২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

একমত হতে ‘বাধ্য করা’ হলে মানা সম্ভব না: সালাহউদ্দিন

“আমরা বিশ্বাস করি, ৩০টি রাজনৈতিক দল একত্রে তত্ত্বাবধায়ক কাঠামোর বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারবে,” বলেন আলী রিয়াজ।

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 28 Jul 2025, 11:05 PM

Updated : 26 Aug 2026, 01:28 PM

সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়ে নিজেদের আপত্তি তুলে ধরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সব প্রস্তাবে শতভাগ একমত হতে বললে আলোচনার জন্য ডাকার কোনো মানেই নেই।

তিনি বলেন, “এখন যদি আমাদের বাধ্য করা হয় যে এসব বিষয়ে একমত হতেই হবে, সেটাতো মানা সম্ভব না।”

সোমবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় দফার বিংশতম বৈঠক শেষে বিফ্রিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি।

এদিন বাক বিতণ্ডা আর চাপাচাপির মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়ে।

এতে করে এদিন সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলোচনার কথা থাকলেও তা হয়নি।

এদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে ৩০টি রাজনৈতিক দলের নেতাদের এ বৈঠক হয়।

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিনের মত কমিশনের পক্ষ থেকে চাপাচাপির বিষয়টি তুলে ধরেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “আর চাপাচাপি করাও যৌক্তিক নয়। এতে বৈঠক দীর্ঘায়িত হচ্ছে।“

তার মতে, জোর করে ঐকমত্যের চেষ্টা যথাযথ হবে না।

দিনভর বৈঠকের বিষয়ে বিফ্রিংয়ে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন বলেন, "কমিশনে আমাদের একটা শর্ত ছিল যে, এনসিসির মতো বা সাংবিধানিক নিয়োগ কমিটির মতো কোনো বিষয় এখানে থাকলে সেই বিবেচনা আগের প্রস্তাব অনুসারে যেতে হবে আমাদের। সেই বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি।

”নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি যেমন সংসদের কাছে, তেমনি জনগণের কাছেও রয়েছে। কিন্তু যদি কর্তৃত্ব না থাকে, কেবল দায়িত্ব আর জবাবদিহি থাকে, তাহলে তা কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যথেষ্ট নয়। সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগে নির্বাহী বিভাগের হাত–পা বাঁধা হলে তা ভবিষ্যতের জন্য বাধা সৃষ্টি করতে পারে।“

তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, "জনগণের প্রত্যাশা পূরণে নির্বাহী বিভাগকে শক্তিশালী হতে হবে, দুর্বল নয়। জাতীয় ঐকমত্য পোষণ হলে যেসব বিষয়ে দলগুলো একমত হবে, সেই বিষয়গুলো এক করে জুলাই সনদ বা জাতীয় সনদে সই হওয়ার কথা। 

”এখন যদি আমাদের বাধ্য করা হয় যে এসব বিষয়ে একমত হতেই হবে, সেটাতো মানা সম্ভব না। নির্বাচন কমিশন গঠনে একটি স্বাধীন সার্চ কমিটি গঠন করা হোক, যেখানে সরকারি দল, বিরোধী দল ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধি থাকবে, সেটিও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে পরবর্তী সময়ে সংসদ কোনো সংশোধনী আনলে, তা রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে গণভোটে যেতে হবে। এটি গৃহীত হওয়া মানে, দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় পদক্ষেপ।"

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক প্রিন্স বলেন, "একটি দল আলোচনা করছে না তাহলে এই বিষয়ে ঐকমত্য কীভাবে হবে? অনেক বিষয়েতো আগেই আলোচনা হয়েছে। তারপরও এসব বিষয়ে এতো সময় কেন নেওয়া হচ্ছে? আর বড় একটি দলের বিরোধিতার পর এসব বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।”

তিনি বলেন, যেসব বিষয়ে বিতর্ক থাকছে সেগুলো বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ঐকমত্য হওয়া বিষয়গুলো নিয়ে দ্রুত যাওয়া উচিত।

”সব এক কাঠামোর মধ্যে আপনি আনতে পারবেন না, এটি অসম্ভব। আমরা ক্ষমতায় গেলে একধরনের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি করবো, অন্য আরেকদল ক্ষমতায় গেলে আরেক রকম করবে। আরেকজন ক্ষমতায় গেলে আরেকটা নীতিমালা করবে। আদর্শের মিল তো হবে না।”

এদিন সকাল সাড়ে ১০টার পর সরকারি কর্ম কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান আলোচনার জন্য উপস্থাপন করেন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ।

এসময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তারা আলোচনায় অংশ নেবেন না। রাষ্ট্র পরিচালনায় নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা রক্ষায় কমিশনের বৈঠক থেকে ওয়াকআউট করে বিএনপি। কারণ দলটি মনে করে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা খর্ব করা হলে রাষ্ট্র পরিচালনায় ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

এর কিছুক্ষণ পর আলোচনার স্থান ফরেন সার্ভিস একাডেমি ভবনে ফায়ার অ্যালার্ম বেজে ওঠায় হুড়োহুড়ি করে বের হয়ে আসেন সবাই। পরে কিছু সময় পর বিএনপি আবার বৈঠকে যোগ দেয়।

সন্ধ্যায় বিফ্রিংয়ে দিনভর বৈঠকের বিষয়ে আলী রীয়াজ বলেন, "আমরা এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছি যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রয়োজন ও প্রস্তাবনার ভিত্তিতে একটি সমন্বিত সনদ তৈরি সম্ভব।

”খসড়া সনদ রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে ৩০ জুলাই বুধবার দুপুর ১২টার মধ্যে পরামর্শ বা সংশোধনী জানাতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। দলগুলোর প্রস্তাব ও পরামর্শের ভিত্তিতে সেদিনই সনদের চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুতের চেষ্টা থাকবে।"

তিনি বলেন, "আজকের আলোচনায় যে চারটি সাংবিধানিক বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকারি কর্ম কমিশন,  মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও ন্যায়পাল।

কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এ নিয়োগগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে একটি স্বতন্ত্র, নিরপেক্ষ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।

"বিএনপি ও তার সমমনা কয়েকটি দল সংবিধানে না এনে আইনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের পক্ষপাতী, তবে অধিকাংশ দল সংবিধানের ১৩৭ অনুচ্ছেদে সংশোধন এনে নিয়োগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পক্ষে।"

ঐকমত্য কমিশনের পক্ষে আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া আলী রিয়াজ বলেন, "দুর্নীতি দমন কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের ব্যাপারে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। এতে যদিও বিএনপি কিছু ভিন্নমত পোষণ করেছে। তবুও আলোচনার ধারা ইতিবাচক মনে হয়েছে।

"তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো এবং প্রধান উপদেষ্টার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একাধিক প্রস্তাবের মধ্যে অন্যতম ছিল- সর্বসম্মতিভিত্তিক নির্বাচন র‍্যাংকড চয়েস, ওপেন ভোট এবং ত্রয়োদশ সংশোধনীতে ফিরে যাওয়া তবে বিচার বিভাগকে অন্তর্ভুক্ত না করে।"

তিনি বলেন, "তত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো নিয়ে জামায়াতে ইসলামী নতুন একটি প্রস্তাব আনলেও বিএনপি এখনো সেটি প্রাথমিকভাবে বিবেচনা করছে। চূড়ান্ত অবস্থান জানায়নি।

”আমরা আশা করছি, রাতের মধ্যেই জামায়াতে ইসলামী সেটি লিখিতভাবে প্রস্তাব দেবে এবং আগামীকাল সকালে আলোচনা পুনরায় শুরু হলে এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অগ্রগতি হবে।

"আমরা বিশ্বাস করি, ৩০টি রাজনৈতিক দল একত্রে তত্ত্বাবধায়ক কাঠামোর বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারবে। এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। জাতীয় ঐক্যের এই মুহূর্তকে সফলভাবে সমাপ্ত করা আমাদের সকলের স্বার্থে।”

কমিশনের প্রস্তাবে সায় জামায়াত-এনসিপির

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, “আমরা চাই দুদক সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হোক, যাতে কোনো রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে আইন পরিবর্তন করতে না পারে। জাতীয় স্বার্থে সংবিধান সংশোধনের দরকার হলে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

"দুদক শক্তিশালী হওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের কোনো ধরনের কার্পন্য বা ফাঁক থাকা এ ব্যাপারে কোন কিছুই আমরা রাখতে চাই না। আমরা খুবই দৃঢ় এবং প্রায় চার তৃতীয়াংশ পার্টিও আজকে এটা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে একমত। যারা সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করতে চাননি তাদের একটা যুক্তি হচ্ছে,  সংবিধানে যদি এটা (দুদক) অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে যদি প্রয়োজনে কোনো পরিবর্তন দরকার হয় পরিবর্তনটা সহজ হবে না।"

তিনি বলেন, "আমরা বলেছি, এ কারণেইতো আমরা সংবিধানের ভিতরে চাই। যে যুক্তিতে আপনারা আইন করে এটা করতে চান, সেই এক যুক্তিতে আমরা এটা সংবিধানে পাঠাতে চাই। কারণ শুধু আইন করলে অধিকাংশ সরকার সকাল-বিকাল আইন পরিবর্তন করতে পারে। আওয়ামী লীগ করেছে। আমরা চাই না, কোন একটি দলের প্রয়োজনে এখানে দুদুকের আইন পরিবর্তন হোক।“

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন বিষয়ে তিনটি প্রস্তাব তুলে ধরে জামায়াতের এই নেতা বলেন, "প্রথম দুটি প্রস্তাব কার্যকরি না হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে নতুন প্রস্তাব করেছি। দুই প্রস্তাবে সর্বসম্মত না হলে তৃতীয় প্রস্তাব হিসেবে র‍্যাংকড চয়েস রেখেছি।ৎ

”তবে শর্ত হচ্ছে প্রকাশ্যে ভোট প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। যেখানে সদস্যরা ওপেন ভোটে নিজের পছন্দ জানাবেন। এতে হর্স ট্রেডিং রোধের সম্ভাবনা বাড়বে।"

বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, "নির্বাচন কমিশন নিয়োগের ক্ষেত্রে একটা বাছাই কমিটির ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন এবং সেটাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন। ঠিক একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাকি যে সংবিধিবদ্ধ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো আছে সেখানেও আপনারা আপনাদের দলীয় অবস্থান পুনর্বিচনা করবেন।

"বিগত পাঁচ দশকে যে দলই ক্ষমতায় এসেছে, তারা নিজেদের মত করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ দিয়েছে, ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণের শিকার হয়েছে এবং জনবান্ধবতা হারিয়েছে।"

তিনি বলেন, “আমরা যদি নিয়োগ প্রক্রিয়া দলীয় বিবেচনার বাইরে এনে একটি নিরপেক্ষ, সকল পক্ষের প্রতিনিধিত্বে গঠিত বাছাই কমিটির মাধ্যমে পরিচালনা করতে পারি, তাহলে দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি নিশ্চিত হবে।”

পিএসসি ও দুদকের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ঐক্যমত কমিশনের প্রস্তাব তুলে ধরে তিনি বলেন, " এ দুই সংস্থায় নিয়োগ যদি একটি নিরপেক্ষ বাছাই কমিটির মাধ্যমে হয় এবং সেটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তাহলে সেটির স্থায়িত্ব এবং নিরপেক্ষতা উভয়ই রক্ষা পাবে। সংবিধান পরিবর্তন যতটা কঠিন, আইন পরিবর্তন তার তুলনায় সহজ। দুদকে সাংবিধানিক অন্তর্ভুক্তি নিরাপদ।"

এনসিপির এই নেতা বলেন, "বিগত বছর কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় প্রশ্নফাঁস এবং ভাইভায় দলীয় বিবেচনার মতো ঘটনাগুলো জনগণের আস্থায় চরম ধাক্কা দিয়েছে। আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ চাই, যেখানে চাকরি হবে মেধার ভিত্তিতে, কোনো দলীয় প্রভাব থাকবে না।

"জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে জনচেতনা তৈরি হয়েছে, তা দলীয় নিয়ন্ত্রণ মুক্ত একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষেই কথা বলছে। আমরা আর দলীয়করণের কোন প্রতিষ্ঠান দেখতে চাই না। আমরা চাই রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে, জনস্বার্থে কাজ করুক।"

আরও পড়ুন

ঐকমত্যর বৈঠক: প্রথমে বিএনপির 'ওয়াকআউট', পরে ফায়ার অ্যালার্ম

ফরেন সার্ভিস একাডেমি: ফায়ার অ্যালার্মের ঘটনায় তদন্ত কমিটি

সচিবালয়ে এখন তারাই, যারা 'স্লিপের' মাধ্যমে এসেছে: জামায়াত