এই গল্পটা ‘পরী’র

আহসান কবিরআহসান কবির
Published : 17 June 2021, 08:41 AM
Updated : 17 June 2021, 08:41 AM

বাংলা সিনেমার নামটা মনে নেই। ছোটকালে দেখেছিলাম। আকাশ পরী এসেছে এক রাজ্যে। রাজকুমারের সাথে তার দেখা হয়েছে।পরীর ফিরে যাওয়ার সময় এলে মন খারাপ হলো রাজকুমারের। রাজকুমার জানতে চাইলো-পরী, রাজ্যে ভালো কী দেখলে? পরীর উত্তর – মানুষ! রাজকুমার আবারো জানতে চাইলো- খারাপ কী দেখলে? পরী জানালো- মানুষ!

সিনেমার ভিলেনের সাথে পরীর পরে আবার দেখা হলেও মূলত এ পৃথিবীর মানুষ ভালো, আবার মানুষই খারাপ। নারীদের ছোট করা হলেও পরীরা সহসা খারাপ হয় না কারণ তারা বাস করে রূপকথার রাজ্যে। পুরুষরাই নাকি পরীদের আঁকে। সাহিত্য বা রূপকথায় পরীদের প্রতি নারীদের আসক্তি আছে কিনা তা পুরোপুরি নির্ণিত হয়। পুরুষ পরীদের আঁকে কারণ পরীরা নারীর পেটে জন্মায় না। কিন্তু পুরুষ প্রেমিক হোক আর ধর্ষক হোক জন্ম তার নারীর পেটেই।

মানুষের আঁকা দৈত্য বা পরীদের চেহারা প্রায় একইরকম। দৈত্যরা মূলত পুরুষ এবং শিং ওয়ালা। গায়ের রং কালো। অন্যদিকে পরীদের গায়ের রং ফর্সা,পাখা সুন্দর এবং শরীরের বাঁক কামনা উদ্রেক করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কালো মানুষদের আঁকা ভূতের চেহারা সাদা আর সাদা মানুষদের আঁকা ভূত বা দৈত্যের চেহারা কুচকুচে কালো। হয়তো সৃষ্টিশীলতার ভেতরেও বর্ণবাদ কিংবা নারীদের প্রতি শোষণ ও কাম চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা কাজ করে।

তাই পুরুষ নির্ণিত পরীদের পোশাকও একইরকম। যে রঙের পোশাক দেবেন সেই রঙে নামকরণ হবে পরীর। যেমন সাদা পোশাকের পরীর বেশি দেখা মেলে তাই সাদা পরী। লাল, নীল বা হলুদ পরীও থাকতে পারে। যদি জীবনের প্রয়োজনে কোন নারী রাত দশটার সময় হিজাব বোরকা পরে কফি বা বার্গার খেতে যায়, কেউ কেউ ছবি দিয়ে নিচে শিরোনাম লেখে- বাহ! কেউ কেউ লেখে- রাতের পরী!

'ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী পোশাক' পরে তনু কিংবা নুসরাতরাও এদেশে ধর্ষিতা হয়। জনপ্রিয় এক অভিনেতার মতো এটা নিয়ে কেউ কথা বলতে গেলে সবাই তাকে নিয়ে যেন হামলে পরে। পোশাক নিয়ে কেউ হয়তো কথা বলতে চান না, চুপ করে থাকেন। কিন্তু ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরে কোন মেয়ে রাতে একা একা রেস্টুরেন্টে গেলে তখন পুরুষরা যেন হয়ে যান অন্যরকম 'জাজমেন্টাল'। ওই মেয়েটার জন্য তখন সমাজ, ধর্ম, রাত, পোশাক সবই নাকি রসাতলে যায়। পরীরা তাই পুরুষের কল্পনাতেই থাকুক।

আর কোন নারী যদি সেলিব্রেটি হন তাহলে তো কথাই নেই। যে পুরুষ কোন নারীকে পর্দায় পরীর মতো পছন্দ করে, নাগাল পেলে সে হয়তো সেই নারীকে শেকল পরাতে চায়। তার চলাফেরা কিংবা পোশাক-আশাক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পুরুষের এই ইচ্ছে হাজার বছর ধরে চলে আসছে। হয়তো এই ইচ্ছে নারীদেরও আছে। কিন্তু 'জাজমেন্টাল' হবার আগে ভাবতে হবে অন্যের ইচ্ছে বা স্বাধীনতায় অযাচিতভাবে কেউ হামলে পরছে কিনা। প্রত্যেক ক্রিয়ার যেমন সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তেমন। যাই ঘটুক পক্ষে বিপক্ষে হামলে পরবে মানুষ। সিনেমার সেই পরীর কথামতো- ভালো মানুষ ও খারাপ মানুষ। সেলিব্রেটিদের ব্যক্তিগত জীবনযাপনের অনেক কিছুই এখন ঠিক করে দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।

পুরুষ যে পরীদের ছবি আঁকে সেখানেও পুরুষের ইচ্ছের প্রতিফলন থাকে শতকরা একশ ভাগ। ধরুন, বনপরী। সে বনে থাকে। বনের ভেতর পরী যে পোশাক পরে থাকবে সেটা পুরুষেরই আঁকা। এই পরীর পোশাক হচ্ছে বনের রাজা 'টারজান' এর বিপরীত। টারজানের যেখানটা লতাপাতা বা চামড়া দিয়ে ঢাকা থাকে পরীরটাও তেমন, সাথে বুকটাও ঢাকা। পরীর কনসেপ্ট মধ্যপ্রাচ্যের সেমিটিক ধর্মে বিপুল পরিমাণে রয়েছে। কিন্তু তাকে বা তার ডানাকে হিজাব পরানো হয়নি কেন সেটাই চিন্তার বিষয়। তাই বনের পরী খানিক 'খুল্লামখুল্লা'!

বনপরীর চেয়ে জলপরীর এগিয়ে থাকার কথা ছিল। পোশাক কিংবা অন্যান্য কারিশমায়। মানুষের কল্পনায় জলপরী যেমন আছে মৎস্যকুমারীও আছে। মৎস্যকুমারীর লেজ অনিবার্য কিন্তু জলপরীর লেজ অনিবার্য নয়। তার পাখা থাকবেই। জলপরী হ্রদ,নদী বা সাগর থেকে ভুস করে উঠে আসবে। পাতালপুরিতে জলপরী রাজকুমারকে নিয়ে গেলেও শেষমেষ জলপরীর ঠাঁই হবে রাজকুমারের রাজমহলেই। পরীরাও নারীর মতো বীরভোগ্যা। পরী ভিলেনের হাতে পড়লে তাকে বাঁচাবে রাজকুমার। পুরুষ কিংবা মানুষ আসলে তার কল্পনার বাইরে যেতে পারে না।

বনপরী বা জলপরীর চেয়ে আকাশপরী এগিয়ে আছে অনেক। আকাশ থেকে নামিয়ে আনাটা কল্পনায় সহজ। আকাশ পরীর পাখা হয়তো সাদা। কিন্তু অন্ধকার পরীও আছে। জ্বিন-পরী বা অন্ধকার পরী নিয়ে মানুষের ভয় অনেক। কোন কোন জ্বিন-পরী নাকি ঘাড় মটকে দেয়। অন্ধকারে পরী তার প্রেমিককে তুলে নিয়ে যায়, ভোরে নাকি পুকুর বা নদীরঘাটে পাওয়া যায় প্রেমিককে। অন্ধকারের পরী সিনেমাতেও দেখা যায়। গান গেয়ে কিংবা নেচে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরীরা অনেক ক্ষেত্রেই দুই রকমের। ভালো এবং খারাপ। খারাপ পরী ঘাড় মটকে রক্ত খায় কিংবা গল্পের খারাপ লোক অথবা সিনেমার ভিলেনের সাথে হাত মেলায়। ভালো পরীরা রাজকুমারকে ভালোবাসে কিংবা বন্দি রাজকুমারীর জন্য জুতো উপহার দেয় যে জুতোতে চড়ে রাজকন্যা আকাশ পাতাল ঘুরে আসতে পারে।

গ্রিক পুরাণ, হিন্দু মিথলজি কিংবা রূপকথায় পরীদের কমতি ছিল না কখনো, ভবিষ্যতের সৃষ্টিশীলতায়ও অনেকাংশ জুড়ে থাকবে এই পরী। যে নারীকে পুরুষ পায় না বা দাবিয়ে রাখতে চায় তার চেয়ে অনেক বেশি তার ফ্যাসিনেশান থাকে এই পরীদের জন্য।

ভারতে এবং বাংলাদেশের মাদারীপুরে পরীদের প্রভাবে এক কিশোরের সাথে অন্য কিশোরের বিয়ে হবার একাধিক ঘটনাও আছে। পরীদের নিয়ে বহু গালগপ্পো কিংবা গান আছে। যেমন- আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী/সাথী মোদের ফুলপরী/লালপরী, নীলপরী সবার সাথে ভাব করি.. এই গানের ভেতরেই আছে আকাঙ্ক্ষ্যা। পরীদের সাথে সবাই ভাব করতে চায়। সংসার বা বিয়ে পরবর্তী জীবনে পরীরা কেমন থাকে সেই গল্প রূপকথাতেও নেই বললে চলে।

পুরুষের সক্ষমতা বা ষড়যন্ত্রই আসল। সে যাকে যেখানে রাখতে চায়, সে সেখানে থাকলে কোন ঝামেলা হয় না। পরী শুধু আঁকাতে কিংবা কল্পনায় থাকুক, বাস্তবের পরীদের পুরুষ রাখতে চায় তাদের অধীন। নারীকে অধীনে রাখার জন্য যদি ধর্ম, রাজনীতি বা রাষ্ট্রকেও প্রয়োজন হয়, পুরুষ এসব কিছুকেই করায়ত্ব করে রাখতে চায়। পুরুষেরা চিরকাল চায় 'বিপন্না নারী'। এ কারণে মানুষ ধর্ম ও নারীর নামে যতোবার রাষ্ট্রকে চিতায় তুলেছে,অন্যকিছুকে তার সামান্যভাগও তোলে নি। নারী তাই শুধু যন্ত্রণা বা বেদনায় নীল হয় না, নীল হয় পুরুষের 'জাজমেন্টালে' কিংবা শোষণে!

লেখাটা 'পরী'দের নিয়ে। এই লেখার সাথে বাংলাদেশের চিত্রনায়িকা পরীমনি কিংবা তার অভিযোগের কারণে যিনি বা যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন সেইসব 'নাসির'দের সাথেও লেখাটার কোন সম্পর্ক নেই। কারণ নাসিরদের আশিটা মোবাইল সিম বা আশিজন বান্ধবী থাকলেও শেষমেষ তাদের কিছু যাবে আসবে না। আর পরীমনি একদুটো বিয়ে করলেই কিংবা রাত দশটার পরে বাইরে বেরিয়েছিল কেন এমন ভেবে তার গুষ্ঠি উদ্ধার করবে অনেকেই। আসলে পরীদের কপাল যেমনই হোক নারীরা কেমন যেন। কখনো কখনো বৈষম্য ছাড়া আর কিছু তাদের ভাগ্যে জোটে না। আর তাই 'পরী সবকিছু খুলে বলুন'- সাংবাদিকদের করা এই প্রশ্ন নিয়েও অনেক ট্রল কিংবা খোলাখুলি হয়। আমরা তারচেয়ে বরং একটা গল্প শুনি-

এক লোক ভিক্ষা করছিল। স্বামী স্ত্রী যাচ্ছিল পাশ দিয়ে। করুণ সুরে ভিক্ষা চাইলো লোকটা। স্ত্রী দয়া পরবশ হয়ে পঞ্চাশ টাকা দিল ভিক্ষুক-কে। টাকাটা হাত দিয়ে খানিকক্ষণ নেড়েচেড়ে ভিক্ষুক লোকটা বললো- মা আপনি নিশ্চয়ই পরীর চেয়েও সুন্দর।
ভিক্ষুকের কথা শুনে ক্ষেপে গেল স্ত্রী। স্বামী কে ইঙ্গিত করে বললো- লোকটা মিথ্যুক। সে অন্ধ না। স্বামী উত্তর দিলো- লোকটা সত্যি অন্ধ, তা না হলে তোমাকে পরীর চেয়ে সুন্দর বলার কথা না।

অন্ধরাই এখন থেকে পরীদের আঁকুক।

আসলে পুরুষ পরী আঁকে ভিন্ন চোখে। আঁকার সময় তার স্ত্রী, বোন বা মা হয়তো সামনে এসে দাঁড়ায় না। যতোই সে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাক না কেন, তাকে মনে রাখতে হবে- যে কেউ এমন কী একজন যৌনকর্মীরও না বলার অধিকার আছে।

প্রকৃতি 'জোরজবরদস্তি' সহ্য করে না।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক