বাংলাদেশের চিন্তাশীল চলচ্চিত্র: কিছু জরুরি প্রশ্ন

নাদির জুনাইদ
Published : 28 Nov 2016, 05:14 AM
Updated : 28 Nov 2016, 05:14 AM

চলচ্চিত্রের দায়িত্ব কি দর্শককে শুধুই বিনোদন যোগানো? কাহিনিতে বিনোদনের প্রাধান্য না থাকলে কি চলচ্চিত্রের বক্তব্যের প্রতি দর্শকের কোনো আগ্রহ তৈরি হবে না?

প্রশ্ন দুটির উত্তর সচেতন মানুষের অজানা নয়। বিশ্বচলচ্চিত্রের ইতিহাসে যে পরিচালকরা খ্যাতিমান তাঁরা চলচ্চিত্রকে মুনাফা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে চটক আর চাকচিক্য-সর্বস্ব বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি। বরং তারা এমন ছবির গতানুগতিক ফর্মুলা প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের ছবিতে প্রকাশ করেছেন সমাজসচেতন বক্তব্য এবং তাদের ছবির নির্মাণশৈলী হয়ে উঠেছে প্রথাবিরোধী, নান্দনিকভাবে আকর্ষণীয়। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় ভারতীয় চিন্তাশীল চলচ্চিত্রের কথা।

ভারতে জনপ্রিয় বিনোদনধর্মী ছবি তৈরি হচ্ছে নিয়মিতভাবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলচ্চিত্রবোদ্ধা এবং সচেতন দর্শকদের কাছে ভারতের চলচ্চিত্র সুপরিচিত এবং তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছিল সত্যজিৎ রায়ের ছবির মাধ্যমে যিনি কখনও আর্থিক মুনাফা অর্জনের জন্য নিজের ছবিতে বিনোদনধর্মী উপাদান ব্যবহার করেননি।

এই বিখ্যাত পরিচালকের কোনো ছবিতেই কাজ করার সুযোগ পাননি বাংলা ছবির অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন। সত্তর-আশির দশকে হিন্দি ছবির সবচেয়ে বিখ্যাত নায়ক অমিতাভ বচ্চন কেবল সত্যজিৎ রায়ের 'শতরঞ্জ কি খিলাড়ি' (১৯৭৭) ছবির কিছু দৃশ্যে নেপথ্য কণ্ঠ দিতে পেরেছিলেন। সুচিত্রা সেন-অমিতাভ বচ্চন বাংলা ছবির অন্য দুই গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক, ঋত্বিক ঘটক আর মৃণাল সেনের কোনো ছবিতেও অভিনয় করার সুযোগ পাননি।

মৃণাল সেনের হিন্দি ভাষার ছবি 'ভুবন সোম' (১৯৬৭)এর মাধ্যমে ভারতে বাণিজ্যিক ছবি থেকে ভিন্ন সমাজসচেতন নতুন ধারার চলচ্চিত্র তৈরির আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই ছবিতেও অমিতাভ বচ্চন কেবল একটি দৃশ্যে কণ্ঠ দিয়েছিলেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাঙালি পরিচালকরা তাদের বাংলা-হিন্দি কোনো ছবিতেই অমিতাভ বচ্চনের মতো দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতাকে কোনো চরিত্রে অভিনয়ের জন্য নির্বাচন করেননি।

বোঝা যায় এই পরিচালকরা এবং বিশ্বের অন্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রকাররা তাদের ছবিতে জাঁকজমক বা জৌলুস প্রয়োজনীয় মনে করেননি। বরং তাদের লক্ষ্য ছিল ব্যক্তিজীবন এবং সমাজের জটিল দিকগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে দর্শককে গভীরভাবে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করা। এই ধরনের চিন্তাসমৃদ্ধ চলচ্চিত্র মানুষের সামাজিক এবং রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করেছে। দর্শকরা ছবিতে দেখতে পেয়েছেন সৃষ্টিশীল ক্যামেরার কাজ এবং সম্পাদনার মাধ্যমে তৈরি নতুন ধরনের চলচ্চিত্র-ভাষা যা চলচ্চিত্রের শৈল্পিক মান বাড়িয়েছে।

এমন ছবি চলচ্চিত্রের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছে। কারণ আর্থিক লাভ নিশ্চিত করার জন্য বহু দর্শককে কেবল হালকা বিনোদন দিয়ে আকৃষ্ট করার গতানুগতিক ফর্মুলা এই চলচ্চিত্রকাররা ব্যবহার করেননি। এই ধরনের ছবিতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জৌলুস নেই; গ্ল্যামারের চটকও এখানে অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু এখানে দেখা যায় পরিচালকের ভাবনার গভীরতা, সামাজিক সমস্যার সাহসী সমালোচনা। শৈল্পিক দিক দিয়ে এমন ছবি হয়ে উঠে সুষমাময়। এই ধরনের চলচ্চিত্র তৈরি হয় মূলধারার ছবির পরিসরের বাইরে।

বাংলাদেশে এমন বক্তব্যধর্মী, সমাজসচেতন, চিন্তাশীল চলচ্চিত্র কি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে তৈরি করা হয়? এই ধরনের ছবি তৈরির প্রতি এদেশের পরিচালকদের এবং দেখার প্রতি দর্শকদের আগ্রহই-বা কেমন? এখানে এমন ছবি কি সহজে নির্মাণ করা সম্ভব?

বক্তব্যের গভীরতা এবং নির্মাণশৈলীর নান্দনিকতা, এই দুই দিক থেকে আমাদের দেশের বিকল্প এবং স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র কতোটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পেরেছে তা বোঝার জন্য এই প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে। কেউ প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে আধুনিক কিংবা গ্ল্যামার-সর্বস্ব বিনোদনধর্মী ছবিকেই ভালো ছবি বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু দামি প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই কোনো ছবির মান বেড়ে যাবে এমন মনে করা যুক্তিহীন। কারণ প্রযুক্তির চাকচিক্য এবং হালকা বিনোদন কখনও মানুষের চিন্তার গভীরতা বৃদ্ধি করবে না। যে ছবি নিছক বিনোদনের মধ্যে মানুষকে মজিয়ে রাখার পরিবর্তে সমাজসচেতন বক্তব্য তুলে ধরে, যে ছবির নির্মাণশৈলী উদ্ভাবনী সেই ছবি মানুষের মনের মুক্তি ঘটাতে পারে তা যত স্বল্প বাজেটের হোক না কেন।

বিনোদন প্রাধান্য দিয়ে আমাদের দেশে মূলধারা এবং মূলধারার বাইরেও অনেক ছবি তৈরি হয়েছে। সেইসব ছবির নির্মাণপদ্ধতিতে প্রাধান্য পেয়েছে দর্শককে সহজে আকৃষ্ট করা যায় এমন বিনোদনধর্মী ফর্মুলা। এই ধরনের কিছু ছবি হয়তো বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু বিনোদন প্রদানের গতানুগতিক প্রথার উপর নির্ভরতার কারণে এই ধরনের ছবি দর্শকের জন্য নতুন কিছু দেখার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেনি। দর্শককে সমসাময়িক বাস্তবতা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে প্ররোচিত করাও সম্ভব হয়নি।

বক্তব্য আর নির্মাণশৈলীর দিক দিয়ে চিন্তাশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্রের কথা বলতে হলে আলমগীর কবিরের 'ধীরে বহে মেঘনা' (১৯৭৩) আর 'রূপালী সৈকতে' (১৯৭৮), মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলীর 'সূর্যদীঘল বাড়ি' (১৯৭৯), তারেক মাসুদের 'মাটির ময়না' (২০০২) এবং হাতেগোনা আর কয়েকটি চলচ্চিত্রের নামই কেবল উল্লেখ করা যায়।

আশির দশকে এদেশে স্বল্পদৈর্ঘের বক্তব্যধর্মী ছবি তৈরির একটি চর্চা শুরু হয়েছিল। কিন্তু ফ্রান্স, ব্রাজিল, ভারত, আর্জেন্টিনা, ইরান, জার্মানি, জাপান, কিউবা প্রভৃতি দেশে যেভাবে বিনোদনধর্মী ছবির বাঁধাধরা পদ্ধতি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে প্রথাবিরোধী নতুন ধারার পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের নির্মাণ শুরু হয়েছিল সেভাবে নতুন চলচ্চিত্রের আন্দোলন বাংলাদেশে আমরা দেখতে পাইনি।

একসময় ঢাকার সিনেমা হলগুলোতে দর্শকরা দেখেছেন পশ্চিমে তৈরি হওয়া বিভিন্ন ক্ল্যাসিক ছবি। ক্লার্ক গেবল, অ্যালেক গিনেস, গ্রেগরি পেক, পিটার ও'টুল, ওমর শরিফ, অড্রে হেপবার্ন, ডরিস ডে, এলিজাবেথ টেলর প্রমুখ বিখ্যাত চলচ্চিত্রশিল্পী অভিনীত অনেক উঁচুমানের ছবি প্রদর্শিত হয়েছে ঢাকার বিভিন্ন সিনেমা হলে। বিভিন্ন দেশে তৈরি শৈল্পিক কিংবা রাজনৈতিক ছবি সিনেমা হলে দেখানো না হলেও বিভিন্ন চলচ্চিত্র সোসাইটি নিয়মিতভাবে বিশ্ববিখ্যাত পরিচালক, যেমন জঁ-ল্যুক গদার, লুই বুনুয়েল, আকিরা কুরোশাওয়া, ইংমার বার্গম্যান, সত্যজিৎ রায় প্রমুখের চলচ্চিত্র বা কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রথাবিরোধী ছবির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করত। এমন প্রদর্শনী নব্বই দশকেও নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হত ঢাকায়।

বর্তমান সময়ে বিদেশি সুনির্মিত চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী এবং তা নিয়ে আলোচনা নিয়মিতভাবে ঘটছে না। এখন ইউটিউবের যুগ। বিদেশি পরিচালকদের দুষ্প্রাপ্য অনেক চিন্তাশীল চলচ্চিত্র ইন্টারনেটের কারণে এখন সহজলভ্য। কিন্তু সেই ধরনের ছবি যে গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝানো এবং তা দেখার প্রতি এই সময়ের তরুণদের আগ্রহ সৃষ্টি করা হয়েছে কি না সেটাই প্রশ্ন।

বক্তব্যধর্মী চলচ্চিত্র তখনই আগ্রহের সঙ্গে তৈরি করা হবে যখন সমাজে গভীর চিন্তা গুরুত্ব দেওয়ার অনুকূল একটি পরিবেশ টিকে থাকবে। ভালো বই পড়ার মাধ্যমে চিন্তার গভীরতা বৃদ্ধি করার সঙ্গেও প্রথাবিরোধী চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়ার সংযোগ রয়েছে।

লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির ১৯৮৯ সালে আলবেনিয়ায় ভ্রমণের পর 'বলকান থেকে বাল্টিক: বিরুদ্ধ স্রোতের যাত্রী' নামে একটি বই লিখেছিলেন। এই বইয়ে তিনি জানিয়েছেন, তখন আলবেনিয়ায় লোকসংখ্যা ছিল ৩২ লক্ষ। অথচ সেখানে কেবল পাবলিক লাইব্রেরির সংখ্যাই ছিল সতেরো শ। এর বাইরে ছিল স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি আর ন্যাশনাল লাইব্রেরি। রাজধানী টিরানায় শাহরিয়ার কবির ঘুরে বেড়ানোর সময় দেখেছিলেন এমন কোনো পাড়া নেই যেখানে বইয়ের দোকান বা পাঠাগার নেই।

আর প্রায় দুই কোটি মানুষের আমাদের রাজধানীতে আজিজ সুপার মার্কেট, নিউ মার্কেট আর অন্যান্য অল্প কিছু জায়গায় হাতেগোনা কয়েকটি বইয়ের দোকান আর লাইব্রেরি দেখা যায়। অথচ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে প্রতি বছরই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন শপিং মল আর ফাস্ট ফুডের দোকান। যদি এখানে পোশাক, প্রসাধন সামগ্রী আর ফাস্ট ফুডের দোকানের ভিড়ে চিন্তাশীল বইয়ের দোকান হারিয়ে যেতে থাকে আমরা কী করে আশা করব মানুষের ভাবনার গভীরতা পক্ষান্তরে উঁচুমানের সংস্কৃতি টিকে থাকবে এই সমাজে?

সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে হালকা দিক প্রাধান্য পেলে সমাজে গভীর বক্তব্যধর্মী চলচ্চিত্র, নাটক, সাহিত্য সৃষ্টি হবে না তা-ও বোঝা যায়। আমাদের সমাজে চাকচিক্যনির্ভর বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্রকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা দেখে কখনও কখনও মনে হয় বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে চলচ্চিত্রকে বিনোদনের সমার্থক করে ফেলা হয়েছে। কোনো কোনো জাতীয় দৈনিকেও দেখা যায় চলচ্চিত্র-সম্পর্কিত সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে 'বিনোদন' শিরোনাম দিয়ে যেন চলচ্চিত্র কেবল বিনোদন হিসেবেই গণ্য হতে পারে। এমন প্রবণতা দর্শকদের চলচ্চিত্র সম্পর্কে ভুল বার্তা দেবে।

বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র একটি আলাদা ধারা। কিন্তু সব চলচ্চিত্র অবশ্যই বিনোদনধর্মী নয় আর বিনোদনমূলক উপাদান ছাড়াই বহু পৃথিবীবিখ্যাত চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। এই দিকগুলো সম্পর্কে আমাদের গণমাধ্যম কতটা গুরুত্বের সঙ্গে পাঠক-দর্শককে বার্তা প্রদান করছে সেই প্রশ্নও আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন।

চিন্তাশীল চলচ্চিত্র তৈরি হওয়া সমাজের স্বার্থেই জরুরি। কারণ এমন ছবির বাস্তবধর্মী বিষয়বস্তু আর সৃষ্টিশীল নির্মাণশৈলী দর্শককে উপস্থাপিত বিষয় সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। অন্যদিকে গতানুগতিক বাণিজ্যিক ছবির হালকা আর স্থূল বিনোদন দর্শকের চিন্তা স্বাভাবিকভাবে করে তোলে অগভীর। কেবলই হালকা বিনোদনে অভ্যস্ত দর্শকের পক্ষে সমাজের বিভিন্ন জটিল সমস্যা অনুধাবনের এবং তা নিয়ে সচেতনভাবে ভাবার সক্ষমতা বা আগ্রহ থাকবে তা আশা করা যায় না। বিনোদনের প্রতি অত্যধিক আসক্ত দর্শক নিজ দেশের ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজের নানা জরুরি দিক নিয়ে চিন্তা করা আর প্রয়োজনীয় মনে করেন না কারণ সেইসব দিকের আলোচনা বিনোদন যোগায় না।

আজ যদি আমরা দেখি বর্তমান প্রজন্ম আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত সামাজিক আন্দোলন, অন্যায় টিকিয়ে রাখা ব্যবস্থার প্রতি দেশের প্রগতিশীল ছাত্রদের প্রতিবাদ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার অনেক দিকই জানে না এবং তরুণদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে অগভীর আর অন্ধ চিন্তা– তাহলে বুঝতে হবে সমাজে চিন্তাশীল সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই ধারণাই স্পষ্ট হবে যে, বিদ্যমান সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশে চিন্তার গভীরতা বাড়ায় এমন সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্রের কদর নেই।

সদ্যপ্রয়াত বিখ্যাত পোলিশ চলচ্চিত্রকার আন্দজে ভাইদা বলেছিলেন, পোল্যান্ডে সমাজসচেতন, প্রথাবিরোধী কোনো চলচ্চিত্র বিনোদনধর্মী ছবির মতোই বাণিজ্যিক সাফল্য পায়। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেনের নতুন ছবির প্রতিও পশ্চিম বাংলায় বহু দর্শকের আগ্রহ ছিল। কিউবায় বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে একের পর এক উঁচুমানের বক্তব্যধর্মী ছবি নির্মাণের মাধ্যমে সাধারণ দর্শককে চিন্তাশীল ছবির প্রতি অনুরক্ত করে তোলা হয়েছিল। ব্রাজিলে চলচ্চিত্রকার গ্লবার রোশার নেতৃত্বে তরুণ পরিচালকরা ষাটের দশকে গতানুগতিকতামুক্ত নির্মাণপদ্ধতি ব্যবহার করে বহু ছবি নির্মাণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্রাজিলিয় ছবির প্রতি বিশেষ আগ্রহ সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন।

বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে বিনোদনমূলক উপাদান নেই, বরং চিন্তাশীল বক্তব্য আর পরীক্ষামূলক নির্মাণপদ্ধতি এমন ছবির প্রতি বহু দর্শকের আগ্রহ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। প্রথাবিরোধী ছবি তৈরির ঝুঁকিও পরিচালক-প্রযোজকরা কম নিচ্ছেন। আবার কখন কখনও আর্থিক সাফল্য থাকবে না এমন ঝুঁকি নিয়ে যদি ছবি তৈরিও করা হয় চিন্তা থাকে যে, সমসাময়িক কোনো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমালোচনার কারণে সেই ছবি সেন্সরের ছাড়পত্র পাবে কি না; বিতরণ এবং প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট সহযোগিতা থাকবে কি না ইত্যাদি।

'জীবন থেকে নেয়া' (১৯৭০), 'হীরক রাজার দেশে' (১৯৮০) বা সম্প্রতি তৈরি 'ভূতের ভবিষ্যৎ' (২০১২) প্রভৃতি ছবিতে যেভাবে রূপকধর্মী কাহিনির মাধ্যমে রাজনৈতিক সমালোচনা তুলে ধরা হয়েছে, তেমন বুদ্ধিদীপ্ত চেষ্টাও বাংলাদেশের চিন্তাশীল ছবির জগতে চোখে পড়ে না। ফলে আমাদের দেশে বাণিজ্যিক লাভ নিশ্চিত করবে এমন বিনোদননির্ভর ছবি তৈরির আগ্রহ আমরা বেশি দেখতে পাচ্ছি। আর প্রচারও যখন আকর্ষণীয় হয় তখন এমন ছবি দেখতে যায় বহু মানুষ। কিন্তু মূলত বিনোদন প্রদানের কারণে এই ধরনের চলচ্চিত্র দর্শকের সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে না। বরং এমন চলচ্চিত্র সমাজে বিদ্যমান অন্যায়ের প্রতি প্রতিবাদ করতে সচেতন হওয়ার প্রয়োজনীয়তা থেকে দর্শকের মনোযোগ সরিয়ে দেয় হালকা বিনোদনের দিকে।

তাই প্রশ্ন তৈরি হয়, এমন চলচ্চিত্র আসলে কার স্বার্থ নিশ্চিত করে? সমাজের বেশিরভাগ মানুষ যদি কেবল বিনোদনধর্মী বিষয়ে অভ্যস্ত হয়ে টিকে থাকা নানা জটিল সমস্যা নিয়ে ধারালো এবং সুচিন্তিত প্রশ্ন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তাহলে কোন গোষ্ঠী প্রকৃতপক্ষে লাভবান হবে?

বিকল্প ধারার যে কমসংখ্যক চলচ্চিত্র আমাদের এখানে তৈরি হচ্ছে সেখানেও দেখা যায় ছবির নির্মাণশৈলী প্রথাবিরোধী এবং উদ্ভাবনী করে তোলার ক্ষেত্রে যথেষ্ট মনোযোগ নেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু নিয়ে নির্মিত কোনো চলচ্চিত্রে গতানুগতিক নির্মাণপদ্ধতি ব্যবহার করা হলে ছবির বক্তব্য দর্শক-মনে অভিঘাত তৈরি করবে না। তাই বিকল্প ধারার পরিচালককে মনে রাখতে হবে বিষয়বস্তুর পাশাপাশি ছবির নির্মাণশৈলীতেও নান্দনিক নতুনত্ব থাকা জরুরি।

কোনো ছবিতে বেশিরভাগ সময় বিনোদন প্রাধান্য দিয়ে কখনও অল্পকটি সচেতন সংলাপ অন্তর্ভুক্ত করলে তা সেই ছবিকে সমাজসচেতন চলচ্চিত্র করে তুলবে না। কোনো জরুরি সামাজিক সমস্যা টিকে থাকার কারণ সম্পর্কে দর্শককে সজাগ করতে হলে নিশ্চিত করতে হবে যেন ছবিতে উপস্থাপিত বিষয় দর্শকমনে অস্থিরতা আর দুশ্চিন্তা তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি মূলত যাদের জন্য সমাজে বিভিন্ন সমস্যা টিকে থাকছে অঙ্গুলি নির্দেশ করতে হবে সেই ক্ষমতাশালীদের প্রতি।

ছবিতে একজন গ্রাম্য জোতদার, একজন মাস্তান, বা কোনো অসাধু কর্মকর্তাকে ভিলেন হিসেবে উপস্থাপন করলে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা কেন টিকে আছে তার সাহসী এবং সঠিক বিশ্লেষণ উঠে আসবে না। ছবির বক্তব্য হয়ে যাবে সীমিত এবং অকার্যকর। ক্ষমতাধর অন্যায়কারীদের জন্যও এমন ছবি অস্বস্তি তৈরি করবে না। জহির রায়হানের 'জীবন থেকে নেয়া' আর তারেক মাসুদের 'মাটির ময়না' বিদ্যমান সিস্টেম সহ্য করতে পারেনি। এই ছবিগুলো সমকালীন জটিল সমস্যা সম্পর্কে দর্শকদের সচেতন করার লক্ষ্য নিয়েই নির্মিত হয়েছিল।

দর্শককে সচেতন করার জন্য সেই ধরনের প্রতিবাদী এবং চিন্তাশীল চলচ্চিত্র তৈরির তাগিদ বর্তমান সময়ের তরুণ চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে কি আমরা দেখতে পাচ্ছি?

চটক, চাকচিক্য আর জৌলুস প্রাধান্য দিয়ে ছবি তৈরি করা হলে তা হয়তো ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করবে, কিন্তু এমন ফর্মুলা-নির্ভর ছবির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সুপরিচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে না। কারণ চলচ্চিত্র একটি শিল্পমাধ্যম যেখানে নির্মাতা নিজের সৃষ্টিশীলতা ব্যবহার করে শক্তিশালী চলচ্চিত্র-ভাষার মাধ্যমে বিভিন্ন অর্থ নির্মাণ করেন। ভালো চলচ্চিত্রের মূল্যায়নে সারা বিশ্বে এই দৃষ্টিভঙ্গিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আমাদের দেশে চিন্তাসমৃদ্ধ চলচ্চিত্রের প্রসার নিশ্চিত করার প্রতি যদি নির্মাতা, দর্শক, গণমাধ্যম, সর্বোপরি রাষ্ট্রের আগ্রহ তৈরি না হয় তাহলে কখনও তা উঁচু শৈল্পিক মান অর্জন করবে না। চলচ্চিত্রকে সে ক্ষেত্রে কেবল বিনোদন যোগানোর মাধ্যমে হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শককে সমাজসচেতন করে তোলার দায়িত্বটি হবে অবহেলিত।

যে মনস্তাত্বিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সমস্যার জন্য আমাদের দেশে চিন্তাসমৃদ্ধ চলচ্চিত্রের প্রতি বহু মানুষের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না সেই সমস্যাগুলি দূর করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি– ভালো চলচ্চিত্র এবং উঁচুমানের সাংস্কৃতিক পরিবেশ টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনেই।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক