Published : 11 Oct 2013, 12:15 AM
কয়েক বছর আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপরীক্ষা দিতে এসে একটা ছেলে গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে মারা গিয়েছিল। আমি এই ঘটনাটার কথা কিছুতেই ভুলতে পারি না। শুধু মনে হয় কোনো দূর এক শহর থেকে ভর্তিপরীক্ষা দিতে এত দূরে তাকে টেনে আনার জন্যেই হয়তো তাকে এত অল্পবয়সে মারা যেতে হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপরীক্ষার নামে সবাই মিলে যে ভয়ংকর একটি হৃদয়হীন পদ্ধতি দাঁড় করিয়ে রেখেছে সেই পদ্ধতিটিই কি কোনোভাবে এর জন্যে দায়ী নয়?
আবার ভর্তিপরীক্ষা আসছে। আমি জানি হাজার হাজার ছেলেমেয়ে তাদের অভিভাবকদের নিয়ে ভর্তিপরীক্ষা দেওয়ার জন্যে এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াবে। খাওয়া-ঘুম-বিশ্রাম দূরে থাকুক, অনেক জায়গায় তাদের একটা বাথরুমে যাবার সুযোগ পর্যন্ত থাকবে না।
অথচ এর কোনো প্রয়োজন ছিল না, খুব সহজেই ছাত্রছাত্রীদের এই ভয়ংকর অমানবিক ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ ছিল। বাংলাদেশের সব কয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যদি রাজি হত তাহলে খুব সহজেই সবাই মিলে একটি (হ্যাঁ, মাত্র একটি) চমৎকার মানসম্মত ভর্তিপরীক্ষা নিয়েই এই দেশের সব ছাত্রছাত্রীকে নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্যে বিবেচনা করতে পারত।
এই সরকার আসার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ডেকে সম্মিলিত ভর্তিপরীক্ষার একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। সেখানে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন এবং আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বিষয়টির সম্ভাব্যতা নিয়ে একটা বক্তব্য দিতে।
আমি একটু গাধা প্রকৃতির মানুষ, তাই সরল বিশ্বাসে সকল তথ্য-উপাত্ত নিয়ে হাজির হয়েছিলাম। বক্তব্য শুরু করার আগেই অবশ্য টের পেয়েছিলাম আমার সেখানে হাজির হওয়াটাই বড় ধরনের নির্বুদ্ধিতা হয়েছে!
সেখানে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলররা আসেন দেরি করে এবং চলে যান সবার আগে। যাবার আগে বলে যান যে তাদের বহুলপরীক্ষিত একটা ভর্তিপরীক্ষা পদ্ধতি চালু আছে; সেটা নড়চড় করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। গুরুত্বপূর্ণ ভাইস চ্যান্সেলররা বলেন যে, তারা কঠিন নিরাপত্তার মাঝে ভর্তিপরীক্ষা নেন; সবাই মিলে পরীক্ষা নিলে তাকে কে সেই নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেবে?
একজন ভাইস চ্যান্সেলর খোলাখুলি বলেই ফেললেন, তিনি যদি সম্মিলিত ভর্তিপরীক্ষার মতো একটা প্রস্তাব নিয়ে তার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যান তাহলে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে।
বেশিরভাগ ভাইস চ্যান্সেলর অবশ্য আমার বক্তব্যের মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারলেন না কিংবা বোঝার চেষ্টাও করলেন না। আমার ছেলেমানুষী বক্তব্য শুনে হতাশভাবে মাথা নাড়তে থাকলেন।
শেষ পর্যন্ত কিছুই হল না, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজের মতো করে ভর্তিপরীক্ষা নিতে থাকল। আমার ধারণা বিষয়টা আরও খারাপ হল। বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মনে হয় প্রায় রাগ করেই ছোট ছোট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যে নির্ধারিত পরীক্ষার দিনগুলোতে ইচ্ছেমতো তাদের ভর্তিপরীক্ষার তারিখ ফেলতে লাগল এবং বাধ্য হয়ে ছোট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শেষমূহূর্তে তাদের পরীক্ষার তারিখ পাল্টাতে বাধ্য হল।
আমি জানি আমাদের পরপর দুই বছর কুয়েটের সঙ্গে একই দিনে পরীক্ষা নিতে হয়েছে। যেসব ছেলেমেয়েদের এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ার আগ্রহ ছিল তারা মন খারাপ করে, ক্ষুব্ধ হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশা ছেড়ে দিয়ে অন্য একটিতেই সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হয়েছে।
কিছুদিন আগে ইউজিসি থেকে আবার সকল বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সম্মিলিত ভর্তিপরীক্ষার সম্ভাব্যতা আলোচনা করার জন্যে সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিনিধিদের ডেকে পাঠানো হয়েছিল। ন্যাড়া দুইবার বেলতলায় যায় না। কিন্তু এটি আমার প্রিয় বেল, তাই ন্যাড়া হয়েও আবার বেলতলায় গিয়েছিলাম।
আমি এবারে খানিকটা কৌতুক এবং অনেকখানি বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করলাম সব বিশ্ববিদ্যালয়ই সম্মিলিত ভর্তিপরীক্ষার পক্ষে বক্তব্যে দিলেন। শুধু তাই নয়, কখন কীভাবে এই পরীক্ষাটি নেওয়া যায় সেই খুঁটিনাটি নিয়েও দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা হল এবং আমি যেহেতু নির্বোধ প্রকৃতির, তাই আবার একটু আশা নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম!
দেখতে দেখতে আবার ভর্তিপরীক্ষার সময় এসেছে এবং দেখা গেল অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি, সব বিশ্ববিদ্যালয়েই তাদের নিজেদের ভর্তিপরীক্ষা নিচ্ছে। কেউ কেউ বরং উল্টোপথে হাঁটতে শুরু করেছেন; শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষার সন্তুষ্ট না থেকে প্রত্যেকটা বিভাগের জন্যে আলাদা আলাদা ভর্তিপরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন!
এই দেশের হতভাগ্য ছাত্রছাত্রীদের পীড়ন করার জন্যে এর চাইতে নির্মম কিছু আবিষ্কার করা যায় কি না আমার সেটি জানা নেই।
এই বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষা পদ্ধতির কোনোই পরিবর্তন হয়নি সেটি অবশ্য পুরোপুরি সত্যি নয়, খুব ছোট একটা পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তনটা এত ছোট যে হয়তো কারও চোখেই পড়বে না; কিন্তু আমার ধারণা পরিবর্তনটা গুরুত্বপূর্ণ।
বিষয়টি খুলে বলা যাক। কিছুদিন আগে যশোর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে তাদের সমাবর্তন বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল (আমার জন্যে সেটি ছিল অনেক বড় একটা দায়িত্ব এবং অবশ্যই অনেক বড় সম্মান)।
সমাবর্তনের পুরো অনুষ্ঠান শেষ করে যখন ফিরে আসছি তখন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর আমাকে বললেন, "আমরা তো অনেকদিন থেকেই সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটা ভর্তিপরীক্ষার জন্যে চেষ্টা করে আসছি, কথাবার্তা হচ্ছে কিন্তু কোনো কাজ তো হচ্ছে না। শুধু আমরা আর আপনারা মিলে একটা যৌথ ভর্তিপরীক্ষা নিলে কেমন হয়? একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় মিলে যে একটা ভর্তিপরীক্ষা নেওয়া যায় তার একটা উদাহরণ তৈরি হোক!"
আমি বললাম, "চমৎকার আইডিয়া। আপনার প্রস্তাবটা আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাব, দেখি সবাইকে রাজি করানো যায় কিনা।"
নিজেদের প্রশংসা করা ঠিক না, তারপরেও বলছি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় অনেক ভবিষ্যৎমুখী, অনেক আধুনিক। যশোর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবটা আমাদের একাডেমিক কাউন্সিলে উপস্থাপন করা মাত্রই সবাই সেটি আগ্রহে লুফে নিল।
আমি সেটি যশোর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয়কে জানালাম এবং তখন তারা খুঁটিনাটি আলাপ-আলোচনা করার জন্যে তাদের কয়েকজন ডিন, বিভাগীয় প্রধান, সিনিয়র শিক্ষক, তরুণ প্রযুক্তিবিদ নিয়ে সারারাত গাড়ি চালিয়ে যশোর থেকে সিলেটে হাজির হয়ে গেলেন।
সম্মিলিত ভর্তিপরীক্ষার জন্যে আমরা যে পদ্ধতিটি গ্রহণ করতে যাচ্ছি সেটি এমনভাবে দাঁড় করানো হয়েছে যেন এর কারণে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কেই তাদের প্রচলিত কোনো নিয়ম পরিত্যাগ করতে হবে না। ভিন্ন ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম পুরোপুরি বজায় রেখেই এই সুযোগটি নিতে পারবে।
সেটি সম্ভব হয়েছে, তার কারণ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষায় কখনওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিভাগের বিষয় নিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয় না। ঘুরেফিরে সব সময়েই ছাত্রছাত্রীর এইচএসসির বিষয়গুলোর উপর পরীক্ষা নেওয়া হয়।
অর্থাৎ যে ছাত্রটি কম্পিউটার সায়েন্স কিংবা কেমিকেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্যে ভর্তিপরীক্ষা দিতে যাচ্ছে, কম্পিউটার সায়েন্স বা কেমিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে তার জ্ঞানের পরীক্ষা করা হয় না। পরীক্ষা করা হয় তার এইচএসসির পদার্থ বিজ্ঞান, গণিত, রসায়ন ইংরেজি ইত্যাদি বিষয়ে।
যদি এইচএসসির পরীক্ষাটি সত্যি সত্যি ছাত্রছাত্রীর সত্যিকারের মেধা যাচাই করতে পারত এবং ফলাফল মাত্র কয়েকটা গ্রেডের মাঝে সীমাবদ্ধ করে ফেলা না হত তাহলে আলাদাভাবে আমাদের কোনো ভর্তিপরীক্ষা নেওয়ারই প্রয়োজন ছিল না। যেহেতু আমরা এইচএসসি পরীক্ষাটুকুর উপর পুরোপুরি নির্ভর করতে পারি না, তাই সেই এইচএসসির বিষয়গুলোরই নূতন করে নিজের মতো করে পরীক্ষা নিই।
কাজেই সম্মিলিত ভর্তিপরীক্ষার মূল ধারণাটি হচ্ছে এইচএসসি পর্যায়ের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর পরীক্ষা নিয়ে নেওয়া; তারপর যে বিশ্ববিদ্যালয় যে বিষয়ের মার্কস যেভাবে ব্যবহার করতে চায় তাদেরকে সেভাবে ব্যবহার করতে দিয়ে মেধাতালিকা তৈরি করে দেওয়া হবে।
একসময় এটা খুব কঠিন ব্যাপার ছিল; কম্পিউটারের কারণে এখন এটা পানির মতো সোজা। এটি যুগান্তকারী নূতন কোনো ধারণা নয়, SAT বা GRE তে ঠিক এ রকমভাবেই পরীক্ষা নেওয়া হয়। আমাদের একটা বাড়তি সুবিধে রয়েছে, টেলিটক মোবাইল টেলিফোনের কারণে ছাত্রছাত্রীদের এসএসসি বা এইচএসসির মার্কসগুলো সরাসরি পেয়ে যাই।
যে বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে এই মার্কস ব্যবহার করতে চায় তারা সেটি করতে পারবে। (আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম যখন শুধুমাত্র একটি এসএমএস দিয়ে রেজিস্ট্রেশনের পুরো প্রক্রিয়া শেষ করার পরিকল্পনা করেছিলাম তখন বনেদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আমাদের অনেক রকম ভয়ভীতি দেখিয়েছিল; এখন দেখি তারাও আনন্দের সঙ্গে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে যাচ্ছে)!
একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় একসঙ্গে পরীক্ষা নেওয়ার একটা বড় সুবিধে হচ্ছে ভর্তিপরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি করার সময় শুধুমাত্র একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সহযোগিতা নিয়ে খুশি থাকতে হবে না, দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বসে প্রশ্ন তৈরি করতে পারবেন। সে জন্যে হয়তো তাদের দুয়েকদিন একসঙ্গে বসতে হবে। কিন্তু কোনো শিক্ষকই সেটা করতে আপত্তি করবেন না।
এই পদ্ধতিটি গ্রহণ করা হলে সবচেয়ে বড় লাভ হবে ছাত্রছাত্রীদের। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সারাদেশ থেকে ছাত্রছাত্রীরা পড়তে আসে; যার অর্থ সারাদেশ থেকে ছাত্রছাত্রীদের ভর্তিপরীক্ষা দিতে আসতে হয়। এই বছর তাদের কষ্ট অনেক কমে যাবে। সেই উত্তরবঙ্গের ছাত্রছাত্রীদের কষ্ট করে সিলেট আসতে হবে না, তারা কাছাকাছি যশোর ক্যাম্পাসেই পরীক্ষা দিয়ে দিতে পারবে।
ঠিক সে রকম সিলেট এলাকার কোনো ছাত্রছাত্রী যদি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চায় তাকে আর কষ্ট করে যশোরে যেতে হবে না, তারা সিলেটে বসে ভর্তিপরীক্ষা দিয়ে দিতে পারবে। একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো বিভাগের জন্যে বিবেচিত হতে পারবে।
আমাদের এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষার তারিখ নভেম্বরের শেষে (৩০ নভেম্বর)। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। আমাদের তরুণ শিক্ষকেরা সব কিছু গুছিয়ে রেখেছে। আমরা ইচ্ছে করলেই নেটে দেখতে পারি কতজন এখন পর্যন্ত এই দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপরীক্ষা দিতে রেজিস্ট্রেশন করেছে।
রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শেষ হতে এখনও কয়েক সপ্তাহ বাকি। এর মাঝে আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রতি দশজনের মাঝে একজন ঠিক করেছে তারা যশোরে বসে সিলেটের জন্যে কিংবা সিলেটে বসে যশোরের জন্যে ভর্তিপরীক্ষা দেবে। যার অর্থ ভর্তিপরীক্ষার সময় বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী আর তাদের অভিভাবকদের দেশের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় না ঘুমিয়ে না খেয়ে না বিশ্রাম নিয়ে আসতে হবে না!
ভবিষ্যতে যদি আমাদের এই উদ্যোগের সঙ্গে আরও বিশ্ববিদ্যালয় যোগ দেয় তাহলে কী চমৎকার একটা ঘটনাই না ঘটবে!
২.
আমাদের বিশ্বাস আমরা যে উদ্যোগটি নিয়েছি সেটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ, একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় মিলে যে একটি ভর্তিপরীক্ষা নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের ভোগান্তি কমানো সম্ভব সেটি হয়তো এবার প্রমাণ করা যাবে। অবশ্যই এটি নূতন করে প্রমাণ করার কিছু নেই, মেডিকেলের ভর্তিপরীক্ষায় বহুদিন থেকে এটি করা হচ্ছে।
শুধু যে মেডিকেল কলেজের জন্যে এটি করা হয় তা নয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতি বছর সারাদেশের অসংখ্য কলেজে তিন-চার লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভর্তিপরীক্ষা নেয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা একবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপ্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তখন আমি সরাসরি নিজের চোখে এই বিশাল দক্ষযজ্ঞটি দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম।
দীর্ঘদিন থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষতার সঙ্গে এই পরীক্ষাটি চালিয়ে আসছে। যার অর্থ বাংলাদেশের সব কয়টি বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটি ভর্তিপরীক্ষা নিতে হলে যে কাজগুলো করতে হবে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিরবে প্রতি বছর এই কাজগুলো করে আসছে।
অথচ মজার ব্যাপার হল, আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যম কখনওই এই বিশাল প্রক্রিয়াটি দেশের মানুষের নজরে আনেনি। কোনো একটা অজ্ঞাত কারণে আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যম খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতিবাচক খবরগুলো বের করে সেটা ফলাও করে প্রচার করতে পছন্দ করে, তাদের সত্যিকারের ইতিবাচক সংবাদটিও কাউকে জানাতে আগ্রহী হয় না।
মজার ব্যাপার হচ্ছে দেশের হাই-ফাই ইউনিভার্সিটির হাই-ফাই গ্রাজুয়েটদের প্রায় সবাই কিন্তু দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে; দেশটি চালাচ্ছে কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটরা। অথচ সংবাদমাধ্যমের এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যে কোনো সমবেদনা নেই, কোনো মমতা নেই।
আমাদের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশালসংখ্যক ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে। দেশের সরকার যদি এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটু গুরুত্ব দিয়ে তাদের সমস্যাগুলো মিটিয়ে দিতে আগ্রহী হত তাহলে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর নয়, আমার নিজের দেশের অনেক বড় উপকার হত!
৩.
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষা শেষ হওয়া মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অল্পকিছু আসন, পরীক্ষার্থী অসংখ্য। তাই বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই আসলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় না। জিপিএ ফাইভ বা গোন্ডেন ফাইভ পাওয়া অনেক ছাত্রছাত্রী যখন আবিষ্কার করে ভর্তিপরীক্ষার মেধাতালিকায় তাদের নাম নেই তখন তারা একটা অনেক বড় ধাক্কা খায়।
যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে তারা এতদিন লেখাপড়া করে এসেছে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে এসেছে, হঠাৎ করে তাদের আত্মবিশ্বাস ধূলিস্যাৎ হয়ে যায়, স্বপ্ন খান খান হয়ে যায়। আমি এই ছাত্রছাত্রীদের বলতে চাই, সবসময়েই কিন্তু এর জন্যে তারা নিজেরা দায়ী নয়। এই দেশের অনেক নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষার প্রশ্নই কিন্তু খুব নিম্নমানের। অনেক সময়েই মেধাতালিকায় ভালো করা আর লটারিতে নাম ওঠার মাঝে বড় কোনো পার্থক্য নেই।
হাইকোর্টে থেকে একবার আমাকে খুব বড় একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো একটা ইউনিটের ভর্তিপরীক্ষা নিয়ে মতামত দেওয়ার জন্যে ডেকেছিল। আমার তখন সেই ইউনিটের প্রশ্নগুলো দেখার সুযোগ হয়েছিল। আইনজীবীরা কোন প্রশ্নটি কোথা থেকে নেওয়া হয়েছে সেটা খুঁজে খুঁজে বের করে দাখিল করেছিলেন এবং আমি এক ধরনের আতংক নিয়ে আবিষ্কার করেছিলাম সেই ভর্তিপরীক্ষার প্রতিটি প্রশ্নই কোনো না কোনো গাইড বই থেকে নেওয়া!
কাজেই ভর্তিপরীক্ষার মেধাতালিকায় ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের নাম খুঁজে না পেলে তারা যেন মন খারাপ না করে, নিজের উপর বিশ্বাস যেন না হারায়। সব সময়েই সেটি মেধার অভাব নয়, অনেক সময় সেটি সঠিক গাইড বই মুখস্থ করার ইচ্ছের অভাবও হতে পারে! এই দেশে যে ভর্তি-কোচিংয়ের বিশাল একটা রমরমা ব্যবসা হতে থাকে তার একমাত্র কারণ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষায় মুখস্থ-নির্ভর গাইড বইয়ের প্রশ্ন!
৪.
আমি মনে করি এখন আমাদের সময় হয়েছে অন্তত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীদের সত্যিকারের সম্মিলিত একটি ভর্তিপরীক্ষা উপহার দেওয়ার। নিঃসন্দেহে তার আগে অনেকগুলো বাধা পার হয়ে আসতে হবে। কিছু কিছু বাধা হয়তো বেশ জটিল, মনে হতে পারে প্রায় দুঃসাধ্য।
কিন্তু এই দেশের নূতন প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে আমরা যদি সিদ্ধান্তটি নিয়ে নিই তাহলে এই দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক মিলে নিশ্চয়ই সব বাধা অতিক্রম করতে পারব। কিন্তু সিদ্ধান্তটি নিতে হবে প্রথম।
যদি সেই সিদ্ধান্তটি নিতে না পারি তাহলে নূতন প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।
আর সংবাদমাধ্যম যদি ভর্তিপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আমাদের ব্যাংক-ব্যালেন্স কতটুকু বেড়ে যায় সেই তথ্যটি প্রকাশ করে দেয় তাহলে আমরা দেশের মানুষের সামনে লজ্জায় মুখও দেখাতে পারব না!
আমাদেরকেই ঠিক করতে হবে আমরা কী চাই।
৮.১০.১৩