Published : 24 Apr 2020, 09:17 PM
বর্তমান বিশ্বে নিরাপত্তার নামে সামরিক খাতে সর্বোচ্চ ব্যয় হয়। যদিও কোন কোন দেশের ক্ষেত্রে বলা হয় শিক্ষাখাতে তাদের বরাদ্দ সর্বোচ্চ, কিন্তু কৌশলে তাদের বরাদ্দ সামরিক খাতেই বেশি। এই সামরিক ব্যয় কোনভাবেই বিশ্বকে নিরাপদ করে না বরং মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে দিনেদিনে। বিশেষ করে পারমাণবিক গবেষণা ও পরীক্ষা বিশ্বকে মহামারীর চেয়ে হাজারো গুণ ভয়ংকর বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইতিহাস বলছে, বিগত ৩,৪০০ বছরের মধ্যে মানুষ কেবল ২৬৮ বছর ধরে শান্তিতে বসবাস করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত যুদ্ধে হতাহতের মোট সংখ্যা আনুমানিক ১৫০ মিলিয়ন থেকে এক বিলিয়ন।
২০২০ সালে তিন কোটি ২ লাখ ৭৭ হাজারেরও বেশি সদস্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীতে কর্মরত আছে বলে ইন্টারনেটে বিভিন্ন ওয়েবসাইট জানাচ্ছে । আধা-সামরিক ইউনিটগুলি এর অন্তর্ভুক্ত নয়। রিজার্ভ মিলিটারি এবং আধা সামরিক বাহিনীসহ মোট সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি সাড়ে ৫৫ লাখ। চীনে সর্বাধিক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে সারাবিশ্বে সশস্ত্র বাহিনীর মোট কর্মী ছিল প্রায় ২ কোটি ৭৪ লাখ ১৪ হাজার জন।
সারা বিশ্বে ভয়ঙ্কর অস্ত্র ও সামরিক প্রতিযোগিতার মাঝেও ২২/২৩টি দেশে কোনও নিয়মিত সামরিক বাহিনী নেই, দেশগুলো হল- অ্যান্ডোরা, কোস্টারিকা, ডোমিনিকা, সংযুক্ত রাষ্ট্র মাইক্রোনেশিয়া, গ্রেনাডা, আইসল্যান্ড, কিরিবাতি, লিখটেনস্টাইন, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, মরিশাস, মোনাকো, নাউরু অস্ট্রেলিয়া, পালাউ, পানামা, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট, গ্রেনাডাইন দ্বীপপুঞ্জ, সামোয়া, সলোমান দ্বীপপুঞ্জ, টুভালু, ভানুয়াতু ও ভ্যাটিকান সিটি।
বাংলাদেশের মত একটা উন্নয়নশীল দেশও ভয়ঙ্করভাবে সামরিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের তথ্যানুযায়ী ২০২০ সালে সামরিক শক্তির দিক দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৬তম স্থানে। এখানে দেশটির অবস্থানের উন্নতি হয়েছে। গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার এই অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৫০টির বেশি স্বতন্ত্র বিষয়কে বিবেচনা করেছে। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক, যৌক্তিক ক্ষমতা ও ভৌগলিক অবস্থানকেও বিবেচনায় রেখেছে তারা। ২০২০ সালে সামরিক ব্যয়ের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ৫৩তম স্থানে। সামরিক খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ৩,৮০০,০০০,০০০ ইউএস ডলার। সামরিক শক্তির দিক দিয়ে ইউরোপের অনেক দেশকে পিছনে ফেলেছে। কিন্তু সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে পড়া সেই দেশগুলো চিকিৎসা ব্যবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত।
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী | |
| সক্রিয় কর্মী | ২০৪,৫৯৬ |
| অতিরিক্ত কর্মী | ৬৩,৯০০ |
| মোতায়েনকৃত কর্মী | ৬,৪১৭ |
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া
অথচ জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের সেনাবাহিনী (People's Army) গঠনের কথা বলেছিলেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেছিলেন- সেনাবাহিনীকে তিনি বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতে পারবেন না। দেশ এবং জাতি গঠনে তাদেরকে কাজ করতে হবে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট সপরিবারে তাকে হত্যার পরের সরকারগুলো লজ্জাজনকভাবে সামারিক খাতে ব্যয় বাড়িয়েছে। সেই হিসেবে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়ের পরিমাণ খুবই কম।
বিশ্বের দশটি বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশসমূহ ২০১৮ সালে বিভিন্ন দেশ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি অস্ত্র আমদানি করেছে। স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইন্সটিটিউট (এসআইপিআরআই) এর ২০১৮ সালে আমদানিকৃত অস্ত্রের মূল্য নির্ধারণের ভিত্তিতে আর্মি টেকনোলজি ডটকম শীর্ষ দশটি অস্ত্র আমদানিকারী দেশগুলির তালিকা নিম্নরূপ:
২০১৮ সালে সৌদি আরবকে সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র, তারপর যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স। সৌদি আরব ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এফ-১৫, যুক্তরাজ্য থেকে টাইফুন মাল্টি-রোল ফাইটার আমদানি করেছিল। যুদ্ধ বিমানগুলো ক্রুজ মিসাইল এবং অন্যান্য যুদ্ধ উপকরণসহ সরবরাহ করা হয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়া তার অস্ত্র ব্যবস্থার উন্নতিতে মূলত সামুদ্রিক সি-৪০০০ এবং এয়ার-৬০০০ এর মতো প্রধান সামরিক উপকরণগুলো সংগ্রহ করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন এবং ফ্রান্স গত পাঁচ বছরে প্রধান রপ্তানিকারক হিসেবে অস্ট্রেলিয়াকে এগুলো রপ্তানি করেছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক হওয়া সত্ত্বেও চীন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশও বটে। ২০১৮ সালে রাশিয়া বেশিরভাগ অস্ত্র চীনকে সরবরাহ করেছে। যার মধ্যে প্রধানত ছিল ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যুদ্ধ বিমান এবং যুদ্ধজাহাজের ইঞ্জিন।
বিদেশি সংস্থাগুলির অস্ত্র সরবরাহে বিলম্বের কারণে ২০১৮ সালে ভারতের অস্ত্র আমদানি ৮৭ শতাংশ কমেছে। তা সত্ত্বেও, ভারতের আমদানি করা অস্ত্রের প্রধান সরবরাহকারী ছিল রাশিয়া, ২০১৪-১৮ সালে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সও ভারতে প্রধান অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ ছিল।
প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে মিশরের অস্ত্র আমদানি ২০১৮ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ২০১৭ সালের তুলনায় ৩৮ শতাংশ আমদানি মূল্য হ্রাস হওয়া সত্ত্বেও, মিশর ২০১৮ সালে মধ্য প্রাচ্যের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক ছিল।
২০১৮ সালে আলজেরিয়ার অস্ত্র আমদানি আগের বছরের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৪-১৮ সালে রাশিয়া তাদের অস্ত্র আমদানির ৬৬ শতাংশ সরবরাহ করেছে, তারপর চীন ১৩ শতাংশ এবং জার্মানি শতাংশ।
২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার অস্ত্র আমদানি ২৩ শতাংশবেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের বেশিরভাগ অস্ত্র সরবরাহ আসে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্য থেকে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা প্রোগ্রামগুলি তার প্রতিবেশি উত্তর কোরিয়ার যে কোনও সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য পরিচালিত হয়ে থাকে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেশিরভাগ অস্ত্র আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। দেশটির আমদানিকৃত অস্ত্রগুলি হল থার্ড মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ম্যাক্সপ্রো সাঁজোয়া কর্মী বাহক (APCs)।
প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ২০১৮ সালে কাতারের অস্ত্র আমদানি বিগত বছরের তুলনায় ২২ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৪-১৮ সালে কাতারের অস্ত্র আমদানির ৬৫ শতাংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহ করেছে, বাকিটা জার্মানি, ফ্রান্স, চীন এবং রাশিয়ার মতো দেশ থেকে এসেছে।
২০১৮ সালে পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানিতে মূলত বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, সাজোয়া যান ও নৌযান অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাকিস্তানের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ ছিল চীন।
বিশ্বের দশটি বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারী দেশগুলো ২০১৮ সালে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করেছে। আর্মি-টেকনোলজি ডটকম ২০১৮ সালে রফতানিকৃত অস্ত্রের মূল্যমানের ভিত্তিতে স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইন্সটিটিউটের (এসআইপিআরআই) উপরের তালিকাটি তৈরি করেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পেন্টাগনের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছেন, পেন্টাগনের উচিৎ প্রতিযোগিদের উপকরণের দিকে নজর দেওয়া। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসন সর্বশেষ জাহাজ ও যুদ্ধ বিমান কর্মসূচিগুলিতে বাড়তি তহবিল দিয়েছে। তবে প্রকৃত অর্থে যা হয়েছে তা হ'ল পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির জন্য অর্থায়ন। ২০২০ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা বিভাগ তার পারমাণবিক অস্ত্রাগারে অস্ত্র আধুনিকায়নের জন্য প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে। ২০২১ সালের জন্য, এই হিসাব ৪ বিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে মোট ২৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে, যা ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় পারমাণবিক সুরক্ষা প্রশাসন (এনএনএসএ), পারমাণবিক প্রযুক্তি বিকাশকারী শক্তি বিভাগের অংশ, ২০২০ সালের তুলনায় আরও ২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে চায়। একত্রে এর অর্থ দাঁড়ায় যে, ট্রাম্প প্রশাসন পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিতে ৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রস্তাব করেছে। সবকিছু একত্রে হিসেব করলে দেখা যাবে পারমাণবিক সাইটগুলো পরিষ্কার ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে দাঁড়াবে।
১৯৪২-১৯৪৫ এর ব্যয়ের উপাত্ত অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩.৩ ট্রিলিয়ন ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক কর্মসূচিতে ব্যয় একটি নির্ভরযোগ্য চিত্র প্রকাশ করে, যদিও সমস্ত পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত না। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত "পারমাণবিক নিরীক্ষণ" এ, স্টিফেন আই শোয়ার্জ দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪০ সাল থেকে তার পারমাণবিক অস্ত্রাগারের বিকাশ ও রক্ষণাবেক্ষণ বজায় রাখতে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এখন ৬,৪০০ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে ১৯৯০ এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্র আসলেই নতুন যুদ্ধবিমান বা বোমা তৈরি করেনি। ইউসিএস গ্লোবাল সিকিউরিটি প্রোগ্রামের সিনিয়র বিজ্ঞানী এবং সহ-পরিচালক ড. লিসবেথ গ্রনলন্ড বলেছেন, "সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পুরাতন বোমাগুলোর জীবনকাল বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের পুনর্নির্মাণ করেছে।" উদাহরণস্বরূপ, বি ৬১-১২ পারমাণবিক বোমাগুলির জন্য একটি জীবন-সম্প্রসারণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে যার জন্য প্রায় ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে।
১৯৪৫ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক যুদ্ধ প্রতিরোধ করতে ৭০,০০০ এরও বেশি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও মোতায়েন করেছে। প্রকৃতপক্ষে, পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই প্রয়াসে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে। যার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি হচ্ছে জাতির প্রতি খুব কম মনোযোগ দেওয়া হয়েছে।
১৯৬২ সালের সেই শ্বাসরুদ্ধকর ১৩ দিনের কথা অনেকেরই জানা। যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবাতে যুক্তরাষ্ট্রকে তাক করে মিসাইল স্থাপন করেছিল। আমেরিকা সোভিয়েত ইউনিয়নকে উস্কানি দিতে ইতালি এবং তুর্কিতে মিসাইল মোতায়েন করেছিল। তার ফলে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সাথে গোপন বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেন কিউবাতে মিসাইল মোতায়েনের। সে মিসাইল পূর্ব এবং দক্ষিণ আমেরিকার বেশিরভাগ অংশ কয়েক মিনিটে নিশ্চিহ্ন করার ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল। এতে কয়েক মিনিটে মিলিয়ন-মিলিয়ন মানুষের জীবন নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। এই আলোকে বিচার করলে কোনও পারমাণবিক বোমাই শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক না। যেমন সহায়ক ছিল না ১৯৪৫ সালে যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে আমেরিকা ৬ অগাস্ট হিরোশিমা ও ৯ অগাস্ট নাগাসাকিতে যে পারমাণবিক বোমা ফেলেছিল সেগুলো। তা মানবতার জন্য চরম অপমান বয়ে নিয়ে এসেছিল। অশান্তি সৃষ্টির সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট নজির তৈরি করেছিল বিশ্ব ইতিহাসে। লক্ষ লক্ষ শিশু ও নিরপরাধ মানুষ সেদিন প্রাণ দিয়েছিল যাদের কোন অপরাধই ছিল না। যে বোমার তেজস্ক্রিয়তার স্বীকার হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে অনেক শিশু অনেক মানুষ যার প্রভাব এখনও বিদ্যমান।
স্বস্তির বিষয় বিভিন্ন দেশ পাল্লা দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন করলেও তার ব্যবহার আর হয়নি কোন যুদ্ধক্ষেত্রে। ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র যে ৪টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছিল তার একটি এখনও অব্যবহৃত রয়ে গেছে।
একথা বলার অপেক্ষা রাখে না আমরা একটা পারমাণবিক বোমা মোতায়েন করে ভীতির সঞ্চার করতে পারি, কিন্তু শান্তি নিশ্চিত করতে পারি না। যেমন তুরস্ক, ইতালি ও কিউবায় আণবিক বোমা মোতায়েন করে শান্তি নিশ্চিত করা যায়নি। বরং সাধারণ মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ও সোভিয়েত নেতাদের কূটনৈতিক তৎপরতায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করা গেছে। কোন যুক্তিই পারমাণবিক বোমার প্রয়োজনীয়তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না। একটা মারণাস্ত্র কখনও শান্তির প্রতীক হতে পারে না। এখাতে সকল ব্যয় অথর্ব ও অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয়। একটি মারণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের হাতে থাকলে নিরাপদ আর উত্তর কোরিয়া বা ইরানের হাতে গেলে বিপদজনক, কেন? যুক্তরাষ্ট্র ফাটালে শান্তি ছড়িয়ে পড়বে আর ইরান ব্যবহার করলেই সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়বে, এটা কেমন বিচার? একটা পারমাণবিক বোমা শয়তান বা ফেরেশতা যেই ব্যবহার করুক না সেটা ধ্বংসই করবে, ধ্বংস ছাড়া অন্য কিছু না। এই আধুনিক বিশ্বে আমরা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে যে কোন সমস্যার সমাধান করতে পারি। তাহলে বিগত ৭৫ বছর ধরে কেন অহেতুক হাজার হাজার পারমাণবিক বোমা বানানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ? কেন এই অপ্রয়োজনীয় মারণাস্ত্রগুলো তৈরি করে তা নবায়ন ও রক্ষণা-বেক্ষণের জন্য প্রতি বছর বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হচ্ছে? এই অর্থ আমরা মানব কল্যাণে ব্যয় করলে নিপিড়ীত মানুষ উপকৃত হত। করোনাভাইরাস আক্রান্ত বর্তমান বিশ্ব আমাদেরকে জানিয়ে দিল এই মারণাস্ত্র না বরং সে অর্থ দিয়ে পর্যাপ্ত হাসপাতাল তৈরি করা ছিল কোটি কোটি গুণ বেশি জরুরী। নিচের পরিসংখ্যানটা আমাদের লজ্জায় দেবে।
একটা পারমাণবিক ডিভাইস বা বোমা তৈরিতে গড় ব্যয় হয় ৫ বিলিয়ন ডলার। এই অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ৫০০ শয্যার অত্যাধুনিক ৬ টিরও বেশী হাসপাতাল তৈরি করা সম্ভব। যে হাসপাতালে সব রকম চিকিৎসা দেওয়া যাবে। যুক্তরাষ্ট্রে এই হাসপাতাল বানাতে যে খরচ হবে অন্যদেশে এটা বানাতে আরও অনেক কম খরচ হবে। বাংলাদেশে এক তৃতীয়াংশও খরচ হবে না। একটা আণবিক বোমা দিয়ে আমরা কোরনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারছি না। আণবিক বোমা কোরনা ভাইরাসকে ধ্বংস করতে পারে না, পারে শুধু মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে। কত অসহায় আজ যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও ইতালি। এরা সবাই বিশ্বের প্রথম দশটা অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশের একটা কিন্তু এই দেশগুলোর ফ্রান্স ছাড়া অন্যগুলো হাসপাতালের শয্যা সংখ্যার দিক দিয়ে প্রথম দশটা দেশের মধ্যে নেই, নিম্নের পরিসংখ্যানে তা দেখা যাবে:
আধুনিক বিশ্বে আণবিক বোমার তো প্রশ্নই ওঠে না, পেশাদার সেনাবাহিনীরও কোন প্রয়োজন নেই। এখন প্রশ্ন উঠবে তাহলে একটা দেশের নিরাপত্তা বিধান কিভাবে হবে? সেজন্য তো আধা সামরিক বাহিনীই যথেষ্ঠ। আমরা যারা অস্ত্র উৎপাদন করছি এবং যেখানে-সেখানে তা বিক্রি করছি, তা যদি না করি তাহলে সন্ত্রাসীরা শক্তিশালী হতে পারবে না। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটা দেশ শত্রুর শত্রুকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছে, অথচ তারা ছিল সন্ত্রাসী দল। জার্মানিও এ দৌড়ে পিছিয়ে নেই। তারাও আইএসের মত সন্ত্রাসী দলকে অত্যাধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করেছে, যা নির্মিত হয়েছিল নুরেনবার্গের জলবন্দরের কাছে একটা কারখানায়। এব্যাপারে জার্মান টিভিতে একটা রিপোর্ট দেখানো হয়েছিল। এসবের আলোকে বলা যেতে পারে নিয়মিত সেনাবাহিনী অপ্রয়োজনীয়। অন্তত ২৩টি দেশ কোন নিয়মিত সেনাবাহিনী গঠন না করে সেটা প্রমাণ করেছে। সেনাবাহিনী প্রকৃতপক্ষে দেশ গঠনে বা নিরাপত্তায় কখনই বড় কোন ভূমিকা রাখেনি। শুধু অন্যের দেশ জোর-দখল করতে বা মিথ্যা আণবিক বোমা তৈরির অপবাদে একটা দেশের মধ্যে অবৈধ অনুপ্রবেশে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হয়েছে। ইরাক তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কিন্তু ইরাকের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো প্রমাণ করা যায়নি।
একটা দেশের যদি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক থাকে সেখানে সেনাবাহিনীকে প্রয়োজন হয় না দেশ রক্ষার জন্য। বিগত ৭০/৭৫ বছরে সে প্রয়োজন হয়নি। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ২৮টি দেশের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হচ্ছে না। এই সত্য বাংলাদেশের জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যথার্থ অনুধাবন করেছিলেন বিধায় তিনি সামরিক ব্যয় কমিয়েছিলেন। তিনি বাস্তবতা জানতেন যে, বাংলাদেশ তার সীমিত শক্তি দিয়ে ভারত বা বার্মার সাথে যুদ্ধে টিকবে না। সেখানে সেনাবাহিনীর মত অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় অপ্রয়োজনীয়। তাই তিনি কূটনৈতিক আচার-আচরণের দিকে জোর দিয়েছিলেন। তার ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ মাত্র ২ মাস ৮ দিন ক্ষমতা গ্রহণ করেই ভারতের সাথে এক ২৫ বছরের ঐতিহাসিক মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। এই চুক্তি সম্ভব হয়েছিল সেই সময়ে বিশ্বে তার ভাবমূর্তির কারণে। যদিও এই মৈত্রী চুক্তিকে ভারত বিদ্বেষী সমালোচকরা কটাক্ষ করেছে সর্বদাই কিন্তু তারা ক্ষমতায় থাকার সময় সেটা বাতিলও করেনি। আর এই চুক্তিতে বাংলাদেশ লাভবান হয়েছে ভারতের চেয়ে অনেকগুণ বেশি। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ভারতকে দিয়ে এই চুক্তি নবায়ন করানোর মত ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন নেতা বাংলাদেশে আর আসেননি। এই চুক্তির কারণে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রায় শূন্যের কোটায় চলে গিয়েছিল। সে অর্থ জনকল্যাণে ব্যয় করা গেছে।
স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইন্সটিটিউট (এসআইপিআরআই) এর নতুন তথ্য অনুসারে, ২০১৮ সালে বিশ্বের সামরিক ব্যয় ২০১৭ সালের তুলনায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮২২ বিলিয়ন ডলার। ২০১৮ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরব, ভারত এবং ফ্রান্স, একত্রে সামরিক ব্যয়ের পরিমাণ সমগ্র বিশ্বের সামরিক ব্যয়ের ৬০ শতাংশ ছিল।
এবারে স্বাস্থ্যব্যয়ের তালিকাটি দেখি-
উপরের তালিকা থেকে জানা যাচ্ছে বিশ্বের সুপার পাওয়ার পাঁচটি দেশ স্বাস্থ্যব্যয়ের দিক থেকে শীর্ষ দশের তালিকায় নেই। আর বিশ্বের প্রথম দশটা অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশের কেবল জার্মানি ছাড়া আর কোন দেশ উপরের তালিকায় নেই। কোভিড-১৯ থেকে বিশ্বনেতারা কী শিক্ষা নেবেন, পারমাণবিক অস্ত্র না স্বাস্থ্য খাত?
সকল পরিসংখ্যান ও প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে সকল দেশ অস্ত্র ক্রয় বা বিক্রয়ে শীর্ষে আছে তাদের স্বাস্থ্যসেবা শীর্ষে না। এক্ষেত্রে জার্মানি ব্যতিক্রম। হাসপাতালের শয্যা সংখ্যার দিক দিয়ে রাশিয়ার অবস্থান ভাল এবং দেশটার স্বাস্থ্যসেবা কমিউনিজমের সময় থেকে অত্যন্ত প্রশংসনীয়, যা তারা অব্যাহত রেখেছে। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় তাদের প্রস্তুতি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় যা খুব জরুরী সেই ভেন্টিলেটরের সংখ্যার দিক দিয়ে রাশিয়া জার্মানির সাথে যৌথভাবে শীর্ষ অবস্থানে আছে। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সাবেক এবং বর্তমান কমিউনিস্ট শাসিত দেশগুলো বেশি পারদর্শিতা দেখিয়েছে। যেমন: চীন, রাশিয়া, কিউবা, স্লোভাকিয়া, বেলারুশ, পোল্যান্ড ও চেক প্রজাতন্ত্র।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউটের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালে বিশ্বের সামরিক ব্যয় ছিল ১ দশমিক ৮২২ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলার (এক লাখ বিরাশি হাজার দুইশ কোটি ইউএস ডলার)। যা ছিল আগের বছরের তুলনায় শতকরা ২ দশমিক ৬ ভাগ বেশি। ফ্লাইট গ্লোবাল এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২০ সালে সারা বিশ্বের সামরিক ব্যয় শতকরা তিন থেকে চার ভাগ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলার।
এ পর্যন্ত বিশ্ব সামরিক খাতে যে পরিমাণ ব্যয় করেছে তা দিয়ে হয়তো সারা বিশ্বের প্রত্যেকটা মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার পূরণ করেও সচ্ছল জীবন যাপনের নিশ্চয়তার বিধান করা যেত। কিন্তু বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র প্রধানরা সেদিকে না গিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতায় মনোনিবেশ করেছে। একটা আণবিক বোমা আরেকটা বোমাকে প্রতিহত করতে পারে না। তৃতীয় বিশ্বের দেশ পাকিস্তানের জবাবে সেই বিশ্বের আরেকটি দেশ ভারত যে আণবিক বোমা বানিয়েছে সেটাও বিশ্বকে ধ্বংসই করবে। পাকিস্তানের ফেলা বোমার ক্ষত সারিয়ে তুলবে না। অথচ ভারতের এই বিজ্ঞানী নাকি খুব দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন কিন্তু সে মেধাকে দরিদ্রের কল্যাণে কাজে লাগাননি। বরং গরিবের রক্তচোষা টাকায়, তাদের আহার কেড়ে নিয়ে সে অর্থ অমানবিক খাতে ব্যবহার করেছেন। আর ফাঁকা বাহবা কুড়িয়েছেন।
স্প্যানিশ ফ্লু ছিল একটি মারাত্মক মহামারী। ১৯১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এটি ৫০০ মিলিয়ন মানুষকে সংক্রমিত করেছিল। সেই সময়কার বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ। ধারণা করা হয় মৃত্যু হয়েছিল ৫০ মিলিয়ন থেকে ১০০ মিলিয়ন মানুষের। ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু থেকে বিশ্ব নেতারা শিক্ষা নেননি। এরপর আবার শুরু করেছেন যুদ্ধ অস্ত্র প্রতিযোগিতা আর ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। এখন সময়, সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার মানবতার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেবার। করোনাভাইরাস আক্রমণ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে সামরিক খাতে নয় স্বাস্থ্যখাতে বেশি ব্যয় হওয়া উচিৎ। প্রায় সব দেশই স্বাস্থ্যখাতের চেয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বেশি করছে, যা শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয় অনুচিতও। মানবতাকে ধ্বংস নয় লালন করায় হোক আমাদের ব্রত। সারাবিশ্ব যদি শুধু শতকরা দশ ভাগ ব্যয় সামরিক খাতে কমিয়ে সেই অর্থ স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করতো, তাহলে করোনাভাইরাস মোকাবেলা সহজ হত।