পাকিস্তানকে জবাব দেওয়ার এটাই শ্রেষ্ঠ সময়

অজয় দাশগুপ্তঅজয় দাশগুপ্ত
Published : 30 August 2021, 09:42 AM
Updated : 8 Dec 2015, 05:25 AM

পাকিস্তানিরা আমাদের রাজদূতকে ডেকে নিয়ে তাদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছে। তারা এটাকে ক্ষোভ বললেও বিবৃতিটি পাঠ করার পর মনে হবে ভর্ৎসনা। এই দুঃসাহস পাকিস্তানিদের মজ্জাগত। যে পর্যায়ের হোক না কেন তারা রূঢ়, উগ্র আর নিয়মহীন। তাদের বর্তমান গোস্বা বা ক্ষোভের কারণ যে দুই বাঙালি মীরজাফর ও তাদের ফাঁসি, এরাও আচরণে ছিল পাকিস্তানের মতো। একজন সরব কসাই, আরেক জন নীরব ঘাতক। চোরে চোরে খালাতো ভাইরা একে অপরের জন্য মায়াকান্না কাঁদবে এটাই স্বাভাবিক।

এই কুমিরের কান্নার পরোক্ষ কারণ নিজেদের ইজ্জতের চাকার পাম্প ফুস হওয়া আর পরাজয়ের অতীতের প্রতি বিদ্বেষ। কী আশ্চর্য! এরাও তাদের এক নেতাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়েছিল। 'পাকিস্তান, পাকিস্তান' করে দুনিয়ায় মাতম তোলা ভুট্টোর কারণে বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিরা অবিভক্ত পাকিস্তানের ক্ষমতা পায়নি। পশ্চিমে বিজয় লাভ করে পূর্বে বুট-বেয়নেটে লোকজনকে ভয়ে দাবিয়ে রাখার নীতি মানেনি সময়। সে মানুষটিকে আমরা একাত্তরে জাতিসংঘে হেডফোন খুলে, অসভ্য অঙ্গভঙ্গি করে হাতের কাগজ ছিঁড়ে ফেলে কথিত বীরদর্পে বেরিয়ে যেতে দেখেছি।

আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার, সভ্যতা, জাতিপুঞ্জের নিয়ম সব কিছুর প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করা ঘোর পাকিস্তানিকেও ছাড় দেয়নি এই জাত। আমাদের দেশে ফাঁসি যখন অপ্রচলিত শব্দ, সূর্যসেন ও ক্ষুদিরামের গৌরবগাথা ব্যতীত মানুষ ফাঁসির বিষয়টি ঘৃণা করত তখন তারা এই লোককে ঝুলিয়ে দিয়েছিল। বাংলাদেশের কাছে পরাজয় ও আত্মসমর্পণের জ্বালা এভাবে ঘোচানো দেশটি এখন মুখে শেখ ফরিদ আর বগলে ইট নিয়ে আমাদের হেদায়েত করতে চায়। এটা তাদের আজন্ম স্বভাব। এতে আমি অবাক হইনি। বরং আমাদের কথায় আসি।

পাকিস্তানিদের এই অশিষ্টাচার ও আমাদের অভ্যন্তরীন বিষয়ে নাক গলানোর পর সামাজিক মিডিয়াসহ বুদ্ধিবৃত্তির প্রতিক্রিয়া দেখে একদিকে যেমন ভালো লাগছে, অন্যদিকে হাসিও পাচ্ছে। যে বিভক্ত সমাজ ও জাতিসত্তা আমাদের ভোগাচ্ছে তার পেছনে পাকিস্তানের ছায়াটা অনেক বড়। মুক্তিযুদ্ধের পর মাত্র কয়েক বছরে তারা তাদের ষড়যন্ত্র ও আমাদের স্বেচ্ছা আত্মসমর্পণের কারণে এটা করতে পেরেছে। দুনিয়ার আর কোনো দেশে বিজয়ী জাতির ভেতর থেকে বিজিতের প্রতি এমন মমত্ব বা আহাজারি দেখা যায় না। মুক্তিযোদ্ধা নামধারীরা যখন পাকি-প্রেমে মজল, নিজেদের বীরত্ব ভুলে দাসানুদাস হওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকল, তখন কি মনে ছিল না, সুযোগ পেলেই তারা আবার ঘাড় মটকে দিতে চাইবে?

এটা তাদের 'খাসলত'। যে বুদ্ধিবৃত্তির আঁতে ঘা লাগায় এখন মুখে কথা বা লেখায় খৈ ফুটবে তাদের অনুরোধ করি গত দুয়েক বছরে তাদের উক্তি, লেখা বা কর্মের দিকে ফিরে তাকাতে। কত কারণে কতভাবে আর কত অজুহাতে আপনারা বাংলাদেশকে ছোট করেছেন। কতভাবে নিজেদের অপমানিত করেছেন, খেয়াল আছে?

এ দেশের বিভ্রান্ত তরুণ-তরুণীরা যখন গালে-মুখে পাকিস্তানের পতাকা এঁকে ক্রিকেট খেলা দেখতে যায়, মেয়েরা প্ল্যাকার্ড নিয়ে বলে, 'মেরি মি আফ্রিদি' বা পাকিস্তানের জয়ে যখন মিষ্টি বিতরণের ধুম পড়ে, আপনারা কি তখন এই অপপ্রক্রিয়ায় নীরবে সমর্থন জানান না? মুক্তিযুদ্ধে পাশে দাঁড়ানো নিজেরা যুদ্ধ করে শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে, প্রাণ দিয়ে আমাদের স্বাধীন করে দেওয়া ভারত আর বৈরী চিরশত্রু পাকিস্তানের খেলায় আপনারা রাজনীতির বদলে ভ্রাতৃত্ব আর ধর্মীয় পরিচয় বড় মনে করেন। এগার জন পাকি খেলোয়াড় তখন আর পাকি থাকে না। তারা আপনাদের বিকৃত মনের জেহাদি সৈনিক। আপনাদের কি ধারণা পাকিস্তানিরা এগুলো জানে না? তারা সব জানে।

প্রবাসে আমার দু'চারজন পরিচিত পাকিস্তানির কথা বলি। এদের ভেতর দুজন আমার কাছের মানুষ। একজন আপদে-বিপদে পাশে দাঁড়াতেও প্রস্তুত। কর্মক্ষেত্রে পরিচয়, এখন তা অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। আর একজন বুদ্ধিজীবী টাইপের অধ্যাপক। এই ভদ্রলোক নিজ দেশে অন্যায়-অনাচার আগ্রাসন যুদ্ধ জেহাদ সব কিছুর ওপর ক্ষিপ্ত, বিরক্ত। পিআইএর ফ্লাইটে ওঠেন না। এমনকি দেশে যেতে না পারলেই তার আনন্দ।

অথচ এই লোক আমাকে দুঃখ করে বলেন, 'বুঝলে অজয়, শুধু তুমি পারলে না। আমার বাংলাদেশি বন্ধুদের প্রায় সবাই আমার কাছে কোনো না কোনোভাবে ক্ষমা চেয়ে বলেছে, একাত্তরে যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে, ওগুলো পলিটিক্স। আমরা বেরাদার আছি ভাই ভাই থাকব।' ভদ্রলোক হেসে আবার এ কথাও শুনিয়ে দেয় 'তুম তো হিন্দু হ্যায় না, ইস লিয়ে বোল নেহি পাত্তা।'

তারপরও তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে এই কারণে, মাঝেমধ্যে যখন একা ও নিভৃতে কথা হয়, লোকটি বলে, 'তোমার মতো যারা তারাই আমার পছন্দের। পাকিদের বিশ্বাস করা মানে নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনা।' তারপর শুরু হয় তার পরিবার ও স্বজনদের ওপর স্বজাতীয় অত্যাচারের বহুশ্রুত বর্ণনা।

এই আমাদের বর্তমান অবস্থা। পাকিস্তানিরা এ-ও জানে, তাদের দেশের হাল করুণ না হলে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় ধ্বংসের পথে না গেলে ওদের গোয়েন্দা সংস্থা বিচার বা ফাঁসি তো দূরের কথা আরেকটি গ্রেনেড হামলা বা অন্য কোনো উপায়ে এদ্দিন মুক্তিযুদ্ধের সব সৈনিককেই উড়িয়ে দিত। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাকে উড়ানোর কোনো চেষ্টা কি তারা কখনও ছেড়ে দিয়েছিল? এসব জানার পরও তারা যখন দেখে, পাকি-প্রেম আর পাকিস্তানি কায়দার রাজনীতি পপুলার এবং ভোটে জিতে ভারত ও অমুসলিম-বিরোধী জোশে ক্ষমতায় যায়, তারা কি ধরে নেবে না আমরা হয় অনুতপ্ত অথবা আত্মবিধ্বংসী?

কথায় বলে ফুটো থাকলে আঙুল দিয়ে তা পরখ করা মানুষের স্বভাবধর্ম। আমাদের অনৈক্যের ফুটোটি কত বড় তা ইমরান খানও জেনে গেছেন। তারা জানে, মুখে যত কথাই বলুক না কেন, এ দেশের মাটিতে পা ফেলা মাত্র বাঙালিদের এক বিরাট অংশ তাদের গলায় ফুলের মালা দিয়ে, পায়ে সালাম করে খাতির জানাবে। আমি একবারও বলছি না যে, সব পাকিস্তানি দুশমন বা শত্রু। কিন্তু তাদের প্রতি অতিরিক্ত দুর্বলতার কারণ না থাকলেও সেটাই চর্চিত হয়ে আসছে।

এই হীনমন্যতা ও পাক-প্রীতি যতদিন থাকবে ততদিন তারা নাক গলাতে পিছপা হবে না। বুদ্ধিবৃত্তির মায়াকান্না বা হঠাৎ উথলে ওঠা দেশাত্মবোধ পাকি আগ্রাসন কিংবা অপমান ঠেকাতে পারবে না। কাগুজে বাঘে পরিণত হীনবল, হতবুদ্ধি জাতি যদ্দিন আসল রয়েল বেঙ্গল ছিল তারা পালিয়ে কূল পায়নি। এখনও যে পালাতে হবে তার প্রমাণ জেগে ওঠা তারুণ্যের সাহসী ক্রিকেট। একদা অবিশ্বাস্য অকল্পনীয় একদিকে দেবতা আরেক দিকে ফেরেশতাতুল্য ভারত ও পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা এখন রীতিমতো ভয়ার্ত, শঙ্কিত। জেগে ওঠার এমন নমুনা যদি সব ক্ষেত্রে দেখানো যায় ইমরান খানের পাকিস্তান বিপাকে পড়তে বাধ্য।

যারা বলছেন কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে তারা ঠিক বলছেন না। কোনো কোনো দেশ ও জাতিতে এর চেয়ে ভয়াবহ জাগ্রত সমস্যা থাকার পরও তারা সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। এখনই কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা হবে হঠকারিতা। তার চেয়ে বরং প্রমাণ হয়ে যাক কতটা ঝানু ও শানিত হল আমাদের কূটনীতি। প্রমাণ হোক কীভাবে এগুলো টেক্কা দিয়ে নিজেদের যুক্তি আর অবস্থান সঠিকভাবে তুলে ধরা সম্ভব।

জাতি যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে, সরকার যদি সচেষ্ট হয়, বুদ্ধিবৃত্তি ও চোরাগোপ্তা পাকিপ্রেমীরা যদি পথ ভুলিয়ে না দেয়, পাকিস্তানের এই শিষ্টাচারবহির্ভূত কূটনীতির জবাব রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও মেধায় দেওয়াই যৌক্তিক। তারা যে নাক গলিয়ে একাত্তরে স্বঘটিত যুদ্ধাপরাধের দায় কাঁধে নিয়েছে সেটাই তুলে ধরা দায়িত্ব আমাদের। চাপে রাখার জন্য অতীতের যত পাওনা আর তাদের ধ্বংসের কথা জানানো দরকার।

দেশে-বিদেশে ভঙ্গুর ও প্রায় ব্যর্থ রাষ্ট্র একঘরে পাকিস্তানকে আরও একবার সমুচিত জবাব দিতে হলে এটাই শ্রেষ্ঠ সময়। আমরা কি তা পারব?

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক