পার্বত্যচুক্তির দুই দশক: এখনও হতাশা কেন?

রাহমান নাসির উদ্দিন
Published : 2 Dec 2017, 06:37 AM
Updated : 2 Dec 2017, 06:37 AM

আজ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, যা 'শান্তিচুক্তি' নামে বহুলভাবে পরিচিত এবং প্রচারিত, স্বাক্ষরের বিশ বছর পূর্ণ হল। বিশ বছর আগে ঠিক এইদিনে চুক্তি স্বাক্ষরকারী দুইপক্ষের মধ্যে যে সৌহার্দ্য, সহযোগিতার মনোভাব, ভার্তৃত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং যে উৎসবের আমেজ ছিল, আজকে সেটা নাই। আজ বিশ্বাসের জায়গায় আছে অবিশ্বাস, আস্থার জায়গায় এসেছে সন্দেহ আর ভাতৃত্বের জায়গায় দৃশ্যত মুখোমুখি অবস্থা। পাহাড়ি আদিবাসীর জীবনে যেখানে উৎসবের আমেজ ছিল, সেখানে বিশ বছর পরে দেখা যাচ্ছে চরম হতাশা। ২৯ নভেম্বর, ২০১৭ ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি বলেছেন, সরকারই চুক্তি বাস্তবায়ন করছে না এবং এ কারণে পাহাড়ে চরম হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে।

এর ফলশ্রুতিতে যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা পরিস্থিতির সৃষ্টি তার জন্য সরকার দায়ী থাকবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের দুই দশক পরে এসেও কেন পাহাড়ি আদিবাসীদের মধ্যে এত হতাশা? এত ক্ষোভ? এসব হতাশার কারণ উপলব্ধির পাশাপাশি, এ প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি এ কারণে যে, বাংলাদেশের সাধারণ জনগণেরও জানা প্রয়োজন কেন চুক্তি স্বাক্ষরের দুই দশক পরেও পাহাড়ি আদিবাসীরা হতাশ এবং ক্ষোভে আক্রান্ত। আমি এখানে খুবই সংক্ষেপে কয়েকটি বিষয়ের অবতারণা করছি।

গত বছর এবং তারও আগের বছর পার্বত্যচুক্তির বর্ষপূর্তিতে আমি বিভিন্ন সংবাদপত্রে লিখেছিলাম, পার্বত্য চট্টগ্রামে 'শান্তির পথে' প্রধান বাধা তিনটি: অতিরিক্ত মিলিটারি উপস্থিতি, ভূমি-বিরোধ এবং সেটেলার বাঙালি সমস্যা। 'পার্বত্য চুক্তির যথাযথ এবং পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যমান অনেক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যাবে', এ মতের সঙ্গে আমিও পুরোপুরি একমত হয়েও পার্বত্য চট্টগ্রামের 'শান্তিচুক্তি' নিয়ে যত লেখালেখি করেছি, প্রায় সর্বত্র বলার চেষ্টা করেছি, 'কেবল চুক্তির ক্লজ-বাই-ক্লজ বাস্তবায়নই পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকলের সমঅধিকার এবং সমমর্যাদার সহাবস্থান সুনিশ্চিত করে পূর্ণাঙ্গ শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, যদি না মিলিটারি সমস্যা, ভূমি-বিরোধ এবং সেটেলার সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য ও সম্মানজনক সমাধানের পাশাপাশি পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠীর এবং সিভিল-মিলিটারি প্রশাসনের সামাজিক মনস্তত্ত্ব, দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাঙালির মেজরিটারিয়ান আইডিওলজির গুণগত পরিবর্তন হয়।'

প্রতি বছর ২ ডিসেম্বর আসে, পাহাড়ি আদিবাসীরা এবং আদিবাসী নেতৃবৃন্দ নিজেদের ক্ষোভ, দুঃখ, হতাশা প্রকাশ করেন, মিডিয়া খানিকটা দেখাদেখি-লেখালেখি করেন, তারপর সবকিছুই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। পাহাড়ি আদিবাসীদের দুঃখ আর দুর্দশার কোনো সুরাহা হয় না। কয়েকটি বিষয় জরুরি ভিত্তিতে গুরুত্বারোপ করে ক্রমবর্ধমান সমস্যা সমাধানে এবং হত্যাশা দূরীকরণে উভয় পক্ষের এগিয়ে আসা জরুরি বলে আমি মনে করি। তবে, রাষ্ট্রকে এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

এক.

ভূমি সমস্যার একটা দ্রুত এবং গ্রহণযোগ্য সমাধান প্রয়োজন। কেননা, ১৯৯৭ সালের পর অসংখ্যবার ভূমি কমিশন গঠন করা হয়েছে, কিন্তু কোনো ভূমি কমিশনই কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে, ১৯৯৭ সালের পর থেকে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রায় ৫ হাজার আবেদনপত্র জমা পড়লেও, তন্মধ্যে যাচাই বাছাই করে ২ হাজার নিষ্পত্তির জন্য নির্ধারণ করা হলেও, এখনও পর্যন্ত একটা আবেদনেরও গ্রহণযোগ্য সমাধান সম্ভব হয়নি। তাছাড়া, ভারত থেকে প্রত্যাগত প্রায় ২২,২২৩টি পরিবারের ৬৪,৬১১ জন পাহাড়ি আদিবাসীকে পুনর্বাসনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এছাড়াও প্রায় ৯০ হাজারেরও বেশি অভ্যন্তরীন উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

তাহলে, পার্বত্য চুক্তি কীভাবে পাহাড়ে শান্তি আনবে? চুক্তি স্বাক্ষরের দুই দশক পরও যদি এসব মৌলিক সমস্যার কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান না-হয়, তা তো হতাশার জন্ম দেবেই। সুতরাং রাষ্ট্রকে দ্রুততম সময়ে এসব ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যা ও ভূমি-বিরোধ দূর করা এবং অভ্যন্তরীন উদ্বাস্তু ও প্রত্যাগত শরণার্থীদেরকে যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

দুই.

পাহাড়ে অতিরিক্ত মিলিটারির উপস্থিতি পাহাড়ের স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থায় নিঃসন্দেহে একটা প্রভাব বিস্তার করে। চুক্তির একটি অন্যতম শর্ত ছিল, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ক্রমান্বয়ে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে, যাতে মানুষের মন থেকে বিদ্যমান 'ভয়ের সংস্কৃতি' এবং 'আশংকার আতংক' দূরীভূত হয়। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের দুই দশক পরও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এখনও পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য হারে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়নি। জনসংহতির দাবি অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনও প্রায় ৪ শত ছোট-বড় অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প আছে যার কারণে সাধারণ পাহাড়িরা একটি স্বাধীন, শংকাহীন এবং ভয়হীন জীবন-যাপন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

ফলে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ক্রমান্বয়ে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পগুলো পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহারের ব্যবস্থা হলে একদিকে যেমন চুক্তির শর্তের বাস্তবায়ন হল, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনও একটা 'ভয়ের সংস্কৃতি' থেকে খানিকটা মুক্তি পাবে।

তিন.

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি আদিবাসী-অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে স্বীকার করে নিতে হবে কেননা পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের আর দশটি এলাকার চেয়ে আলাদা। এর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, অর্থনৈতিক কাঠামো, ভৌগোলিক পরিবেশ, এতদঞ্চলের মানুষের জীবনাচার, ধর্মবিশ্বাস, ভাষা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সবকিছুই একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এ বাস্তবতা স্বীকার করে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংরক্ষণের বিয়টি বিশেষ বিবেচনায় গুরুত্ব দিতে হবে।

এখানে মনে রাখতে হবে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে আর দশটি এলাকার মতো সাধারণীকরণ না-করে, একটি বিশেষ অঞ্চল হিসাবে স্বীকার করে নিতে হবে, যা পার্বত্য চুক্তিকে সুষ্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে।

চার.

চুক্তি স্বাক্ষরের বিশ বছর পার হয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলার শাসনভার পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাদের সরাসরি ভোট নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তরের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি পাহড়ি-বাঙালি স্থায়ী অধিবাসীদের একটি সঠিক ভোটার তালিকা পর্যন্ত অদ্যাবধি করা সম্ভব হয়নি। ফলে, কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছা এবং আকাঙ্ক্ষার অধীনে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পরিচালিত হয়। যে দল ক্ষমতায় থাকে, সে দল তাদের দলীয় আনুগত্য এবং দলীয় সম্পৃক্ততার প্রশ্নটি বিবেচনায় নিয়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়।

ফলে, এসব জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা যতটা না পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ জনগণের — আদিবাসী এবং বাঙালি — প্রতিনিধি না-হয়ে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হয়ে উঠে। এসব চেয়ারম্যান পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের চাওয়া-চাহিদার চেয়ে রাষ্ট্রের পলিসি কিংবা কেন্দ্রীয় সরকারের আকাঙ্ক্ষা এবং পলিসি বাস্তবায়নের অধিকতর মনোযোগী থাকেন। এ কারণেই চুক্তি স্বাক্ষরকারী আদিবাসী প্রতিনিধি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃত্ববৃন্দ বা আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে তিন পার্বত্য জেলার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের একটা সমন্বয়হীনতা সবসময় লেগে থাকে।

ফলে, চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার বিশ বছর পরও এসব বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগ না-থাকার কারণে চুক্তিকেন্দ্রিক হতাশা দিন দিন বাড়ছে।

পাঁচ.

পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে এখনও পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু বিভাগের হস্তান্তর করা হয়নি যা সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে একটা অনাস্থার এবং অসন্তোষের সম্পর্ক তৈরি করছে। সরকারপক্ষ ইতোমধ্যে বেশকিছু বিভাগ পাবর্ত্য জেলা পরিষদের হাতে হস্তান্তর করলেও স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ভূমি, বন ও পরিবেশ, পর্যটন প্রভৃতি এখনও জেলা পরিষদের হাতে হস্তান্তর করা হয়নি যা চুক্তির নানান শর্তাবলীর অন্যতম। সরকার অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ও দপ্তরগুলো জেলা পরিষদের হাতে হস্তান্তর করে চুক্তি বাস্তবায়নের পারসেন্টেজ বাড়ানোর চেষ্টা করলে, পাহাড়ের আদিবাসীদের মধ্যে অসন্তোষ তো তৈরি হবেই।

তাই, ক্রমান্বয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ এবং দপ্তরগুলো জেলা পরিষদের হাতে হস্তান্তর করে একটি বিশেষ অঞ্চল হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক এবং শাসনতান্ত্রিকতায় গতি আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে।

ছয়.

চুক্তি স্বাক্ষরের বিশ বছর পরও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদকে একটি ঠুঁটো জনগন্নাথ বানিয়ে রাখা হয়েছে। তার পর্যাপ্ত লোকবল নাই, অর্থবল নাই, প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সেটা বাস্তবায়নের ক্ষমতা নাই। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর তার কোন কর্তৃত্ব নাই। চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে আজ বিশ বছর অথচ এখনও পর্যন্ত কোন আঞ্চলিক পরিষদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো কার্যবিধি তৈরি করা হয়নি। ফলে, চুক্তি একটা হয়েছে বটে, কিন্তু সেটাকে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন এবং চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছার অভাব চুক্তি স্বাক্ষরের শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত জারি আছে।

চুক্তি কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটা হতাশার ভাব ক্রমান্বয়ে বৃহৎ থেকে বৃতত্তর হয়ে উঠছে।

সাত.

চুক্তিতে লিখিতভাবে না-থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ক্রমান্বয়ে সম্মানজনকভাবে সেটেলার বাঙালিদেরকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যথাযথভাবে পুনর্বাসনের একটা ব্যবস্থা করা সরকারের তরফ থেকে আন্তরিকভাবে কাম্য ছিল, কিন্তু সেটা কোনোভাবেই করা হয়নি এবং কোনো সরকারের আমলেই সত্যিকার অর্থে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা বাঙালির সঙ্গে পাহাড়ি আদিবাসীদের মধ্যে সংঘাত নেই। পাহাড়ি-বাঙালি দীর্ঘ বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে একত্রে একসঙ্গে বসবাস করছে, এমনকি স্বাধীনতাপূর্ব বহুকাল থেকে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যখন সেটেলার বাঙালিদেরকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে অভিবাসন করানো হল, তখন থেকে কিছু বাঙালির সঙ্গে পাহাড়ি আদিবাসীদের সংঘাত দ্রুত বাড়তে থাকে যা ক্রমান্বয়ে 'পাহাড়ি বনাম বাঙালি' একটা দ্বান্দ্বিক অবস্থান গ্রহণ করেছে।

এখানে মনে রাখতে হবে যে, দ্বন্দ্বটা পাহাড়ি বনাম বাঙালি নয় বরঞ্চ কিন্তু কিছু বাঙালির সঙ্গে কিছু পাহাড়ির। এর একটা অন্যতম কারণ হচ্ছে, পাহাড়িদের প্রতি মেজরিটি সেটেলার বাঙালির দৃষ্টিভঙ্গি যা অত্যন্ত নেতিবাচক। ফলে, সেটেলার বাঙালির উপস্থিতি পার্বত্য চট্টগ্রামের পারষ্পরিক সহযোগিতা এবং সহমর্মিতার মাধ্যমে একত্রে বসবাস করার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের বাধা হিসাবে কাজ করে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়টির প্রতি একেবারেই সুনজর দেয়া হয়নি। কিন্তু এ দ্বৈরথও যে, নানামুখী হতাশার জন্ম দিচ্ছে, সেটা অনস্বীকার্য।

পরিশেষে বলব, ক্রমবর্ধমান হতাশার অন্যতম কারণ হচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষের কাঙ্ক্ষিত সদিচ্ছার অভাব। চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সদিচ্ছার অভাব বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকারের আমলে সুষ্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। ১৯৯৭ সালে চুক্তি স্বাক্ষরের পর আওয়ামী লীগ ২ বছরের বেশি সময় ক্ষমতা ছিল। এরপর বিএনপি-জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল ৫ বছর। ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের সরকার ২ বছর। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা আছে প্রায় ৯ বছর। কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়নের সদিচ্ছার অভাব সবসময় ছিল। বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে বলতে গেলে সবচেয়ে তীব্র অনীহা ছিল। কারণ তাদের দাবি অনুযায়ী চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়। তাই যে দলই ক্ষমতায় আসুক চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রকৃতপক্ষে এ দায়িত্ববোধই আসল বিষয়। আমরা যদি সকলে যে যেখানে আছি, সেখানে নিজ নিজ দায়িত্ব এবং কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করি, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যায়।

পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের বিশ বছর পরও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য যখন পাহাড়ি আদিবাসী নেতৃবৃন্দকে দাবি-দাওয়া পেশ করতে হয়, তখন সেটা আমাদের সকলের জন্য লজ্জার। আর আমরা সকলে এ লজ্জা থেকে মুক্ত হওয়ার আন্তরিক চেষ্টা করলেই পাহাড়ের আদিবাসী এবং অধিবাসীদের হতাশাও ক্রমান্বয়ে দূরীভূত হবে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক