Published : 10 May 2020, 04:18 PM
করোনাভাইরাসের সংক্রমণকালে হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার কথাটি বেশ আলোচিত। কফ এটিকেট বা কাশির শিষ্টাচার হলো মুখ ঢেকে হাঁচি-কাশি দেওয়া। অর্থাৎ, হাঁচি-কাশির মাধ্যমে আপনার শরীরের রোগজীবাণু বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই হাঁচি-কাশির সময় আপনার নাক-মুখ ঢেকে ফেলতে হবে। যাতে করে আপনার নাক-কিংবা মুখ থেকে বের হওয়া ক্ষুদ্র ড্রপলেট বা তরল-কণা অন্য কারো শরীরে, বাতাসে বা মাটিতে ছড়িয়ে না পড়ে। এর মাধ্যমে জীবাণুও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই হাঁচি-কাশি দিতে হলে কনুই ভাঁজ করে নাক বা মুখ ঢাকার চেষ্টা করতে হবে। এরপর হাত বা কনুই সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। সবচেয়ে ভাল হয়, টিস্যু দিয়ে মুখ ঢেকে হাঁচি বা কাশি দেওয়া। এরপর সেই টিস্যুটাকে ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দেওয়া এবং হাত সাবান দিয়ে পরিষ্কার করা।
করোনা প্রতিরোধে নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, নাক-মুখ-চোখে হাত না দেওয়ার কথা শুনতে শুনতে আমাদের কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। একই সঙ্গে যেখানে-সেখানে কফ-থুতু না ফেলা, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলা, ভিড় এড়িয়ে চলা, মাস্ক ব্যবহারের নির্দেশনাও আমাদের সবার মুখস্ত। কিন্তু তারপরও কি আমরা এসব নিয়ম পালন করছি? না, বেশিরভাগ মানুষই তা পালন করছি না। এমনকি 'এই ভাইরাসটি নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হবেন না, সতর্ক ও সচেতন হোন' এই নির্দেশনাটি অজস্রবার প্রচার করার পরও আমরা তা মানছি না। করোনাভাইরাস বিষয়ে সচেতন হয়ে সঠিক আচরণ করাটাই হচ্ছে 'করোনা-শিষ্টাচার'। এই শিষ্টাচার পালন করাটাই এখন আমাদের সমাজে অত্যন্ত জরুরি।
সম্প্রতি আমার এক আত্মীয় ভয়ানক উদ্বিগ্ন হয়ে আমায় ফোন করে বললেন: আমাদের পাড়ায় তিনটে গলি বাদে এক জনের পজ়িটিভ বেরিয়েছে, কী হবে! অর্থাৎ মারণ-ভাইরাস দুয়ারে এসে পড়ল, এবার বুঝি তারও আর নিস্তার নেই! করোনাভাইরাস আক্রান্তরা নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন, এমনকি ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও হেনস্থা হচ্ছেন। কোনও এলাকায় কোভিড-১৯'এর চিকিৎসাকেন্দ্র বা কোয়ারেন্টিন সেন্টার খুলতে গেলে স্থানীয় মানুষ তেড়ে আসছেন। এমনকি করোনাভাইরাস সন্দেহযুক্ত মৃতদেহ সৎকার করতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলিও জ্বর, হাঁচি-কাশি বা কোনও 'কোভিড সন্দেহযুক্ত' লক্ষণের রোগী দেখলেই বেঁকে বসছে (কারণ কোভিড-ছোঁয়া থাকলেই হাসপাতাল দু-চার সপ্তাহের জন্য 'সিল' হয়ে যাবে)। সবচেয়ে হতাশাজনক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম- 'অমুক অঞ্চলে করোনার হানা', যেন বাঘ-সিংহ আসছে! অথচ এমন হওয়ার প্রয়োজন ছিল না। শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে এই ভাইরাস ভয়াবহ কিছু নয়।
তবে কথা পরিষ্কার করে বলা ভাল, এটা আবার কেউ ভেবে বসবেন না যে করোনাভাইরাস সংক্রমণে কোনও বিপদ বা ভয় নেই । কিন্তু আবার করোনাভাইরাস মানেই অবধারিত মৃত্যু, এমনটাও নয়। প্রায় ৮০% করোনাভাইরাস পজ়িটিভ রোগীর শরীরে কোনও রোগ-লক্ষণ থাকে না বা থাকলেও সামান্য। প্রায় ১৫%-এর শরীরে রোগ-লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং তা সাধারণ সর্দিকাশি বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো। ৫-৭% রোগীর ক্ষেত্রে অসুখের বাড়াবাড়ি হয়, হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। করোনাভাইরাস সংক্রমণে মৃত্যুর হার এখনও ২-৩%। এবং মৃতরা সাধারণত শারীরিক ভাবে দুর্বল বা অন্য কোনো ব্যাধিতে আক্রান্ত, বিপর্যস্ত (তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইট)। অর্থাৎ একজন সুস্থ সবল লোকের করোনাভাইরাস সংক্রমণ হলেও, বড় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কম। কেউ যদি বলেন, সামান্য হলেও এই ঝুঁকিই বা নেব কেন, নিজের প্রাণ বলে কথা! সে ক্ষেত্রেও দুটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।
প্রথমত, এক মাস বা দুমাস 'লকডাউন' করে ঘরে বসে থাকলেই ভাইরাস দূর হবে না। বরং এটা জেনে রাখা ভাল যে, এই ভাইরাস অন্তত ৬ থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত আমাদের মধ্যে থাকবে বা আরও বেশি। এবং এই ভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ধাক্কা (সেকেন্ড ওয়েভ) অনেক বেশি জোরালো বা ঘাতক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তা হলে কত দিন ঘরে বসে থাকবেন? এই ভাইরাসকে সঙ্গে নিয়েই চলার উপায় ভাবতে হবে।
দ্বিতীয়ত, এই দেশে আমরা সকলে এর চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকি নিয়েই প্রতি দিন রাস্তাঘাটে চলাফেরা করি। আমাদের দৈনিক সড়ক দুর্ঘটনায়ও তো বহু লোক মারা যায়। তাই বলে কি আমরা রাস্তায় হাঁটি না? এই বর্ষা মৌসুমে আমাদের দেশে বজ্রপাতেও তো বহু লোকের প্রাণ যায়। ক্যান্সার, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হার্ট-অ্যাটাকে মৃত্যুর পরিসংখ্যান নাই বা উল্লেখ করলাম। কাজেই আমাদের হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। আবার আগের মতো 'যা হয় হবে' বলে রাস্তায় বেড়িয়ে ধেই-ধেই নাচারও সুযোগ নেই। সঠিক তথ্য ও জ্ঞান অর্জন করতে হবে। নিয়ম মেনে চলতে হবে। সতর্ক হতে হবে। আমাদের সমস্যা হলো, আমরা কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাসকে 'অতি-ভয়ঙ্কর' এক দৈত্য বানিয়ে ফেলেছি। বৈজ্ঞানিক তথ্যের বাইরে মনগড়া সব তথ্য বিলানোর ক্ষেত্রে উৎসাহী হয়েছি। অন্যদিকে আমজনতা, তারা যথাযথ তথ্য ও জ্ঞান বিষয়ে ততটা আগ্রহী নয়, যতটা হুজুগে। এই হুজুগে শিক্ষিতরাও কম নাচছেন না। যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে খুব কম মানুষই পরিচালিত হয়। গুজব আর অপতথ্যের আগুনে ধুনো দিতেই ব্যস্ত সবাই!
অতিরিক্ত তথ্য প্রচার, আলোচনা ও বিশ্লেষণও কখনও কখনও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রমরমার যুগে সেটা যে কোন ভয়াবহ স্তরে যেতে পারে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। এখানে সকলেই বিশেষজ্ঞ। সকলেই নিজের হিসেবে জগৎ জুড়ে বার্তা (লেখা/অডিও/ভিডিও) পাঠাচ্ছেন বা বিনিময় করছেন। প্রচুর ভুল এবং উদ্দেশ্যমূলক প্রচার, রাজনৈতিক অভিসন্ধি ইত্যাদিও কাজ করছে করোনাকে ঘিরে। অর্থাৎ, মানুষের বিভ্রান্তি বেড়েই চলেছে। সংবাদ মাধ্যমেও এখন করোনাভাইরাস ছাড়া আজ আর কোনও খবর নেই। বিশেষত টিভির খবরে করোনাভাইরাস তো 'মহাতারকা'-র মর্যাদা পেয়ে গেছে!
আসলে করোনাভাইরাস এখন আমাদের জীবনে 'নতুন বাস্তবতা' হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতাকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের পথ চলতে হবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম দিয়ে, যাকে বলা যায় 'করোনা-শিষ্টাচার', এই শিষ্টাচার মেনেই একে পরাস্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
আমাদের দেশে সম্প্রতি কিছু চিকিৎসা-চিত্র গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যা উদ্বেগজনক। সিএনজি-চালকরা রোগীকে রাস্তায় ফেলে পালাচ্ছেন। তীব্র শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত একাধিক রোগী নানা হাসপাতালে প্রত্যাখাত হচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালে অক্সিজেন ও অন্যান্য অত্যাবশ্যক চিকিৎসা-সামগ্রীর অভাবে রোগীরা মুমূর্ষু হয়ে পড়ছেন। কোভিড-১৯ পরীক্ষার ফল আসতে দেরি হচ্ছে বলেও বহু রোগী বিপন্ন। মহামারীর আতঙ্কের ওপর চিকিৎসাহীনতার আশঙ্কা যোগ হয়ে এক দুর্বিষহ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ বিভ্রান্তি, সঠিক তথ্যের অভাব। বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে নানা ঘটনার যে বিবরণ মিলছে, তাতে আশঙ্কা হয়, করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা থাকলে কী কী আচরণবিধি পালনীয়, সে সম্পর্কে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা আছে কিনা! অভিযোগে উঠেছে যে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে রোগী ভর্তি করছে না। সরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর লিখে দিলিই কেবল তারা রোগী ভর্তি করছে। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, এমন লিখিত অনুমতির প্রয়োজন নেই। পিপিই-প্রভৃতি সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করলে কোভিড-১৯ রোগীর পরিচর্যায় ঝুঁকি নেই। তারপরও কোথাও কোথাও স্বাস্থ্যকর্মীরা নাকি রোগীর পরিচর্যা করতে, এমনকি অ্যাম্বুল্যান্স থেকে রোগীকে নামাতে অস্বীকার করেছেন। অপর পক্ষে, বেশ কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হয়েছেন। সব মিলিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলার চিত্রটি প্রকট। এর ফলে হাসপাতালে হেনস্থার ভয়ে সংক্রমণের প্রথম পর্যায়ে রোগীর পরীক্ষা বা চিকিৎসা না করিয়ে ঘরে রাখবার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এতে রোগীর প্রাণ বিপন্ন হবে, সংক্রমণের প্রকোপ বাড়ারও আশঙ্কা রয়েছে। হাসপাতাল রোগীর জন্য সুরক্ষিত, এই আশ্বাস তৈরি করা জরুরি। বর্তমানে এর যথেষ্ট ঘাটতি আছে।
করোনাভাইরাস মহামারীর সামনে বিশ্বের সকল দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাই কঠিন পরীক্ষার মুখে। এক সঙ্গে বহু মানুষ সংক্রমিত হওয়ার কারণে এবং চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত ও বিপন্ন হওয়ায় চিকিৎসার জোগানে টান পড়েছে। কিন্তু সমাধানও কি নেই? অনেক দেশে এমন কি আমাদের প্রতিবেশী ভারতের কেরল রাজ্যে করোনাভাইরাস চিকিৎসায় বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে ব্যবহার করা হয়েছে। জাতীয় দুর্যাগ পরিস্থিতিতে বিশেষ নির্দেশ জারি করে বেসরকারি চিকিৎসাকর্মীদের কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণের কাজে লাগানো হয়েছে। কেরল সরকার আট শতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল চিহ্নিত করেছে কোভিড-১৯ মোকাবিলার জন্য। এ কাজে বেসরকারি হাসপাতালগুলোও স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে চিকিৎসার সমন্বয়ে সহায়তা করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে অযৌক্তিক ও অতিমাত্রায় করোনাভীতি এবং সরকারের পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাবের কারণে এ কাজটি করা হয়নি। ফলে বেসরকারি হাসপাতালগুলো এই মহামারীকালে অপ্রয়োজনীয় ইমারত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, মানুষের চিকিৎসাসেবায় কোনো রকম ভূমিকাই পালন করতে পারল না।
এক দিকে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী রাখবার মতো সরকারি অবকাঠামোর অপ্রতুলতা, অন্য দিকে সরকারি ও বেসরকারি সকল সম্পদের সমন্বিত ব্যবহার করার গুরুত্বপূর্ণ দিকটি অবহেলা করা হলো। করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, আগামী দিনগুলোতে তা উদ্বেগজনক পর্যায়ে উপনীত হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাবিধির অনুসরণ নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে সমন্বিত চিকিৎসার প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালকে সরকারি বিধির অধীনে আনলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ হতে পারে। মনে রাখতে হবে এই মহাসঙ্কটে রোগীর প্রাণরক্ষার এবং চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখবার কাজটিই প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।