বন্দুকযুদ্ধ: ভালো না মন্দ?

Published : 4 July 2019, 12:51 PM
Updated : 4 July 2019, 12:51 PM

নয়ন বন্ড নামের সন্ত্রাসীর ক্রসফায়ারে মৃত্যুর খবর পড়ে প্রথমেই আমার মনে যে প্রতিক্রিয়া জেগেছিল সেটা হলো 'বেশ ভালো হয়েছে, উচিত শাস্তি হয়েছে'। আমি নিশ্চিত আরো অনেক মানুষের মনে এটাই ছিল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরই আমার মনে হয়েছে, সন্ত্রাসের জবাবে ক্রসফায়ার বা কথিত বন্দুক যুদ্ধ কখনও সমাধান নয়।

নয়ন বন্ড ও তার সহযোগিরা রিফাতকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করেছিল। এই ঘটনা প্রমাণ করে দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা। একদল সন্ত্রাসী জনবহুল সড়কে দিনের বেলায় যখন হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধ করতে সাহসী হয় তখন একথাই প্রমাণ হয় যে রাষ্ট্রের আইন শৃংখলা পরিস্থিতি অত্যন্ত দুর্বল। সন্ত্রাসীরা অকুতোভয় এই কারণে যে, তারা জানে আইন তাদের স্পর্শ  করতে পারবে না। তাদের খুঁটির জোর এতই বেশি যে তারা আইনের ফাঁক গলে ঠিকই বের হয়ে যেতে পারবে। এই ভয়াবহ ঘটনা আইনের ও ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থাহীনতা তুলে ধরে।

নয়ন বন্ডকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা আইনের শাসনের ও বিচারের প্রতি অধিকতর আস্থাহীনতার প্রমাণ। এই ঘটনায় বোঝা যায়, পুলিশ প্রশাসনও মনে করছে আইনমাফিক পথে নয়ন বন্ডের মতো সন্ত্রাসীদের দমন করা সম্ভব নয়। তাই তারা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পথ অবলম্বন করছে। আর জনগণ যে, ক্রসফায়ারকে মানসিক সমর্থন দিচ্ছে সেটি আরও ভয়াবহ প্রবণতা। এটি প্রমাণ করে যে, জনগণও আইনের প্রতি আস্থাহীনতায় ভুগছে। তারা আইনের ফাঁক গলে সন্ত্রাসীদের রেহাই পাওয়া দেখে হতাশ। তারা ধর্ষণ  ও হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধের কোন প্রতিকার না দেখে দেখে হতাশ হয়ে পড়েছে। তারা দেখেছে রিশা হত্যার মামলা এখনও আদালতে ঝুলছে। তারা দেখেছে সাগর-রুনি ও তনুর হত্যাকারীরা ধরাই পড়েনি। তারা দেখেছে, নুসরাত হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধের পরও সেটাকে আত্মহত্যা বলে চালানোর অপকৌশল ও অপরাধীদের বাঁচানোর তৎপরতা। তারা আরও অনেক হত্যা, ধর্ষণ ও অনেক রকম ভয়াবহ অপরাধ  ও তার বিচারহীনতা এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা দেখে দেখে ক্লান্ত। তারা ক্ষমতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সন্ত্রাসীদের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর তামাশা দেখে ক্ষুব্ধ, ক্লান্ত, বিরক্ত ও হতাশ। এই কারণেই যখন রিফাত হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধ তারা দেখে তখন সন্ত্রাসী নয়ন বন্ডের ক্রসফায়ারে মৃত্যুর সংবাদে তারা উল্লসিত হয়। কিন্তু এই উল্লাস কি আইনের শাসনের প্রতি, বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার প্রকাশ নয়? এটা কি লিঞ্চিং মবের অনুরূপ আচরণ নয়?

বিচার ব্যবস্থা হলো একটি দেশের মেরুদণ্ড। আইনের শাসন, বিচার ব্যবস্থার দৃঢ়তা, সুবিচার এবং দ্রুত বিচার জনজীবনের নিরাপত্তা ও প্রশান্তির জন্য অত্যাবশ্যক। আইন, প্রশাসন ও বিচারের স্তম্ভের উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে দেশ। এর কোন একটি স্তম্ভ দুর্বল হয়ে গেলেই বিপদ। বাঘের চেয়েও ভয়াবহ হলো অরাজকতায় পূর্ণ দেশ।  দেশের জনগণ যদি বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারায় তাহলে উন্নয়ন ও অর্জনের যত গৌরবই আমরা করি না কেন, সকলি গরল ভেল।

অতীতে আমরা এনকাউন্টার, অপারেশন ক্লিন হার্ট, ক্রসফায়ার কম দেখিনি। রাজনৈতিক কর্মী, কথিত সন্ত্রাসী, সত্যিকারের সন্ত্রাসী, দুচারজন নিরীহ মানুষ, ভুল মানুষসহ অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে এই বিচার বহির্ভুত বন্দুকের গুলিতে। বিচার বহির্ভুত এসব হত্যা কি নতুন সন্ত্রাসীর জন্মকে রোধ করতে পেরেছে? সন্ত্রাসীরা রক্তবীজের মতো, রাক্ষসের মতো। এক সন্ত্রাসীর পতিত রক্ত আরও সন্ত্রাসীর জন্ম দেয়। দরকার হলো রাক্ষসদলের প্রাণভোমরাকে হত্যা করা। সন্ত্রাসীরা হলো ক্ষমতার অপব্যবহার নামক বিষবৃক্ষের বিষাক্ত ফল। ফল ছিঁড়ে লাভ নেই, দরকার বিষবৃক্ষটিকে উপড়ানো। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য গড ফাদাররা বাবা-মায়ের নয়নমণি সন্তানদের বানায় নয়ন বন্ড। তাদের হাতে তুলে দেয় অস্ত্র। তারা ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে হয়ে ওঠে মানুষখেকো বাঘের চেয়ে হিংস্র। এই নয়ন বন্ডের নামে এলাকায় মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাইয়ের আরও বেশ কয়েকটি মামলা ঝুলছিল। তাহলে কেন এতদিন এই সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়নি? কার ইশারা ও আশ্রয় প্রশ্রয়ে এই সন্ত্রাসী এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব করতো? গড ফাদাররা নিজেদের স্বার্থে সৃষ্টি করে মাস্তানরুপী কিলিং মেশিন। দুর্নীতিবাজ ক্ষমতাশালীরা এই কিলিং মেশিনদের নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। সেই সব খুঁটির জোরেই নয়ন বন্ড ও ফরাজীদের আস্ফালন। দরকার কিলিং মেশিন তৈরির এসব কারখানাকে সিলগালা করার। দরকার বিচার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে সন্ত্রাসীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। আইনের মারপ্যাঁচে এরা যেন বের হতে না পারে সেটা নিশ্চিত করা দরকার। দ্রুত বিচার ও দ্রুত সাজা বাস্তবায়ন দরকার। দরকার পুলিশ প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত ও তত্পর করা। প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ কেন লাগবে? রাষ্ট্র ব্যবস্থা যদি সক্রিয় ও গতিশীল থাকে, দুর্নীতিমুক্ত থাকে তাহলে তার আপন গতিতেই দেশ এগোতে পারে।

এক নয়ন বন্ডের মৃত্যু হয়েছে বিচার বহির্ভূত গুলিতে। দরকার ছিল দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দ্রুত শাস্তি কার্যকর করা। প্রকৃত সত্য হলো নয়ন বন্ড ও ফরাজিদের সৃষ্টি করে আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য মাস্তান তৈরির প্রক্রিয়া এবং সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, ক্ষমতার অপব্যবহার। বিষবৃক্ষের শিকড় না কাটলে নয়ন বন্ডদের জন্ম হতেই থাকবে। ক্রসফায়ারে কয়টাকে মারা হবে? এবং বিচার বহির্ভূত হত্যা জনমনে গ্রহণ যোগ্যতা পাওয়ার ভয়াবহ ফলাফল জাতিকে কোন দিকে নিয়ে যাবে? ক্রসফায়ার নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা চাই। আইন শৃংখলা পরিস্থিতির উন্নয়ন চাই। এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ চাই, দ্রুত বিচার ও দ্রুত শাস্তি কার্যকর চাই। এই সমাজে যেন ক্ষমতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে নয়ন বন্ড ও ফরাজিদের জন্ম না হয়। রিফাতদের যেন মরতে না হয় চাপাতির কোপে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক