২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮ আশ্বিন ১৪৩৩

এথেন্স ৫৪তম আন্তর্জাতিক বইমেলা: সন্ধ্যার বাতাসে কাগজের সুবাস

প্রযুক্তির অতি-ব্যবহারের যুগেও মানুষ যে কারণে বইয়ের কাছেই ফিরে আসে।

এথেন্স ৫৪তম আন্তর্জাতিক বইমেলা: সন্ধ্যার বাতাসে কাগজের সুবাস

গ্রিসে বইমেলার ইতিহাস কিন্তু আজকালের নয়। এর গোড়াপত্তন বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে, বিশেষ করে গ্রিক বুক পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে।

তাইজুল ফয়েজ, গ্রিস থেকে

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 23 Sep 2026, 02:33 PM

Updated : 23 Sep 2026, 02:41 PM

গ্রিসের ঐতিহাসিক রাজধানী এথেন্সের কথা ভাবলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাজার বছরের প্রাচীন স্থাপত্য, দেব-দেবী আর জ্ঞানচর্চার অমলিন স্মৃতি। সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটলের এই ভূমিতে দাঁড়িয়ে সাহিত্যকে ভালোবাসার জন্য কোনো কৃত্রিম বাহানার প্রয়োজন হয় না।

তবে সেপ্টেম্বরের এক মিষ্টি সন্ধ্যায় এথেন্সের ট্র্যাফিক আর প্রাচীন পাথুরে ভাস্কর্যের নগরী পেরিয়ে যখন পেদিওন তৌ আরেওস উদ্যানের কাছে পৌঁছালাম, তখন চারপাশের পরিবেশ সম্মোহনী রূপ ধারণ করেছিল। গ্রিক পৌরাণিক যুদ্ধদেবতা ‘এরিস’-এর নামানুসারে গঠিত এই ঐতিহাসিক উদ্যানের সবুজ পাইন গাছের পাতার ঘ্রাণের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল তাজা ছাপা বইয়ের কালি আর নতুন কাগজের সুবাস।

গ্রিসের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, অ্যাটিকা আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ, এথেন্স পৌরসভা এবং গ্রিক বুক পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ পরিচালনায় ৫৪তম এথেন্স আন্তর্জাতিক বইমেলা তার দুয়ার খুলে দিয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই মেলার একটি নির্দিষ্ট ঐতিহ্য ছিল; আয়োজিত হতো ঐতিহাসিক ‘জাপেইয়ন’ প্রাঙ্গণে।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেলার কলেবর বৃদ্ধি পাওয়া এবং সাধারণ মানুষের জন্য আরও উন্মুক্ত পরিসর তৈরি করার উদ্দেশ্যে মেলাটি স্থানান্তরিত হয় এথেন্সের অন্যতম বৃহৎ এই সবুজ উদ্যানে। ফলে মেলা কেবল প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশাল উন্মুক্ত পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ নিয়েছে।

গ্রিসে বইমেলার ইতিহাস কিন্তু আজকালের নয়। এর গোড়াপত্তন বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে, বিশেষ করে গ্রিক বুক পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে। সত্তর দশকের শুরুর দিকে যখন এটি প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে, তখন উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় প্রকাশকদের বই পাঠকদের সামনে তুলে ধরা। সময়ের পরিক্রমায় সেই সাধারণ আয়োজনটিই আজ পুরো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, মধ্য-মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপীয় সাহিত্যের অন্যতম প্রধান মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

Image

মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশপথ পেরিয়ে ভেতরে এগোতেই চোখে পড়েছিল সুসজ্জিত দীর্ঘ সারি সারি স্টল।

ঐতিহাসিকভাবে এথেন্স শহরটি বই ও সাহিত্যের প্রতি তাদের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছে নানাভাবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এথেন্স যখন ‘ওয়ার্ল্ড বুক ক্যাপিটাল’ বা বিশ্ব বই রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে, তখন শহরের মূল দর্শনই ছিল: “বই ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে”।

সেই মূলধারার সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাই বহমান রয়েছে এই ৫৪তম আসরে। গত ৪ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা ১৭ দিনের এ উৎসবে ২১০টি প্রকাশনা সংস্থা ২৮৫টি সুসজ্জিত স্টল নিয়ে হাজির হয়েছিল। ছিল বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ। ৭ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে মেলা উদ্বোধন হলেও ৪ সেপ্টেম্বর থেকেই উন্মুক্ত এই উদ্যান পাঠকদের কলকাকলিতে মুখরিত ছিল।

মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশপথ পেরিয়ে ভেতরে এগোতেই চোখে পড়েছিল সুসজ্জিত দীর্ঘ সারি সারি স্টল। প্রতিটি স্টলের মাথায় জ্বলছিল হালকা হলদে আলো, আর উদ্যানের ফোয়ারাগুলো রাতের অন্ধকারে সেই আলোর প্রতিফলন ঘটিয়ে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করছিল।

এবারের মেলার মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে সময়োপযোগী একটি বিষয়কে সামনে রেখে: ‘টেকসই উন্নয়ন: আগামীকালের স্থপতি হিসেবে বই’। জাতিসংঘের ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে পরিবেশ সুরক্ষা, সামাজিক সমতা, দায়িত্বশীল ভোগ, মানসম্মত শিক্ষা এবং টেকসই নগর ও সমাজ নির্মাণের মতো সামাজিক ও বৈশ্বিক বিষয়গুলোকে সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। আজকের এই দ্রুতগতি সম্পন্ন প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে, যেখানে মানুষের মনোযোগের বড় অংশজুড়ে রয়েছে মোবাইল, স্ক্রিনটাইম আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সেখানে এথেন্সের এই বইমেলা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে ধীর গতিতে চিন্তা করার এবং মানবিক অনুভূতি জাগ্রত করার সবচেয়ে শক্তিশালী অনুঘটক আজও একটি মুদ্রিত বই।

স্টলগুলোর গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখছিলাম, কেউ নির্দিষ্ট বইয়ের তালিকা হাতে নিয়ে ঘুরছেন, কেউ কেবল কৌতূহলবশত পাতা উল্টে দেখছেন। পুরো মেলাজুড়ে আয়োজিত ২০০টিরও বেশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট অফিস, ইউরোপীয় কমিশন, নেটওয়ার্ক ফর চিলড্রেনস রাইটস এবং ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অন বুকস ফর ইয়ং পিপল (আইবিবিওয়াই)-এর গ্রিক শাখার যৌথ আয়োজনে বিভিন্ন প্যানেল আলোচনা চলছিল খোলা মঞ্চে।

Image

মেলার এক স্টলে বই দেখছেন লেখক।

অন্যদিকে ‘রাইটার্স কর্নার’-এ নতুন ও অভিজ্ঞ লেখকদের সঙ্গে পাঠকদের সরাসরি বিতর্ক ও আলোচনা জমজমাট হয়ে উঠেছিল। উদীয়মান লেখকদের জন্য রাখা বিশেষ তিন দিনের আয়োজন নতুন চিন্তার পথ উন্মোচন করেছে। হেলেনিক কমিকস একাডেমি আয়োজিত শিশুদের জন্য বিশেষ বিভাগে দেখা গেল এক মনোরম দৃশ্য; শিশুরা হাসিমুখে কমিকস আর রঙিন ছবির বই নিয়ে মেতে আছে। জোর করে পড়ার টেবিলে বসানোর সংস্কৃতি বাদ দিয়ে, বইকে কীভাবে আনন্দের সঙ্গী হিসেবে উপস্থাপন করা যায়—এথেন্স বইমেলা যেন তারই এক প্রত্যক্ষ পাঠশালা।

মেলার পথ ধরে যত এগোচ্ছিলাম, কানে আসছিল নানা ভাষার গুঞ্জন—গ্রিক, ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, আরবি ও ফার্সি। এথেন্স এমনই এক শহর যেখানে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের সমাগম ঘটে। এই বহুভাষিক সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ করেই আমার মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল মাতৃভাষা বাংলার জন্য। বাংলা ভাষা পৃথিবীর অন্যতম প্রাচুর্যময় ও সমৃদ্ধ ভাষা। চর্যাপদের পদাবলী থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ কিংবা আধুনিক বাংলা সাহিত্য—আমাদের রয়েছে হাজার বছরের দীর্ঘ এবং গভীর এক ঐতিহ্য।

কিন্তু আন্তর্জাতিক এই সাহিত্য উৎসবে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করলাম, বিশ্বসাহিত্যের মূলধারায় বা অনুবাদ সাহিত্যে আমাদের উপস্থিতি এখনও যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। আমরা যারা প্রবাসে বসবাস করি, আমাদের জন্য মাতৃভাষা শুধু ঘরের ভেতর বা পরিবারের সঙ্গে কথা বলার একটা মাধ্যম নয়; এটি আমাদের সত্তা, আমাদের শিকড়। ইউরোপে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের প্রবাসী তরুণ-তরুণীদের কাছে আমাদের এই সমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি পৌঁছে দেওয়া আজ জরুরি। আন্তর্জাতিক বইমেলাগুলোতে প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও অনুবাদকদের উদ্যোগ বাড়াতে হবে, যাতে বাংলা ভাষা শুধু দেশের সীমানায় নয়, আন্তর্জাতিক সাহিত্যপ্রেমীদের কাছেও স্বমহিমায় পৌঁছে যেতে পারে।

১৭ দিনব্যাপী চলা এই মেলায় কোনো দর্শনার্থী হয়তো একটি নির্দিষ্ট বই কিনতে এসে অন্য আরেকটি বই কিনে বাড়ি ফিরেছেন। কোনো শিশু হয়তো প্রথমবারের মতো নিজের পছন্দের একটি গল্প বেছে নিয়েছে, আবার কোনো তরুণ হয়তো কোনো প্রবীণ লেখকের অনুপ্রেরণায় নিজে এক দিন নতুন কিছু লেখার সাহস পেয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে আসার মুহূর্তে মাথার ওপর এথেন্সের রাতের আকাশ আর পেদিওন তৌ আরেওস উদ্যানের পাইন গাছের দীর্ঘ ছায়াগুলো মায়াবী নীরবতায় আমাকে বিদায় জানাচ্ছিল।

বই হয়তো সরাসরি কোনো রাজনৈতিক বা পরিবেশগত সমস্যার সমাধান রাতারাতি করবে না, কিন্তু বই মানুষের মন ও সমাজ বদলানোর প্রাথমিক অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। মানুষ যখন প্রশ্ন করতে শেখে, মানুষ যখন অন্যের গল্প নিজের ভেতরে অনুধাবন করতে শেখে—তখনই পরিবর্তন শুরু হয়। এথেন্সের ৫৪তম আন্তর্জাতিক বইমেলা আমাকে দেখিয়েছে, সাহিত্যের মাধ্যমেই কেবল বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও ভাষার মানুষকে এক সুতোয় গাঁথা সম্ভব। আর সেই বৈশ্বিক মিলনমেলায় আমার প্রিয় বাংলা ভাষার জন্য আরও বড়, আরও উজ্জ্বল একটি স্থান তৈরি করার স্বপ্ন বুকে নিয়েই রাতের এথেন্সে আমার ফেরার পথ ধরা।

লেখক: কেন্দ্রীয় সভাপতি, ইউরো বাংলা প্রেস ক্লাব