মরিয়মের মৃত্যু ও জনতার আদালত নিয়ে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি
মরিয়মের মৃত্যু কি আমাদের বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক বিবেকের সামনে নতুন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে?
জার্মানির এক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিষয়ক সেমিনারে মুসলিম পুরুষদের বহুবিবাহ নিয়ে বেশ হাসাহাসি চলছিল। ঠিক এমন সময় সেখানে উপস্থিত তিউনিসীয় একজন নারী দাঁড়িয়ে পশ্চিমা পুরুষদের কাছে জানতে চাইলেন, পুরো মিলনায়তনে এমন কেউ আছেন কি যিনি জীবনে একাধিক নারীর সান্নিধ্যে আসেননি? উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্য থেকে কেউ নিজেকে এই তালিকার বাইরে দাবি করে দাঁড়াননি। সূত্রের নির্ভরযোগ্যতা বিচারে এই বর্ণনাকে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই, কারণ এই গল্পটি আমি শুনেছি এক সহকর্মীর মুখে। তবে গল্পের বাস্তব ভিত্তি যাই হোক না কেন, তা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, আত্মসংযম ও সামাজিক নৈতিকতা নিয়ে এক গভীর পর্যবেক্ষণের মুখোমুখি করে। বলে রাখা ভালো এই আলোচনা বহুবিবাহের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার নয়।
মানুষের মধ্যে যৌন আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক জৈবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু মানুষকে শুধু প্রবৃত্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মানুষের বিশেষত্ব তার বিবেক, আত্মসংযম, নৈতিক বোধ ও দায়িত্বশীলতায়। আকাঙ্ক্ষা থাকা স্বাভাবিক; সেই আকাঙ্ক্ষা কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, কোথায় তার সীমা, অন্যের সম্মতি ও মর্যাদা কোথায় রক্ষা করতে হবে, সেখানেই সভ্যতার পরিচয়।
ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রীয় আইন মানুষের আচরণকে সেই সীমার মধ্যে রাখার চেষ্টা করে। পারস্পরিক সম্মতি, সততা ও দায়িত্ববোধ সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি। জবরদস্তি, যৌন হয়রানি, নির্যাতন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ হতে পারে না।
বাংলাদেশের বাস্তবতা এই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৪ সালের জাতীয় নারী নির্যাতন জরিপে ২৭ হাজারের বেশি নারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। জরিপে দেখা যায়, ৭৬ শতাংশ নারী জীবনের কোনো পর্যায়ে স্বামী বা অন্তরঙ্গ সঙ্গীর কাছ থেকে শারীরিক, যৌন, মানসিক, অর্থনৈতিক নির্যাতন ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন।
আরও উদ্বেগজনক হলো নীরবতা। নির্যাতনের শিকার নারীদের ৬২ শতাংশ কাউকে বিষয়টি জানাননি। আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন মাত্র ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। অ-সঙ্গীর সহিংসতার ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপের হার আরও কম, ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ নির্যাতনের বিস্তারের পাশাপাশি বিচারপ্রাপ্তির পথে সামাজিক ভয়, লজ্জা, পারিবারিক চাপ ও তথ্যের অভাবও বড় বাধা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালের বৈশ্বিক হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় প্রতি তিনজন নারীর একজন জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে অন্তরঙ্গ সঙ্গীর শারীরিক নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়াতেও অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার হার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি।
বর্তমান সময়ে সমস্যাটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর হয়রানি। বাংলাদেশের জাতীয় জরিপে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ নারী ছবি ব্যবহার করে হয়রানি, যৌন হয়রানি, ভয় দেখানো এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন। বাংলাদেশে পরিচালিত অন্য গবেষণাতেও নারীদের অনলাইন হয়রানির উচ্চমাত্রা উঠে এসেছে। ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও, কথোপকথন এবং পরিচয় ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে কাউকে সামাজিকভাবে অপমান করার প্রবণতা এখন অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব জীবনের নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে আলোচিত ঘটনায় মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর প্রসঙ্গও এসব প্রশ্ন সামনে এনেছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ কী, কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, কার কতটুকু দায় রয়েছে, এসব নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে মরিয়ম পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। সদ্য কৈশোর-উত্তীর্ণ মেয়েটি তার আগে সামাজিক নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে। মরিয়মকে এমন একটি অস্বাভাবিক দাম্পত্যের দিকে ঠেলে দেওয়ার পেছেনে সামাজিক চাপ এবং অপমানের ভূমিকা তো নেহায়েতে কম ছিল না।
মরিয়মের মৃত্যু ও জনতার আদালতের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিকে আরও সামনে এনেছে।কোনো নারীর ব্যক্তিগত জীবন কারও কাছে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। কিন্তু সেই কারণে তিনি নির্যাতনের শিকার হওয়ার যোগ্য হয়ে যান না। একইভাবে কোনো পুরুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে সামাজিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া ন্যায়বিচার নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান ও আদালতের।
আমাদের সমাজে যৌন সহিংসতার অভিযোগ উঠলে অনেক সময় মূল প্রশ্ন থেকে আলোচনা সরে যায়। নারী কোথায় ছিলেন, কার সঙ্গে ছিলেন, তার পোশাক কেমন ছিল, তার আগে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, এসব প্রশ্ন সামনে আসে। অথচ মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—সম্মতি ছিল কি না, জবরদস্তি হয়েছিল কি না, ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছিল কি না এবং অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে।
এই জায়গায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও দায়িত্ব রয়েছে। কোনো ছবি দেখেই ছড়িয়ে দেওয়া, অভিযোগ শুনেই বিশ্বাস করা, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা এবং অপমানজনক মন্তব্য করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয়। মতপ্রকাশের সঙ্গে দায়িত্বও রয়েছে। একজন মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদা ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই।
সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ প্রকাশের অধিকার আছে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের অধিকার নেই। বিশেষ করে যৌন অপরাধের ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি। অভিযোগ, তদন্ত ও প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখতে হবে।
আমাদের প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক পরিবেশ, যেখানে নির্যাতিত নারী নিরাপদে কথা বলতে পারেন, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হয় এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিও ন্যায়সঙ্গত বিচার পান। অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু সামাজিক প্রতিশোধকে বিচার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। ভুক্তভোগীকে দ্বিতীয়বার অপমানের শিকার করা যাবে না, আবার নিরপরাধ ব্যক্তিকেও জনমতের চাপে ধ্বংস করা যাবে না।
অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যেই কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় নিহিত নয়। তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় যখন নির্যাতিত মানুষ নিরাপদে কথা বলতে পারেন, ভুক্তভোগীর মর্যাদা রক্ষা পায়, নিরপরাধ ব্যক্তি সামাজিক প্রতিশোধ থেকে সুরক্ষা পান এবং বিচার হয় আবেগ নয়, তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নয়, অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনো অন্ধ প্রতিশোধ নয়।
খালিদুর রহমান: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক। ইমেইল: khalid_sust@yahoo.com
