২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

শুরু হোক আনুষ্ঠানিক যৌনশিক্ষা প্রদান

শুরু হোক আনুষ্ঠানিক যৌনশিক্ষা প্রদান
Illustration for teen sex group projet.

কাজী আহমদ পারভেজ

Published : 19 Aug 2014, 03:15 PM

Updated : 01 Jul 2022, 05:48 PM

যৌনতা নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের রক্ষণশীলতা আমাদের জন্য কতটা স্বস্তিকর অথবা জটিলতাপূর্ণ?

এ কথা এখন কমবেশি সবাই মানছেন যে, ব্যক্তিজীবনে সুস্থ ও স্বাভাবিক যৌনতার অধিকার আসলে প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকারেরই অংশ। আর তা নিশ্চিত করার জন্য যথাসময়ে যৌনতা সম্পর্কিত সঠিক জ্ঞানার্জনের বিকল্প নেই। কিন্তু সেই 'যথাসময়'টা যে কখন, আর সেই 'জ্ঞানার্জন'এর মাধ্যমটা যে কী, এই দুটো নিয়ে অনেকেই কমবেশি সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে যান।

এদের মধ্যে অনেকেই এ ব্যাপারে একমত যে, বয়ঃসন্ধিতে একটি আনুষ্ঠানিক যৌনশিক্ষা শুরু করা যেতে পারে, আর তা হতে পারে এই সমস্যার একটি যথার্থ সমাধান। তবে এই মতের বিরুদ্ধাচারণের জন্যও কিন্তু মানুষের অভাব হয় না!

যারা এই মতের বিরুদ্ধাচারণ করেন তাদের বেশিরভাগের যুক্তিগুলো মোটামুটি এ রকম–

১. আমাদের তো এ রকম আনুষ্ঠানিক যৌনশিক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি। তাই বলে আমরা সবাই কি অস্বাভাবিক যৌনাচারে লিপ্ত?

২. বয়োসন্ধিতে যৌনশিক্ষা পেয়ে সেটার যে অপব্যবহার হবে না, তার গ্যারান্টি কী?

প্রথম যুক্তিটাতে আত্মগরিমা দেখানোর একটা প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সত্যি না হওয়া সত্ত্বেও একজন সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতার বিচারে বলে ফেলেন। আর দ্বিতীয়টা এই কারণে ঠিক যে, কোনো কিছুরই গ্যারান্টি নেই। তবে এটাও সত্য যে, সব জেনে বুঝে যদি কেউ জ্ঞানের অপব্যবহার করতে চায়, তাদের সংখ্যা কখনও আশঙ্কাজনক হয় না। যা হয় তা নিতান্তই ক্ষুদ্র এবং তাকে সিস্টেম এরর হিসেবে মেনে নেওয়া যেতেও পারে।

Image
সব জেনে বুঝে যারা জ্ঞানের অপব্যবহার করতে চায়, তাদের সংখ্যা কখনও আশংকাজনক হয় না

প্রায়ই শুনে থাকি বয়োসন্ধির সময় সিস্টেমেটিক যৌনশিক্ষা শিশু-কিশোর-কিশোরীদের এক্সপ্লয়েটেশন কমাতে ভুমিকা রাখে। এটা মেনে না নেওয়ার যুক্তি পাই না। এখন যদি প্রশ্ন করা হয়, কোনটা আগ্রাধিকার পাওয়া উচিত– অজ্ঞ রেখে গোটা শিশু-কিশোর-কিশোরী সমাজকে হয়রানির ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া, নাকি জানা ও বোঝার পর দুচার জনের অপব্যবহারের ঝুঁকি নেওয়া।

দুচার জন ডেভিয়েটের স্বার্থের তুলনায় গোষ্ঠীস্বার্থ যে বেশি প্রাধান্য পাওয়া উচিত সেটা আশা করি সবাই মানবেন।

এই প্রসঙ্গের অবতারণা এ কারণে যে, সম্প্রতি জানা, দেখা ও বোঝা কিছু কিছু ব্যাপারে আমার মনে হয়েছে যে বর্তমান প্রজন্ম অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি যৌনহয়রানি ও এক্সপ্লয়েটেশনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অতীতেও যৌনহয়রানি ও এক্সপ্লয়েটেশনের ঝুঁকি বয়ঃসন্ধিকালে অনেককেই পোহাতে হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তিগত উন্নতি, যোগাযোগ এবং বিভিন্ন ধরনের চিত্রধারণ ব্যবস্থার সহজপ্রাপ্যতা এই ঝুঁকি আগের চেয়ে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমি বিশ্বাস করতে চাই, বিকৃত রুচির মানুষের সংখ্যা আসলে খুব বেশি নয়। কিন্তু অজ্ঞতা সেই সব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিকৃত মানুষের বিকৃতি চরিতার্থ করার বিরাট সুযোগ করে দিচ্ছে। সিস্টেম্যাটিক যৌনশিক্ষায় যৌনআচরণের স্বাভাবিক বিষয়গুলিকে স্বাস্থ্য ও হাইজিনের অংশ হিসেবে দেখানোর পাশাপাশি এক্সপ্লয়েটেশন জিনিসটা বুঝতে সাহায্য করবে। এতে করে বিকৃত মানুষদের জন্য তাদের বিকৃতি চরিতার্থ করার পথটা কঠিন হয়ে পড়বে।

এ কথা অনেকাংশেই সত্য যে, এক্সপ্লয়েটেশনের প্রথমদিকে অনেকেই না বুঝে তার শিকার হয়। পরে যখন বুঝতে পারে তখন তা থেকে বের হয়ে আসার খুব একটা উপায় থাকে না। কিছু উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারগুলো আরও পরিষ্কার করা যেত, কিন্তু তা করতে ইচ্ছা হচ্ছে না, তাতে মনোকষ্ট আরও বাড়ত। তাছাড়া কী বলতে চাইছি, পাঠক এটুকু থেকেই অনুমান করে নেবেন বলে আশা করছি।

বলছিলাম প্রযুক্তিগত ঝুঁকির কথা।

মাঝে মাঝে পত্রিকান্তরে এমএমএস বা হিডেন ক্যাম ফাঁস হবার সংবাদ দেখি। কখনও কখনও জোর করে ভিডিও তৈরি করার ও তা ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার কথা শুনি। এসব পড়ে বা শুনে মনে হয় এ জাতীয় ঘটনা কালেভদ্রে দুচারটা হয় হয়তো। সম্প্রতি জানলাম, ইন্টারনেটে নাকি এ ধরনের ভিডিওর সংখ্যা শত শত, হয়তো হাজার হাজারও হতে পারে। এত বিপুল সংখ্যক ভিডিও লিক হয়ে নেটে এসেছে, জোর করে করা হয়েছে, এগুলো বিশ্বাস করা কঠিন।

এ জন্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানলাম, এসবের বেশিরভাগই পারস্পরিক সম্মতিতে ধারণ করা। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো আপলোডিংও সম্মত হয়েই করা হয়ে থাকবে। এই চর্চাগুলো যে এক ধরনের এক্সপ্লয়েটেশন সেটা জানা থাকলে হয়তো তা এভাবে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পারত না। যারা স্বেচ্ছায় এটা করছে, ঠিক কী কারণে যে তা করছে বুঝতে পারছি না, তবে যা যা করছে তা যে রুচিহীন আচরণের পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর চর্চার বিস্তার ঘটাচ্ছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। আর এসবে জড়াতে গিয়ে অজ্ঞতার কারণে ঘটছে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের মতো ঘটনা যা থেকে জীবনের ঝুঁকিও সৃষ্টি হচ্ছে।

Image
এত বিপুল সংখ্যক ভিডিও লিক হয়ে নেটে এসেছে, জোর করে করা হয়েছে, এগুলো বিশ্বাস করা কঠিন

এই প্রসঙ্গে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সম্পর্কে জ্ঞান থাকার গুরুত্বও আলোচিত হওয়া উচিত। আর তা শুধু জন্ম বা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্যই নয়, বরং স্বাস্থ্যকর ও পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনের জন্যও যে এটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝার জন্যেও। অতি রক্ষণশীলতার জন্য কন্ট্রাসেপটিভের প্রাপ্যতা বরাবরই জটিল একটা বিষয় ছিল। আশার কথা, কোনো কোনো সুপার শপের ডিসপ্লেতে আজকাল এগুলো পাওয়া যাচ্ছে। আশা করা যায়, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও সেই পরবর্তী জটিলতা নিরসনে এই বিষয়টি ভূমিকা রাখবে।

অস্বাস্থ্যকর ও অসুস্থ যৌনচর্চা এবং এক্সপ্লয়েটেশনগুলো তথ্যপ্রযুক্তির কারণে যেভাবে ছড়াচ্ছে ও মাল্টিপ্লাই করছে তা এক সময় তরুণ সমাজের জন্য হুমকি বয়ে আনতে পারে। এই অবস্থার উন্নতির জন্য অনতিবিলম্বে সুস্থ যৌনচর্চা সম্পর্কিত শিক্ষার পরিকল্পনা করা ও সেই অনুযায়ী ক্রমান্বয়ে সিস্টেমেটিক আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করাটা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ জন্য বিভিন্ন দেশে যেসব মডেল রয়েছে, সেগুলির মধ্য থেকে আমাদের জন্য উপযোগী একটি মডেল বেছে নেওয়াই হবে সবচেয়ে সহজ একটা উপায়। জানি না কবে তা হবে, তবে যত তাড়াতাড়ি তা হয়, ততই মঙ্গল।

যতদূর মনে পড়ে, এদেশের ইংলিশ মিডিয়ামের বিজ্ঞান বইগুলোতে নিচের শ্রেণিগুলো থেকেই হেলথ-হাইজিন শিক্ষার অংশ হিসেবে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চেনানোর পাশাপাশি সেগুলোর যত্ন নেওয়া, সুরক্ষা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে জ্ঞানচর্চা শুরু হয়। জানি না এদেশে তা ঠিক ওইভাবে শেখানো হয় কি না। যদি হয়, তা নিঃসন্দেহে খুব ভালো একটা পদক্ষেপ। এভাবে শুরু করা হলে পর্যায়ক্রমে তা নিয়ে শিশুরা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বিস্তারিত ও খোলামেলা আলোচনায় উত্তরণ ঘটানো সম্ভব। কেন যে তা ঘটছে না, জানি না।

পুরো বিষয়টা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনার সময় এসে গেছে। সময় থাকতে এটা নিয়ে না ভাবলে একটা গোটা প্রজন্মকে তার মূল্য দিতে হতে পারে। মনে রাখা জরুরি যে শুধু সুস্থ জীবনই নয়, সুস্থ যৌনজীবনও প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকারের অংশ। আর এ জন্য সঠিক জ্ঞানের বিকল্প নেই।