Published : 20 Aug 2026, 08:51 PM
বনানী গোরস্থানে চিরশায়িত হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী দীপু মনির স্বামী তৌফীক নাওয়াজ।
পেশায় এই আইনজীবী ছিলেন একজন নিভৃতচারী শিল্পীও। নিয়মিত বাজাতেন বাঁশি। খেলতেন ক্রিকেট।
বৃহস্পতিবার গুলশান আজাদ মসজিদে নিভৃতচারী এই মানুষটির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বেলা পৌনে ৩টার দিকে বনানী গোরস্তানে বাবা আমিনর রহমানের কবরে তাকে দাফন করা হয়। পাশেই তার মা খায়রন নেছার কবর।
তৌফীক নাওয়াজের শৈশবের বন্ধু আইনজীবী ও রাজনীতিক মহসিন রশীদ।
ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “তৌফীক নাওয়াজ একজন নিভৃতচারী মানুষ ছিলেন। যেমন ক্রিকেট খেলতেন, তেমনি বাঁশিও বাজাতেন।
“বাঁশি বাজানো তো তাদের পরিবারের একটি অংশই। তার বাবা আমিনর রহমান বাঁশি বাজাতেন। তার ছেলে তৌকীর নাওয়াজও ভালো বাঁশি বাজায়। তৌফীক তো একক বাঁশি বাজানোর অনুষ্ঠানও করতো।”
তৌফীক নাওয়াজ শৈশবে শিক্ষা লাভ করেছেন রাজধানীর সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলে।
তৃতীয় শ্রেণি থেকে একসঙ্গে পড়েছেন মহসিন রশীদ। তিনি বলেন, তৌফকী নাওয়াজ ঢাকায় পড়াশোনা শেষ করে গ্র্যাজুয়েশন করেছেন অক্সফোর্ড থেকে। সেখানে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।
আইনবিদ্যায় পড়ালেখা শেষ করে দেশে ফিরে কামাল হোসেনের চেম্বারে আইন পেশা শুরু করেন তৌফীক নাওয়াজ, বলছিলেন মহসিন রশীদ।
বন্ধুর জানাজায় এসেছিলেন বেশ কয়েকজন সহপাঠী। তাদের মধ্যে মহসিন রশীদ ছাড়াও ছিলেন সৈয়দ আশরাফুল হক, মনিরুল আলম।
একজন বন্ধু নিজের নাম প্রকাশে রাজি হননি। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি নাম বলতে পারব না, সমস্যা হয়। তবে তৌফীক নাওয়াজ অনেক ভালো, সৎ মানুষ ছিলেন।”
আশৈশব বন্ধু আইনজীবী মহসিন রশীদ বলেন, “পেশাগত জীবনে তৌফীক নাওয়াজ অত্যন্ত নিষ্ঠাবান হিসেবে কাজ করেছেন। তার দেশের জন্য মায়া ছিল অনেক। আমাদের বঙ্গোপসাগরে আন্তর্জাতিক সীমানা বিজয়ের নেপথ্যে তার ভূমিকা ছিল অনবদ্য। তিনি বাংলাদেশের পক্ষে লড়েছেন সব সময়।
“দেশের স্বার্থে আইন অঙ্গনে তিনি তৎপর ছিলেন সব সময়।”
আজাদ মসজিদে জানাজার পর তার এক বন্ধু নিজের পরিচয় ও নাম প্রকাশ না করে বলেন, “স্ট্রোকের পর ও তো কেবল চোখ নাড়াতে পারতো। ও খুব ট্যালেন্ট ছিল, ওর মাথা (ব্রেন) কাজ করছিল।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তৌফীক নাওয়াজ মঙ্গলবার রাতে ঢাকার কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে (সাবেক ইউনাইটেড হাসপাতাল) মারা যান।
৭৬ বছর বছর বয়সি তৌফীক নাওয়াজ দীর্ঘ দিন ধরে কিডনি ও লিভারের নানা জটিলতায় ভুগছিলেন।
২০১৯ সালে তিনি স্ট্রোক করেছিলেন। সর্বশেষ গত ২৭ মে হুইল চেয়ারে করে কারাবন্দি স্ত্রী দীপু মনিকে দেখতে তাকে আদালতে নিয়ে গিয়েছিলেন স্বজনেরা।
সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি চব্বিশের আন্দোলনের পরে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ কারাগারে আটক আছেন। স্বামীর শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে তাকে ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার সকালে প্যারোলে মুক্তি পান তিনি। সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে তাকে মুন্সীগঞ্জ কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে কঠোর পুলিশি পাহারায় ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। সকাল সোয়া ৮টায় তিনি কলাবাগানের বাসায় পৌঁছান।
প্রয়াত তৌফীক নেওয়াজের মরদেহও সকালে কলাবাগানের বাসায় নেওয়া হয়। বাসার নিচে গ্যারেজে ফ্রিজার ভ্যানে রাখা হয় তার মরদেহ।
গাড়ির পাশেই ফ্লোরে কাপড় পেতে স্থানীয় বশির উদ্দিন রোড মসজিদের মুয়াজ্জিনসহ পাঁচজনকে কোরআন তেলাওয়াত করতে দেখা যায়।
পুলিশকে ওই বাড়ি ঘিরে সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়। ওই বাড়িতে যারা যাচ্ছিলেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছিল পুলিশ।
বেলা ১১টার কিছু আগে চাঁদপুর থেকে আসা দীপু মনির একজন আত্মীয়র সঙ্গে বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিবেদকের কথা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নারী বলেন, দীপু মনি খুব ভেঙে পড়েছেন। মানসিকভাবে তিনি খুব বিপর্যস্ত। কিছু খেতে চাচ্ছেন না।
দীপু মনিকে সান্ত্বনা দিতে এসেছিলেন চাঁদপুর আওয়ামী লীগের জাকিয়া সুলতানা শেফালী। তিনি বলেন, “উনি ভালো নেই। এ সময় তার কী অবস্থা, সেটা তো বোঝা যায়।”
জাকিয়া সুলতানা জানান, তার সঙ্গে আরো কয়েকজন কর্মী দীপু মনির সঙ্গে দেখা করেছেন।
বেলা সোয়া ১২টার পর তৌফীক নাওয়াজের মরদেহ নিয়ে ফ্রিজার ভ্যান রওয়ানা হয় গুলশানের আজাদ মসজিদের দিকে। এর পরপরই দীপু মনিকে প্রিজন ভ্যানে করে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়।
বাদ জোহর আজাদ মসজিদে যখন জানাজার নামাজ চলছিল, দীপু মনি বাইরে প্রিজন ভ্যানে ছিলেন।
জানাজা শেষে ভ্যান থেকে নেমে শেষবারের মত স্বামীকে দেখেন তিনি। এ সময় আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
গুলশান আজাদ মসজিদে জানাজার আগে-পরে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের, যারা নিজেদের আত্মীয় বা স্বজন হিসেবে পরিচয় দিলেও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বেলা পৌনে ৩টায় বৃষ্টির মধ্যে যখন বাবা আমিনর রহমানের কবরে তৌফীক নাওয়াজকে দাফন করা হয়, তখন দীপু মনি কবরস্থানে উপস্থিত ছিলেন। তাদের মেয়ে দ্বীপান্বিতা নাওয়াজ কবরে মাটি ছড়িয়ে দেন।
জানাজার পর দীপু মনি ভিডিওকলে কারো সঙ্গে কথা বলেন অন্য একজন নারীর সহায়তায়। এসময় তাকে খানিকটা রাগান্বিত দেখা যায়।
দাফনের পর মোনাজাতে অংশ নেন দীপুমনিসহ উপস্থিত বন্ধু, স্বজন ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা।
বনানী গোরস্তান মসজিদের ইমাম মাওলানা ওমর ফারুক মোনাজাত পরিচালনা করেন।
মোনাজাতের পর ইমাম ওমর ফারুককে ডেকে স্বামীর জন্য দোয়া কামনা করেন দীপু মনি। ঢাকা মহানগর পুলিশ ও কারাগারের নিরাপত্তাকর্মীদের কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দাফনের পুরো প্রক্রিয়া সারা হয়।
স্বামীকে দাফনের পর বনানী কবরস্থানে নিজের বাবা এম এ ওয়াদুদের কবর জিয়ারত করেন দীপু মনি। ওয়াদুদ ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন।
কবর জিয়ারত শেষে বৃষ্টির মধ্যেই দীপু মনিকে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়। প্যারোলে মুক্তির নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টা ৫৮ মিনিটে তাকে আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয় বলে জানান মুন্সীগঞ্জের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা নুরমহল আশরাফী।