২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রেম-ভালোবাসাহীন চলচ্চিত্র: সাংস্কৃতিক সংকটে বাংলাদেশ

প্রেমহীন চলচ্চিত্র তৈরির আবদার কি আসলে এক দরদহীন ও নিষ্ঠুর সমাজ গড়ারই চক্রান্ত নয়? সমাজ থেকে নিত্য হারিয়ে যাওয়া উদারতা আর সংস্কৃতির ওপর এই উগ্র আক্রমণকে আমরা কীভাবে রুখে দাঁড়াব?

প্রেম-ভালোবাসাহীন চলচ্চিত্র: সাংস্কৃতিক সংকটে বাংলাদেশ
সিনেমার প্রেমময় ইতিহাস মুছে ফেলা সহজ নয়—বাংলাদেশ যুগে যুগে ভালোবাসাতেই বেঁচে আছে।

অজয় দাশগুপ্ত অজয় দাশগুপ্ত

Published : 28 Aug 2026, 10:24 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:28 PM

‘পরিবর্তনই জীবন’—এ কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। গীতার কর্মযোগ ও সাংখ্য যোগ অংশে বলা হয়েছে যে, পরিবর্তন হলো সৃষ্টির শাশ্বত ও প্রাকৃতিক নিয়ম; যা কিছু স্থির বা অপরিবর্তনীয় নয়, তা-ই জীবন। যুগে যুগে দার্শনিকরাও এই সত্যই উচ্চারণ করে গেছেন। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাস যেমন সরল সত্যটি জানিয়ে দিয়েছিলেন—পরিবর্তনই জীবনের একমাত্র ধ্রুব বাস্তবতা।

তবে সমাজ ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন মূলত দু’রকমের রূপ নিয়ে আসে: শুভ এবং অশুভ। আর এই দুই ধরনের পরিবর্তনের প্রভাবও সমাজের ওপর পড়ে ভিন্নভাবে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথাই ধরা যাক। এটি ছিল এক অভাবনীয় শুভ পরিবর্তন, যা আমাদের চেতনা ও জাতীয় অস্তিত্বকে গভীরভাবে পুনর্গঠিত করেছিল। সেই সংগ্রামমুখর দিনগুলোতে পুরো দেশ ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠেছিল নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও জাতীয় পরিচয়কে আঁকড়ে ধরে। চরম সংকটের মুহূর্তে আলোকবর্তিকার মতো প্রেরণা হয়ে দেখা দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; আর প্রতি পদক্ষেপে স্পন্দন হয়ে বেজেছিল কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল চল চল’ গানের সেই অদম্য যাত্রাসংগীত।

কিন্তু ইতিহাসের চাকা সবসময় এক রেখায় ঘোরে না। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবার-পরিজনসহ খুন হলেন। এর মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে চার জাতীয় নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এরর মধ্য দিয়ে নেমে আসে এক অন্ধকার ও অশুভ পরিবর্তনের ছায়া। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, সেই মুহূর্তে জাতির অগ্রযাত্রা থমকে গিয়েছিল। তবে ইতিহাস বলে, তা শত আঘাতে ধীর হলেও একেবারে থেমে যায়নি।

আমাদের দুশমন বা শত্রুপক্ষ আমাদের সেই রক্তার্জিত গতিকে স্তব্ধ করতে পারেনি। দুশমন বলতে আমরা যেন ভুল না বুঝি, বিভ্রান্ত না হই। আমাদের আসল শত্রু তারা, যারা যেকোনো উপায়ে, যেকোনো ছলে রূপ বদলে বাঙালিকে নিচু করে রাখতে চায়। ইতিহাস সাক্ষী—তাদের চরম আস্ফালন, চক্রান্ত আর অপপ্রয়াসের পরও বাংলাদেশ কখনো হেরে যায়নি।

এই অপরাজিত থাকার মূল শক্তিটাই ছিল আমাদের সংস্কৃতি। সে সময় আমাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তি এতটাই সুদৃঢ় ও শক্তিশালী ছিল যে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির যাবতীয় মারমুখী প্রতিরোধ তার গায়ে ধাক্কা খেয়ে বার বারবার ফিরে গিয়েছে। চরম সংকটকালে আমরা আশ্রয় নিয়েছি সংস্কৃতিরই গভীর স্নেহে, যা আমাদের এক পরম মমতায় শিশুর মতো আগলে রেখেছিল।

এমনকি এই তো সেদিনও আমাদের সমাজে সংস্কৃতি চর্চা মানুষের জীবনযাত্রার মূল প্রেরণা হয়ে উপস্থিত ছিল। নাটক, সিনেমা, গান, নাচ আর কবিতার আলোয় ঝলমল করত আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের পুরো ক্যানভাস। নারী ও পুরুষের মধ্যে সামাজিক সৌজন্যের সূক্ষ্ম দেয়াল হয়তো ছিল, কিন্তু আজকের মতো এমন উগ্র বিদ্বেষ ও বিভেদের সুউচ্চ প্রাচীর হয়ে দেখা দেয়নি।

তবে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আমরা স্বীকার করি আর না-ই করি, গত এক দশকে আমাদের সমাজমানসে অলক্ষ্যে সুদূরপ্রসারী অশুভ পরিবর্তন ঘটে গেছে। এই বিপর্যয়ের পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক কাঠামোর চূড়ান্ত নিষ্ক্রিয়তা যেমন দায়ী, তেমনই নতুন ডিজিটাল দুনিয়ার অনিয়ন্ত্রিত আগ্রাসনও কম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেনি। আন্তর্জাতিক সীমানাজুড়ে ধর্মীয় উগ্রবাদের বাড়বাড়ন্ত, ঘরের দরজায় ধর্মান্ধতার বিষাক্ত ছোবল এবং একাত্তরের পরাজিত শক্তির আস্ফালন যখন ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছিল, তখন আমাদের শাসক কিংবা সমাজ তা নিয়ে মাথা ঘামায়নি।

তারা ব্যস্ত ছিল লোকদেখানো সব সাংস্কৃতিক আয়োজন ও প্রচারসর্বস্ব অনুষ্ঠান নিয়ে। ফলে আমাদের সংস্কৃতি হয়ে পড়েছিল খাচায় বন্দি কোনো ডানাকাটা পাখির মতো—যা বাইরে থেকে দেখতে হয়তো চমৎকার শোনাত, কিন্তু আকাশের মুক্ত বাতাসে ওড়ার সক্ষমতা তার ছিল না। আর সেই ডানাকাটা পাখিকে নিছক দৃশ্যকাব্য বানিয়ে খাঁচায় বন্দি রেখে আমরা যখন নিশ্চিন্তে আকাশে হিংস্র চিল, বাজ আর শকুনদের নিশ্চিন্তে ডানা মেলতে দিয়েছি, তারা সুযোগ বুঝে নীরবে পুরো সমাজটাকেই আজকের এই সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

আমি আবারও স্পষ্ট করে বলতে চাই—এখানে বিদায়ী কর্তৃত্ববাদী কোনো ব্যবস্থা কিংবা নির্দিষ্ট দলের সংকীর্ণ রাজনৈতিক সমীকরণের কথা বলছি না। আমি বলছি একটি উদারনৈতিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ আজ যে করুণ অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে, তার কথা। রাতারাতি ভোজবাজির মতো সমাজের বুক থেকে সমস্ত উদারতা, পরমতসহিষ্ণুতা আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ লোপ পেয়ে যাওয়া কি চট করে মেনে নেওয়ার মতো কোনো সাধারণ বিষয়?

যে মাটিতে লালন সাঁইয়ের বাণী মর্মরিত হয়েছে, যে মাটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাউল, ফকির, দরবেশ আর সুফিবাদের শান্তিময় দর্শনে সিক্ত হয়েছে—সেই মাটিতেই আজ তারা এভাবে একের পর এক লাঞ্ছিত ও আক্রান্ত হবেন, এ কথা কি সত্যি কিছুদিন আগেও কেউ ভেবেছিলেন? কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, তা-ই ঘটেছে এবং এখনও প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে।

খুব সাদা চোখে একটু খেয়াল করে দেখুন—কোনো একটি সম্প্রদায়ের মানুষকে এভাবে একের পর এক হত্যা করা হবে, আর নানা ধরনের দুর্বল চিত্রনাট্য সাজিয়ে আপনার-আমার চিন্তাশক্তি ও বিবেককে গোলকধাঁধায় ফেলে দেওয়া হবে, এমন দৃশ্য কি আমরা আগে কখনো দেখেছি?

আপনার হয়তো মনে হতে পারে, পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে তারা বাধ্য হয়ে এমন দুর্বল স্ক্রিপ্টের আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি মোটেও তা নয়। এভাবে একের পর এক মানুষকে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করা গেলে মূল সত্যটা আপনাতেই ধোঁয়াশায় ঢাকা পড়ে যায়। আর কোনো মিথ্যাকে যখন প্রতিনিয়ত উচ্চস্বরে পুনরাবৃত্তি করা হয়, তখন একসময় সেটাই সমাজের চোখে সত্য বলে প্রতিভাত হতে শুরু করে। আজ পুরো দেশজুড়ে ঠিক সেই সুপরিকল্পিত বিভ্রান্তির মহোৎসবই চলছে।

একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে মাইকে ঘোষণা দিয়ে দেশ ছাড়ার হুমকি দেওয়া নিশ্চয়ই কোনো সামান্য স্পর্ধা নয়। এমনকি দেখলাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পর্যন্ত শান্তভাবে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না, তাকে থামাবার চেষ্টায়ও ব্যবহৃত হচ্ছে চূড়ান্ত আক্রমণাত্মক ভাষা ও উগ্রতা। চারপাশের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবভঙ্গি ও সামাজিক উন্মাদনাই বলে দিচ্ছে—আমাদের এই প্রিয় স্বদেশ আজ ভালো নেই।

যে বিষয়টি লিখব বলে ঠিক করেছি সে বিষয়ে আসি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের হাতে এখন স্মার্টফোন শোভা পাচ্ছে। তবে এই যন্ত্রে তারা কি কেবল কথা বলা কিংবা চ্যাটিংয়েই সীমাবদ্ধ? একটি প্রজন্ম হয়তো তা-ই করছে, কিন্তু বাকি সিংহভাগ প্রজন্ম মোবাইল বা ল্যাপটপে নিয়মিত নাটক-সিনেমা দেখছে। শুধু বাঙালি কেন, চলচ্চিত্র তো সারা বিশ্বের মানুষের প্রধান বিনোদন। ‘কাগজের যুগ শেষ’—এমন নানা চর্চার পরও সংবাদপত্র ও বই যেমন বহাল তবিয়তে টিকে আছে, চলচ্চিত্রও একইভাবে টিকে থাকবে। অথচ এখন একদল মানুষ সুর তুলেছেন—প্রেম নিয়ে নাকি সিনেমা বানানো যাবে না। শুধু তা-ই নয়, এই অযৌক্তিক দাবি নিয়ে তারা আইনের দ্বারস্থ হয়েছেন। 

প্রেম কেন এত অপরাধের বিষয় হবে? রোমান্টিকতা কেন খারাপ হতে যাবে? বছরের পর বছর ধরে যেসব সিনেমা, থিয়েটার বা সাহিত্য প্রেমে ভরপুর গল্প উপহার দিয়ে আসছে, তা কি এই সমাজের কোনো সর্বনাশ করেছে?

আমার জন্মের বহু আগে পদ্মাতীরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মিত হয়েছিল। ঢাকার মুকুল টকিজ (পরবর্তীতে আজাদ সিনেমা) এবং চট্টগ্রামের নিরালা (পরবর্তীতে রঙ্গম)-সহ একাধিক হলে মুক্তি পাওয়া এই সফল ছবির নির্মাতা আবদুল জব্বার খান, যাকে আমরা বাংলাদেশের সিনেমার জনক বলি। আজ তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো সিনেমায় প্রেমের ওপর এই নিষেধের খড়্গ চেয়ে আইনি তৎপরতা দেখে মূর্ছা যেতেন, নয়তো অভিমানে দেশান্তরিত হতেন।

আমরা তো হলে গিয়ে সিনেমা দেখার সেই সোনালি যুগের মানুষ। রাজ্জাক, কবরী, সুচন্দা, ববিতা, উজ্জ্বল, সুজাতা, আজিম থেকে জাফর ইকবাল পর্যন্ত—পোস্টার-বিলবোর্ডে ছিলেন আমাদের স্বপ্নময় হিরো-হিরোইন।

সেই সিনেমাগুলো আমাদের পরম মমতায় প্রেম শিখিয়েছিল, রোমান্টিক গল্পগুলো আমাদের চিনিয়েছিল বিরহের গভীরতা। কোনো কোনো প্রেমের ছবির তীব্র কষ্ট আর বেদনা হয়তো আমাদের সারারাত ঘুমাতে দেয়নি, কিন্তু তা কখনো কোনো বিকৃত কাম উদ্রেক করেনি, লালসা জাগায়নি, ধর্ষণ শেখায়নি। বরং স্বাধীন বাংলাদেশের এসব প্রেমময় চলচ্চিত্র মানুষকে দিনশেষে আরও কিছুটা সহনশীল আর মানবিক মানুষ হতেই শিখিয়েছে।

বাঙালির জীবনে প্রেম তো কেবল জরুরি বিষয় নয়, এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। প্রেম মানেই কি শুধুই একজন পুরুষ আর একাধিক নারীর শারীরিক সম্পর্ক বা স্থূল আকর্ষণের গল্প? যারা জীবনে কখনো কবিতার পংক্তি ছুঁয়ে দেখেনি, গানের সুরে চোখ মেলেনি, ক্যানভাসে রঙের খেলা দেখেনি, বাঁশির সুর শুনে উদাস হয়নি—কেবলমাত্র তারাই বলতে পারে সিনেমায় প্রেম নিষিদ্ধ হোক।

কারণটা তো জলজ্যান্ত পরিষ্কার। যে মানুষ ভালোবাসতে জানে, ভালোবেসে জীবনকে চিনেছে, সে তো চমৎকার সংবেদনশীল সত্তা। আর আইনি নোটিশ টাঙিয়ে সিনেমার প্রেমে লাগাম টানতে চাওয়া এই মানুষগুলো আসলে নিষ্ঠুরতম, দরদহীন আর পাষাণ সমাজ তৈরি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

প্রেম তখনই জয়ী হবে, যখন আমরা রাধা-কৃষ্ণ কিংবা লাইলী-মজনুর মতো নিখাদ ও প্রেমময় জীবনকে ভালোবাসতে শিখব। তবে আসল মুশকিলটা হলো—ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়ায় একা ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া আজকের এই নিস্পৃহ সমাজে সিনেমার প্রেমে লাগাম টানার মতো এমন একটা উদ্ভট কথা বলেও পার পাওয়া যাচ্ছে। অথচ লাইলী-মজনু কিংবা শিরি-ফরহাদের মতো কালজয়ী নামগুলোই তো সাক্ষ্য দেয়, কোন সম্প্রদায় বা সংস্কৃতির মানুষ হয়েও ভালোবাসার শক্তিতে তারা ইতিহাসকে জয় করেছিলেন।

যাদের প্রেমে এত আপত্তি বা মানা আছে, তারা এসব রূপালি পর্দার আলো থেকে দূরে থাকলেই পারেন। বাংলাদেশ এবং এ দেশের বিপুল সাধারণ মানুষ যুগে যুগে ভালোবাসাতেই বেঁচে ছিল, আছে এবং ভালোবাসাতেই বাস করবে—দিনশেষে এটাই সত্য।

অজয় দাশগুপ্ত ছড়াকার, প্রাবন্ধিক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: dasguptaajoy@hotmail.com