ত্রিমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার বিপক্ষে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

রাজু আলাউদ্দিন
Published : 30 May 2021, 02:26 PM
Updated : 30 May 2021, 02:26 PM

"সাবেক প্রথার বাংলা দেশে  এখনও তিনটি  শিক্ষাপ্রণালী আছে এবং তাহা সরকারের অনুমোদিত—নিউস্কীম মাদ্রাসা , ওল্ডস্কীম মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষা। ইহা শিক্ষাক্ষেত্রে কেবল  গণ্ডগোলই সৃষ্টি করিয়াছে এবং মুসলমান সমাজে অনৈক্য আনয়ন করিয়াছে।–আযাদ পাকিস্তানে ইহাদের অস্তিত্ব নিষ্প্রয়োজন, বরং হাস্যকর ও লজ্জাকরও বটে। পৃথিবীর কোনো সভ্যদেশে সরকার একাধিক শিক্ষাপ্রণালী কখনও মজ্ঞুর করেন না। " 

– ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্  ( আনিসুজ্জামান, ইহজাগতিকতা ও অন্যান্য, কারিগর, কলকাতা, ২০১২, পৃ ২৭৮)

শহীদুল্লাহ যদি স্বাধীনতার পরও বেঁচে থাকতেন তাহলে তাকে হয়তো আবারও বলতে হতো "স্বাধীন  বাংলাদেশে ইহাদের অস্তিত্ব নিষ্প্রয়োজন, বরং হাস্যকর ও লজ্জাকরও বটে।" যে-পরিবর্তনহীনতাকে তিনি হাস্যকর ও লজ্জার বলে অভিহিত করেছেন, স্বাধীন দেশের বহু সরকার তার পরিবর্তন 'নিষ্প্রয়োজন' বলে ভেবেছেন। এক অর্থে যে-শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে পাকিস্তান-সরকার আমাদের মধ্যে বিভেদকে অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে পরিবর্তন করতে চায়নি,  স্বাধীন দেশের সরকাররাও সেই শক্রপক্ষের আদর্শকেই বহন করছে। 

ভাবতে আশ্চর্য লাগে যে শহীদুল্লাহ সেই পাকিস্তান আমলেই একক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভেবেছিলেন এবং একাধিক শিক্ষাব্যবস্থা কতটা গণ্ডগোল পাকাতে পারে তার ভবিষ্যদ্বাণী তিনি করে গিয়েছিলেন। একাধিক শিক্ষাব্যবস্থা যে আখেরে অনৈক্য সৃ্ষ্টি করে, তাও স্পষ্টভাবে বলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা এতই দুর্ভাগা জাতি যে স্বাধীন হওয়ার পরও এই জ্ঞানতাপস, জণপ্রেমিক, জাতির কল্যাণকামী অসাম্প্রদায়িক মানুষটির পরামর্শ ও সতর্কবাণী উপেক্ষা করে তিনটি নয়, আজ চারটি শিক্ষাব্যবস্থা জারি রেখেছি। শহীদুল্লাহ-কথিত 'তিনটি  শিক্ষাপ্রণালী'র সঙ্গে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাদানের আরও একটি প্রণালী যুক্ত হয়ে গণ্ডগোলকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। 

স্বাধীনতার পর কোন সরকারই এর পরিবর্তনে বিন্দুমাত্র আন্তরিক ভূমিকা তো দূরের কথা, শহীদুল্লাহর পরামর্শ ও সতর্কতাকে কাঁচকলা দেখিয়ে তা আগের শিক্ষাব্যবস্থাকে যেমন জারি রেখেছেন, তেমনি সেই ব্যবস্থার মানকেও নিয়ে গেছেন রসাতলে। আর মাদ্রাসা শিক্ষাক্রমে সরকার বাহাদুর  উল্লেখযোগ্য কোনও পরিবর্তন তো আনতে পারেনই নি, উল্টো মাদ্রাসার হুজুরদের সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল  দাবির কাছে মাথানত করে সাধারণ শিক্ষাক্রম থেকে অসাম্প্রাদায়িক ও প্রগতিশীল লেখকদের অগ্রসর চিন্তার  বিভিন্ন লেখাকে বাদ দিয়েছেন।  

শহীদুল্লাহ-কথিত  'অনৈক্য' কিভাবে সাধিত হচ্ছে তার নমুনা আজ আমরা  নানান ধরনের হিংসা, অবজ্ঞা, সংঘর্ষের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা জাতি ধর্মের ভেদাভেদ সম্পর্কে সহনশীলতা বাড়ায়। অর্থাৎ, অপর জাতি ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন শেখায়। এমনকি শ্রেণিবৈষম্যকেও ঘুচিয়ে দিতে শেখায়। কিন্তু আমাদের দেশে বাংলা, ইংরেজি আরবি ত্রিমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা জাতি, ধর্ম, সম্প্রদায় শ্রেণির প্রতি কেবল হিংসারই জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। এই হিংসা আরও বাড়ছে মোল্লা-মাওলানাদের জাতি, ধর্ম সম্প্রদায়বিরোধী হিংসাত্মক ওয়াজের মাধ্যমে। পৃথিবীর অন্য দেশে এই রকম ত্রিমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নেই। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত কেউ কোনোভাবেই বাংলা আরবি শিক্ষায় শিক্ষিতজনকে জ্ঞানবুদ্ধি মর্যাদায় নিজের সমকক্ষ বলে মনে করে না। মনে করে ওরা অনাধুনিক, পশ্চাদপদ এবং নির্বোধ। অন্যদিকে বাংলা শিক্ষায় শিক্ষিত ছেলেটি মনে করে আরবি ইংরেজিতে শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা দেশের সংস্কৃতির প্রতি অশ্রদ্ধ, দেশটাকেও সে নিজের মনে করে না। এদিকে আরবিওয়ালারা ভাবে,  ইংরেজি বাংলা শিক্ষায়  শিক্ষিত লোকগুলো ইসলাম আল্লাহ সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ , অতএব এরা ভ্রান্ত। ফলে তাদের প্রতি এই আরবিওয়ালাদের দৃষ্টিভঙ্গী  ঘৃণার। ত্রিমুখী শিক্ষাব্যবস্থার বিষবৃক্ষ আমাদের মধ্যে বিভেদ ঘৃণার ফল ছড়িয়ে দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সৃষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকে আমরা ধর্মের তলোয়ারে বিভক্ত করে নিয়েছি। ফলে এটি এখন যতটা না অন্য সম্প্রদায়ের দেশ, তারচেয়ে ঢের বেশি মুসলমানদের দেশ। আমরা এখন আর গর্বের সঙ্গে বলতে পারি না এটি স্বাধীন বাঙালি জনগোষ্ঠীর দেশ। কিংবা যদি অযথা বিতর্ক এড়াতে চান, তাহলে অন্তত এভাবে বলতে পারিএটি বাংলাদেশিদের দেশ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা ধর্মনিরপেক্ষ  সাংস্কৃতিক আবহ থেকে বহু দূর সরে এসেছি। ধর্মনিরপেক্ষতার পতাকাটি এখন ধর্মীয় চাপাতিতে লেগে থাকা রক্ত মোছার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। 

শহীদুল্লাহর দূরদর্শী চিন্তাকে অনুসরণ করে যদি দেশটিকে একক কোনও শিক্ষাপ্রণালীতে বেঁধে দেওয়া যেত তাহলে এই ঘৃণা, বিভেদ আর হিংসা এড়িয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা যেত। ইসলামী ও  আরবী শিক্ষায় যদি কারও আগ্রহ থাকে তাহলে সেটাতো কোন ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সেই ‍জ্ঞানপিপাসা সে মেটাতে পারে ইসলামী শিক্ষা বিভাগের আওতায়।  ইংরেজি বিষয়ে আগ্রহীরা তাদের তৃষ্ণা মেটাতে পারবে  বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ' ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য ' বিভাগে। ভাষাভিত্তিক ও ধর্মভিত্তিক নানামুখী শিক্ষা জাতিকে  একক জাতিসত্তার ধারণার বিরুদ্ধেও দাঁড় করিয়ে দেয় পরোক্ষভাবে। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত যে-ছাত্রটি নিজেকে বাঙালি ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, মাদ্রাসার ছাত্রটি শুধু বাঙালি পরিচয়ে তৃপ্ত হতে চাইবে না; সে প্রধানত এবং প্রথমত, হয়তো শুধুই মুসলমান ভাবতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। এমনকি  এটা ভাবাও আজ অসম্ভব নয় যে দেশব্যাপী মাদ্রাসার বিস্তার এবং মোল্লাদের মাধ্যমে ধর্মীয় বিশ্বাসের আধিপত্যের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীটিও দেশের সামাজিক সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ফলে হয়তো এখন আর শুধু 'বাঙালি' ভাবতে সাহস পায় না, তাকে হয়তো বলতে হয় 'বাঙালি মুসলমান'।  গত দশ বছরে বাঙালির পরিচয়  কিভাবে বিবর্তিত হয়েছে  তার ইতিহাস আমরা জানি। এর জন্য অশিক্ষা ও কুশিক্ষাই প্রধানত দায়ী। আর এই অশিক্ষা ও কুশিক্ষার  উৎস এই  'অনৈক্য' ‍সৃষ্টিকারী  বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা্ যা শহীদুল্লাহর ভাষায় 'হাস্যকর ও লজ্জাকর'। এবং তা একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধীও, কেননা দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেয়া হয়েছিল এই বলে যে 'বাংলা হিন্দু , বাংলা খৃস্টান, বাংলার  বৌদ্ধ,বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালী।' বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা এক অর্থে এই ঐক্যেরও বিরোধী অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। একক শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন না করা পর্যন্ত নানান ধরনের বিভেদ ও বিরোধের নিষ্পত্তি করা অসম্ভব।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক