০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩

কেমন আছে জাপানে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি ছাত্ররা

“হাত-পা ভাঙলেও স্কুলে যেতে হবে, শিক্ষকরা নিজ চোখে দেখে ডাক্তারের কাছে পাঠাবে, তারপর ছুটি।”

কেমন আছে জাপানে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি ছাত্ররা

লেখকের সেলফিতে জাপানে পড়তে যাওয়া বিশ্বজিৎ ঠাকুর।

মোহাম্মদ জুবায়ের মোহাম্মদ জুবায়ের

জাপান থেকে ফিরে

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 08 Nov 2026, 12:21 PM

Updated : 08 Nov 2026, 12:21 PM

“না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন যে…”। কথাটুকু শেষ হওয়ার আগেই মোহাম্মদ ইয়াসিন বললেন, “ভাই, কখনও কখনও মনে হয়, খাওয়ার চেয়ে ঘুমটাই বেশি জরুরি। ভোরে কাজে বের হতে হবে। একটু ঘুমিয়ে নিই। কাজে যাওয়ার আগে খেয়ে নেব।”

আর কথা বাড়াই না। দিনভর ক্লাস করে, তারপর কাজ শেষে রাতে ঘরে ফেরা ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত ইয়াসিনকে ঘুমাতে দিই। দেখি, কুকারে ভাত রয়েছে, মাছ-মাংসও রান্না করা আছে পর্যাপ্ত পরিমাণে। একা একা খেতে বসে মনটা খারাপ হয়। ভাবি, স্বচ্ছ্ল-সুন্দর জীবনের পেছনে ছুটতে কী কষ্টই না সইছে দেশ থেকে আসা এই তরুণেরা।

জাপানের যান্ত্রিক জীবনের বাস্তবতা কেবল এই ছাত্রটির নয়, বাংলাদেশ থেকে স্বপ্ন নিয়ে এশিয়ার উন্নত দেশটিতে পড়তে যাওয়া প্রায় সবার গল্প একইরকম। বিশেষ করে যারা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, যাদের পড়ার ফাঁকে শ্রম দিয়ে টিউশন ফি জোগাড় করতে হয়।

‘আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস-২০২৬’ কাভার করতে গিয়েছিলাম জাপান। ঢাকা থেকে চীনের গুয়াংজু হয়ে জাপানের ওসাকা বিমানবন্দর। তারপর ট্রেনে চেপে নাগোয়া স্টেশন। সেখানেই ইয়াসিন নিতে এসেছিল। চার স্টেশন পেরিয়ে নাকা ওতাই স্টেশনে নেমে ছেলেটির বাড়িতে যাওয়া। বাড়ি না বলে মেস বলা ভালো। এক ফ্ল্যাটে তিনজন- ইয়াসিন, জোবায়ের ও রাশেদ।

জাপানের ব্যস্ত জীবন বোঝাতে একটা উদাহরণই যথেষ্ট। এই তিনজনকে কখনও সেভাবে একসঙ্গে পাইনি বাসায়। কালে-ভদ্রে রাতের খাবারের সময় দেখা হতো। এই বাইরের দেখাটা এমন- ইয়াসিন ক্লাসে তো রাশেদ কাজে, তখন হয়ত জোবায়ের ঘুমাচ্ছে বাসায়! এই তাদের নিত্যদিনকার রুটিন।

ইয়াসিনের বাড়ি কুমিল্লায়। রাশেদ ও জোবায়ের মুন্সিগঞ্জের। ঢাকা নিহোঙ্গো একাডেমি থেকে জাপানি ভাষার পাঁচ ধাপের একটি শিখে শিল্পোন্নত দেশটিতে পাড়ি জমিয়েছে তারা। অনেক শখ চাপা দিয়ে! জোবায়ের যেমন আবাহনী ক্লাবের হয়ে ক্রিকেট খেলতেন। অনূর্ধ্ব-১৮, প্রথম বিভাগেও খেলেছেন। এখন সে পড়ছেন অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। রাশেদ পড়ছেন ইন্টারন্যাশনাল বিজনেসে। ইয়াসিনেরও অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন।

জাপানের জীবন কেমন লাগে? প্রশ্নটি শুনে ইয়াসিন হাসেন লাজুক হাসি। বলেন, “জাপানের জীবন ভালো আছে, যদি মানিয়ে নেওয়া যায়। এখানে ব্যস্ততা বেশি। প্রায় প্রতিদিন ক্লাস থাকে। এরা পড়াশোনার উপর খুব গুরুত্ব দেয়। আপনার হাত-পা ভাঙলেও স্কুলে যেতে হবে, তখন শিক্ষকরা নিজ চোখে দেখে আপনাকে ডাক্তারের কাছে পাঠাবে, তারপর ছুটি। ক্লাস ফাঁকি দিলে পয়েন্ট কেটে নেয়।”

এই যে এত কষ্ট, সহ্য হয়? তরুণ ইয়াসিনের কথাগুলো পরিণত, দায়িত্ববানের কণ্ঠ হয়ে কানে বেজে ওঠে, “বাড়িতে থাকতে তো একটা প্লেটও ধুয়ে খেতাম না। এখন রান্না, ঘর পরিষ্কার সব কাজই নিজেদের করতে হয়। শুরুতে একটু কেমন কেমন লাগত, এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন পড়ি, কাজ করি, ঘুমাই আর মাঝেমধ্যে সময় পেলে ঘুরতে যাই। তবে, এই জীবনেরও অন্যরকম আনন্দ আছে।”

Image

বাংলাদেশ থেকে জাপানে পড়তে যাওয়া ইয়াসিনের সেলফিতে তার বন্ধু রাশেদ ও লেখক।

কাজের ব্যস্ততায় নিজেরও ঘোরাঘুরি হয় না। একদিন গিয়েছিলাম কাঁচাবাজারে, রাশেদের সঙ্গে। নাগোয়া স্টেশন থেকে ২০ মিনিটের হাঁটা রাস্তা শেষ করে পৌঁছলাম নুর হালাল স্টোরে। দোকান বন্ধ দেখে গেলাম অদূরে আরেকটি দোকানে। এই ফাঁকে গল্প হয় নানা বিষয়ে। প্রতিটি রাস্তায় ট্র্যাফিক সিগন্যাল দেখে সে থামে, আমিও থামি (ঢাকায় এমন করে আমরা ট্র্যাফিক সিগনাল মানতে চাই না)।

কেবল ট্র্যাফিক সিগন্যাল নয়, সবকিছুতেই নিয়ম মানা জাপানিদের অভ্যাস। রাশেদ যেমন বললেন, “জাপানে এলে আসলে জাপানি হয়ে উঠতে হবে। ট্রেনে উচ্চস্বরে কথা বলা যাবে না। এমনকি নিজের ঘরেও না। কোথাও ময়লা ফেলা যাবে না। চারদিক দেখছেন না কেমন পরিষ্কার? আমরা যে বাজার করছি, এই বাজারও খোলামেলাভাবে নেওয়া যাবে না। মানে, আপনি কী কিনছেন, সেটাও অন্যকে দেখানো এখানে অভদ্রতা।”

রাশেদের কথা শুনে, ফেরার পথে নুর হালাল স্টোর থেকে কেনা ইলিশ মাছটি এমনভাবে পলিথিনে মোড়ালাম, যেন কারো দৃষ্টিগোচর না হয়! এত যে নিয়মের বালাই, কিন্তু জাপানের মানুষ ভীষণ বন্ধুসুলভ। সবাই শিনকানশেন ট্রেনের মতো বুলেট গতিতে ছুটছে, কিন্তু বন্ধুবৎসলতা, সহযোগিতা, মানবিকতার মনোভাব স্পষ্ট। যাত্রাপথে ট্রেন, প্ল্যাটফর্ম চিনতে যতবারই ভুল হয়েছে, ততবারই কেউ না কেউ এগিয়ে এসেছে। পৌঁছে দিয়ে গিয়েছে ট্রেনের দরজা পর্যন্ত। ইংরেজিতে আলাপচারিতায় একটু বেগ পোহাতে হয়েছে, এই যা। জোবায়ের বললেন, জাপানিজ ভাষা কিছুটা জানা থাকলেও কোনো সমস্যাই হয় না।

তার মতে, “জাপানে এলে আপনাকে প্রথম শর্ত ভাষা শিখে আসতে হবে। কিছু নিয়ম-কানুনও জেনে আসতে হবে। আমাদের দেশ থেকে যারা পড়তে আসে, তারা অনেকেই এগুলো না জেনে আসে। ফলে ট্রেনে কথা বলে ফেলে, জোরে হাসাহাসি করে, এতে জাপানিরা বিরক্ত হয়, ভিন্ন চোখে তাকায়।”

এশিয়ান গেমসের মিডিয়া সেন্টার কুনজো-ফুতো থেকে আসার পথে একদিন ট্রেনে দেখা হয় বিশ্বজিৎ ঠাকুর নামের ছেলেটির সঙ্গে। রাজশাহীতে বাড়ি। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরার স্বপ্ন নিয়ে জাপানে পাড়ি জমিয়েছে সে। ঘুম ঘুম চোখে আমাকে দেখে এগিয়ে এলো কাছে। আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করল, “বাংলাদেশ?” হ্যাঁ-সূচক উত্তর পেয়ে তার চোখ থেকে ঘুম নিমিষেই উধাও। বিদেশ-বিভূইয়ে দেশের একজনকে পাওয়ার উচ্ছ্বাস ফুটে উঠল তার চোখেমুখে।

ট্রেন বাতাসের বেগে এসে পৌঁছুল নাগোয়া স্টেশনে। দুজনে একসঙ্গে নামলাম। গল্প করলাম বেশ খানিকটা সময়। দেখলাম, কফি পান শেষে কাপটা সে ব্যাগে পুরছে। অন্য কোথাও ময়লা ফেলতে মানা, তাই। নানা আলাপে স্বপ্ন, লক্ষ্যটা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন বিশ্বজিৎ।

“বাবার মৃত্যুর পর সব দায়িত্ব আমার কাঁধে এসে পড়েছে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে জাপানে এসেছি। পরিশ্রম করছি। এখানকার জীবন খুব কঠিন, সেটা মেনে নিয়েই চলছি। দেখা যাক, সৃষ্টিকর্তা কপালে কী রেখেছেন? পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পারি কিনা?”

বাবা-মা, পরিবার-পরিজনদের মুখে হাসি ছোটাতে, স্বচ্ছ্বলতার প্রয়োজনে, স্বস্তির আশায় এই ছেলেগুলো বেছে নিয়েছে কষ্টের পথ। পরিবার থেকেই আছে দূরে। হঠাৎ মনে হয়- দেশে থাকা তরুণরা, ছাত্ররা কষ্টের পথ বেছে নিচ্ছে কী?