আওয়ামী পরিবারের ৭২ বছর

অমি রহমান পিয়ালঅমি রহমান পিয়াল
Published : 13 Feb 2012, 08:20 AM
Updated : 22 June 2021, 06:00 PM

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের বাড়বাড়ন্ত। ভারতে নেহেরু পরিবার, পাকিস্তানে ভুট্টো পরিবার, শ্রীলংকায় বন্দরনায়েক, মায়ানমারে অং সান- উত্তরাধিকারসূত্রে দেশ শাসন করেছে। এ পরিবারতন্ত্রের বাইরে গিয়ে নতুন রাজনৈতিক ধারা সৃষ্টির দাবিতেও সোচ্চার বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাবলম্বীরা। বাংলাদেশে তেমনই বঙ্গবন্ধু পরিবার এবং এ পরিবারের সীমা বঙ্গবন্ধু কিংবা তার কন্যা শেখ হাসিনায় আটকে নেই। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগানকে ক্বলবে ধারণ করা প্রতিটি বাঙালি এ পরিবারের সদস্য। এ বাংলার, এ বদ্বীপের সকল অর্জন, সকল ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ভাষা আন্দোলন, আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন- আওয়ামী লীগকে কোথাও থেকে সহজে মুছে ফেলা যাবে না।

পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনও রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মী, সমর্থকদের এতো রক্ত দিতে হয়নি। ষাটের দশকের শেষভাগে ইন্দোনেশিয়ায় সামরিক গণহত্যার শিকার পিকে পার্টির নিহত সদস্য ও সমর্থকের সংখ্যা ৫ লাখের মতো। সত্তর দশকের শুরুতে আওয়ামী লীগের আত্মদানকারী কর্মী, সমর্থকদের সংখ্যা এর কয়েকগুণ। জেনারেল রাও ফরমান আলী তার নীল প্যাডে অপারেশন সার্চলাইটের যে চূড়ান্ত নীলনকশা তৈরি করেছিলেন তাতে নির্মূলের এক নম্বর নামটি ছিল আওয়ামী লীগ। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মুসলিম লীগারদের খোঁজেনি। জামাতে ইসলামীর সদস্যদের খোঁজেনি। খুঁজে বেরিয়েছে আওয়ামী লীগারদের, খুঁজে খুঁজে হত্যা করেছে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ তিরিশ লাখের ৮০ ভাগই আওয়ামীমনা। তারা একটি স্বাধীন দেশ পেতে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিলেন। সেই দেশ তারা পেয়েছেন। 

২.

আওয়ামী লীগের আজকের অবস্থানে আসতে কম ঝঞ্ঝা পোহাতে হয়নি। পাকিস্তান হওয়ার পর তখন দুই পাশেই মুসলিম লীগের জয় জয়কার। পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের হাল সব এলিটদের হাতে। নবাব ফ্যামিলির লোকজন, চোস্ত উর্দুতে বাতচিৎ করা লোকজন। সেখানে আমজনতার ঠাঁই নাই। কলোনিয়াল শাসন থেকে মুক্তি পেয়ে বাঙালি ঢুকে পড়লো আরেক উপনিবেশবাদে। রাজনীতিতে এ জনতাকে সম্পৃক্ত করতে, রাজনীতিকে ধনীদের হাত থেকে মুক্তি দিতেই- জন্ম নিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী মানে জনতা। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন কেএম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে জন্ম নিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। ৬ বছর পর ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির চর্চায় মুসলিম শব্দটি ঝেড়ে ফেললো এ সংগঠন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২২৩টি আসনের ১৪৩টি আসনই জিতেছিল আওয়ামী লীগ। ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দিয়েছিল মুসলিম লীগকে। তারা আর কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি। পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বিরোধী দল হয়ে দাঁড়ায় আওয়ামী লীগ। ১৯৫৭ সালে পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক মতপার্থক্যে মাওলানা ভাসানী আলাদা হয়ে ন্যাপ গড়লেন। আওয়ামী লীগ চলে এলো শেখ মুজিবুর রহমানের ডায়নামিক নেতৃত্বে।

পাকিস্তানে সামরিক শাসন শুরুর পর জান্তার মাথা ব্যথার নাম হয়ে যায় আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। হেন অজুহাত নেই যা ব্যবহার করে তাকে জেলে ঢোকানো হয়নি। তার মতো এতো দীর্ঘ সময় জেল খাটেননি আর কোনো নেতা। যাবজ্জীবনের আসামী জেল খাটে ১৪ বছর, বঙ্গবন্ধু খেটেছেন প্রায় ১৩ বছর। নির্দিষ্ট করে বললে ৪ হাজার ৬৭৫ দিন! এই অন্তর্বর্তী সময়েই তিনি দিয়েছেন স্বাধীনতার রূপরেখা। ৬ দফার ধারাবাহিকতায় এলো ৭ মার্চ- এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। নেতার তর্জনী হেলনে বাঙালি বুঝে নিল যুদ্ধ করে মাতৃভুমি ছিনিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে। সেই যুদ্ধের নেতৃত্ব দিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। তার দুই বছর আগে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকীকে পূর্ব পাকিস্তানের নাম বাংলাদেশ বলে ঘোষণা দিলেন বঙ্গবন্ধু। ওই নামেই এখন ওড়ে আমাদের লাল সবুজ পতাকা। 

স্বাধীনতার পর সময়টা ছিল বড্ড কঠিন! যুদ্ধবিধ্বস্ত, তলাবিহীন ঝুড়ির দেশকে বিনির্মাণের দায়িত্বে ছিল আওয়ামী লীগ। এর মধ্যেই এলো আঘাত। পঁচাত্তরের ১৫ অগাস্ট হত্যা করা হলো জাতির জনককে। তারপর আবার একাত্তরের মতো চললো নির্মূল অভিযান। শুরু হলো আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র। বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার চক্রান্ত। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে টিকে গেল আওয়ামী লীগ। ৮১-তে ফিরলেন শেখ হাসিনা। ঘুরে দাঁড়ালো আওয়ামী লীগ। লাঠি-গুলি-টিয়ারগ্যাস, আর্জেস গ্রেনেডেও ঠেকানো গেল না তার উত্থান। গত ১৩ বছর ধরে শাসনক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। এ একযুগ সমৃদ্ধির যুগ। উন্নয়নের সোপান বেয়ে তরতরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তলাবিহীন ঝুড়ির সে দেশটা এখন মধ্যম আয়ের দেশ! পাকিস্তান ভারতের চেয়েও এগিয়ে গড় প্রবৃদ্ধিতে। 

৩.

এই লম্বা যাত্রাপথে এমন নয় কোনো ভুল ছিল না। খন্দকার মোশতাকের মতো ডানপন্থিদের দলে রাখার মূল্য জীবন দিয়ে চুকিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। শেখ হাসিনার দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ অন্যায় সমঝোতার। যে স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে জীবন দিলেন নূর হোসেন, সেই স্বৈরাচারের দলকে জোটসঙ্গী করার সমঝোতা। ২০১৩ সালের পর হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সমঝোতা। এর মূল্য কম দিতে হয়নি। গত ৮ বছরে মৌলবাদের ভয়াবহ উত্থানের অন্যতম কারণ ছিল এ সমঝোতা। পড়ার বই পাল্টে গেছে, দলের মধ্যে ঢুকে পড়েছে সাম্প্রদায়িক ঘরানার লোকজন! আশার কথা সেই ফাঁদ কেটে বেরোতে পেরেছে দল। যদিও অন্যান্য দলগুলো নিয়ে মহাজোট করে সরকার চালায় আওয়ামী লীগ, কিন্তু তারা কেউ অপরিহার্য নয়। আওয়ামী লীগ নিজের জোরেই চলার মতো অবস্থানে বহুদিন। রাস্তা থেকে মোল্লাদের দূরে রাখতে যে সমঝোতা সেটাও ভেঙ্গে কঠোর অবস্থানে এখন সরকার। 

হ্যাঁ দলে দুর্নীতিবাজ আছে। অসৎ লোক আছে। সাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ আছে। অপরাধী আছে। কিন্তু তারা গুটি কয়েক। সামষ্টিক আওয়ামী লীগের গাণিতিক হিসেবে তারা অতীব সংখ্যালঘু। দিনরাত প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়ে টিকে থাকা লাঠির জোরে নয়। এই টিকে থাকা পরিবারের সদস্যদের ভালোবাসায়। আওয়ামী পরিবারের লোকজন অত্যাচার সয়ে বড় হয়েছে। ত্যাগের রাজনৈতিক দীক্ষায় দীক্ষিত তারা। সরকারে আসার পর প্রচুর নতুন মুখ দেখা যায়। এদের গায়ে গতরে চর্বিও অনেক। তেল মেরে মেরে বিস্ময়কর উত্থান অনেকের। ত্যাগীদের হতাশ করে এরা অনেক কিছুই বাগিয়ে নিচ্ছে। কেউ কেউ ধরা পড়ছে, জেলে যাচ্ছে। আমরা জানি দলের বিপদে এরা থাকবে না। কিন্তু এদের অপরাধের দায় আমাদেরই নিতে হবে। তারপরও আমরা আশাহত নই। আওয়ামী লীগের ঘরের মধ্যে রাজনীতি এতো বেশি যে তারা এ কারণেই মাঠের রাজনীতিতে অপরাজেয়। 

বঙ্গবন্ধু দিয়েছেন রাজনৈতিক মুক্তি। শেখ হাসিনা দিয়েছেন অর্থনৈতিক মুক্তি। এই বাংলাদেশ এখন নিজের টাকায় পদ্মাসেতু বানায়। এই বাংলাদেশ এখন অন্তরীক্ষে স্যাটেলাইট পাঠায়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে এ বাংলায়। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে এ বাংলায়। এসবই সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এবং গোটা আওয়ামী পরিবারের নেতৃত্বে। সেই পরিবার আজ পা দিল ৭২ বছরে। আর কোনো দলের আছে এতো অর্জন! এই অর্জনের যোগ্যতায়ই বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে চলে আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্যরা। গোটা দেশ যখন আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগবিরোধী অক্ষে বিভক্ত, যখন দিনরাত চলে আওয়ামী লীগ উৎখাতের চক্রান্ত, তখন আওয়ামী পরিবার নির্ভয়ে লড়ে যায়। দিন শেষে আমরাই বাংলাদেশকে দেখে রাখি। আমরা মানে, আওয়ামী পরিবার।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক