গ্রিসে তিন বাংলাদেশির মৃত্যু: প্রবাসে একাকিত্ব ও সুরক্ষার প্রশ্ন
অনেকের জীবনই কাটে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, আর্থিক দায়িত্ব এবং স্বজনদের কাছ থেকে দূরে থাকার বাস্তবতায়।
জীবিকার সন্ধানে দেশ ছেড়েছিলেন তারা। কেউ গড়ে তুলেছিলেন নিজের ব্যবসা, কেউ পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্নে পাড়ি জমিয়েছিলেন ইউরোপের দেশ গ্রিসে। প্রবাসের মাটিতে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন। স্বজনদের মুখে হাসি ফোটানো, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়া আর দেশে থাকা পরিবারের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তাদের জীবনের লক্ষ্য।
কিন্তু সেই জীবনসংগ্রামের মাঝেই থেমে গেল তিন বাংলাদেশির পথচলা। একজন ছুটি কাটিয়ে বাংলাদেশ থেকে গ্রিসে ফেরার দুই দিনের মাথায় হাসপাতালে মারা গেলেন। আরেকজনের মৃত্যু হলো দেশ থেকে ফেরার সাত দিনের মাথায় সড়ক দুর্ঘটনায়। অন্যজনের মরদেহ উদ্ধার হলো নিজের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে, কয়েক দিন দোকান বন্ধ থাকার পর।
তিনজনের মৃত্যু তিনভাবে। কিন্তু পেছনে পড়ে রইল একই রকম শূন্যতা, স্বজনদের কান্না আর প্রবাসজীবনের বাস্তবতার গল্প।
আট বছরের সন্তানকে রেখে সিজানের বিদায়
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার দেবপাড়া ইউনিয়নের বৈঠাখাল গ্রামের সিজান মিয়ার বয়স হয়েছিল ৩৫ বছর। ২০১৯ সালে জীবিকার সন্ধানে গ্রিসে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। স্বপ্ন ছিল পরিবারের সচ্ছলতা ফেরানোর এবং আট বছরের ছেলের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার।
সম্প্রতি ছুটি কাটাতে দেশে এসেছিলেন সিজান। স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে গত ৩ অক্টোবর আবারও গ্রিসের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন। পরদিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়। তখন তিনি গ্রিসে পৌঁছানোর কথা জানিয়েছিলেন। তারপর আর তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি স্বজনরা।
একপর্যায়ে গ্রিসে থাকা পরিচিতজনদের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, ৮ অক্টোবর রাতে এথেন্সে এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন সিজান। সিজানের মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বাংলাদেশ দূতাবাস। পরে ২৫ অক্টোবর মরদেহ ঢাকায় পৌঁছালে তা নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের বাড়িতে। ভোরে ঢাকায় পৌঁছানো সিজানের জানাজা অনুষ্ঠিত হয় দুপুরে বৈঠাখাল গ্রামের মাদ্রাসা মাঠে। পরে তাকে দাফন করা হয়।
যে মানুষটি পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে প্রবাসে এসেছিলেন, তার শেষযাত্রায় সেই পরিবারের সদস্যদেরই কাঁধে নিতে হলো মরদেহ। আট বছরের সন্তানটির কাছে বাবার এই বিদায় তৈরি করল শূন্যতা।
দেশে ছুটি কাটিয়ে ফিরেই সেলিমের মৃত্যু
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার পুলপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ সেলিমের বয়স হয়েছিল ৫৮ বছর। দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি বসবাস করছিলেন গ্রিসে। এথেন্সের একাডেমিয়া এলাকায় নিজের ব্যবসা পরিচালনা করতেন তিনি। কয়েক মাস বাংলাদেশে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে নতুন করে প্রবাসজীবনে ফিরেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই ফেরা আর দীর্ঘ হলো না। গত ৫ সেপ্টেম্বর গ্রিসে পৌঁছান সেলিম।
দেশে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আবারও কাজ ও ব্যবসার ব্যস্ততায় ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু গ্রিসে পৌঁছানোর পরপরই শারীরিক অসুস্থতা অনুভব করেন। পরে নিজেই এথেন্সের একটি হাসপাতালে ভর্তি হন।
পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা তাকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কথা জানান। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ৭ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় হাসপাতালেই মারা যান তিনি।
সেলিমের এই মৃত্যু প্রবাসজীবনের বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে। দেশে ছুটি কাটিয়ে প্রিয়জনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যে মানুষটি আবারও জীবিকার তাগিদে বিদেশে ফিরেছিলেন, তার আর স্বজনদের কাছে ফিরে যাওয়া হলো না।
এ প্রসঙ্গে কমিউনিটি নেতা তাজুল ইসলাম বলেন, “প্রবাসে অনেক বাংলাদেশি একা থাকেন। কাজ ও ব্যবসার ব্যস্ততায় অনেক সময় নিজেদের শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না। আবার কারও সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলে তিনি বিপদে পড়েছেন কি না, সেটিও সহজে বোঝা যায় না। প্রবাসীদের উচিত একে অপরের খোঁজখবর রাখা এবং অসুস্থ হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া।”
নিজের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানেই নিঃসঙ্গ মৃত্যু
গ্রিসের বন্দরনগরী পেরাইয়াসে একটি মুদি দোকান পরিচালনা করতেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা কোরবান আলী। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটিতে বসবাস করছিলেন তিনি। প্রবাসে নিজের ব্যবসা গড়ে তুললেও জীবনের শেষ অধ্যায়টি কেটেছে নিঃসঙ্গতায়।
গত ৯ অক্টোবরের পর থেকে তার দোকানটি বন্ধ ছিল। দোকানের ভেতরে একটি কক্ষে রাত কাটাতেন কোরবান আলী। কয়েকদিন ধরে দোকান বন্ধ থাকায় একপর্যায়ে ভেতর থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে গিয়ে তার মরদেহ উদ্ধার করে। তখন মরদেহটি অর্ধগলিত অবস্থায় ছিল। স্থানীয়দের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর ২০ অক্টোবর পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে।
কোরবান আলীর দেশে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। প্রবাসের মাটিতে নিজের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন যে মানুষটি, তার মৃত্যুর খবর সামনে আসে দোকান বন্ধ থাকা এবং দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর। বর্তমানে তার মরদেহ এথেন্সের একটি হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস।
এ প্রসঙ্গে নোয়াখালী সমিতি ইন গ্রিসের সভাপতি হাফেজ আহমেদ বলেন, “আমরা প্রবাসে পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকি। বিপদে-আপদে অনেক সময় পরিচিতজন ও কমিউনিটির মানুষই প্রথম ভরসা হয়ে ওঠেন। তাই কারও দীর্ঘদিন খোঁজ না পাওয়া গেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা একা থাকেন, তাদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখা জরুরি।”
একে অপরের পাশে থাকার তাগিদ
গ্রিসে বসবাসরত বাংলাদেশিদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে কাজ, ব্যবসা ও পরিবারকে সহায়তা করার মধ্য দিয়ে নিজেদের জীবন গড়ে তুলেছেন। কেউ রেস্তোরাঁয় কাজ করেন, কেউ নির্মাণশ্রমিক, আবার কেউ ছোট ব্যবসা পরিচালনা করে দেশে থাকা পরিবারের খরচ বহন করেন। তাদের অনেকের জীবনই কাটে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, আর্থিক দায়িত্ব এবং স্বজনদের কাছ থেকে দূরে থাকার বাস্তবতায়।
তবে সর্বশেষ এই তিন গ্রিস প্রবাসীর মৃত্যুর ঘটনার প্রেক্ষাপট এক নয়। সেলিমের মৃত্যু হয়েছে অসুস্থতার পর হাসপাতালে, সিজানের মৃত্যু সড়ক দুর্ঘটনায় এবং কোরবান আলীর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে তার ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান থেকে। তবু ঘটনাগুলো প্রবাসজীবনে স্বাস্থ্যসচেতনতা, নিরাপত্তা, সামাজিক যোগাযোগ এবং বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর গুরুত্ব নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
গ্রিসে কমিউনিটি নেতা তাজুল ইসলাম বলেন, “প্রবাসে কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া, পরিচিতজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং দীর্ঘ সময় কারও খোঁজ না পেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে একাকী বসবাসকারী প্রবাসীদের ক্ষেত্রে পরিবার, বন্ধু ও কমিউনিটির নিয়মিত খোঁজখবর বড় ভূমিকা রাখতে পারে।”
