স্বাধীনতার ৫০ বছর: কোথায় হারিয়ে গেল স্প্রিন্টের সোনালী সেদিন!

নাজমুল হক তপন
Published : 23 April 2021, 02:25 AM
Updated : 23 April 2021, 02:25 AM

'কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই …', মান্না দের কালজয়ী এই গানটির সঙ্গে বেশ সাদৃশ্য আছে সাফ (এখন সাউথ এশিয়া) গেমস স্প্রিন্টে বাংলাদেশের সোনাজয়ীদের বর্তমান অবস্থা। বিমল নিউ ইয়র্কে, দুই আলম (শাহ আলম ও মাহবুব আলম) ঘুমিয়ে আছে কবরে। নেই তারা আজ কোন খবরে!

দেশের অ্যাথলেটিক্স ধুঁকছে। দীর্ঘদিন ধরে। অনেকেই আসছে-যাচ্ছে, কিন্তু দাগ কাটতে পারছে না। অ্যাথলেটিক্সের সেই সোনালী দিনগুলো আজ কোথায় যে হারিয়ে গেল, তার খোঁজ খবর নেওয়ারও যেন কেউ নেই। সবকিছু পড়ে আছে যেন অযত্ন, অবহেলায়।

'একদা আমাদেরও দ্রুততম মানব ছিল', 'উপমহাদেশ স্প্রিন্টে আমরাও সেরা ছিলাম'- সে পুরানো সোনালী মুহূর্তগুলো স্মরণ করে কফি হাউজের গানের মতই স্মৃতি সম্বল করে দিন কাটানোটাই বোধকরি আমাদের নিয়তি নির্দিষ্ট। এ ঘোরপাক থেকে বেরিয়ে আসার পথটা জানা নেই। কিংবা জানতে চাওয়ার চেষ্টাও নেই।

১৯৮৪ সাল। কাঠামান্ডুতে প্রথম সাফ গেমস। গেমসের মুল আকর্ষণ অ্যাথলেটিক্স। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে ১০০ মিটার স্প্রিন্ট। দক্ষিণ এশিয়ার অলিম্পিকখ্যাত এ আসরে ভারত, শ্রীলঙ্কার বাঘা-বাঘা স্প্রিন্টারদের পেছনে ফেলে বাংলাদেশের দৌড়বিদরা অভাবনীয় কিছু করে ফেলবে, অতি স্বপ্নবাজের পক্ষেও এমনটা ভাবা ছিল কঠিন। কিন্তু কঠিনকেই বাস্তবে রূপ দিলেন স্প্রিন্টাররা। ১০০ মিটার স্প্রিন্টে ফটো ফিনিশে 'দ্রুততম মানব' হতে পারলেন না আফতাব মোল্লা। তবে ১০০ মিটার রিলেতে সোনা জিতল বাংলাদেশ। চার নায়ক ছিলেন- আফতাব মোল্লা, সাইদুর রহমান ডন, মুজিবর রহমান মল্লিক ও শাহ আলম।

পরের বছরই দক্ষিণ এশিয়ার 'দ্রুততম মানব' হতে না পারার আক্ষেপ ভুলিয়ে দিলেন শাহ আলম। ১৯৮৫ সাফ গেমসের ঢাকা আসরে নতুন রেকর্ড গড়ে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে জিতলেন স্বর্ণপদক। আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন আদিল সুমনওয়ালার কাছ থেকে কেড়ে নিলেন 'দ্রুততম মানব' খেতাব। মুঠোভরে পাওয়ার আনন্দে ভাসল দেশের অ্যাথলেটিক্স।

এখানেই থেমে থাকেননি শাহ আলম। ১৯৮৭ সালে সাফ গেমসের কলকাতা আসরেও ধরে রাখলেন শ্রেষ্ঠত্ব। গড়লেন নতুন রেকর্ড (১০.৭৯ সেকেন্ড, আগের রেকর্ড ছিল ১০.৮০ সেকেন্ড)। উড়ল দেশের বিজয়কেতন। পর-পর দুই বার ১০০মিটার স্প্রিন্টে সোনার হাসি-এ যেন রূপকথার গল্প! এরপরই শুরু ট্র্যাজেডি।

১৯৮৯ সালে ইসলামাবাবাদ পরের আসরে ব্রোঞ্জ পেলেন শাহ আলম। এই 'শোককে' শক্তিতে পরিণত করার জন্য নিজেকে তৈরি করছিলেন ১৯৯০ সালের বেইজিং এশিয়ান গেমস সামনে রেখে। এরই মধ্যে কয়েকদিনের ছুটিতে যান গ্রামের বাড়িতে। ১৯৯০ সালের ২৯ মে। নিজের মোটরবাইকে করে গ্রামের বাড়ি সাহেবনগর (জেলা-মেহেরপুর, থানা গাংনী) থেকে রওনা দিয়েছিলেন ঢাকার উদ্দেশ্যে। মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে পাবনার কাশিনাথপুরে। ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারান বাংলাদেশ ইতিহাস সেরা এই অ্যাথলিট। মাত্র তিরিশেই নিভে যায় সাফ গেমসে দু দুবারের দ্রুত মানবের জীবন প্রদীপ। দেশের অ্যাথলেটিক্সের আকাশ থেকে চিরদিনের জন্য ঝরে গেল উজ্জ্বল তারাটি।

এ দেশের অনিরাপদ সড়কের আরেক বলি স্প্রিন্টার মাহবুব আলম। এবারেও ঘাতক ট্রাক। ১৯৯৫ সালে মাদ্রাজ (বর্তমানে চেন্নাই) গেমসে ২০০ মিটার দৌড়ে অর্জন করেন দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব। ১৯৯৯ এর আসরে ফটোফিনিশে পারেননি স্বর্ণ জিততে। ২০১০ সালে মাইক্রোবাসে করে কুমিল্লা থেকে ঢাকা ফেরার পথে কাঁচপুরের কাছে ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় মাইক্রোবাসটির। মাত্র ৩৮ বছর বয়স সড়কে খরচের খাতায় পড়ে গেলেন মাহবুব। চিরসমাপ্তি ঘটল আরেকটি অধ্যায়ের।

শাহ আলমের পর মাহবুব আর বিমল চন্দ্র তরফদারের হাত ধরে স্প্রিন্টে সেরা সময়ের স্বাদ পাওয়া শুরু করেছিল দেশের ক্রীড়াপ্রেমীরা। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই দক্ষিণ এশিয়ার 'দ্রুততম মানব'-এর মুকুট জয়ের কৃতিত্ব দেখান বিমল। ১৯৯৩ সালের ঢাকা আসরে ১০০মিটার স্প্রিন্টে গড়েন নতুন রেকর্ডও (১০.৬১ সেকেন্ড)। ফিরিয়ে আনেন দক্ষিণ এশিয়ার 'দ্রুততম মানব'-এর হারানো মুকুট।

নতুন স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করল সবাই। বিমলকে ঘিরে আরও বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করল দেশের মানুষ। কিন্তু আবারও বিনা মেঘে বজ্রপাত! এবারের দুর্ঘটনা মনস্তাত্বিক (!)। আথলেটিক্সে দেশে কোন ক্যারিয়ার নাই- এ মানসিক ভার নিতে পারেননি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের ছাত্র বিমল। ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা চাইলেও মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারলেন না। উচ্চতর ট্রেনিংয়ের জন্য তাকে বিদেশে পাঠানোর কথা, তাও আলোর মুখ দেখছে না। এরই মধ্যে এসে গেল আটলান্টা অলিম্পিক গেমস (১৯৯৮)। দলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র গেলেন বিমল। কিন্তু ফিরলেন না। অলিম্পিক দলের সঙ্গে না ফেরায় তাকে বহিষ্কার করল অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন।

দেশের হয়ে বড় অর্জনের হাতছানি পেছনে ফেলে বিমল বেছে নিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নিশ্চিত-নির্ভার জীবন। সেই থেকে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারের দেশের বাসিন্দা তিনি। পরিবার নিয়ে থাকেন নিউ ইয়র্কে। 

দেশ সেরা তিন স্প্রিন্টারের দুজন নাই, আর একজন থেকেও নাই। মার্কিন মুলুকে বসে বিমল দেখেন এ সময়ে বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্সের দুর্দিন। তার খোঁজ কেউ না রাখলেও দেশ সম্পর্কে খোঁজ খবর ভালই রাখেন এ সাফ স্বর্ণজয়ী স্প্রিন্টার। মেসেঞ্জারে বেশ একটা লম্বা সময় কথা হল বিমলের। কথা বললেন পরিষ্কার বাংলায়। পরিবারে বাংলায় কথা বলাটা ধরে রেখেছেন বলেও জানালেন, "আমার বড় মেয়ের বয়স ১৩ আর ছোট মেয়ের বয়স ৮। দুজনই বাংলায় কথা বলতে পারে। যদিও লিখতে পারে না। আমরা বাসায় বাংলাতেই কথা বলি।"

বিমল জীবনসঙ্গিনী করেছেন তারই এলাকা সাভার পাল পাড়ার মেয়ে অঞ্চিতাকে। বিমল সাভারের ধামরাইয়ের ছেলে। পারিবারিকভাবে বিয়েটা হয় ২০০৪ সালে। সাফ গেমসে স্বর্ণ জয়ের ১৪ বছর পরে। বিয়ে নিয়ে বিমল দিলেন মজার এক তথ্য, "আমি যে সাফে স্বর্ণজয়ী এটা আমার ওয়াইফ জানত না। তবে শ্বশুর জানত।"

অনেক কিছুর মতই তারকাখ্যাতিও খুব বেশিদিন উপভোগ করতে পারেননি বিমল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনও ছিল আড্ডাহীন-নিরাবেগ, "বিকেএসপি থেকে পড়াশুনা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছিলাম। দু বছর পড়েছিলাম। ওই সময় ছেলেদের সঙ্গে মেয়েরাও পরিচিত হতে চাইত। বিশেষ করে ভার্সিটির বাসে। তবে ভার্সিটিতে আড্ডা মারার জন্য খুব একটা সময় বের করতে পারিনি। প্র্যাকটিসের বিষয় ছিল। ক্লাস শেষ হলেই ছুটতে হত।"

মনোবিজ্ঞানে ভর্তি হওয়া প্রসঙ্গেও বললেন অনেক কথা। সেখানেও উঠে এলো 'পড়া বিদ্যা নিজের উপর প্রয়োগ' করতে না পারার ব্যর্থতাও, "আমাদের সময়ে বিকেএসপির পরিচালক ছিলেন ফারকুল ইসলাম। উনি ছিলেন সাইকোলজির ছাত্র। উনার একটা প্রভাব তো ছিলই। আর তাছাড়া মনে হয়েছিল, স্পোর্টস সাইকোলজিস্টদের ভবিষ্যত ভাল। খেয়াল করবেন, স্পোর্টস সাইকোলজি কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্নায়ুর চাপ ধরে রাখা, ভালভাবে ঘুমানোর জন্য, চাপ সামলানোর জন্য মনোবিজ্ঞানীদের সহায়তা একজন স্পোর্টসম্যানের জন্য খুবই দরকারি। যদিও শেষপর্যন্ত কিছুই হলো না। যুক্তরাষ্ট্রেই থেকে গেলাম।"

ওই সময়ের কিছু ঘটনার প্রভাবে আসলে ভেতরে ভেতরে ভীষণ মুষড়ে পড়েছিলেন বিমল। বিশেষ করে বিদেশে ট্রেনিংয়ে পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে। তিনি বলেন, "দেশে থাকতে উচ্চতর ট্রেনিংয়ের জন্য আমাকে বিদেশে পাঠানোর কথা ছিল। এ নিয়ে আমি ভীষণভাবে উদ্দীপ্ত ছিলাম। কিন্তু অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলেও আমাকে পাঠানো হয়নি। ওই সময় বিদেশে পাঠানো হলে, হয়ত আমি দেশেই থেকে যেতাম, আর সবকিছুই অন্যরকম হত।" যোগ করলেন, "ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে মন দিয়ে কিছু করাটা খুবই কঠিন। এই যে, এখন বাংলাদেশে সবাই ক্রিকেট খেলতে চায়, কারণ ক্রিকেটে ক্যারিয়ার আছে। আর একই কারণে অ্যাথলেটিক্সে সেভাবে ছেলে/মেয়েরা আসছে না। আমাদের কিংবা তার আগের সময়ে ঘরোয়া আসরেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হত। এখন হয় না।"

ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রসঙ্গে আর একটা ঘটনার কথাও জানালেন বিমল, "ভারতের বিখ্যাত ক্রীড়া বিজ্ঞানী কুন্তল রায় আমার টিস্যু ও অন্যান্য সবকিছু পরীক্ষা করে বলেছিলেন, প্রথম ৬০ মিটার আমি কিংবদন্তীর স্প্রিন্টার কার্ল লুইস মানের স্প্রিন্টার। কিন্তু পরের ৪০ মিটারে আমার শরীরের উপরের অংশ আর নীচের অংশের ভারসাম্য থাকে না। আর তাতে আমি মন্থর হয়ে পড়ি। আমার গতি কমে যায়। ওই ৪০ মিটার নিয়ে কাজ করার জন্য আমাকে বিদেশে পাঠানোর কথাও ছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ আর নেওয়া হয়নি।"

স্প্রিন্টে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ সাফল্য পাওয়াটা যে একটা স্বচ্ছল জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, তার সেরা দৃষ্টান্ত বোধকরি দুই আলম পরিবার। তিন মেয়ে নিয়ে এখনও ভাসমান আফরোজা বেগম (মিসেস শাহ আলম)। ছয় বছর হলো ক্যান্টনমেন্টের সরকারি কোয়ার্টার তাদের ছেড়ে দিতে হয়েছে। ঢাকার খরচ কুলিয়ে উঠতে পারছেন না বলে এখন বাসা ভাড়া নিয়ে আছেন উপজেলা শহর গাংনীতে। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়েটি মৌসুমী আক্তার নিওরো প্যাশেন্ট। তিন বোনের সবার ছোট একমাত্র ছেলে মামুনুর রশিদ। বিবিএ শেষ করে চাকরি করছেন। বাবা শাহ আলম মারা যাওয়ার সময় মায়ের গর্ভে ছিলেন মামুন। ছেলের ছোট-খাটো চাকরি আর আউটার স্টেডিয়ামে বরাদ্দ পাওয়া একটা দোকান, এ নিয়েই সংসারযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন আফরোজা বেগম।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে দোকানের ভাড়াও এখন অনিয়মিত। একটা সময় অনেক প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলেন, কিন্তু সবই যে ছিল কথার কথা সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন আফরোজা বেগম। বললেন, "২০১৫ সালে আমাদের কোয়ার্টার ছেড়ে দিতে বলা হল। ভাড়া বাসায় উঠলাম। আউটার স্টেডিয়ামে দোকান ভাড়া বাবদ পাই ১২ হাজার টাকা। এর মধ্যে বড় মেয়ের বিয়েতে অনেক খরচ হয়ে গেল। এদিকে ছোট মেয়েটাও অসুস্থ। ওর বাবা মারা যাওয়ার সময় মেয়ের বয়স ছিল দু বছর। কোনরকমে চালিয়ে নিচ্ছিলাম। কিন্তু ঢাকার খরচ কুলিয়ে উঠতে পারছিলাম না। এদিকে শশুর বাড়িতেও তেমন ঘরবাড়ি নাই। তাই গাংনীতে বাসা ভাড়া করে আছি।"

এক বুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আরও যোগ করলেন, "ছেলে একটা ছোটখাটো চাকরি করে। এ অবস্থায় পুরো পরিবারসহ ঢাকায় থাকাটা আমাদের জন্য কঠিন। কোয়ার্টার থেকে যেন নামিয়ে দেওয়া না হয়, এর জন্য অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছি, কিন্তু কোন কাজের কাজ হয়নি।"

শুধু আর্থিক বিষয়ই নয়, দেশের জন্য বিরল সম্মান বয়ে আনা শাহ আলমের স্মৃতিকে মনে রাখার কোন দায়ও অনুভব করেনি সংশ্লিষ্টরা। আফরোজা বেগম বলেন, "পাবনায় যেখানে দুর্ঘটনা হয়েছিল, ওই সড়কটির নাম শাহ আলমের নামে করার কথা ছিল। মেহেরপুর স্টেডিয়ামের নামকরণও শাহ আলমের নামে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোন কিছ্ইু হয়নি। আমারও বয়স হয়েছে। আর দৌড়দৌড়ি করতে পারি না। মেয়েদের নিয়ে দুশ্চিন্তাও বাড়ছে। জানি না সামনের দিনগুলো কিভাবে যাবে?" স্মৃতিচিহ্নের চেয়ে যেন একাকী জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার তাড়নাই এখন বেশি আফরোজার।

যে অনিশ্চয়তার কথা তারুণ্যেই অনুভব করতে পেরেছিলেন বিমল, তার অগ্রজ স্প্রিন্টারদের পরিবারগুলো স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে সেই নিদারুণ সত্যটিই। মাহবুব আলমের পরিবারের গল্পটিও এর থেকে ভিন্ন কিছু নয়। একমাত্র মেয়ে শারজানাকে নিয়ে মিসেস মাহবুব স্বপ্না বেগম থাকেন তার বাবার বাড়িতে। জানালেন, "আউটার স্টেডিয়ামে একটা দোকান বরাদ্দ দেওয়ার কথা ছিল। এর জন্য অনেক ঘোরাঘুরি করেছি কিন্তু কোন লাভ হয়নি। মাহবুবের নামে কিশোরগঞ্জ জেলা স্টেডিয়ামের নামকরণ করার কথা ছিল। সেটাও হয়নি। এ নিয়ে আর কোন আলোচনা শুনিনা। সব বাদ দিয়ে এখন আমার একমাত্র চিন্তা মেয়েকে নিয়ে। মেয়ের বিয়ের চেষ্টায় আছি।"

কেন পড়াশুনা চালিয়ে নিচ্ছেন না, প্রশ্নের জবাবে যা বললেন, শুধু অসহায়ের মতো শুনে গেলাম, "আমি যে কি অবস্থায় আছি, সেটা আমিই জানি। আসলে যার অবস্থা, সেই বোঝে। আর কেউ বোঝে না।" মেয়ে শারজানাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস নেই স্বপ্না বেগমের। শারজানা এবার বাণিজ্য বিভাগ থেকে এইসএসসি পাস করেছে। বিয়ে দিয়ে মেয়েকে থিতু দেখতে চাইছেন স্বপ্না বেগম; আপাতত স্বপ্ন তার এতটুকুই! 

দেশের হয়ে কোন পুরস্কার বা স্বীকৃতি পাননি বিমল। আগেই বলেছি, মেসেঞ্জারে একটা লম্বা সময় আড্ডা দিয়েছি এ স্বর্ণজয়ীর সঙ্গে। প্রাণবন্ত এই আড্ডায় সারাক্ষণই হাসতে হাসতে কথা বলেছেন বিমল। তার স্ত্রীর নাম অঞ্চিতা। এই অঞ্চিতা শব্দের অর্থ জানেন না, এর অর্থটা জেনে নিয়ে স্ত্রীকে সারপ্রাইজ দেবেন, এমন প্রতিশ্রুতিও দিলেন দক্ষিণ এশিয়ার সাবেক এই দ্রুততম মানব।

কথা উঠল এই সিরিজের বিষয়গুলো নিয়েও। জানতে চাইলেন, "স্বাধীনতার ৫০ বছরে ক্রীড়াঙ্গনে দেশের ৫০ গৌরবে নিশ্চয়ই দেশের ক্রিকেটের টপিকই বেশি রাখবেন তাই না?" উত্তর দিলাম, "হ্যাঁ ক্রিকেটই বেশি থাকবে। সব খেলা মিলিয়ে ৩০টা আর বাকি ২০টা ক্রিকেট নিয়ে।" কথা শেষ না হতেই কেড়ে নিয়ে বললেন, "দেখছেন, ঠিকই পক্ষপাতিত্ব করলেন।" বলেই প্রাণখোলা হো হো করে হেসে বললেন, "আরে জাস্ট কিডিং। ক্রিকেটের অর্জন বেশি তাই ক্রিকেট বেশি থাকাটাই তো স্বাভাবিক।"

বিমলের পর দক্ষিণ এশিয়া গেমসে অ্যাথলেটিক্স থেকে সর্বশেষ স্বর্ণটি এসেছে ২০০৬ সালে। সেবার কলম্বো গেমসে ১১০ মিটার হার্ডলসে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন মাহফিজুর রহমান মিঠু। আর বিমলের পর গত ২৮ বছরে 'দ্রুততম মানব' খেতাব ফিরিয়ে আনতে পারেনি কেউ!

স্প্রিন্ট তথা অ্যাথলেটিক্সের হারানো সুরের স্মৃতি নিয়েই আমরা কাটাচ্ছি দশকের পর দশক। অ্যাথলেটিক্স শুধু অতীতের সাক্ষী 'কফি হাউজ' হয়েই আছে, সাফল্যের আড্ডাটা সেখানে আর নেই। 

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক