মুক্তিযুদ্ধ, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও ইতিহাসের অধিকার: পর্ব-১
মনোজগতে আধিপত্য বিস্তারের প্রথম ধাপ ইতিহাসের ন্যারেটিভ। ১৯৪৭ সালের আগে ভারতের মুসলিম নেতারা ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন। তারা মুসলমান নৃপতিদের কথা তুলে ধরেছেন যারা শৌর্যে-বীর্যে ছিলেন অতুলনীয় এবং মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন, ভারতীয় মুসলমানরা তাদেরই বংশধর। ইসলামি শাসকদের আমল ছিল স্বর্ণযুগ। ব্রিটিশ ও হিন্দুদের চক্রান্তের কারণে আজ তারা হীনাবস্থায়। এই অবস্থা থাকবে না যদি মুসলমানদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা হয়। ইতিহাসের এই ব্যবহার মুসলমান তরুণদের সংগঠনে ভূমিকা রেখেছিল এবং পাকিস্তান মানসিকতা তৈরি করেছিল। ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, পাকিস্তান: ইসলাম। ভারত: হিন্দু।
এই ন্যারেটিভ ভাঙতে বিপরীতে বঙ্গবন্ধুকে সোনার বাংলার মিথের কথা বলতে হয়েছিল। নানা বঞ্চনার কথা তুলে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সংহত করেছিলেন। পোস্টারে লেখা হয়েছিল, 'সোনার বাংলা শ্মশান কেন?'
১৯৭১ সালের বিজয়ের পর দাঁড়াল বাঙালিদের রাষ্ট্র বাংলাদেশ। এই রাষ্ট্র সেক্যুলার। এই রাষ্ট্রে থাকবে সিভিল কর্তৃত্ব। এই রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা আছে ৩০ লাখ শহীদ, ৬ লাখ বীরাঙ্গনা, অগণন আহত– প্রায় সব বাঙালির আত্মত্যাগ, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব এবং সবশেষে তাজউদ্দীন আহমদের 'বাংলাদেশ সরকার'। ন্যারেটিভের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল– রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং স্বাধীনতাবিরোধীরা পরিত্যাজ্য।
জিয়াউর রহমান ও সামরিক বাহিনী, এরশাদ ও সামরিক বাহিনী এবং খালেদা জিয়া এবং তারপর খালেদা জিয়া ও মতিউর রহমান নিজামী এই ন্যারেটিভ বিনষ্ট করতে চেয়েছেন। জিয়া ১৯৪৭ সাল ফিরিয়ে আনলেন। অস্ত্র ও অর্থের সাহায্যে এই ন্যারেটিভ চাপিয়ে দিলেন। বলা হল, ধর্ম প্রধান, রাষ্ট্র হবে ধর্মীয়; এই রাষ্ট্র হবে মুসলমানদের, রাজাকার আর আল বদররা কেন পরিত্যাজ্য হবে? তারা আমাদের সহযাত্রী, অর্থাৎ ১৯৭১ সালে হত্যা-ধর্ষণ কিছুই হয়নি।
এই তত্ত্বে নতুন প্রজন্মকে বিশ্বাসী করানোর জন্য শান্তি কমিটির সদস্যকে প্রেসিডেন্ট, স্বাধীনতাবিরোধী দালালদের প্রধানমন্ত্রী, সিনিয়র মন্ত্রী; রাজাকার, আল বদরদের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী বানানো হল। গত ৩০ বছর এই তিনজন এ কাজটি করেছেন। দুটি নতুন প্রজন্ম এই ন্যারেটিভে বিশ্বাস করে। পুরনোদের অনেকে এটি মেনে নিয়েছে। যেটা মুক্তিযুদ্ধপন্থীরা জানে না, বিরোধীরা জানে তা হল– ইতিহাসের সূত্র ছিন্ন করে দিতে হবে যাতে মনোজগতে ইতিহাসের সত্য স্থান না পায়, যেটি করা হয়েছে পাকিস্তানে।
বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, শেখ হাসিনা সরকারও এ বিষয়ে একমত পোষণ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষাক্রম থেকে ইতিহাস হটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বলা হচ্ছে, তারা বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী। কপাল আমাদের! ইতিহাসের অধিকার থেকে আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছিল, আর সেই অধিকার যাতে আমরা ফিরে না পাই সে ব্যবস্থাই করা হল ২০১২ সালের বিজয়ের মাসে ইতিহাস বাদ দিয়ে!
এই পটভূমি দিতে হল দীর্ঘ হলেও একটি কারণে। আমরা যা হারিয়েছিলাম তা আইনগতভাবে আমাদের ফিরিয়ে দিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচার বিষয়ক ট্রাইব্যুনাল। এর আগে বিচারপতি খায়রুল হকও দুটি রায়ে ১৯৭১ সালের ন্যারেটিভকেই সত্য বলেছিলেন, কিন্তু তার দিকে দৃষ্টি পড়েছে কম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এখন দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সব ধরনের রাজনীতির জন্য।
ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে গোলাম আযম, আলী আহসান মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, কাদের মোল্লা, বাচ্চু রাজাকার, আশরাফুজ্জামান খান, চৌধুরী মঈনুদ্দীন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, আবদুল আলীম ও দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর রায় দিয়েছে। মতিউর রহমান নিজামী ও মীর কাশেম আলী খানের রায় হলে, প্রথম সারির অপরাধীদের রায় দেওয়া সম্পূর্ণ হবে। এখানে গোলাম আযম, কাদের মোল্লা এবং আলীমকে শুধু ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়নি, বাকি সবাইকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। সবাই সুপ্রিম কোর্টে গেছেন। সুপ্রিম কোর্ট শুধু কাদের মোল্লার রায় দিয়েছে। আদালতে কাদের মোল্লাকে সর্বোচ্চ দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এই রায়গুলি গুরুত্বপূর্ণও ভবিষ্যতের জন্য। কারণ, এই সব রায়ের মাধ্যমে আমরা ইতিহাসের অধিকার ফিরে পেয়েছি। গত তিন দশক মনোজগতে আধিপত্যটা এমনভাবে হয়েছে যে প্রচলিত চিন্তার বাইরে বের হওয়া অনেক বুদ্ধিজীবীর পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না। এই সব রায়ে ইতিহাসের সত্যগুলি তুলে ধরা হয়েছে। এখানেই এই ট্রাইব্যুনাল ও রায়ের গুরুত্ব।
প্রতিটি রায়ে ভূমিকাংশ মোটামুটি এক। প্রথম রায়ে জামায়াতকে অভিযুক্ত করার পর পরবর্তী রায়গুলিতে এই বিষয়টিকে আরও বিশদ করা হয়েছে। তারপর প্রত্যেকের অভিযোগগুলি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কিছু অভিযোগ টেকেনি। কিন্তু যে সব অভিযোগ টিকেছে এবং বিশ্লেষিত হয়েছে তাতে ফুটে উঠেছে একাত্তরের রক্তাক্ত চিত্র– অপহরণ, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, হিন্দু ও আওয়ামী লীগ সদস্যদের নির্দিষ্ট করে খুন।
রায়গুলি একদিকে সেই সময়ের দলিল যা আমাদের স্মৃতি থেকে অবলোপনের চেষ্টা করা হয়েছে ১৯৭৫ সাল থেকে– লে. জেনারেল জিয়াউর রহমানের আমল থেকে এবং তা ধীরে ধীরে জোরদার করা হয়েছে লে. জে. হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ এবং সবশেষেও বেগম খালেদা জিয়া ও মতিউর রহমান নিজামীর আমলে। বেগম জিয়া ইতিহাসের দলিল বদলে দিয়েছিলেন নিজের স্বামীকে স্বাধীনতার 'ঘোষক' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ের কথা বলেছিলাম। তাঁর একটি রায়ে এই দাবি যে অসত্য তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের ছাত্রদের এ কারণে এই রায়গুলি পড়া দরকার।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এ শতাব্দীতে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এর জন্য দীর্ঘ চল্লিশ বছর আন্দোলন করতে হয়েছে এবং শেখ হাসিনা এই বিচার শুরু করেছেন। এ কারণেই আমরা আওয়ামী লীগকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এবং যারা এই বিচারের বিরোধী তাদের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি হিসেবে উল্লেখ করি। আমি এখানে মানবতাবিরোধী কয়েকটি রায়, তার গুরুত্ব ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করব।
আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের রায়টি প্রথম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার আগে বলা দরকার সরকারের বিভিন্ন অংশ, এমনকি সরকারের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, আদালতের বিচারকদের মধ্যে গত তিন দশক কীভাবে অভিঘাত হেনেছিল, এখনও তারা ন্যায়-অন্যায়ের বিষয়টি গুলিয়ে ফেলেন। ট্রাইব্যুনাল যখন প্রথম গঠিত হয় তখন জামায়াত সমর্থক এক বিচারককে তদন্ত সংস্থার প্রধান করা হয়। এ নিয়ে প্রবল বিতর্ক শুরু হলে তাকে অপসারণ করা হয়। বাচ্চু রাজাকার গ্রেফতারের আগে পালিয়ে যান।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য, এটিএন বাংলা প্রথম বাচ্চু রাজাকারকে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মবিষয়ক ধারাবাহিক অনুষ্ঠানের সুযোগ দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে। মিডিয়া কীভাবে রাজাকারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে তা দেখাবার জন্যই এই উদাহরণ। অথচ সেখানে যারা নির্বাহী তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বলে পরিচিত। বাচ্চু রাজাকারের রায় প্রথম দেওয়া হয়। সেই রায়েই শুধু বাচ্চু নয়, জামায়াতকেও দোষী করা হয়। কাদের মোল্লার রায়ের প্যাটার্নও ছিল এক। কিন্তু তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
এ নিয়ে সারা দেশে তরুণদের উজ্জীবন ঘটে। ঢাকায় শাহবাগে একমাসব্যাপী দীর্ঘ আন্দোলন হয়। বিচারকদের এ বিভ্রান্তি কেন জানা যায়নি। সুপ্রিম কোর্ট পরে সেই রায় বাতিল করে। তারপর যেসব রায় দেওয়া হচ্ছিল যৌক্তিকভাবেই তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু গোলাম আযমের ক্ষেত্রে বলা হল সর্বোচ্চ শাস্তি তার প্রাপ্য কিন্তু বয়সের কারণে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হল না। একই ধরনের রায় দেওয়া হয়েছে আলীমের ক্ষেত্রেও। অথচ পৃথিবীর কোথাও বয়সের কারণে যুদ্ধাপরাধী কাউকে ছাড় দেওয়া হয়নি। তারপরও আমরা চেয়েছি এই বিচার চলুক। কারণ আমাদের আন্দোলনের কারণেই বিচার শুরু হয়েছে, আদালতের রায় আমাদের মানতেই হবে। তবে ন্যায্য ক্ষেত্রে প্রতিবাদ থাকবে।
এখানে প্রথমে বাচ্চু রাজাকারের রায়ের ন্যারেটিভ ও প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করেছি। আলোচিত কিছু রায়ও একইভাবে পর্যালোচনা করব। তাতে পুনরুক্তি থাকতে পারে একেকটি অনুচ্ছেদকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য। তাছাড়া রায়ের সময়টুকুও তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
দুই
এই রায়ে প্রথমেই বাঙালিদের ইতিহাসের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার জন্য কণ্টকাকীর্ণ পথ পরিক্রম করেছে। এ পথপরিক্রমা ছিল যন্ত্রণাময়, রক্তাক্ত, স্বেদ ও আত্মত্যাগের। সমসাময়িক ইতিহাসে মুক্তির জন্য বাঙালিরা যে দাম দিয়েছে আর কোনো জাতি তা দেয়নি।
[Undeniably the road to freedom for the people of Bangladesh was arduous and torturous, smeared with blood, toil an sacrifices. In the contemporary world history, perhaps no nation paid as dearly as the Bengalees did for their emancipationa]
অর্থাৎ ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে। এত মানুষ শহীদ হলেন কীভাবে? তাদের হত্যা করেছে পাকিস্তানি সেনা এবং তাদের সহযোগীরা। এই সহযোগী শক্তি কারা? এরা হল রাজাকার, আল বদর প্রভৃতি এবং এরা প্রায় সবাই উদ্ভূত জামায়াতে ইসলামী থেকে। এভাবে বিচারের আওতায় চলে আসে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগীরা। এভাবেই চলে আসে সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামী। আর এভাবেই পুনরুজ্জীবিত হয় ১৯৭১ সালের ন্যারেটিভ, যা ভুলিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত ও তাদের সমমনারা।
এ কারণে তারা ইতিহাস বিকৃত করেছিল রাষ্ট্রীয় দলিলে, পাঠ্যবইয়ে। ন্যারেটিভ সঠিক হলে, জামায়াতে ইসলামী যে হত্যাকাণ্ড, নিপীড়ন, ধর্ষণ, চালিয়েছিল তা আসতে হবে। সে প্রশ্ন এলে বিচারের প্রশ্ন আসবে। যে কারণে নির্মূল কমিটির আন্দোলনে বার বার বাধা দেওয়া হয়েছে; মিথ্যা মামলা দিয়ে শাহরিয়ার কবির ও আমাকে গ্রেফতার, রিমাণ্ড ও জেলে দেওয়া হয়েছে; জাহানারা ইমামসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার মামলা হয়েছে। এ কারণেই জিয়াউর রহমান ও বিএনপি নেতারা বলেছেন– কবে কী হয়েছে তা ভুলে যেতে হবে, ভুলে যাওয়া উচিত, দেশের উন্নয়নে সমন্বয়ের রাজনীতি প্রয়োজন।
আমরা বলেছি, অপরাধীর শাস্তি না হলে ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান তুচ্ছ হয়ে যায়, তাদের ও আমাদের অপমান করা হয়, ৬ লাখ বীরাঙ্গনাকে অপমান করা হয়। আর খুনের বিচার তো তামাদি হয় না। বিচারকরাও সেই সত্যের প্রতিধ্বনি করেছেন– আমাদের ভোলা উচিত নয় যে, লাখ লাখ ভিকটিমের পাওনা তাদের নিপীড়কদের শাস্তি। সময়ের স্রোত অপরাধ মুছে দেয় না। আন্তর্জাতিক অপরাধ যখন বিচারপ্রক্রিয়ার অধীনে আনা হয় তখন বলা যেতে পারে বিচারে দেরি হলেও, বিচারবঞ্চিত থাকছি না আমরা।
[We should not forget it that the millions of victims who deserve that their tormenters are held accountable; the passage of time does not diminish the guilt. Therefore, justice delayed is no longer justice denied, particularly when the perpetrators of core international crimes are brought to the process of justice.]
এভাবে মুক্তিযুদ্ধ প্রতিষ্ঠিত হয় রায়ে। এভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এ সত্য যে, জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনতাবিরোধী দল এবং তার সমর্থক-কর্মীরা যে অপরাধ করেছে তার বিচারও বাঞ্ছনীয়। এভাবে আমরা ইতিহাসের অধিকার ফিরে পাই।
জামায়াতে ইসলামী মানবতাবিরোধী/যুদ্ধাপরাধীদের দল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাজি পার্টি ছিল এ রকম একটি দল। ন্যুরেমবার্গ মামলায় চারটি সংগঠনেরও বিচার হয়েছিল। ট্রাইব্যুনাল যখন গঠিত হয় তখন আমরা বলেছিলাম, দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীরও বিচার হওয়া বাঞ্ছনীয়। তখন কেউ কর্ণপাত করেননি। নির্মূল কমিটি দু'যুগ ধরে বলে আসছে, জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিসহ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হোক। স্বাভাবিকভাবেই কেউ কর্ণপাত করেননি। বঙ্গবন্ধু করেছিলেন, তাঁর সে সাহস ও দূরদর্শিতা ছিল।
জিয়াউর রহমান জামায়াতকে সিদ্ধ করলেন এ কারণে যে, পাকিস্তান-সৌদি অক্ষ, যার প্রতিভূ জামায়াত, তারা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যায় সাহায্য করেছে। আর জিয়া তো পাকিস্তানবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চান, জামায়াত ছাড়া তাকে কে সেই দর্শন শেখাবে? তাছাড়া দেশ ও জাতিকে দুভাগ করা ছিল তার রাজনৈতিক লক্ষ্য, যাতে একভাগেরও রাজা হতে পারেন তিনি। আর বঙ্গবন্ধু যা করেছেন তা নস্যাত না করলে তার স্থান থাকে কোথায়? সে কারণে জামায়াত ও জামায়াতী দর্শন সিদ্ধ হল। দেশ বিভক্ত হল স্বাধীনতার পক্ষ-স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তিতে।
২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় যখন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের প্রশ্ন এল, তখন অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে নির্মূল কমিটি একটি স্মারকলিপি দিয়েছিল জামায়াতকে নিবন্ধন না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে। কারণ মানবতাবিরোধী অপরাধের দল ছাড়াও নিবন্ধনের শর্ত তারা পূরণ করছিল না। নির্বাচন কমিশন তখন অবৈধভাবে জামায়াতকে নিবন্ধন দিয়েছিল। কোনো রাজনৈতিক দল এর প্রতিবাদ করেনি।
জামায়াতকে যাতে নিষিদ্ধ না করা হয় সে জন্য অ্যাপলজিস্টরা একটি যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন; তা হল, জামায়াত আন্ডারগ্রাউন্ডে গেলে তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা মুশকিল হবে। জামায়াত ষড়যন্ত্রে বিশ্বাসী একটি দল; আন্ডারগ্রাউন্ড, ওভারগ্রাউন্ড যেখানেই থাকুক না কেন ষড়যন্ত্র করবেই। মৌলবাদী জঙ্গী প্রায় ১০০ টি সংগঠন আছে যা আন্ডারগ্রাউন্ডে এবং তারা কোনো না কোনোভাবে জড়িত জামায়াতের সঙ্গে। জঙ্গীদের দমন তো এ সরকার ভালোভাবেই করেছে। ওভারগ্রাউন্ডে থেকে কি জামায়াত নাশকতামূলক কাজ করছে না? ২০১২ সালের শেষ থেকে এখন পর্যন্ত যে পুলিশ হত্যার জন্য আক্রমণ, গাড়ি ভাঙচুর ও জ্বালিয়ে দেওয়া, দাঙ্গা, বোমাবাজি– এগুলো কি জামায়াত/বিএনপি করছে না?
ট্রাইব্যুনালের এই রায়ের ফলে এই প্রশ্নটি আবার চলে এসেছে সামনে– যুদ্ধাপরাধীদের একটি দল কীভাবে রাজনীতি করবে? রাজনৈতিক দলগুলো অবশ্য বাস্তবতার দোহাই তুলবে। কিন্তু নৈতিক প্রশ্নটি তো থেকেই যাবে। কারণ রায়ে বলা হয়েছে– যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে তখন কিছু বাঙালি, বিহারি, পাকিস্তানপন্থী, ধর্মভিত্তিক দলের সদস্য, বিশেষ করে জামায়াত এবং এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে পাকিস্তানি মিলিটারির সঙ্গে যুক্ত হয়ে বা সহযোগিতা করে। তারা প্রায় সবাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করে নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন (গণহত্যা, ধর্ষণ) করেছে।
[And most of them committed and facilitated the commission of atrocities in violation of customary international law in the territory of Bangladesh.]
আর জে রুমেল নামে একজন গবেষক একটি বই লিখেছেন যার নাম 'স্ট্যাটিসটিকস অব জেনোসাইড অ্যান্ড মাস-মার্ডার সিন্স ১৯০০'। তিনি লিখেছেন, আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ও তার জেনারেলরা পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক এলিটদেরও হত্যা করতে চেয়েছিল। তারা হিন্দুদের নির্দিষ্টভাবে হত্যা করতে চেয়েছে আর বাকিদের ভারতে ঠেলে দিতে চেয়েছে। তারা বাঙালিদের অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করে দিতে চেয়েছে যাতে কমপক্ষে আরেক জেনারেশন তারা পশ্চিম পাকিস্তানের অধস্তন থাকে।
জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের মিলিটারিদের সঙ্গে মিলে এ কাজটি করেছে। তাদের ক্ষমা করবেন কীভাবে! তাদের রাজনীতি করতে দেবেন কীভাবে! জামায়াত এখনও মুক্তিযুদ্ধ স্বীকার করেনি। তাই গ্রেফতারের আগে পর্যন্ত আল বদরের ডেপুটি আলী আহসান মুজাহিদ সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন, এ দেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই।
তিন
এ রকম একটি দেশে, যে দেশে বাস্তব-অবাস্তবের সীমারেখা বলে কিছু নেই, সে দেশে মানবতাবিরোধী [যুদ্ধাপরাধ] অপরাধের বিচার হবে সে কথা কেউ ভাবেনি। অবশ্য, বলতে পারেন, যেখানে সত্য-মিথ্যার ধার ধারে না কেউ, সে রকম দেশেই হয়তো এটি সম্ভব। কিন্তু কেন যেন মনে হয়, যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামী ও খুনীদের সমর্থনকারী বিএনপি স্বপ্নেও ভাবেনি যে, এ রকমটি হতে পারে বা হবে। একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করি।
আলবদর নিজামী একবার এক টিভি সাংবাদিককে আলোচনার জন্য বাসায় আসতে বলেছিলেন। তিনি গিয়েছিলেন। আলোচনার পর নিজামী তাকে খেয়ে যেতে বললেন। সাংবাদিক রাজি হলেন না। ঠাণ্ডা পানীয় অফার করলেন। তাও তিনি গ্রহণ করলেন না। নিজামী বললেন, ''আপনি কি আমাকে ঘৃণা করেন? দেখেন, আগামী ১৫ বছর পর আমরাই– এই জামায়াতে ইসলামীই সব নিয়ন্ত্রণ করব, বিএনপিও থাকবে না।'' সাংবাদিক যে কথা বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বলতে পারেননি ভয়ে, তা হল, আলবদর আবার মানুষ হল কবে? আর জামায়াত যখন সব নিয়ন্ত্রণ করবে তখন দেশত্যাগ করব।
নিজামীর কথা কিছুটা হলেও ফলেছে। জামায়াত ক্ষমতায় এসেছিল। বিএনপি আছে; এখন তারা জামায়াতের কমাণ্ড কাউন্সিলের অধীন। এদের বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা বিএনপি কারও, এমনকি খালেদা জিয়ারও নেই। কিন্তু সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বদলে জামায়াত নেতারা জেলে থাকবেন সেটি বোধহয় তাদের কল্পনায়ও ছিল না। জামায়াত-বিএনপি কি ভেবেছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার করার কথা? দেশটাকে তো তারা হাফ পাকিস্তান বানিয়ে ফেলেছে; সেখানে আবার কে এই বিচার করবে?
ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পরও বিষয়টি তারা সিরিয়াসলি নেয়নি। বিচার শুরু হওয়ার পরও ভেবেছে, আওয়ামী লীগ পাঁচ বছর ধরে এ বিচার চালাবে [ট্রাইব্যুনাল সরকারের কথামতো চলে না এ ধারণা কারও নেই] নির্বাচনে সুবিধা পাওয়ার জন্য। কিন্তু নির্বাচনে তো তারা আসবে না। সুতরাং এসব ট্রাইব্যুনাল তখন থাকবে না।
বেগম জিয়া তো নাকি ঘোষণা করেছেন ক্ষমতায় গেলে এসব বিচার-টিচার হবে না। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার এক মাসের মধ্যে রায় হয়ে যাবে এটি তারা স্বপ্নেও ভাবেনি। যুদ্ধাপরাধীদের দুটি দলের নেতাদের বক্তৃতায় বিষয়টি স্পষ্ট। নতুন কোনো বক্তব্য তারা দেননি। আশঙ্কা করা হয়েছিল, গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, বোমা বিস্ফোরণ অনেক কিছু হতে পারে। কিছুই হয়নি।
অন্যদিকে এই রায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের উজ্জীবিত করেছে। মিছিল হয়েছে, কোলাকুলি, মিষ্টি খাওয়া হয়েছে। চল্লিশ বছরের সংগ্রামে হঠাৎ রায় এক ধরনের অবসাদও এনে দিয়েছে অনেকের মনে। আনন্দাশ্রু অনেকের চোখে। মৃত্যুর আগে খুনীদের বিচার দেখে যাওয়া যাবে এটি অনেকেই ভাবেননি। সবাই আশা করছেন, দ্রুত আরও কিছু রায় হবে; তারপর দ্বিতীয় পর্যায় অর্থাৎ আপিলে যাবে এবং তারপর তৃতীয় পর্যায় অর্থাৎ রায় কার্যকর হবে।
এ রকম ভাবনা-চিন্তার কারণ কী? কারণ আর কিছুই নয়, দায়মুক্তি। বাংলাদেশে দায়বদ্ধতার বদলে দায়হীনতা বা দায়মুক্তির বিষয়টি শুরু হয়েছে জেনারেল জিয়ার আমলে। শুধু শুরু নয় তিনি সেটা ভালোভাবে প্রতিষ্ঠা করলেন। জামায়াতীদের মুক্তি দিয়ে, রাজনীতি করতে দিয়ে, ক্ষমতায় বসিয়ে। একই কাজ করেছেন তার শিষ্য এরশাদ ও তার পত্নী খালেদা জিয়া।
শুধু তাই নয়, সপরিবারে বঙ্গবন্ধু ও চার নেতাকে যারা খুন করেছিল তাদের সবাইকে রাষ্ট্রীয় পদ দিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পৃথিবীর কোনো দেশে এ রকম অভাবনীয় ও জঘন্য কাণ্ড কেউ ঘটায়নি। সভ্য দেশে কেউ ভাবতে পারে না যে, হত্যাকারীর বিচার হবে না। শুধু তাই নয়, মারাত্মক যে কাণ্ডটি করা হয়েছিল তা হল, সংসদে আইন করে খুনীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
এর অর্থ সামরিক শাসকরা এ বার্তা দিতে চেয়েছেন জামায়াত ও বঙ্গবন্ধুর খুনীদের পুর্নবাসন করে যে, খুন করা, ধর্ষণ করা, লুট করা, অগ্নিসংযোগ করা, এথনিক ক্লিনজিং– কোনো কিছুই অপরাধ নয়। জিয়া তো এ পথে এসেছিলেন, এরশাদও। আর স্বামীর দল বিএনপির কাণ্ডারী খালেদা জিয়া তো এর বাইরে যেতে পারেন না। সমাজে এভাবে ভায়োলেন্স ছড়িয়ে দিয়েছিল এই দায়হীনতা।
রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে রাজনীতিতে যাওয়ার জন্য ওই খুনীদের ব্যবহার শুরু করে, রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়। এর উদাহরণ জিয়াউর রহমানের আমল থেকে কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত ক্ষমতা দখলের জন্য সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন ক্যু, জামায়াত-বিএনপি আমলে শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য প্রকাশ্যে গ্রেনেড হামলা, জঙ্গীদের প্রশ্রয়দান। বাংলাদেশকে খুনীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিলেন জেনারেল জিয়া।
বিচারহীনতা থেকে বিচারমুখীতার দিকে প্রথম পদক্ষেপ নেন শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে। ইনডেমনিটি বাতিল করা হয়, বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচার হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে দেওয়া রায় কার্যকর হয়। এবারও, আগেই বলেছি, এই রকমটি হবে কেউ ভাবেনি। কিন্তু হয়েছে। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, মুজিবুর রহমান মিঞা ও শাহীনুর ইসলাম প্রদত্ত রায়ে বিচারমুখীনতা ও দায়হীনতা বন্ধের প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, এ সংস্কৃতি চলতে পারে না; কারণ বিচার না হওয়া দেশের রাজনৈতিক এবং পুরো জাতির মনস্তত্ত্বে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। এই দায়হীনতা সৃষ্টি করেছিল রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার এবং ধ্বংস করেছিল শাসনতন্ত্র।
[The perpetrators of the crimes could not be brought to book and this left a deep wound on the country's political psyche and the whole nation. The inpunity they enjoyed held back political stablity saw the ascend of militancy and destroyed the nation constitution.]
আমরা অনেকবার বলেছি, জামায়াতী সংস্কৃতির কারণেই দেশে মৌলবাদ জঙ্গীবাদের সৃষ্টি এবং বিকাশ। কারণ জঙ্গীদের অধিকাংশ জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও জামায়াতী দর্শনে বিশ্বাসী এবং তারা দেখেছিল গণহত্যা, গণধর্ষণ, গণঅগ্নিসংযোগ, গণলুটপাটে কোনো শাস্তিই হয় না, বরং ক্ষমতায় যাওয়া যায়। এই প্রত্যয় গত প্রায় চার দশক বাংলাদেশের মানুষের মনোজগতে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার! একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য এটি যথেষ্ট।
বিএনপি-জামায়াত তো বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব করতে চায়নি। তারা চেয়েছে এবং চাইছে পাকিস্তানবাদের প্রতিনিধিত্ব করতে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের রেশ খানিকটা থাকলেও এটি সম্ভব হবে না। সেজন্য তারা বাঙালি প্রত্যয় ধ্বংসের জন্য এ প্রত্যয় চেয়েছে। সংবিধানও বিনষ্ট করতে চেয়েছে; কারণ, ১৯৭২ সালের সংবিধান বাঙালি জাতি ও রাষ্ট্রের মৌলিকত্ব ধারণ করে। যে কারণে জিয়াউর রহমান প্রথমে এসেই ১৯৭২ সালের সংবিধানের মৌলিকত্ব বিনষ্ট করলেন। মুক্তিযুদ্ধ বদলে করলেন স্বাধীনতা যুদ্ধ।
এ পরিপ্রেক্ষিতে বিচারকরা বিশেষভাবে দায়হীনতার উল্লেখ করেছেন। এই রায়/বিচার সমাজে বিচারহীনতা থেকে বিচারমুখীনতা সৃষ্টি করবে। এই রায় বাঙালি মৌলিকত্ব ঘোষণা করে ইতিহাসে আমাদের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশি শব্দ সংবিধানে প্রোথিত করে জিয়াউর রহমান ইতিহাসে আমাদের অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন।
এই বিচারহীনতার কীভাবে প্রভাবিত করে মনস্তত্ত্ব? ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত যখন ক্ষমতায় তখন ১৯৭১ সালের মতো বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন নেমে এসেছিল; জেল, হত্যা, ধর্ষণ, হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল এবং এথনিক ক্লিনজিং শুরু হয়েছিল। আমি জানি না কেন আমরা ইতিহাসের সূত্রগুলো ভুলে যাই। মাহফুজ আনাম খুব সুন্দরভাবে একটি বাক্যে লিখেছেন, ''বঙ্গবন্ধু-উত্তরকালে আমাদের সংগ্রামের দিকটি কখনও আমাদের মনস্তত্ত্বে আসেনি।''
[ÒThe cultural aspect of our struggle never occupied any thinking of the post-Bangabandhu regimes.Ó]
চার
কাদের মোল্লার রায়ের দিন আমি আদালতে ছিলাম, রায় ঘোষণার পরপর যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা তুলে ধরছি। রায়ের পর প্রথম প্রশ্ন জেগেছিল, কতজনকে হত্যা করলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়?
৩০ লাখ শহীদের পরিবার, ৬ লাখ বীরাঙ্গনা ও তাঁদের পরিবার, গত চল্লিশ বছর কারও কাছে কিছু চায়নি। অথচ তাদের রক্ত, বেদনা, অপমানের ওপর ভিত্তি করে সৃষ্টি হয়েছিল বাংলাদেশের। তারা কিছুই চায়নি, শুধু বিচার চেয়েছিল এবং বিচারে দোষ প্রমাণিত হতে সর্বোচ্চ শাস্তি আশা করেছিল। সেই সামান্য, অতিসামান্য চাওয়াটুকু আবার জুতোয় মাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব ভিকটিম বলছেন, এই সামান্য বিচার চাওয়াটাই ভুল হয়েছিল। কারণ বিচার না হলে, তখন ভবিষ্যতে হওয়ার আশাটাই হত সান্ত্বনা। এখন আর সেই সান্ত্বনাটুকুও নেই। ইয়াহিয়া ও তার দোসররা ২৬ মার্চ হেসেছিল রক্তের হোলি খেলা দেখে, আর আজ অনেকে সেই হাসিই হাসছে ৩০ লাখ শহীদের অপমান করতে পেরে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছে তাতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও অপরাধ তদন্ত কমিটি এবং প্রসিকিউটারের চোখে পানি দেখেছি। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাঙালি বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছিল। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি-জামায়াত [এবং অনেকের মতে, সরকার সমর্থকদের একটি অংশ] ছাড়া বাঙালি বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছে। আমার ছাত্র ও ছাত্রতুল্য সাংবাদিকরা শুধু বলেছে, স্যার, এ জন্যই কি সারাটা জীবন দিয়ে দিলেন আপনারা?
আমরা আমাদের জেনারেশনের প্রায় তিন কোটি মানুষ কখনও কারও কাছে কিছু চাইনি, শুধু চেয়েছিলাম, যুদ্ধাপরাধের বিচার হোক, জাতি কলঙ্কমুক্ত হোক, শহীদ পরিবারগুলো শাস্তি পাক। এই সামান্য চাওয়ার জন্য আজ আমাদেরই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। নিজের মনেই প্রশ্ন জাগছে, বিচার চেয়ে কি ভুল করেছিলাম? মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের বক্তব্য কি ছিল নিছক বক্তব্য? মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখা কি অপরাধ?
বাচ্চু রাজাকারের রায়ে আমরা খুশি হয়েছিলাম ইতিহাসের সত্য প্রতিফলিত হতে দেখে। কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগের মাত্রা ছিল তার থেকেও বেশি। অভিযোগগুলো একবার বিবেচনা করে দেখুন। ৫ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে কলেজছাত্র পল্লবকে দুদিন মিরপুরে গাছে ঝুলিয়ে রেখেছিল কাদের, তারপর হত্যা করা হয়েছিল। এই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে সন্দেহাতীতভাবে।
২৭ মার্চ কাদের ও তার বিহারি সহযোগিরা কবি মেহেরুননেসার বাড়িতে ঢুকে তাকে, তার মা ও দুই ভাইকে হত্যা করে। মেহেরুননেসার মাথা কেটে ঝুলিয়ে রাখে। এই অভিযোগও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। ২৯ মার্চ পয়গামের সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবকে নিয়ে যাওয়া হয় মিরপুরের জল্লাদখানায়। আবু তালেবের মেয়ে জানিয়েছেন, কোরবানির গরুর মতো তালেবকে জবাই করে মাংসগুলো টুকরো টুকরো করে উল্লাসে তারা মেতে ওঠে। এই অভিযোগও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত।
২৬ মার্চ সন্ধ্যায় কাদের মিরপুরের হযরত আলী লস্কর ও তার পরিবারের পাঁচ সদস্যকে হত্যা করে ও ১১ বছরের শিশুকন্যাকে ধর্ষণ করে। এই অভিযোগও প্রমাণিত। ২৪ এপ্রিল মিরপুরে অলোকদি গ্রামে ৩৪৪ জনকে নির্যাতন করে খুন করে। মামা বাহিনীর শহীদুল হক মামা জানিয়েছেন, আজলা ভরে মানুষের চোখ তিনি সমাহিত করেছেন। এই অভিযোগও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। প্রমাণিত হয়নি ঘাটের চরের গণহত্যায় কাদেরের ইনভলভমেন্ট।
কাদের মোল্লা মোট ৩৫৫ জনকে খুন করেছে বা খুনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ১৯৭১ সালে কাদের অর্জন করে 'কসাই' উপাধি। সেই উপাধিতেই তাকে সবাই চেনে। অন্যরা পেয়েছিল রাজাকার উপাধি, যেমন বাচ্চু রাজাকার। ৩৫৫ জনকে খুন করার জন্য যাবজ্জীবন! সরকার বদলালে সেটি বাতিল হয়ে যাবে অথবা রাষ্ট্রপতি মার্জনা করবেন। সে কারণেই কাঠগড়ায় বিমর্ষ কাদের মোল্লা রায় শুনে চাঙা হয়ে ওঠে এবং 'আল্লাহু আকবর' বলে দাঁড়িয়ে যায়। দেখায় 'ভি চিহ্ন'। ১৯৭৫ সালের পর থেকে ইতিহাসের যে ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে তাতে তো আকার-ইঙ্গিতে তাই বলা হয়েছে। রায়ে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, জামায়াতী কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক পর্যালোচনা আছে। কিন্তু সেই বিষয়টি যখন রায়ে পাওয়া যায় না তখন পূর্বোক্ত পর্যালোচনাগুলো খারিজ হয়ে যায়।
ভাইসব, আপনারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে মাফ করে দিয়েন। তাঁর কারণে মেজররা মেজর জেনারেল, সেকশন অফিসাররা সচিব, মুনসেফরা বিচারক হতে পেরেছিলেন। তিনি আজীবন কারও কাছে কিছু চাননি। দিয়েই গেছেন। সবশেষে সপরিবারে জানটাও দিলেন। সে রক্ত বুটে পাড়িয়ে একজন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান হয়ে 'মসনদে' বসলেন। সে দিনটিকে স্মরণ করার জন্য তার স্ত্রী জন্মদিন বদলালেন।
এসবের সূত্র আজ বিভিন্নজনের কর্মকাণ্ডে আমরা দেখতে পাই। আপনাদের ইজ্জত বাড়াবার জন্য বঙ্গবন্ধু ও ৩০ লাখ শহীদ যে অপরাধ করে গেছেন ভাইসব, নিজগুণে তা মাফ করে দিয়েন এবং আসতে যেতে 'ভি চিহ্ন' দেখাবেন যাতে ইলেকট্রনিক মিডিয়া বার বার সেগুলো দেখিয়ে এই বার্তা দেয় আপনারাই বিজয়ী, আপনারাই সত্যের ধারক।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। আরও বলেছিলেন, বলা হয় [অর্থাৎ গুজব ছড়ানো হচ্ছে] বিচার হবে না, আপোস হচ্ছে। 'শেখ মুজিবুর রহমান কখনও আপোস করে নাই'। বঙ্গবন্ধুকন্যা যখন ট্রাইব্যুনাল করেছিলেন তখন আমরা খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন দুর্বলতা নিয়ে আমরা বারবার বিভিন্ন প্রশ্ন উখাপন করেছি, সমাধান চেয়েছি, প্রধানমন্ত্রী সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করেননি। আইনমন্ত্রী আমাদের বিরোধিতা করেছেন। আমরা আরও বলেছি, এই বিচারে সামান্য গড়বড় হলেও দায়িত্ব বর্তাবে সরকারের ওপর।
কিন্তু ২০০৮ সালের ভোট ও সামরিক সাপোর্টে স্ফীত হয়ে আমদের উপেক্ষা করা হয়েছে। আজ দায়িত্ব সরকারের কাঁধেই বর্তাচ্ছে। দিকে দিকে সে ধ্বনিই শোনা যাচ্ছে, হয়ে গেল আপোস? বাচ্চু রাজাকারকে পালাতে দেওয়া, পালাতে দেওয়া এ কারণে বলা হচ্ছে, যাদের দায়িত্ব ছিল তাকে চোখে রাখার তারা সেটা করেনি এবং এ কারণে তাদের কোনো শাস্তিও হয়নি। পুলিশের বেধড়ক মার খাওয়া।
হরতাল ঘোষণার আগে খবরের কাগজের প্রতিবেদন অনুযায়ী চট্টগ্রামে এক জামায়াত নেতা বলেছেন, সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, হরতালে দেদার ভাঙচুর, হত্যার পরও আর্মড পুলিশ বা বিজিবি, র্যাব না নামানো, হরতালের আগের দিন প্রহৃত পুলিশদের দাঙ্গাবাজ বর্তৃক রজনীগন্ধা প্রদান ও হাসিমুখে তা গ্রহণ, তিনদিন অবাধে জামায়াতকে রাস্তা ছেড়ে দেওয়া, জামায়াতের গৃহযুদ্ধের হুমকি, তারপর এই রায়। অধিকাংশ মানুষ এর মধ্যে কোনো না কোনো যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন। আমরা এর সত্য মিথ্যা জানি না।
ব্যক্তিগতভাবে তা বিশ্বাস করাও কষ্ট। কিন্তু তখন একজন রিকশাওয়ালাও বলেছেন, 'এত নাটক করার কি দরকার ছিল'? আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, মন্ত্রী বা আওয়ামী নেতারা রায়ের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তা কেউ বিশ্বাসই করছে না। সেদিন দুপুর সাড়ে বারোটার পর থেকে সরকারের শত ভালো কাজের একটিরও কথা কেউ বলল না। সবকিছু মুছে গেল। বিশ্বাসের জায়গাটাও নষ্ট হয়ে গেল। মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করুন। পদ্মা সেতু, খালেদা জিয়ার চিঠি এখন কোনো ইস্যু নয়। এটিই ইস্যু। কে কার সঙ্গে কী আপোস করেছে, সেটির সঙ্গে রায়ের কী সম্পর্ক, এগুলো আমি জানি না, জানতেও চাই না। এটি বিশ্বাস করলে আমাদের আর ভোট দেওয়ার জায়গায়ই থাকে না।
যে একশ'জনের সঙ্গে কথা হয়েছে গতকাল তার ৫০ জনই ঘোষণা করেছেন, এ দেশে তারা আর ভোট দেবেন না। হয়তো এগুলো ক্ষোভের কথা, রাগের কথা। কিন্তু রাস্তার মানুষদের নিয়ে রাজনীতি করতে হলে তাদের সেন্টিমেন্ট বুঝতে হবে। অন্তত গত ৫০ বছরের ইতিহাস তা প্রমাণ করে না। এই রায় আমাদের কেন ক্ষুব্ধ করল, এই রায় মানুষের মনে কেন সন্দেহের সৃষ্টি করল এবং যার ফলে রায়ে দায়-দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তাল? বাচ্চু রাজাকারও ছিল আলবদর, তার বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছিল, তাকেও একটি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু একটি কি দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। মোল্লা ৩৫৫ জনকে খুন করেছে বা তার সঙ্গে জড়িত, ১১ বছরের এক বালিকাকে ধর্ষণ করে লাভ করেছে যাবজ্জীবন। সে কারণেই সে রায় শেষে বলেছে, 'আল্লাহু আকবর'।
এই বৈসাদৃশ্য সবার চোখে প্রকট হয়ে ঠেকছে এবং সে কারণেই নানা ধরনের সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে। একটা খুন করলেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, ৪৫৫ জনকে খুন করলে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন। অন্যান্য বিচারক যদি একজনকে খুনের দায়ে প্রাণদণ্ড দেন তাহলে কি তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে? মানুষের ক্রোধটা হল এই যে ৪৫৫ জন খুন করেও সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয় না। কজনকে হত্যা করলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেতে পারে মহারাজ?
এই রায় এই বার্তা দিয়েছে, ''৪৫৫ জনকে খুন! ফিকর মাৎ কর। আরও খুন কর। একজনকে খুন করলে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে, সুতরাং বাঁচতে চাইলে বেশি কর। ধর্ষণ ভি কর, কুছ পরোয়া নেহি।'' ১৯৭৫ সালে জিয়াউর রহমানরা, ফারুক-রশীদরা এই বার্তা দিয়েছিল, ''খুন করেগা বাঁচ যায়েগা। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ভি মিলেগা।'' সে কারণে গণহত্যার সহযোগী শর্ষিনার পীরকে দুবার স্বাধীনতার পদক দিয়েছিলেন বীরউত্তম জিয়াউর রহমান। সেই থেকে সমাজে, রাষ্ট্রে ভায়োলেন্সের শুরু। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে না দেওয়ায় রাষ্ট্রের বুনন নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। এ সরকার সেসব হত্যার বিচার করে দায়বদ্ধতা আনতে চেয়েছিল এই রায়ে সেটি নস্যাৎ হয়ে গেল।
বিষয়টি অন্যভাবে দেখা যেতে পারে। ১৯৭৫ সালের পরের জেনারেশন এই সংস্কৃতিতে বড় হয়েছে, যেখানে খুনীদের সমাজে রাষ্ট্রে স্থান দেওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার, তাদের শাস্তির বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষকে নানাভাবে হেনস্থা করা, দায়হীনতার সংস্কৃতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। দায়হীনতার সংস্কৃতির বিনাশ চাইলে বিদ্যমান ব্যবস্থাটা নাড়া খায়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেকেও তাই সেই সংস্কৃতি অজান্তে মেনে নেন।
বাংলাদেশে একটি কথা বহুল প্রচলিত, জাজেস ও জেনারেলরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে নষ্ট করেছেন। তারা সামরিক আইন বিধি জারি করেছেন, সামরিক প্রধানের অধীনে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর বিচারের ব্যাপারে বিব্রত হয়েছেন, সামরিক শাসন বৈধ করেছেন, নির্বাচন কমিশনার হয়ে যাবতীয় কুকর্ম করেছেন। একজন বিচারপতি খায়রুল হক বা বিচারপতি শামসুদ্দীন চৌধুরী মানিকের প্রয়োজন হয়েছে সেসব কলঙ্ক অপনোদন করে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য।
এ কারণে প্রতিক্রিয়ার ধারক-বাহকরা তাদের বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এই রায় দেখে মনে হচ্ছে, বিচারপতিদের পূর্বতন ঝোঁক মনের গহীন গভীরে বাসা বেঁধে আছে যা অজান্তে কাজ করে। এই রায় বঙ্গবন্ধুকে, ৩০ লাখ শহীদকে, ৬ লাখ বীরাঙ্গনা, অগণিত মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশের জন্মকে অপমান করেছে। বলতে চেয়েছে গণহত্যা, ধর্ষণ এগুলো মাইনর অপরাধ। এর জন্য গুরুদণ্ড হতে পারে না। ১৯৭৫-এর অনুসারীরা ছাড়া এ রকম ঔদ্ধত্য দেখানো সম্ভব নয়। এই রায় ও নানাবিধ গুজব শুনে আমার মনে হয়েছে, সমাজে এখনও ১৯৭৫ সাল, মার্কিন ডলার এবং পেশিশক্তি প্রাধান্য বিস্তার করে আছে।
তবে এই রায়ের একটি ইতিবাচক দিক আছে। ১৯৭৫ সালের প্রতিনিধিরা যখন দাঙ্গা শুরু করে, গৃহযুদ্ধের হুমকি দেয় সবাই তাদের তুষ্ট করতে অস্থির হয়ে পড়ে। ভাবে এরাই সমাজে রাষ্ট্রে জয় এনে দেবে। এদের সঙ্গে সমঝোতা দরকার।
৫ তারিখ দুপুর সাড়ে বারোটা বা মধ্যাহ্নে সারাদেশে কালো ছায়া নেমে এসেছিল। তারপর আস্তে আস্তে সে মেঘ সরিয়ে গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে লাগল সবাই যাকে আমরা বলি সাইলেন্ট মেজরিটি। এই নিশ্চুপ সংখ্যাগরিষ্ঠ হঠাৎ আড়মোড়া ভাংতে শুরু করছে। ব্লগ, ফেসবুক, টুইটার সয়লাব হয়ে গেছে। এতে রায় সম্পর্কে সবার নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে আর সরকার সম্পর্কে বিরূপতা।
এই নিশ্চুপ গরিষ্ঠের অধিকাংশ তরুণ যারা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছিল। এই গরিষ্ঠের মনোভাব যদি নীতিনির্ধারকরা উপেক্ষা করেন তাহলে নির্বাচনে বিপর্যয় ছাড়া কিছু আশা করা যায় না। এই রায়ের প্রতিক্রিয়া শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ। কাদের মোল্লা যে কসাই কাদের নামে পরিচিত তার যদি মৃত্যুদণ্ড না হয় তাহলে কার হবে? এটিই ছিল প্রতিক্রিয়া।
এই নিশ্চুপ গরিষ্ঠের অনেকে বলেছিলেন নতুন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল। তবে সামনে আছে সেসব যার উল্লেখ করেছি সেই প্রতিবন্ধকতা পেরুতে হবে। আমরা খুশি যে তরুণ প্রজন্ম দায়ভার কাঁধে নিতে এগিয়ে এসেছে। আমাদের অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমানকে তারা নিয়ে যাবে সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে। আমি শুধু বলব, লড়াই চালিয়ে যাওয়াটাই আসল, জয়-পরাজয় কিছু নয়। তারপরও বলব, ইতিহাস আমাদের পক্ষে। যারা ইতিহাস বিনষ্ট করতে চায় ছলে-বলে-কৌশলে, ইতিহাস তাদের পক্ষে নয়। সে কারণে অন্তিমে আমরাই জিতব। কারণ পরাজিতের সঙ্গে পরাজিতরাই আঁতাত করে, বিজয়ীরা নয়।
পাঁচ
গোলাম আযমের রায়ও আমাদের একইভাবে আশাহত করেছিল। তার রায়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষজন খুশি হতে পারেননি। না পারাটা খুব স্বাভাবিক। গোলাম আযম নিছক একটি নাম ব্যক্তি নন। বাংলাদেশে তিনি যুদ্ধাপরাধের প্রতীক। জামায়াতে ইসলামী নামে যে দল ১৯৭১ সালে সারা বাংলাদেশে যে কুকাণ্ড করেছিল তিনি তার প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ, ৬ লাখেরও বেশি ধর্ষণ, গণদেশত্যাগ, লুট, অগ্নিসংযোগের মন্ত্রদাতা তিনি। বিচারে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে না, এটি মেনে নেওয়া কষ্টকর।
আমি এই নেতিবাচক মনোভাবের বিরোধী। কেননা যখন আমরা এ ধরনের মন্তব্য করি তখন ভুলে যাই এই বিচারের জন্য কী কঠিন পথ আমাদের পেরুতে হয়েছে। জেনারেল জিয়ার পাপমোচনে কত মানুষকে আত্মত্যাগ করতে হয়েছে! যুদ্ধাপরাধ বিচারের সংগ্রামটা মুক্তিযুদ্ধেরই বয়সী। কয়েক পর্যায়ে আন্দোলনটি গতি পেয়েছিল। প্রথম পর্যায়ের পর দ্বিতীয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলন বেগবান হয়। দেশদ্রোহীর তকমা নিয়ে তাঁর মৃত্যু হলে আন্দোলনে ভাটা পড়ে।
তৃতীয় পর্যায়ে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আন্দোলন এগিয়ে নেয়। এ পর্যায়ে কবি শামসুর রাহমান, অধ্যাপক কবির চৌধুরী, বিচারপতি কেএম সোবহান, অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, শাহরিয়ার কবির থেকে কাজী মুকুল গত দীর্ঘ দু'দশক জোরালো আন্দোলন করেছেন, লাঞ্ছিত হয়েছেন। অনেকে এখন প্রয়াত। বিচার না দেখার আফসোস নিয়ে মরেছেন। আমরা সৌভাগ্যবান যে, যে আন্দোলন করেছি দীর্ঘ চার দশক, তার ফল দেখে যেতে পারছি। তাই রায় নয়, বিচার যে হচ্ছে এবং রায় হচ্ছে সেটিও কম অর্জন বলে মনে করি না।
আন্দোলনের পরের অবস্থাও বিবেচ্য। ১৪ দলের মেনিফেস্টোতে যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রতিশ্রুতি সুনির্দিষ্টভাবে দেওয়া হয়েছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তরুণরা যে আওয়ামী লীগের ভোটের ঝুলি ভর্তি করে দিয়েছিলেন তার একটি কারণ, যুদ্ধাপরাধ বিচারে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই দাবি উঠেছিল যুদ্ধাপরাধের বিচারের। আওয়ামী লীগ এক বছর দেরি করেছিল। তারপর ট্রাইব্যুনালের কথা ঘোষণা করেছিল। তখন রব উঠেছিল, ট্রাইব্যুনাল হয়েছে, গোলাম আযমরা তো গ্রেফতার হবে না। তারা গ্রেফতার হলে বলা হল তদন্ত হবে না। বিচার শুরু হলে বলা হল বিচার হবে না। বিচার শুরু হলে বলা হল বিচারে এত দিন কেন লাগবে, ইচ্ছে করে দেরি হচ্ছে যাতে রায় দিতে না হয়। এখন রায় দেওয়া হলে বলা হল, রায় মানি না। জামায়াতও রায় মানে না। আর এত দিন ওই ধরনের অপপ্রচারে জামায়াত-বিএনপি হাত ছিল না তা কীভাবে বলি!
তবে সঙ্গে সঙ্গে এ কথা বলাও দরকার এই সরকারই সমস্ত অপপ্রচারের সুযোগ দিয়েছে। তারা ট্রাইব্যুনালের অবকাঠামো সম্পর্কে আমরা যা বলেছি তার কোনো গুরুত্ব দেয়নি, হেলাফেলাভাবে বিচার-প্রক্রিয়া চালিয়েছে, অথর্ব এবং সন্দেহভাজন লোকদের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়েছে, অযোগ্য ও সুবিধাবাদী ও সুবিধাভোগীদের প্রচারের দায়িত্ব দিয়েছে। সুতরাং সরকার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার কারণও সরকার। কিন্তু তারপরও তো বিচার হয়েছে এবং ছয়জনের রায় পাওয়া গেছে। এই অর্জন কি একেবারে তুচ্ছ করার মতো?
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যা লিখেছেন তা যথার্থ। তিনি লিখেছেন, ''যুদ্ধাপরাধের বিচার কিন্তু কোনো ব্যক্তির বিচার নয়, এটি হল একটি অপরাধের বিচার। এ বিচার খুবই প্রয়োজনীয় ছিল। কারণ এটি ছিল মস্ত বড় এক অপরাধ। এমন নয় যে, কিছু ব্যক্তি একটি অপরাধ সংঘটন করেছে। এটি একটি সংগঠিত অপরাধ। … যুদ্ধাপরাধের বিচার করার এই সংস্কৃতি সারাবিশ্বেই উদাহরণ তৈরি করছে। আমরাও তেমন একটি উদাহরণ তৈরি করছি। এটাই হচ্ছে যুদ্ধাপরাধের বিচার-প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় দিক।'' [জনকন্ঠ ১৬.৭.১৩]
প্রায় একই রকম মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান: ''আমি যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবি করে এসেছি। কারও কোনো নির্দিষ্ট শাস্তি দাবি করিনি। আদালতে উপস্থাপিত তথ্য ও সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে বিচারকরা যে রায় দিয়েছেন তা আমি সুবিচার বলে গণ্য করি।'' [প্রথম আলো ১৬.৭.১৩]
যে বিচার হওয়ার কথা ছিল না, বিচার শুরু হওয়ার পর রায় হবে কি না এ সন্দেহ ছিল– সেই বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। গোলাম আযম ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধ যে হয়েছিল যা বিএনপি-জামায়াত এতদিন অস্বীকার করে আসছে, তার বিপরীতে সত্য শুধু প্রতিষ্ঠিত নয়, আইনি ভিত্তি পাচ্ছে, বিশ্বের মানুষ আবার জানতে পারছে জামায়াতে ইসলামী কত বড় ক্ষতিকর একটি প্রতিষ্ঠান, যার কাজ ধর্মের ফেরি করে মানুষ হত্যা আর ধর্ষণ। এটি আমাদের অর্জন, সরকারেরও অর্জন ও কৃতিত্ব।
তারপরও একটি কথা বলি, ১৯৭১ সালে গণহত্যার যখন ভিডিও চিত্র দেখি তখন পাগল পাগল লাগে। মনে হয় ওইসব হত্যাকারীকে হত্যা করি। গোলাম আযমরা ১৯৭১ সালে যখন হত্যাযজ্ঞ চালায় তখন তারা শিশু, নারী, অসুস্থ, বয়স্ক কিছুই বিবেচনায় আনেনি। মানবিকতা ইসলামের ধর্ম, জামায়াত বা হেজাবিদের [হেফাজত-জামায়াত-বিএনপি] নয়। সুতরাং আমাদের শুধু শুধু অনুকম্পা দেখাবার কী কারণ থাকতে পারে?
হ্যাঁ, বর্তমানে বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই দিক থেকে এ রায় আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ গ্রহণযোগ্য। আর বিরানব্বই বছর বয়সে জেলে গিয়ে আমৃত্যু জেলে থাকা খুব আনন্দের ব্যাপার নয়। তিলে তিলে দগ্ধ হয়ে মৃত্যু, ফাঁসির চেয়ে অনেক বেশি কঠোর শাস্তি। যেমনটি লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ''যদিও তার প্রাণদণ্ডাদেশ প্রত্যাশিত ছিল, কিন্তু এত দীর্ঘ সময়ের কারাদণ্ডও চরম শাস্তিই।'' [ঐ]
গোলাম আযমের দণ্ড হতই, কম বেশি, কিন্তু তার চেয়ে বিবেচ্য দণ্ড দেওয়া ছাড়া এই রায়ে আর কী বলা হয়েছে। দণ্ডের ডামাডোলে এই রায়ের বিশেষ দিকগুলো ঢাকা পড়ে গেছে।
যে কজন যুদ্ধাপরাধীর দণ্ড দেয়া হয়েছে তাঁর মধ্যে গোলাম আযমই প্রথম, যার বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগের ৬১টি কাউন্ট প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে চারটি অভিযোগ নেতৃত্বদানের উপাদান। বাকিটি সিরু মিয়া ও তার পুত্রকে খুন। সবকিছুই প্রমাণিত হয়েছে এবং বিচারকরা বলেছেন, এ কারণে তাঁর প্রাণদণ্ডাদেশ যৌক্তিক কিন্তু বয়সের কারণে তা দেওয়া হল না। এখানে উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কোনো ধারা/বিধিতে বয়সের কারণে দণ্ড লাঘবের কোনো ব্যবস্থা নেই।
গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী এবং মুজাহিদের ক্ষেত্রে আমরা শুরু থেকে বলছিলাম, নেতৃত্বের দায় প্রযোজ্য হওয়া উচিত, ইংরেজিতে যাকে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আমাদের বিচারশাস্ত্রে এ বিষয় নিয়ে তেমন কাজ হয়নি। গোলাম আযমের বিচারে প্রসিকিউশন এ বিষয়টির ওপরই গুরুত্ব আরোপ করে এবং বিচারকরা তা গ্রহণ করেছেন।
নেতৃত্বদানের কারণেই গোলাম আযমের দণ্ড দেয়া হয়েছে। এর ফলে, অন্যান্য অনেকের ক্ষেত্রে দণ্ড দেওয়া বিষয়টি সহজ হয়ে গেল। শুধু তাই নয়, আমাদের বিচারশাস্ত্রেও নতুন মাত্রা যুক্ত হল।
এই রায়ে জামায়াত সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, অন্য কোনো রায়ে বিষয়টি তেমনভাবে বলা হয়নি। আগের রায়গুলোতে জামায়াতে ইসলামীকে শুধু অপরাধী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। এই রায়ে আরও তিনটি পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে–
১. ১৯৭১ সালে জামায়াত যে রকম অপরাধী সংগঠন ছিল, এখনও তাই আছে।
২. এই নেতৃত্ব তরুণদের বিপথগামী করছে।
৩. জামায়াতের কোনো ব্যক্তিকে সরকারি বা বেসরকারি কোনো পদে রাখা বাঞ্ছনীয় নয়। এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে স্বচ্ছ চিন্তার, মুক্তবুদ্ধির মানুষের চিন্তা মিলে যায়। কিন্তু এই পর্যবেক্ষণ কতগুলো প্রশ্ন তুলেছে–
ক. অপরাধী সংগঠনকে রাজনীতি করতে দেওয়া উচিত কি না বা তার সেই অধিকার থাকে কিনা;
খ. অপরাধী সংগঠনের সদস্যরাও তো অপরাধী [প্রতি হরতালে এই অপরাধীরা রাস্তায় গাড়ি পোড়ানো, বোমা নিক্ষেপ ও মানুষ ও পুলিশ হত্যা করছে;]
গ. এই অপরাধীদের সামরিক-বেসামরিক চাকরিতে রাখা যায় কি না;
৪. বিএনপি এই অপরাধী সংগঠনের সঙ্গে রাজনীতি করছে, সুতরাং সেটিও অপরাধ কিনা, সরকারকে শুধু নয়, সমাজকেও এ বিষয়ে ভাবতে হবে, বিশেষ করে তরুণদের। অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা শুধু নয়, তাদের সঙ্গে মিলে তারা যে রাজনীতি করছে, সেটিও কি রাজনীতি, নাকি অপরাধমূলক কার্যকলাপের বিস্তৃতি ঘটাচ্ছে। এ সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন–
১. জামায়াত যে সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে সেগুলো মাফিয়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত হবে কিনা।
২. হলে, সেগুলোর কার্যক্রম চালু থাকবে কিনা।
৩. সেগুলো এফবিসিসিআইয়ের মতো বাণিজ্যিক সংগঠনে থাকতে পারবে কিনা।
এ বিষয়গুলোরও ফয়সালা হওয়া উচিত। আদালতের আদেশে কিন্তু বিশ্বের অনেক জায়গায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তি ঘটেছে। তবে আমাদের দেশে মানুষ মূলত আওয়ামী লীগবিরোধী। সুতরাং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে এই দাবিগুলো বিবেচনা না করলে সরকার একা এ কাজ করতে পারবে না, সাহসও করবে না। তবে পদওয়ালা জামায়াতীদের পদ থেকে তো সরানো যেতে পারে। এ বিষয়ে কোনো না কোনো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেসব জামায়াতী ও তাদের সমর্থক আছে তাদের এবং আমলাতন্ত্রে চিহ্নিত যারা আছে তাদের অপসারণের মাধ্যমে কাজটি শুরু করা যায় কিনা সেটি ভেবে দেখতে হবে।
অনেকে প্রশ্ন করবেন বা বলবেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে কথিত দল নিজের ঘর আগে পরিষ্কার করুক। এই সঙ্গে আরও প্রশ্ন উঠতে পারে বিশেষ করে হেজাবিরা যে প্রশ্ন করতে পারে তা হল এটি তো পর্যবেক্ষণ, রায় নয়। তাহলে বলতে হবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়েও তো আন্দোলন চলে না, কারণ হেজাবিরা যে বলছে, আদালতের রায় আছে তত্ত্বাবধায়কের পক্ষে তা তো ঠিক নয়। সেটিও তো পর্যবেক্ষণ।
গোলাম আযমের নব্বই বছরের দণ্ড নিয়ে ক্ষোভের আরেকটি কারণ হচ্ছে এই যে, সবার আশঙ্কা, বিএনপি বা ১৮ দলীয় জোট ক্ষমতায় এলে গোলাম আযমকে ছেড়ে দেওয়া হবে। সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অনেক সাংবাদিকও। তাদের তাহলে বলব, এই যদি শঙ্কা হয় তাহলে স্বীকার করে নিতে হবে যে, এদেশে আওয়ামী লীগ বা ১৪ দলীয় জোট মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আর বিএনপি বা ১৮ দলীয় জোট মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের। সুতরাং, যুদ্ধাপরাধ বিচার অব্যাহত রাখা ও রায় কার্যকর করার জন্য তো ১৪ দলকেই আবার ভোট দিতে হয়।
১৪ দলকে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে অনীহা থাকবে, আবার এদের বিচার ও দণ্ড কার্যকর নিয়ে আশঙ্কা করা হবে– দুটো তো এক সঙ্গে চলে না। আর এসব জঞ্জাল পরিষ্কার শুধু আওয়ামী লীগেরই দায়িত্ব, সুশীল বা সাধারণ বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল বা মিডিয়ার নয়– তা তো হতে পারে না। গোলাম আযমের দণ্ডাদেশ দেওয়ার পর অনেকে বলছেন, আওয়ামী লীগ কেন সন্তুষ্ট এই রায়ে? এই সরকার ট্রাইব্যুনাল করেছে, এই সরকার ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে কীভাবে প্রশ্ন তোলে? অনেকে বলেছেন, আওয়ামী লীগ যে জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত করছে এ রায় তারই প্রমাণ। অনেক বাঘা রাজনীতিবিদও এ কথা বলেছেন।
এসব দায়িত্বহীন উক্তি। এসব উক্তির অর্থ দাঁড়ায়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের নির্দেশে কোর্ট-কাছারি চলছে। এটি শুধু বিচার ব্যবস্থা নয়, বিচারকদের প্রতিও অবমাননাকর মন্তব্য। এ ধরনের সস্তা মন্তব্য না করা শ্রেয়। যদি বিচারকরা সেই মতো রায় দিতেন তাহলে আমৃত্যু জেল না দিয়ে যাবজ্জীবন দিতেন এবং জামায়াত সম্পর্কেও এত কঠিন কঠিন মন্তব্য করতেন না।
এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে একটি টেলিভিশনে চট্টগ্রামের এক মুক্তিযোদ্ধার মন্তব্য আমার ভালো লেগেছে। তিনি বলছিলেন, শহীদ পরিবারের জন্য এই রায় অপ্রত্যাশিত। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য যথেষ্ট। কারণ ১৯৭১-৭২ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে অস্ত্র ছিল। তাঁরা যুদ্ধাপরাধীদের নিধন না করে, শাস্তি না দিয়ে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। শুধু মুক্তিযোদ্ধারা নয়, সমাজ তাদের গত পঁয়ত্রিশ বছর আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে সে সমাজের অন্তর্গত আমরাও। বিচার বা দণ্ডাদেশ প্রত্যাখ্যান করার আগে যেন আমরা এ বিষয়টিও চিন্তায় রাখি।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচার বিলম্বের কারণ ভূমিকায় বলেছেন– রায় আরও দ্রুত হত, ভালো হত যদি তারা অবকাঠামোগত সুবিধা পেতেন। তিনি উল্লেখ করেছেন একটি রেফারেন্স লাইব্রেরি নেই, এক সেট মাত্র স্বাধীনতার দলিলপত্র আছে ছয় বিচারকের জন্য। এসব কথা আমরা অনেকবার বলেছি। সরকার এটিকে গুরুত্ব দেয়নি। হেলাফেলা করেছে। লাজলজ্জা থাকলে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করব– বিচার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হলে অবকাঠামোর উন্নয়ন করুন। এই সীমিত সাধ্যে তদন্ত, টিম, প্রসিকিউশন, বিচারকরা যে কাজ করছেন সে জন্য তাঁরা অবশ্যই সমাজের অভিনন্দন পেতে পারেন।
সবশেষে বলি, যুদ্ধাপরাধের বিচার তো আমরা চেয়েছি। এর অর্থ আমরা 'ডিউ প্রসেস অব ল' বা নির্দিষ্ট বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে চেয়েছি। ট্রাইব্যুনাল হয়েছে, সুতরাং ট্রাইব্যুনালের রায়ও আমাদের গ্রহণ করতে হবে, মানতে হবে। দণ্ড আমাদের পছন্দ না হলে আপিলের সুযোগ আছে। আমাদের বরং এখন গোলাম আযমের মৃত্যুদণ্ডের জন্য আপিলের দাবি তোলা উচিত। বলা উচিত জামায়াত নিষিদ্ধ করা হোক, যেহেতু এটি একটি মাফিয়া সংগঠন। দাবি তোলা উচিত, এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করতে হবে। নির্বাচন কমিশন এ বিষয় নিয়ে রাজনীতি করছে। এটি ঠিক নয়।
আমরা নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার চেয়েছি দেখেই জামায়াতের কোটি কোটি টাকা খরচের পরও ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করা যায়নি আন্তর্জাতিকভাবে। প্রতিটি রায়ই প্রশংসিত হয়েছে। সুতরাং আমরা যেন প্রতিটি রায়ের পর আবেগে এমন কিছু না করি যাতে রায় বিতর্কিত হয়ে যায়, আমাদের অর্জনটুকুও বিনষ্ট হয়।
[চলবে]
মুনতাসীর মামুন: অধ্যাপক, লেখক ও গবেষক।
