৯৮০-১৯৮১ মেয়াদে ভিপি ছিলেন ছাত্র মৈত্রীর ফজলে হোসেন বাদশা; যিনি পরে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। বাদশার সঙ্গে জিএস ছিলেন ছাত্রলীগের জাহাঙ্গীর কবির রানা। 

“বাদশা-রানার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রাকসু নির্বাচন হয়নি। তখন জিএস এর কক্ষটি অনুশীলনকে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়। এরপর ১৯৮৮-১৯৯০ সালে ফের ডাকসু নির্বাচন হয়। ১৯৮৮ সালে রাগিব আহসান মুন্না ও রুহুল কুদ্দুস বাবু এবং ১৯৮৯-১৯৯০ মেয়াদে ভিপি-জিএস ছিলেন রুহুল কবির রিজভী ও রহুল কুদ্দুস বাবু। ওই সময়টায় অনুশীলন নাট্যদল কক্ষটি ছেড়ে দেয়। পরে যখন আবার রাকসু নির্বাচন অনিয়মিত হয়ে যায়, তখন কক্ষটি আবারো অনুশীলনকে বরাদ্দ দেওয়া হয়।”

মলয় ভৌমিকের ভাষ্য, “আমরা রাকসু ভবন ব্যবহার করলেও সব সময় চেয়েছি রাকসু নির্বাচন যেন নিয়মিত হয়। আমরা রাকসু ভবন ব্যবহার করেছি, কিন্তু এর মূল মালিকানা কখনোই দাবি করিনি। এটি রাকসুর জন্যই।” 

অনুশীলনের ৬৫টি নাটক মঞ্চে এসেছে। যার সবগুলোর মহড়া এই কক্ষে হয়েছে বলে জানান মলয় ভৌমিক।

১৯৮১ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত অনুশীলন নাট্যদলে সক্রিয় ছিলেন নাট্যকার মাসুম রেজা। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

সেসময়ের স্মৃতি মনে করে বাংলা একাডেমির পুরস্কারপ্রাপ্ত এই নাট্যকার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ, তার অনেকটাই এই রাকসু ভবন ঘিরে। আমরা মহড়া করে তখন আবুর হোটেলে চা খেতাম।”

কথাসাহিত্যিক দীপু মাহমুদ, ‘মনপুরা’-খ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা গিয়াস উদ্দীন সেলিমও ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। গিয়াস উদ্দীন সেলিম শুরুতে অনুশীলন নাট্যদলে যুক্ত থাকলেও পরে বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটার নামে নতুন সংগঠন গড়েন, সংগঠনটি পরে আর সক্রিয় থাকেনি।

শুধু অনুশীলন নাট্যদল নয়, দেশের সাংগঠনিক আবৃত্তি চর্চার প্রথম সংগঠন ‘স্বনন’ও রাকসু ভবনের একটি মহড়া কক্ষে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। তারাও ভবনটি ছাড়ছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটি (রুরু), সমকাল নাট্যচক্র, রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং ফোরাম, জাসাস, উদীচী, এডুকেশন ক্লাব, তীর্থক নাটক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ড্রামা অ্যাসোসিয়েশন, বিথিরা, অরণি সাংস্কৃতিক সংসদ, গণশিল্পী সংস্থা এবং অ্যাসোসিয়েশন ফর কালচার অ্যান্ড এডুকেশনসহ ১৫টি সংগঠনের কার্যালয় ছিল ভবনটিতে।

আপাতত বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শেখ রাসেল মডেল স্কুলের’ পুরাতন টিনশেড ভবনের কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে।  

আপাতত বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শেখ রাসেল মডেল স্কুলের’ পুরাতন টিনশেড ভবনের কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে।

সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো স্থায়ী ঠিকানা কবে পাবে?

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক মিজান শেখ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলি এতদিন রাকসু ভবন ব্যবহার করেছে, সেটা অস্থায়ীভাবেই। অনেক বছর পর রাকসু নির্বাচন হচ্ছে। ফলে সংগঠনগুলোকে এই কক্ষগুলি ছেড়ে দিতে হয়েছে।

“আমরা অনেক দিন ধরেই দাবি জানিয়ে এসেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে যেন ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে (টিএসসিসি) কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেটাই মূলত সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর জায়গা। কিন্তু টিএসসিসি ভবনটি অনেক বছরেও পূর্ণাঙ্গ ভবনে রূপান্তর করা যায়নি। আমরা দাবি জানিয়েছি, সেটি যেন সংস্কার করে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে বরাদ্দ দেওয়া হয়।” 

আশির দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (টিএসসিসি) নামে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি অনেক বছরেও। ছোট পরিসরে একটি ভবন নির্মাণ করা হলেও সেই ভবনের যে কক্ষ নির্মাণ করা হয়, তা ব্যবহার উপযোগী নয় বলে সংস্কৃতিকর্মীদের ভাষ্য।

টিএসসিসি নির্মাণের পরিকল্পনার সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। টিএসসিসির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অনেক আগের কথা। এখন খুব একটা মনে নেই। তখন আমি মাত্র রাজশাহীতে গিয়েছি। সেসময়ের কথা ভালোভাবে বলতে পারবেন অধ্যাপক মলয় ভৌমিক। অধ্যাপক মেসবাহ কামাল।

এ বিষয়ে অধ্যাপক মলয় ভৌমিক বলেন, “আশির দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রটিকে আমরা মূলত করতে চেয়েছিলাম ‘ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’। সেটির একটা রূপরেখাও করা হয়েছিল। কিন্তু তা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন আজও হয়নি। এর জন্য নামটিও টিএসসি না হয়ে ‘টিএসসিসি’ হয়েছে। সেখানে একটা ভবন করা হয়েছে। কিন্তু কক্ষগুলো ছোট ছোট, যা সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য উপযোগী নয়।”

নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক হাবিব জাকারিয়া উল্লাস বলেন, “এটা দুঃখজনক ব্যাপার যে, এত বছরেও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির স্থায়ী ঠিকানা হল না। ৩৫ বছর পর রাকসু নির্বাচন হচ্ছে। নির্বাচিত কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর সাংস্কৃতিক সংগঠনের জন্য একটা স্থায়ী জায়গা নির্ধারণের ব্যাপারে তারা তৎপর হবেন বলে প্রত্যাশা করি।”

নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক আতাউর রহমান রাজু ‘আনর্ত’ নামে একটি ছোটকাগজের সম্পাদক। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতিচর্চার জন্য টিএসসিসিই মূলত জায়গা। এটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি বলে রাকসুতে অস্থায়ীভাবে (সংগঠনগুলো) ছিল। কারণ রাকসু নিয়মিত ছিল না।

“অতীতের কোনো প্রশাসনই সাংস্কৃতিক সংগঠনের জন্য ভাবেনি। যদি ভাবত, তাহলে টিএসসিসি আরও আগেই পূর্ণাঙ্গ রূপ পেত। টিএসসিসিকে পূর্ণাঙ্গ ভবনে রূপান্তর করে, সেখানেই সব সাংস্কৃতিক সংগঠনকে জায়গা দেওয়া উচিত।”

কবে টিএসসিসি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মাঈন উদ্দীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাকসু ভবনে থাকা সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলিকে আপাতত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্কুলের টিনশেড ভবনে জায়গা দেওয়া হয়েছে।

“সাংস্কৃতিক কর্মীরা টিএসসিসি সংস্কার চায়, এটা আমাদেরও চাওয়া। কিন্তু এটা তো দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। টিএসসিসি কবে সংস্কার করে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে, তা এখন বলা সম্ভব নয়। রাকসু নির্বাচনের পর সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সাথে কথা বলে এ ব্যাপারে চিন্তা করা হবে। আপাতত তাদেরকে পুরাতন স্কুল ভবনেই জায়গা দেওয়া হয়েছে।”