১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

কেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওরফে ‘রঠা’কে নিষিদ্ধ করা জরুরি?

দেশে লোডশেডিং, যানজট থেকে শুরু করে কোষ্ঠকাঠিন্য—সব সমস্যার মূলেই কি তবে রবীন্দ্রনাথ? রবীন্দ্র-বিরোধী অন্ধ গোঁড়ামি ও উদ্ভট যুক্তিগুলোকে কটাক্ষ করে ব্যঙ্গাত্মক প্রস্তাবনা।

কেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওরফে ‘রঠা’কে নিষিদ্ধ করা জরুরি?

রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি লেপে দেওয়ার সময় এক তরুণী। পরে সেই তরুণীসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ।

সৌমিত জয়দ্বীপ সৌমিত জয়দ্বীপ

Published : 11 Oct 2026, 08:22 AM

Updated : 11 Oct 2026, 08:21 AM

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওরফে ‘রঠা’কে নিয়ে কিছু লেখা বা বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। তবুও অনুরোধের ঢেঁকি গিলতে গিয়ে এই ফরমায়েশি লেখা লিখতে হচ্ছে। লিখছিই যেহেতু, সেহেতু এই সুযোগে দাবি জানিয়ে রাখি: রবীন্দ্রনাথকে বাংলাদেশ থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকার বাহাদুরের কাছে বিনীত অনুরোধ, নির্বাহী আদেশে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করা হোক।

পাঠকদেরও অনুরোধ করি, এই লেখাটাকে অতি সিরিয়াসভাবে পাঠ করার জন্য। এই লেখাটি সিরিয়াস ভঙ্গিতে পাঠ করতে পারলে আপনার মধ্যে যে জোশ আসবে, তা দিয়ে আপনি একাই রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট ভূমিকা পালন করতে পারবেন। পরবর্তী সময়ে সফল হলে ‘রঠা’বিরোধী বীরযোদ্ধা হিসেবে এক অমূল্য সনদ অর্জন করবেন। সেই সনদ ভবিষ্যতে কাজে লাগিয়ে ভাতা-টাতাও পেয়ে যাবেন। অতএব আর দেরি কেন!

আমরা জানি (গণিতের নিয়ম অনুযায়ী যেভাবে জানতে হয়, সেভাবে জানতে হবে), বহু সমস্যার মধ্যে আমরা এই মহান জাতিটি দিনাতিপাত করছি। কিন্তু আমাদের প্রধানতম সমস্যার নাম হলো ফ্যাসিবাদ। আর এই ফ্যাসিবাদী প্রবণতার কূলশিরোমণি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওরফে ‘রঠা’ (পাঠাও বলা যেতে পারে)। আমরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে একেকটি সমস্যার সমাধান করি, আর এই মৃত লোকটি বারবার ভূতের মতো আমাদের তাড়া করেন। তার কারণেই রাতে ভালো ঘুম হয় না। সকালটা বিশ্রীরকম কোষ্ঠকাঠিন্যে শুরু হয়। বিকেলটা হয় ম্যারম্যারে। সন্ধ্যা থেকে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত মনটা ভরে থাকে অস্বস্তিকর ব্যভিচারে। কাহাতক আর এসব মেনে নেওয়া যায়! তাকে অবশ্যই নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। নইলে আমাদের কোনো সমস্যারই ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল’ অনুযায়ী সমাধান হবে না।

আমরা জানি এবং মনেপ্রাণে মানি, রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী একটি উচিত কাজ করেছিল। বাংলাদেশ কেন সেই উচিত কাজটি অতিসত্বর করছে না, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ কি ফ্যাসিবাদের উল্লাস মঞ্চে পরিণত হতে চায়? এই লোককে নিষিদ্ধ করার যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে। কিন্তু সেসব যুক্তি খোঁজার কোনোই প্রয়োজন নেই। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যেসব কারণে তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল, সেগুলো হুবহু বসিয়ে দিয়ে আইন জারি করলেই ল্যাঠা চুকে যাবে। মোদ্দাকথা হলো, ইস্ট অর ওয়েস্ট, বাংলাদেশ ইজ দ্য বেস্ট—এই ঘোড়ার ডিম ‘রঠা’কে অনতিবিলম্বে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। সরি, করতেই হবে।

বাংলাদেশের জনসমাজে এই ভদ্রলোকের (দুঃখিত, অভদ্রলোক বলতে পারলে বেশি পুণ্য হবে) কী কাজ এখন? কোন কাজে তিনি লাগেন আমাদের? ফসলের ক্ষেতে লাগেন? শ্রম বাজারে লাগেন? ক্ষুদ্রঋণে লাগেন? রাস্তায় চলতে লাগেন? গাড়িতে বা ট্রেনে চাপতে লাগেন? বিমান চড়তে বা কিনতে তাকে প্রয়োজন হয়? বিদ্যুৎ পেতে? তেল-গ্যাস পেতে? রান্না করতে? নিত্যদিনের কোনো কাজে? কোনো চুক্তিতে বা মুক্তিতে? বরং এই লোককে নিষিদ্ধ করতে পারলে আমাদের তেলের দাম কমে যাবে। আমরা সপ্তাহে ২৪ ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ পাব। অকাতরে-সকাতরে চলে যাবে হাম ও ডেঙ্গু। চলে যাবে ট্র্যাফিক জ্যাম। থাকবে না কোনো ময়লা-আবর্জনা। রাস্তাঘাট হয়ে উঠবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। একে নিষিদ্ধ করতে না পারলে আমাদের মনের ও বনের অন্ধকার দূর হবে না। অতএব, এদেশের উৎকৃষ্ট ও সবচেয়ে গরিষ্ঠ জনসমাজের কোনো কাজেই তার কোনো প্রয়োজন নেই। তাহলে তাকে অযথা কেন টেনে নিয়ে যেতে থাকবে জনগণের করের টাকায় চলা এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে রাষ্ট্র চালায় গরিষ্ঠরা আর ভূত হিসেবে চেপে বসে আছেন একজন ভিন্নদেশি ভিন্নধর্মী? অতএব, তাকে নিষিদ্ধ করতেই হবে।

এই ভূতকে বিদায় করতে হলে কাকদের (শকুনদের ব্যবস্থা করতে পারলে মন্দ হতো না, কিন্তু এত শকুন এই মুহূর্তে ব্যবস্থা করা সম্ভব না, শকুনরা সব ভালো হয়ে গেছে বলে জানা যাচ্ছে) রাজসভা গঠন করে তার পিণ্ডি-চণ্ডী আর মুণ্ড-পিণ্ড একাকার করে ফেলতে হবে। একদম খুবলে খাবে কাকরা, যেন নিষিদ্ধ না করার পাঁয়তারা যারা করবেন, তারাও ভরকে গিয়ে বাধ্য হন গরিষ্ঠ মতকে গণতান্ত্রিক মত হিসেবে স্বীকার করতে। এর চেয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নিষিদ্ধ করার কৌশল আর কোথায় পাওয়া যাবে? সংখ্যাগরিষ্ঠের মত প্রতিষ্ঠিত হওয়াই তো প্রকৃত গণতন্ত্র। এই লোককে নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে আমরা বিশ্ব চরাচরে প্রমাণ করতে পারব যে, জাতি হিসেবে আমরা কতটা গণতান্ত্রিক। অতএব, ‘রঠা’কে নিষিদ্ধ করতে আর কত দেরি, হে পাঞ্জেরি!

না, কোনোভাবেই তাকে আমরা এই রাষ্ট্রের ছায়া ও কায়ায় বহন করতে পারি না। তার নামে কোনো কাল্ট বানানো চলবে না এ দেশে। এই লোক আমাদের অনেক ক্ষতি করেছেন। ক্ষতি করেছেন ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত। ক্ষতি করেছেন ১৯১২ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত। অথচ আমরা এমন এক বেকুব জাতি যে, ঘোরতর পূর্ববাংলাবিরোধী এই লোককে ১৯৭১ সালে আমরা মাথায় উঠিয়ে যুদ্ধে গেছি। সেই থেকে এই লোক অনন্ত ক্ষতি করেছেন সমগ্র পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্র বিধৌত এই জনপদটির। এই লোক একজন আপাদমস্তক ক্ষতিকারক জীব। তাকে মানুষই গণ্য করা যায় না। তার হাতে লেগে আছে বহু মানুষ খুনের রক্ত। তিনি একজন খুনি, ধর্ষক, গণহত্যাকারী কিংবা তাদের অকাজ-কুকাজের সম্মতি উৎপাদনকারী। তাকে এই মহান বঙ্গদেশ থেকে নিষিদ্ধ করতেই হবে।

তাকে নিষিদ্ধ করে দিলে আমাদের বহু সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আমরা ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ থেকে মুক্তি পাব। আমাদের সংস্কৃতি থেকে হিন্দুত্ববাদ বিদায় নেবে। ফি-বছর বর্ষবরণের আদিখ্যেতাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দেওয়া যাবে। তাকে নিষিদ্ধ করতে পারলে আমাদের নারীদের চলাফেরার স্বাধীনতা ফিরে আসবে। কেউ নারীদের পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন করবে না। ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মানুভূতি নিয়ে আমাদের হা-হাপিত্যেশ বন্ধ হবে। আমাদের রাষ্ট্র পবিত্রভূমিতে পরিণত হবে। এই লোকের যন্ত্রণায় আমরা অসুস্থ হয়ে না পড়ার আগেই তাকে তাই নিষিদ্ধ করা জরুরি হয়ে গেছে। তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতেই হবে।

এই বুড়ো যন্ত্রণাদায়ীকে নিষিদ্ধ করতে পারলে আমাদের বহু সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে আমাদের সংস্কৃতি জগতের। আমরা আরো আরো বড় বুদ্ধিজীবীর জন্ম দিতে পারব। আমাদের কবিতা হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবির হাতে লেখা। আমাদের উপন্যাস হয়ে উঠবে জগৎশ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকের কলমের ফলায় সৃষ্ট। আমাদের গান হয়ে উঠবে একদম সহি পথের অনুসারী। আমাদের নাটক হয়ে উঠবে শেক্সপিয়ারের হস্ততুল্য—সরি, সমতুল্য। এই একটি লোক আমাদের আকাশ-বাতাস-মাটি-পানি-বায়ু নিয়ে মৃত্যুর এত বছর পরেও সাপ-লুডো খেলছেন। এই লোককে নিষিদ্ধ করতে না পারলে আমরা মানে-জ্ঞানে-গুণে কিছুতেই বর্ধনশীল জাতিতে পরিণত হতে পারব না। অতএব, আমরা তার সর্বান্তঃকরণে নিষিদ্ধ চাই।

এই লোককে যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানেই তাকে আস্ত ডুবিয়ে ও চুবিয়ে দিতে হবে। রাস্তার দেয়ালে, ঘরের চোয়ালে, সংগঠনের খেয়ালে, গ্রন্থাগারের শো-কেজে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, সিলেবাসে, পাঠ্যপুস্তকে, জাতীয় সংগীতে, সিনেমায়, নাটকে, মঞ্চে যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানেই এই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী আততায়ী ও অনুভূতি নিয়ে খেলা করা মৃত মস্তানের আস্তানা ভেঙে তছনছ করে দিতে হবে। নিজের দেশে গিয়ে আবার জন্মান, জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী কূপমণ্ডূক। এই সোনার দেশে আপনার (ভদ্রতা করে ‘আপনার’ বললাম, নইলে তার জন্য ‘তোর’ শব্দটা অধিকতর প্রযোজ্য) ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই— ছোটো সে তরী।’ কোনো মানবতাবিরোধী ব্যক্তিকে আমাদের এই মানবহিতৈষী দেশের কোথাও ঠাঁই দেওয়া যাবে না।

এই লোককে নিয়ে যারা স্তুতি করেছেন অতীতে কিংবা ভবিষ্যতেও করবেন, তাদেরও এই দেশ থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। এমন লোককে নিয়ে স্তুতি করার চেয়ে নিজের দেশের কাউকে বরেণ্য বানানো বেশি জরুরি। যারা তা করবে না, তারা রাষ্ট্রদ্রোহী। এই লোককে নিয়ে খুবই আবোলতাবোল ও বাজে কথাটা লিখেছিলেন হুমায়ুন আজাদ নামের এক অকালকুষ্মাণ্ড রাষ্ট্রদ্রোহী। তিনি লিখেছিলেন:

“রবীন্দ্রনাথ— যাঁকে বাতিলের চেষ্টা করে আসছে নষ্টরা পবিত্র পাকিস্তানের কাল থেকে; পেরে ওঠে নি। এমনই প্রতিভা ঐ কবির, তাঁকে বেতার থেকে বাদ দিলে তিনি জাতির হৃদয় জুড়ে বাজেন; তাকে পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দিলে তিনি জাতির হৃদয়ের কাব্যগ্রন্থে মুদ্রিত হয়ে যান, তাঁকে বঙ্গভবন থেকে বাদ দেওয়া হলে তিনি সমগ্র বঙ্গদেশ দখল করেন; তাঁর একটি সংগীত নিষিদ্ধ হলে তিনি জাতীয় সংগীত হয়ে ওঠেন। তাঁকে মাটি থেকে বহিষ্কার করা হলে তিনি আকাশ হয়ে ওঠেন; জীবন থেকে তাঁকে নির্বাসিত করা হলে তিনি রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন জাতির স্বপ্নলোকে। নষ্টরা তাঁকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে আপ্রাণ। যদিও তিনি জাতীয় সংগীতের রচয়িতা, তবুও তিনি জাতীয় কবি নন। তাঁর নামে ঢাকায় একটি রাস্তাও নেই; সংস্থা তো নেই। তাতে কিছু যায় আসেনি তাঁর; দশকে দশকে বহু একনায়ক মিশে যাবে মাটিতে। তিনি বেঁচে থাকবেন বাঙলায় ও বিশ্বে।”

না, এই লোকের প্রতি এমন পূজা-টুজা তো নিবেদন করতে দেওয়া যাবে না এই দেশে। এসব ফালতু কাল্ট-পূজা তো জাতি গঠনের অন্তরায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এসব কথা নষ্ট করে ফেলবে। আজ রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি, এক্ষুণি এসব কথা ও উক্তিও নিষিদ্ধ করতে হবে। কোনোভাবেই এসব চলতে দেওয়া যাবে না। এগুলো আমাদের ভাবধারা ও আদর্শের জন্য ক্ষতিকর। এসব চলতে থাকলে নষ্ট হয়ে যাবে আমাদের যুবসমাজ। ভবিষ্যৎ হয়ে উঠবে অন্ধকার। মাদকাসক্ত হয়ে পড়বে অনাগত ভবিষ্যৎ।

এত কিছু বলার পরেও, একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আমরা কি আজও বুঝতে পারছি না, কেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওরফে ‘রঠা’কে এই দেশ থেকে নিষিদ্ধ করা জরুরি? আমাদের আর কত ক্ষতি হয়ে গেলে আমরা এই প্রেতাত্মাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করব?

সৌমিত জয়দ্বীপ: সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: sowmit.joydip.lekhalekhi@gmail.com