মুজিব-ইন্দিরা স্থলসীমান্ত চুক্তি এবং ছিটমহলে বিনা যুদ্ধে মানুষের মুক্তি
মানচিত্রের রেখা কেবল সীমানা নির্ধারণ করে না, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন। মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি এবং পরবর্তী সাংবিধানিক ও আইনি লড়াই কীভাবে ছিটমহলবাসীকে রাষ্ট্রহীনতার অভিশাপ থেকে মুক্তি দিয়েছিল?
‘বিনাযুদ্ধে নাহি দেব সূচ্যগ্র মেদিনী’—সূঁচের ডগায় যেটুকু জমি ধরে, বিনা যুদ্ধে সেটুকুও দেব না। মহাভারতে আছে, যুধিষ্ঠির বনবাস থেকে ফিরে এসে দুর্যোধনের কাছে মাত্র পাঁচটা গ্রাম চেয়েছিলেন, পাঁচ ভাইয়ের জন্য। কিন্তু দুর্যোধন পাণ্ডবদের তা দেননি। ব্যস, লেগে গেল যুদ্ধ—কুরুক্ষেত্র। সে তো দ্বাপর যুগের কথা, তখনই জমি নিয়ে এমন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ! আর কলিকালে তো সীমান্ত নিয়ে দেশে দেশে যুদ্ধ লেগেই থাকে।
কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৬২টি ছিটমহল নিয়ে অর্ধশতাব্দীর অধিককালের যে সমস্যা ছিল, তার মীমাংসা হয়েছে বিনা যুদ্ধে। তা সম্ভব হয়েছিল ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত ‘মুজিব-ইন্দিরা স্থলসীমান্ত চুক্তি’র মাধ্যমে।
যুদ্ধ না হলেও পথটা মসৃণ ছিল না। পথ দেখার আগে পাথেয়গুলো দেখে নেওয়া দরকার।
ছিটমহল সমাচার
‘ছিটমহল’ হলো এমন একটি ভূখণ্ড, যা একটি রাষ্ট্রের অংশ হলেও সম্পূর্ণরূপে অন্য একটি রাষ্ট্রের ভূখণ্ড দ্বারা পরিবেষ্টিত। আন্তর্জাতিক ভূগোলে একে বলা হয় ‘এনক্লেভ’।
ভারত-বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ভূগোল একসময় এতটাই জটিল ছিল যে, এক রাষ্ট্রের ছিটমহলের ভেতরে অন্য রাষ্ট্রের ছিটমহল, এমনকি তার ভেতরেও আরেক রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের নজির পাওয়া যেত। এসব কারণে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তকে বিশ্বের অন্যতম জটিল ছিটমহল-ভূগোল হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
চুক্তি মীমাংসার আগে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ছিল ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল, আর ভারতের অভ্যন্তরে ছিল ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল।
একটি দেশের ভূখণ্ড দ্বারা চারদিক থেকে পরিবেষ্টিত, অথচ অন্য একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবে টিকে থাকা এই বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডগুলো ছিল উপমহাদেশের দেশভাগ, রাজ্যসীমা এবং দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার এক অদ্ভুত উত্তরাধিকার।
এসব ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছিল সেখানে বসবাসকারী মানুষকে। রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে বসবাস করেও তারা অনেক সময় সেই রাষ্ট্রের কার্যকর প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আইনশৃঙ্খলা, ভোটাধিকার কিংবা সরকারি পরিচয়পত্র থেকে বঞ্চিত ছিল। ফলে বাংলাদেশ-ভারতের ছিটমহল সমস্যা কেবল একটি সীমান্ত-সমস্যা ছিল না; এটি ছিল নাগরিকত্ব, রাষ্ট্রীয় পরিচয় এবং মানবিক মর্যাদারও সমস্যা।
২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে ভারত ও বাংলাদেশের পরস্পরের ভূখণ্ডে অবস্থিত ছিটমহলগুলোর বিনিময় কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে এই দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। তবে এই পরিণতির পেছনে ছিল প্রায় সাত দশকের কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাস।
বেরুবাড়ি: সাংবিধানিক জটিলতার সূচনা
১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় স্যার সিরিল র্যাডক্লিফের নেতৃত্বে ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্ত নির্ধারণ করা হলেও সীমান্তের কিছু অংশ নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিরোধ দেখা দেয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার বেরুবাড়ি ইউনিয়ন নং ১২ প্রথম বড় বিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
১৯৫৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুনের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে বেরুবাড়ি ইউনিয়ন নং ১২-এর একটি অংশ পাকিস্তানকে দেওয়ার এবং কুচবিহারের ছিটমহলসমূহ বিনিময়ের ব্যবস্থা করা হয়।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক সাংবিধানিক প্রশ্ন দেখা দেয়: ভারত সরকার কি কেবল একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি করেই ভারতের ভূখণ্ডের কোনো অংশ অন্য রাষ্ট্রকে দিয়ে দিতে পারে?
ভারতের রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৩(১)-এর অধীনে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের কাছে মতামতের জন্য পাঠান। এটি সাধারণ অর্থে কোনো পক্ষের দায়ের করা মামলা ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক মতামত চাওয়া (Presidential Reference)।
মামলার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ছিল ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩-এর ক্ষমতার সীমা। ওই অনুচ্ছেদ সংসদকে কোনো রাজ্যের আয়তন বৃদ্ধি বা হ্রাস, সীমানা পরিবর্তন কিংবা নতুন রাজ্য গঠনের ক্ষমতা প্রদান করেছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট ব্যাখ্যা করে যে, এই ক্ষমতা ভারতের অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ড পুনর্বিন্যাসের জন্য।
একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক; ভারতের একটি রাজ্যের ১০০ বর্গকিলোমিটার জমি কমিয়ে যদি সেই জমি ভারতেরই অন্য একটি রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাহলে প্রথম রাজ্যের আয়তন কমে গেলেও সেই ভূখণ্ড ভারতের মধ্যেই থাকে। কিন্তু সেই ১০০ বর্গকিলোমিটার যদি পাকিস্তান বা অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্রকে দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে শুধু একটি রাজ্যের আয়তন কমে না; সেই ভূখণ্ড ভারতের সার্বভৌম ভূখণ্ডের বাইরে চলে যায়।
১৯৬০ সালের ১৪ মার্চ ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ‘রি: বেরুবাড়ি ইউনিয়ন অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অব এনক্লেভস’ (In Re: Berubari Union and Exchange of Enclaves) মামলায় তার ঐতিহাসিক মতামত প্রদান করে।
সুপ্রিম কোর্ট মত দেয়— অনুচ্ছেদ ৩-এর অধীনে বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে ভূখণ্ড হস্তান্তর বা সার্বভৌমত্ব ত্যাগ (cession) করার ক্ষমতা সংসদের নেই। এর জন্য সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৬৮ অনুসারে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন।
এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। আদালত বলেনি যে ভারত কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি করতে পারে না বা কোনো ভূখণ্ড কখনোই অন্য রাষ্ট্রকে দিতে পারে না। বরং আদালত বলেছিল—ভারতের ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব পরিবর্তনের মতো মৌলিক পদক্ষেপ কেবল সেই সাংবিধানিক পদ্ধতিতেই করা যাবে, যা সংবিধান নির্ধারণ করেছে।
সুপ্রিম কোর্টের মতামতের পর ভারতীয় সংসদ ১৯৬০ সালের ‘সংবিধান (নবম সংশোধন) আইন’ পাস করে। এর মাধ্যমে সংবিধানের প্রথম তফসিলে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়, যাতে ভারত-পাকিস্তান চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেরুবাড়ি-সংক্রান্ত ভূখণ্ড হস্তান্তরের সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয়।
তবে নবম সংশোধনী পাস হলেও বেরুবাড়ি-সংক্রান্ত সব বাস্তব সমস্যা সেদিনই শেষ হয়ে যায়নি। পরবর্তী সময়ে সীমান্ত-নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের প্রশ্নে আরও জটিলতা থেকে যায়।
স্বাধীন বাংলাদেশ এবং ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ছিটমহল সমস্যাটি নতুন রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করে।
১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ‘স্থলসীমান্ত চুক্তি’ (Land Boundary Agreement — LBA) স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তিতে দুই দেশের ছিটমহল বিনিময়, সীমান্তের বিভিন্ন অমীমাংসিত অংশ নির্ধারণ এবং বেরুবাড়িসহ অন্যান্য সীমান্ত-সংক্রান্ত বিষয়ের সমাধানের কাঠামো নির্ধারিত হয়।
চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে ভারতের অভ্যন্তরে থাকা বাংলাদেশের ছিটমহলগুলো বাংলাদেশকে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ভারতের ছিটমহলগুলো ভারতকে দেওয়ার নীতিগত ব্যবস্থা করা হয়।
তবে ১৯৭৪ সালের চুক্তি স্বাক্ষরের পরও এর পূর্ণ বাস্তবায়ন দীর্ঘদিন আটকে থাকে।
বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় সংশোধনী
ভারতের মতো বাংলাদেশকেও তার সংবিধানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হয়েছিল। ১৯৭৪ সালের ২৮ নভেম্বর ‘সংবিধান (তৃতীয় সংশোধন) আইন’ পাস হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২ সংশোধন করা হয়। সংশোধিত বিধানে ১৯৭৪ সালের চুক্তির আওতায় অন্তর্ভুক্ত ও বাদ দেওয়া ভূখণ্ডের সাংবিধানিক অবস্থান নির্ধারণের ব্যবস্থা করা হয়।
অর্থাৎ ভারত যেমন তার প্রথম তফসিল সংশোধন করেছিল, বাংলাদেশ তার অনুচ্ছেদ ২ সংশোধন করে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করেছিল।
২০১১: চূড়ান্ত সমাধানের প্রস্তুতি
মুজিব-ইন্দিরার ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন এগিয়ে নিতে ৩৭ বছর পর (২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর) দুই দেশ একটি প্রটোকল (Protocol) স্বাক্ষর করে।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দুই দেশ যৌথভাবে ছিটমহলগুলোর আয়তন, জনসংখ্যা ইত্যাদি গণনা করে।
২০১৫: ভারতীয় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে চূড়ান্ত পথ উন্মুক্ত
ভারতের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সাংবিধানিক পদক্ষেপ আসে ‘সংবিধান (একশততম সংশোধন) আইন, ২০১৫’-এর মাধ্যমে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে ভারতের সংবিধানের প্রথম তফসিল সংশোধন করে ভারত-বাংলাদেশ স্থলসীমান্ত চুক্তি, ১৯৭৪ এবং ২০১১ সালের প্রটোকল বাস্তবায়নের সাংবিধানিক ভিত্তি সম্পূর্ণ করা হয়।
৩১ জুলাই ২০১৫: ছিটমহল বিনিময় কার্যকর ও ফলাফল
ভারতীয় সংসদের সাংবিধানিক সংশোধন ও দুই দেশের অনুসমর্থনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ৩১ জুলাই ২০১৫ মধ্যরাতে ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হয়। অর্থাৎ ৩১ জুলাই ২০১৫ কোনো নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের দিন নয়, বরং ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা স্বাক্ষরিত ‘স্থলসীমান্ত চুক্তি’ অনুযায়ী ছিটমহল বিনিময় বাস্তবায়িত হওয়ার দিন।
এর ফলে বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল বাংলাদেশের অংশে পরিণত হয় (পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়), যাদের মোট আয়তন ১৭,১৬০.৬৩ একর। আর ভারতের ভেতরে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল ভারতের অংশে পরিণত হয় (পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়), যাদের মোট আয়তন ৭,১১০.০২ একর। অর্থাৎ দুই দেশ মিলিয়ে মোট ২৪,২৭০.৬৫ একর ভূখণ্ডের ছিটমহল-ব্যবস্থার অবসান ঘটে।
এখানে মনে রাখা দরকার, ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা ‘স্থলসীমান্ত চুক্তি’তে শুধু ছিটমহল বিনিময় ছিল না; অপদখলীয় ভূখণ্ড (এক দেশের দখলে থাকা অন্য দেশের আইনসম্মত জমি) হস্তান্তর ও প্রায় ৬.১ কিলোমিটার সীমানা নিষ্পত্তিও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বস্তুত ছিটমহল সমস্যার আসল কেন্দ্র ভূখণ্ড ছিল না—ছিল মানুষ; ছিল ৫১ হাজারের বেশি মানুষের মুক্তি। ২০১১ সালে দুই দেশের যৌথ গণনা অনুযায়ী ছিটমহলগুলোর মোট জনসংখ্যা ছিল ৫১,৫৪৯ জন—বাংলাদেশের অভ্যন্তরের ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলে ৩৭,৩৩৪ জন এবং ভারতের অভ্যন্তরের ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহলে ১৪,২১৫ জন।
ছিটমহল বিনিময়ের আগে বাসিন্দারা যদিও আইনগত অর্থে সবাই রাষ্ট্রহীন ছিলেন না, কিন্তু কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, নাগরিক সেবা ও অধিকার থেকে দীর্ঘদিন প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তাদের রাষ্ট্রীয় নাগরিকত্বের পরিচয় থাকলেও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করার মতো প্রশাসনিক কাঠামো ছিল না। তারা ভোট দিতে, ভ্রমণ করতে বা সরকারি পরিষেবা গ্রহণ করতে পারতেন না, মৌলিক মানবাধিকারের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।
ছিটমহল বিনিময়ের পর এদের সবাইকে কিন্তু এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যেতে হয়নি। বরং ‘স্থলসীমান্ত চুক্তি’র একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক নীতি ছিল—যে ভূখণ্ড যে রাষ্ট্রের কাছে যাবে, সেখানকার অধিবাসীরা নিজের বসতভিটায় থেকেই সেই রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার সুযোগ পাবেন।
অর্থাৎ বাসিন্দাদের নিজ নিজ জায়গায় থেকে নতুন রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার অধিকার এবং মূল ভূখণ্ডে চলে যাওয়ার অধিকার—দুই পথই খোলা রাখা হয়েছিল।
বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ১১১টি সাবেক ভারতীয় ছিটমহল থেকে প্রাথমিকভাবে ৯৭৯ জন (শেষ পর্যন্ত ৯২০ জন) তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব বজায় রেখে ভারতে চলে যাওয়ার বিকল্প গ্রহণ করেছিলেন। বাকিরা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে বসবাস করছেন।
অন্যদিকে, ভারতের ভেতরে থাকা ৫১টি সাবেক বাংলাদেশি ছিটমহলের বাসিন্দাদের কেউ বাংলাদেশে যাওয়ার বিকল্প গ্রহণ করেননি; তাঁরা ভারতের নাগরিক হিসেবে সেখানেই থেকে যান।
রাষ্ট্রের মানচিত্র বদলানো যায়; কিন্তু মানুষের বাড়িঘর, স্মৃতি, পূর্বপুরুষের কবর, জমি ও সামাজিক সম্পর্ককে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া যায় না। ফলে ছিটমহল বিনিময়ের সবচেয়ে বড় মানবিক সাফল্য ছিল ব্যাপক জনসংখ্যা স্থানান্তর নয়; বরং মানুষকে তাদের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ না করেই একটি স্বীকৃত রাষ্ট্রীয় পরিচয় দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা। জনগণ তাদের নাগরিকত্ব বেছে নিয়েছিল এবং বিশ্বের অন্যতম জটিল ছিটমহল-ভূগোলের শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধান হয়েছিল।
বেরুবাড়ির চূড়ান্ত পরিণতি এবং দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ও তিনবিঘা করিডোর প্রসঙ্গ
১৯৫৮ সালের নেহরু-নুন চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল—বেরুবাড়ি ইউনিয়ন নং ১২-এর অর্ধেক পাকিস্তান পাবে এবং অপর অর্ধেক ভারত রাখবে। কিন্তু ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পরিস্থিতি নতুনভাবে বিবেচিত হয়। ১৯৭৪-এর বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তিতে বেরুবাড়ি-সংক্রান্ত চূড়ান্ত সমঝোতা হয়; আগের ব্যবস্থা বদলে দেওয়া হয়: দক্ষিণ বেরুবাড়ি ইউনিয়ন নং ১২ এবং সংলগ্ন কিছু ভূখণ্ড ভারত রাখবে; বিনিময়ে বাংলাদেশ ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থিত বাংলাদেশের একটি সংযুক্ত যুগ্ম-ছিটমহল দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ধরে রাখবে।
কিন্তু সমস্যা ছিল—দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। তাই একই ১৯৭৪ সালের চুক্তির অনুচ্ছেদ ১(১৪)-এ ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য একটি সরু ভূখণ্ড—প্রায় ৩.৭৪ একর—চিরস্থায়ীভাবে ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থা করে। এটিই ‘তিনবিঘা করিডোর’। ১৯৯২ সালের ২৬ জুন ইজারার বিস্তারিত ব্যবস্থা চূড়ান্ত হওয়ার পর তিনবিঘা করিডোর দিয়ে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতায় সীমিত সময়ের যাতায়াত শুরু হয়। পরে ধাপে ধাপে তা বাড়ানো হয় এবং ২০১১ সালে ২৪ ঘণ্টা চলাচলের সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা কার্যত বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে (লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার অন্তর্ভুক্ত) স্থায়ী যোগাযোগ পায়।
বিশ্ব থেকে শিক্ষা: অন্যরা কীভাবে ছিটমহল সামলেছে
ফ্রান্সের ভূখণ্ডের মধ্যে স্প্যানিশ ছিটমহল লিভিয়া (Llívia): ১৬৫৯ সালের পিরেনিসের সন্ধি (Treaty of the Pyrenees)-এর মাধ্যমে ফ্রান্স ও স্পেনের দীর্ঘযুদ্ধের অবসান ঘটে এবং সীমান্তের বিস্তৃত পুনর্বিন্যাস হয়। ফ্রান্স সেরদানিয়া অঞ্চলের বহু এলাকা পেলেও লিভিয়া স্পেনের অধীনেই থেকে যায়। ১২ নভেম্বর ১৬৬০ সালের লিভিয়া চুক্তি (Llívia Convention)-এর মাধ্যমে সীমান্ত আরও স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়।
নেদারল্যান্ডসের ভূখণ্ডের মধ্যে বেলজিয়ামের ছিটমহল বার্লে-হার্তগ (Baarle-Hertog) ও বার্লে-নাসাউ (Baarle-Nassau): ঐতিহাসিক ভূমি-বণ্টন ও মধ্যযুগীয় চুক্তির উত্তরাধিকার হিসেবে নেদারল্যান্ডসের অভ্যন্তরে বেলজিয়ামের ২২টি ছিটমহল তৈরি হয়েছিল। ১৯৯৫ সালের অক্টোবরে দুই দেশের সীমান্তরেখা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত ও চূড়ান্ত করা হয়; তবে ছিটমহলগুলোর অনন্য ভূগোল বিলুপ্ত হয়নি, বরং আইনগতভাবে স্বীকৃত অবস্থায় টিকে আছে।
ইউরোপের ছিটমহল এবং বাংলাদেশ-ভারতের ছিটমহল—পাশাপাশি রাখলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়।
লিভিয়া দেখায়, একটি ছিটমহলকে চুক্তির মাধ্যমে স্থায়ীভাবে স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব। বার্লে দেখায়, বহু শতাব্দীর জটিল ছিটমহল-ভূগোলও যুদ্ধ ছাড়াই দ্বিপাক্ষিক সীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে আইনগতভাবে নিষ্পত্তি করা সম্ভব। আর বাংলাদেশ-ভারত দেখায়, যখন ছিটমহলবাসীর মানবিক দুর্ভোগ অত্যন্ত গভীর এবং বিদ্যমান ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন পারস্পরিক ভূখণ্ড বিনিময় ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমেও একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব।
বাংলাদেশ-ভারত চুক্তির প্রতিক্রিয়া
১৯৭২ সালে ২৫ বছর মেয়াদী মুজিব-ইন্দিরা মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই এর বিরুদ্ধে প্রবল রাজনৈতিক সমালোচনা শুরু হয়। কোনো কোনো মহল চুক্তিটিকে দাসত্ব-চুক্তি, গোলামী চুক্তি, দেশ বিক্রির চুক্তি নামে কটাক্ষ করে বাতিলের আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তির ক্ষেত্রেও গোষ্ঠীবিশেষের তীক্ষ্ণ সমালোচনা ছিল তীব্র। একে বাংলাদেশের পক্ষে ‘অত্যন্ত অসম ও অসম্মানজনক’ বলে অভিহিত করা হয়।
আঞ্চলিক বিরোধ মোকাবেলার অনন্য নজির
বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময়কে শুধু একটি সফল সীমান্ত-সমঝোতা হিসেবে দেখলে এর গভীরতর তাৎপর্য ধরা পড়ে না। এটি একই সঙ্গে সার্বভৌমত্ব, সংবিধান, কূটনীতি এবং মানবাধিকারের একটি অসাধারণ অধ্যায়। কূটনীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সাংবিধানিক অখণ্ডতার সঙ্গে আঞ্চলিক বিরোধ মোকাবেলার ক্ষেত্রে এটি একটি অসাধারণ মডেল।
মানচিত্রের একটি ছোট্ট রেখা সংশোধন করতে লেগেছে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়। কিন্তু সেই রেখার ওপারে ও এপারে বসবাসকারী মানুষের কাছে এর মূল্য হারানো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। এটি শুধু সীমান্তরেখা সরায়নি; মানুষকে রাষ্ট্রের ভেতরে ফিরিয়ে এনেছে।
রাষ্ট্রের জন্য সীমান্ত একটি রেখা; মানুষের জন্য সেটিই জীবন।
বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ গবেষক ও লেখক। ই-মেইল: baizid.romana@gmail.com
