শিক্ষক হত্যা-নিপীড়ণ: প্রাণের চেয়ে মান বড়

সুরেশ কুমার দাশ
Published : 5 July 2022, 04:54 PM
Updated : 5 July 2022, 04:54 PM

এই সমাজ রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে মানুষকে হৃদয়হীন বিবেকহীন করে তুলছে সেখানে আশুলিয়ার শিক্ষক হত্যার দায়ে আটক আশরাফুল ইসলাম জিতুর বিরুদ্ধে গতানুগতিক দোষারোপ করাই যায়। এর বাইরে নয় শিক্ষক উৎপল সরকারের প্রাণ যাওয়ায় অন্তত তাকে অপমানের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে না। অপমানিত হয়ে প্রাণে বেঁচে থাকা মানে প্রতিনিয়ত নিজের কাছেই পরাজিত হওয়া। এ এক অন্যরকম ক্লান্তি ও গ্লানি। 

উৎপল সরকারকে হত্যা করার আগেও / জন শিক্ষককে চরমভাবে অপমানিত করা হয়েছেসেটা আমরা জানি। তখন খোদ শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ আসেনি। অন্তত স্বপন কুমার বিশ্বাসের ঘটনাটির আগে পর্যন্ত নয়। অভিযোগ রয়েছে স্বপন কুমার বিশ্বাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে জুতার মালা পরানোর ঘটনা পুলিশ ও প্রশাসন ধামাচাপা দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। উৎপল খুন না হলে, স্বপনকে নিয়ে আদৌ কতটা মাতামাতি হতো, সেটা বোঝার জন্য অতীতের দিকে আলো ফেললে- আমরা অন্ধকারই দেখি

 শ্যামল কান্তি ভক্ত, আমোদিনী পাল, হৃদয় চন্দ্র ণ্ড, সবশেষ স্বপন কুমার বিশ্বাস। শ্যামল কান্তির শিক্ষকতা কেড়ে নেয়া হয়েছিল। পরে প্রমাণ না হওয়ায় শিক্ষকতা ফিরে পেয়েছেন। তাকে ব্যাপক জনতার সামনে কান ধরে ওঠবসা করানো হয়েছিল। বলতে হবে এটা ছিল শাস্তিদাতার বদান্যতা! তাকে তিনি সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসা থেকে রক্ষা (?) করেছিলেন। এসব শিক্ষকদের উপরও ধর্মানুভূতির কথা বলে অভিযোগ আরোপ করা হয়। স্বপন বিশ্বাস থানায় অভিযোগ থেকে রেহাই পেয়েছেন। কিন্তু হৃদয় ণ্ডলের বিরুদ্ধে এখনো অভিযোগ ঝুলছে। আর আমোদিনী পাল তাকে অপমানিত করার জন্য মামলা করলেও সেটা গতি পাচ্ছে না। 

যেসব শিক্ষকের কথা বললাম, তাদের নির্দোষ ভূমিকা প্রমাণ হওয়ার পরও শিক্ষকদের কোনো সংগঠনই প্রতিবাদে শামিল হয়নি। কিন্তু উৎপলের মৃত্যুর কারণে বেশিরভাগ আটপৌরে মানসিকতার শিক্ষকরা নিরাপত্তা নিয়ে ভয়ে আছেন। শ্যামলহৃদয়ের মতো অপমানের ভয়ে তারা কেউ প্রতিবাদে শামিল হননি। কারণ মানসম্মান নিয়ে তাদের কোনো ভয় নেই। বেইজ্জতি, অপমানের ভয় তাদের কাউকে কাবু করতে পারেনি।  যে কারণে তখন শিক্ষকরা কেউ মাঠে নামেননি। 

সেটাই বলছি– হত্যার দায়ে আটক কলেজ শিক্ষার্থী জিতু সমাজ পরিবেশের চর্চার বাইরে থেকে কিছু শিখেনি। সমাজ যে চর্চাটা দেখিয়েছে যেখানে মুন্সীগঞ্জের শিক্ষককে অপমানিত করার পর কেউ প্রতিবাদ করেননি। কোনো প্রতিবাদ আসেনি দেখে, এটা জিতুর মতো অনেকের কাছে এই বার্তা গেছে। কারণ আমরা যা শিখেছি সব তো আমাদের হাতে কলমে শিখিয়ে দেওয়া হয়নি। সমাজের মারফতে পরোক্ষ প্রত্যক্ষভাবে আমরা অনেক বার্তা পাই। তা থেকে   শিখি। 

শিক্ষক স্বপন বিশ্বাসকে জুতার মালা দানকারীরা (?) সংখ্যায় এত বেশি ছিল যে পুলিশ পর্যন্ত ভড়কে গেছে। সেখানকার কোনো জায়গা থেকে প্রতিবাদ তো হয়ইনি, গোটা পরিস্থিতিতে সেই মুহূর্তে পুলিশ পর্যন্ত কোনো সাপোর্ট পায়নি। যে কারণে একজন শিক্ষককে গলায় জুতার মালা পরিয়ে দিয়েছে, পুলিশ বলতে বাধ্য হয়েছে- এই ঘটনা আমাদের অগোচরে ঘটেছে। অথচ যখন শিক্ষকের গলায় জুতার মালা দেওয়া হচ্ছে, তখন তার পাশে পুলিশ। ছবিতে এমনই দেখা গেছে। তারপরও পুলিশ এবং প্রশাসন বলছে, এটা পুলিশ এবং প্রশাসনের অগোচরে ঘটেছে। আবার পুলিশ এও বলেছে, তখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ছিল যখন আমাদের আর কিছু করার ছিল না।

তাহলে এই সমাজ আর রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সত্য বলারও অবকাশ নেই। চোখের উপর  ঘটনা ঘটছে, পুলিশ বলছে, 'দেখি নাই' মানে পুলিশকে বলতে হচ্ছে 'দেখেও দেখি নাই' হঠাৎ পুলিশ অন্ধকার দেখল কিনা। যে কারণে অন্ধ না হয়েও অন্ধের মতো বলতে হয়েছে। অথবা চোখে দেখলে হাত দিয়ে নিজের চোখ নিজেকে ঢেকে রাখতে হচ্ছে। যেহেতু আমি সত্য বলতে পারছি না, ধর্মের নামে উম্মাদনাকারীদের ভয়ে, সেজন্য হাত দিয়ে আমি আমার চোখ ঢেকে রাখার মতোই।তাহলে শুধু কি জিতু নষ্ট হয়েছেযে নষ্ট মানুষের ভয়ে পুলিশ 'থ' হয়ে গেছে,  সেখানে রাষ্ট্র আর সমাজ কোন অবস্থায় আছেতার প্রমাণ দেওয়ার আর কি বাকি থাকে?

আমরা উৎপল সরকারের হত্যা নিয়ে অনেক প্রতিবাদী। কিন্তু শ্যামল ভক্ত, হৃদয় ণ্ডলের ক্ষেত্রে আমাদের আচরণ কেমন ছিল? বিবেক কোথায় ছিল? কেন পুলিশ দেখেও দেখছে না বলছে। একইভাবে সমাজ ও সংগঠনগুলো দেখেও না দেখার মতো অবস্থানে ছিল। অভিনয় বা ছলনা নয়। এটা হচ্ছে একজন মানুষ চোখ বন্ধ করে নিজেকে বিবেকশূন্য বন্যপ্রাণীর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চর্চা। এটা তো একদিনে হয়নি। 

শিক্ষকের বিবেক, জনতার বিবেক আর পুলিশের বিবেক একদিনে হত্যা করা হয়নি। 'শিক্ষক'কে নিপীড়ণের মধ্য দিয়ে একটি বড় অংশ অংশের মানুষ যখন সাম্প্রদায়িকতার 'মজা' উপভোগ করেছিল, তখনই বিবেক হত্যার শুরু। যদিও এর শুরুটা বহু বছর আগে থেকেই। গুটি কয়েক মানুষ প্রতিবাদ করবে আর গোটা সমাজ বন্য জন্তুর চামড়া গায়ে দিয়ে নৃত্য করবে তাহলে প্রাণের ভয়, নিরাপত্তার ভয়টা বাড়বে। মানসম্মানের ব্যাপারে মালুম হবে না। যে আমি প্রাণের চিন্তা করিসম্মানের চিন্তা না করে, তাহলে অন্য সব প্রাণির মতো প্রাণটাই মুখ্য হবে।

তাই জিতুরা আমাদের দেখে শিখছে, তারা দেখছে আলোকে কিভাবে অন্ধকার বলা হচ্ছে। অর্থাৎ আজকে আলো মানে অন্ধকার। আর অন্ধকার মানে আলো। তাই জিতু এই সমাজ আর আইনের চোখে দোষী। 

কিন্তু  মনে রাখতে হবে, জিতু খুন করলেও কেউ কোনো সাম্প্রদায়িকতার কথা তোলেনি। কোনো ধর্ম অবমাননার কথা প্রচার করেনি। জিতু যে কারণে খুন করেছে, সেটা উৎপল সরকারকে খুন না করে অন্য রহিম, করিম নামে যে কোনো শিক্ষককে খুন করতে পারতো। সে হৃদয় ণ্ড, শ্যামল ভক্ত নামে কোনো শিক্ষককে সাম্প্রদায়িকভাবে অপমানিত করেনি। তাই উৎপল সরকার মরে গেছে, তার আত্মসম্মান, মর্যাদা বা সম্প্রদায়গত সম্মানের ব্যাপারেও ভাবনার আপাতত কোনো অবকাশ নেই।

কিন্তু যারা জুতার মালা পরিয়ে, কান ধরে ওঠবস, লাথিগুঁতোপিটুনি খেয়ে, অপমান সহ্য করে বেঁচে আছেন, তাদের তো প্রতি মুহূর্তে অপমানের দহন, সাম্প্রদায়িক বর্বরতার ক্ষত বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। হাট বাজার স্কুল কলেজ লোকসমাজের সর্বত্র। উৎপল সরকার তো একবার মরেছে তাদের বহুবার মরে যেতে ইচ্ছা করবে। অপমানের শিকার এক শিক্ষক সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, "আমি আমার মা আর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে নিজের মনকে প্রবোধ দিয়ে অপমানের জ্বালা বুকে নিয়ে বেঁচে আছি।"

কেন তাদের এই অপমানহতমানের শিকার হতে হয়েছে? কেন তাদের পক্ষে কোনো শিক্ষকসমাজ তখন কথা বলেননি, যেখানে তাদের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ এনে অপমানিত, লাঞ্ছিত, নিগৃহীত হতে হলো?

গত কয়েক বছরে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস সৃষ্টি ও সাম্প্রদায়িকতার অপকৌশল বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই- অতি সহজে ধর্ম অবমাননার কথায় হিন্দু সম্প্রদায়কে সংঘবদ্ধভাবে আক্রমণ করা হয়েছে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের ঘটনা ছিল নিকট সময়ের মধ্যে সবচেয়ে পৈশাচিক ও বর্বরতায় পরিপূর্ণ। ফেইসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে নির্বিচারে আক্রমণ, অগ্নি সংযোগ, ভাঙচুর, খুন ইত্যাদি। এরপর গত বারের শারদীয় দুর্গাপূজাতেও ঘটলো একের পর এক আক্রমণ। 

অন্তত এই দুটি ঘটনা কি ভয়ঙ্করভাবে হিন্দু সম্প্রদায়কে সন্ত্রস্ত করেছে, তাদের আজকের দিনযাপন কোন পর্যায়ে- সেই খবর আমরা জানিনা। এভাবে সন্ত্রাস ও আতঙ্ক সৃষ্টির পর একটা জনগোষ্ঠি স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করা সম্ভব কিনা, গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন।

এসব ঘটনা সবগুলো ঘটেছে- ফেইসবুক ব্যবহার করে। এখনো ঘটছে ফেইসবুক ব্যবহার করেই। সেটা কিছুটা ধরন পাল্টেছে। হিন্দু সম্প্রদায়কে থ্রেট করা হচ্ছে, বার্তা দেয়া হচ্ছে– শিক্ষকদের অপমান, লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে। 

ঘটনার শিকার শিক্ষকদের বক্তব্য এবং দেশের কিছু অসাম্প্রদায়িক চেতনাধারী ব্যক্তি বিশেষের বক্তব্য হচ্ছে- এসব সাম্প্রদায়িক প্রচার-প্রচারণা ও হুজুগ সৃষ্টির কারণ হচ্ছে- কর্মক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পদপদবি কেড়ে নেয়ার হীন মানসিকতা ও শিক্ষক হিসেবে যারা সুনামের অধিকারী তাদেরকে তাড়ানোর জন্য। সরিয়ে দেয়ার জন্য। ব্যক্তি বিশেষ বা কতিপয় গোষ্ঠির এই বদ লালসা থেকে এই ধর্ম অবমাননার হুজুগ তৈরি করা হচ্ছে। আর এতে স্থানীয়ভাবে চেনা-অচেনা মানুষগুলোর ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষক অপমানের মতো ঘটনাগুলো দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের মাথায় আঘাত করা হচ্ছে। অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের রাষ্ট্রীয় অবস্থান ও অধিকারকে নড়বড়ে করে তুলেছে। ঘটনাগুলো একের পর এক ঘটছে। হিন্দুদের কাছে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন 'তারা কোথায় যাবে, রাষ্ট্রে তারাই বা কারা'?

আমরা সাদাচোখে বিশ্বাস যদি করি শুধু কর্মক্ষেত্রে প্রতিহিংসা থেকে এসব হচ্ছে, তাহলে ভাবনাটা ঠিক নয়। এত ঘটনার পরও কেন অপেক্ষার সময় থাকে না- এটা আসলে ধর্ম অবমাননা কিনা যাচাই করার। কিংবা কেবল হঠাৎ আবেগের ফলে উম্মাদনা হচ্ছে কিনা? এতগুলো মানুষ এক সাথে এভাবে জুতার মালা প্রস্তুত করার মত ফন্দি-ফিকির কম কথা নয়। এসব ঘটনার একটা কেন্দ্রবিন্দু আছে। এই কেন্দ্রটা চিহ্নিত করার গরজ নেই। নাসিরনগরের সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব, কুমিল্লার পূজা মণ্ডপ থেকে সারাদেশের ঘটনা- হুটহাট এত মানুষ জড়ো করা দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনা ছাড়া অসম্ভব। 

যদি বলি, শিক্ষকদের অপমানের বিরুদ্ধে কেন শিক্ষক সমাজ প্রতিবাদ করেনি? তার কারণ, সাম্প্রদায়িক আক্রমণে তাদের মৌন স্বীকৃতি আছে। যেখানে শিক্ষক সমাজের মৌন স্বীকৃতি আছে বলে ধরে নিচ্ছি, সেখানে জনসমাজের বোধ-বিবেচনা অনেক অধঃপতিত তো বটেই। সুতরাং জনসমাজকে দীর্ঘদিন এসব  শিক্ষক সমাজ এই ধ্যান ধারণাতে, এই মানসিকতায় শিক্ষা দিয়েছে। এই সাম্প্রদায়িক ভেদ-বিভেদ কোথাও কোথাও গুপ্ত বিদ্যাচর্চার মতো। মানুষ হিসেবে মানবতার বাইরে ধর্মে ধর্মে মানুষ যে পৃথক, সেই বিশ্বাস তৈরি হয়ে গেছে এদেশে। শিকড় গেড়েছে। সহজ কোনো পন্থায় এখান থেকে বের হওয়া যাবে- অসাম্প্রদায়িক সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে যারা চিন্তা করে, তাদের সেই ভাবনা ভুল হবে। তাতে এক পক্ষ অপমান হজম করতে থাকবে কিন্তু তারা যারা প্রাণের ভয় করছে- সেই প্রাণ রক্ষা পাবে না। কারণ জানোয়ার সৃষ্টি করলে, সেই বন্য জানোয়ারকে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কোনো ধর্মাধর্মের দোহাই দিয়ে আটকানো যাবে না।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক