উড়ন্ত ঘোড়া, ক্ষমতার রাজনীতি ও বিকল্পহীনতার পুরোনো আখ্যান
শাসক বদল আর রাজনৈতিক ব্যবস্থার বদল কি এক কথা, নাকি দুটির পথ সম্পূর্ণ আলাদা?
শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন একটি কথা প্রায়ই শুনতাম, ‘শেখ হাসিনার বিকল্প নেই।’ কথাটি সাধারণত তার সমর্থকরাই বলতেন। রাজনীতিতে এটি ছিল বেশ কার্যকর একটি কৌশল। কারণ কোনো নেতার বিকল্প নেই, এ কথা যত বেশি বলা যায়, তত বেশি মানুষকে বোঝানো যায় যে নেতা ছাড়া দেশটি বুঝি একদিনও চলবে না। হাসিনাবিরোধীরা অবশ্য কথাটি শুনে হাসতেন। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় এর জবাবও পাওয়া গেল, ‘আমরা সবাই বিকল্প।’ বাহ! বেশ আশাব্যঞ্জক কথা। মনে হলো, এবার বুঝি সত্যিই নতুন রাজনীতির দরজা খুলছে। একজনের বিকল্প একজন নয়, হাজার হাজার মানুষ। অর্থাৎ রাজনীতি আর কোনো একক মুখের ওপর নির্ভর করবে না।
তারপর শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলেন। এবার আমাদের দেখার পালা, বিকল্প কোথায়? দেখা গেল, রাষ্ট্রক্ষমতার অস্থায়ী পর্বে সামনে এলেন মুহাম্মদ ইউনূস ও তার সহযোগীরা, সঙ্গে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু ছাত্রনেতা। এনজিও-অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, সব মিলিয়ে বেশ বৈচিত্র্যময় একটি ব্যবস্থা। মনে মনে বললাম, রাজনীতির বিকল্প এনজিও! তবে এখানেই গল্প শেষ নয়। প্রায় ১৮ মাস পর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আবার এল বিএনপি, আর বিকল্পের মুকুট গেল তারেক রহমানের মাথায়। অর্থাৎ ‘আমরা সবাই বিকল্প’ থেকে আমরা বেশ দ্রুত ‘একজনই বিকল্পের’ যুগে ফিরে এলাম। তখন প্রশ্নটা একটু জোরে করেই করা যায়, কোথায় গেল সেই হাজার হাজার বিকল্প?
রাজনীতির এই ‘বিকল্প-উৎপাদন’ প্রক্রিয়াটি আরও মজার। একদিকে এনজিও, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, কোথাও সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা, আবার নির্বাচনি রাজনীতিতে বিএনপি, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে ‘বিকল্প’ শব্দটির অর্থই যেন বদলে গেছে। আগে বিকল্প মানে ছিল নতুন কিছু। এখন বিকল্প মানে, আগের লোকটি নেই, অতএব যে আছে, তাকেই আপাতত বিকল্প বলে ধরে নাও। রাজনীতির অভিধানে এ এক চমৎকার সুবিধা। একজনকে সরাও, একজনকে বসাও, তারপর বল, পরিবর্তন হয়ে গেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, পরিবর্তনটা কোথায়? শুধু মুখ বদলালে কি রাজনীতি বদলায়? ক্ষমতার চেয়ার একই থাকে, রাষ্ট্রের কাঠামো একই থাকে, অর্থনৈতিক সম্পর্ক একই থাকে, জনগণের সঙ্গে শাসকের দূরত্ব একই থাকে, শুধু চেয়ারে বসা মানুষটি বদলে গেলে তাকে কি সত্যিই বিকল্প বলা যায়? তাহলে তো বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিকল্পের কোনো অভাবই নেই। চেয়ার একটি, দাবিদার অনেক। প্রয়োজনে আরও কয়েকজন তৈরি করা যাবে।
এখানেই বিকল্প নিয়ে আসল কৌতুক। শেখ হাসিনার বিকল্প কে, এই প্রশ্ন করতে করতে আমরা কখনো কি ভেবেছি, শেখ হাসিনার রাজনীতির বিকল্প কী? দুটি প্রশ্ন এক নয়। একজন ব্যক্তির বিকল্প খুঁজতে গেলে আরেকজন ব্যক্তিকে পাওয়া যায়। কিন্তু একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিকল্প খুঁজতে গেলে দরকার হয় ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন, ভিন্ন অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার, ভিন্ন রাষ্ট্রচিন্তা এবং ভিন্ন ক্ষমতার সম্পর্ক।
এখানেই আমাদের তথাকথিত প্রগতিশীলদের একটি বড় অস্বস্তি। শেখ হাসিনাকে সরানোই যদি চূড়ান্ত রাজনৈতিক লক্ষ্য হয়, তাহলে তার জায়গায় কে বসবে, এই প্রশ্নটি একসময় আর গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। তখন যে-ই আসুক, তাকেই পরিবর্তন বলা যায়। কিন্তু ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর জিনিস। সে প্রশ্ন করবেই, আপনি কাকে সরালেন, আর কাকে আনলেন?
যদি এক ধরনের শাসক সরিয়ে আরেক ধরনের শাসক আসে, যদি এক ধরনের বৈষম্য সরিয়ে আরেক ধরনের বৈষম্য আসে, যদি সাম্প্রদায়িকতা ও অসহিষ্ণুতা নতুন পোশাক পরে ফিরে আসে, তাহলে সেটিকে পরিবর্তন বলা যাবে কি? নাকি সেটি কেবল ক্ষমতার পালাবদল?
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার, রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন, পুঁজিবাদী অর্থনীতি, প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ এবং কর্তৃত্ববাদ, সবকিছুকেই একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। মুক্তিযুদ্ধও কোনো দলীয় সম্পত্তি নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে যুক্ত একটি জাতীয় গণতান্ত্রিক ঐতিহাসিক সংগ্রাম। অতএব মুক্তিযুদ্ধের কথা বললেই কেউ প্রগতিশীল হয়ে যায় না, আবার মুক্তিযুদ্ধের নাম ব্যবহার করলেই গণতন্ত্র নিশ্চিত হয় না। ঠিক তেমনি পরিবর্তন বললেই পরিবর্তন ঘটে না।
আসল প্রশ্ন তাই আরও কঠিন। আমরা কি শুধু শেখ হাসিনার বিকল্প চেয়েছি, নাকি তার আমলের রাজনীতির বিকল্প চেয়েছি? দুটির মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল। যদি প্রথমটি চাই, তাহলে আমাদের সামনে বহু নাম আছে। কিন্তু যদি দ্বিতীয়টি চাই, তাহলে কাজটি কঠিন। কারণ তখন শুধু ব্যক্তি বদলালে চলবে না, বদলাতে হবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বদলাতে হবে ক্ষমতার সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় আনুগত্যের বাইরে আনার চেষ্টা, অর্থনৈতিক বৈষম্যের কাঠামো এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ব্যবহার। বদলাতে হবে সেই পুরোনো সংস্কৃতিও, যেখানে ক্ষমতায় থাকলে নিজের লোক, আর ক্ষমতার বাইরে থাকলে গণতন্ত্র!
আমাদের রাজনীতিতে গণতন্ত্রেরও বোধহয় একটি মেয়াদ আছে। ক্ষমতায় গেলে গণতন্ত্র একটু ছুটিতে যায়, বিরোধী দলে গেলে আবার ফিরে আসে। এর মধ্যেই ডিসেম্বর এসে হাজির। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্যালেন্ডার শুধু তারিখ দেখায় না, ভবিষ্যৎও বলে দেয়। বিশেষ করে ডিসেম্বর। ডিসেম্বর মানেই ইতিহাস, আবেগ, প্রত্যাশা এবং নতুন রাজনৈতিক হিসাব। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা।
ঘোষণা শুনে রাজনৈতিক বাজার যেন চাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে। কেউ বলছেন, তিনি ফিরবেন। কেউ বলছেন, ফিরবেন না। কেউ বলছেন, পরিস্থিতি বদলাবে। কেউ বলছেন, পরিস্থিতি বদলালেও কিছু বদলাবে না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, প্রত্যেক পক্ষের কাছে নিজের নিজের ভবিষ্যৎবাণীর ক্যালকুলেটর আছে। সমর্থকের ক্যালকুলেটরে যোগ হয় আশা, বিরোধীর ক্যালকুলেটরে সন্দেহ, বিশ্লেষকের ক্যালকুলেটরে অনিশ্চয়তা। আর সাধারণ মানুষের ক্যালকুলেটরে একটি মাত্র সংখ্যা, বাজারে চালের দাম কত?
কারণ রাজনৈতিক বক্তব্য যতই উত্তপ্ত হোক, মানুষের সংসারে চাল-ডাল, চাকরি, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও চিকিৎসার হিসাব ঠান্ডা মাথায় করতে হয়। রাজনীতির বড় বড় প্রকল্প, বিপ্লবের বড় বড় ঘোষণা আর ভবিষ্যতের উজ্জ্বল নকশার মাঝেও সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত জানতে চায়, তার জীবনটা একটু সহজ হবে কি না।
এই জায়গায় মনে পড়ে সেই বিখ্যাত বন্দির গল্প। এক রাজা দুই বন্দিকে মৃত্যুদণ্ড দিলেন। একজন বন্দি প্রাণভিক্ষা চেয়ে বলল, তাকে এক বছর সময় দেওয়া হোক। সে রাজার প্রিয় ঘোড়াকে উড়তে শেখাবে। রাজা ঘোড়া ভালোবাসতেন। উড়ন্ত ঘোড়ার কল্পনায় মুগ্ধ হয়ে এক বছরের সময় দিলেন। অন্য বন্দি বলল, ‘তুমি তো জানো, ঘোড়া উড়তে পারে না!’ প্রথম বন্দি বলল, ‘এক বছরে অনেক কিছু ঘটতে পারে। রাজা মারা যেতে পারেন, ঘোড়া মারা যেতে পারে, আমি মারা যেতে পারি। আর দুনিয়ায় তো কত অলৌকিক ঘটনা ঘটে। এমনতো হতে পারে, ঘোড়াটা সত্যিই উড়তে শিখবে!’
রাজনীতিতেও বোধহয় এই দর্শনটি বেশ কার্যকর। ডিসেম্বর আসতে এখনও সময় আছে। তার মধ্যে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে পারে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বদলাতে পারে, দলগুলোর অবস্থান বদলাতে পারে। এমনকি যারা আজ একে অন্যের বিকল্প বলে নিজেদের প্রচার করছে, তারাও কাল পরস্পরের মিত্র হয়ে যেতে পারে। রাজনীতিতে অসম্ভব বলে আসলে কিছু নেই। শুধু উড়ন্ত ঘোড়াটার ব্যাপারটা একটু কঠিন।
তবে এই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অন্য জায়গায়। আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু আশার ব্যবসা মানুষকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারে না। ‘আমি আসছি’, ‘আমরাই যোগ্য’, ‘আমরাই পারি নতুন বাংলাদেশ গড়তে’, এসব ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু জনগণের প্রশ্ন আরও শক্তিশালী: এলে কী হবে? যে ফিরে আসতে চায়, সে কী নিয়ে ফিরবে? যে পরিবর্তনের কথা বলে, সে কী পরিবর্তন করবে? যে গণতন্ত্রের কথা বলে, সে ক্ষমতায় গিয়ে গণতন্ত্র কতটা মানবে? যে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কথা বলে, সে ভোটের সময় সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে কী করবে? যে স্বাধীনতার কথা বলে, সে স্বাধীনতার মূল্যবোধকে রাষ্ট্রের নীতিতে কতটা ধারণ করবে?
এগুলোই আসল প্রশ্ন। ২০২৪-এর আন্দোলনে বলা হয়েছিল, ‘আমরা সবাই বিকল্প।’ কথাটি যদি সত্যি হয়, তাহলে রাজনীতি কয়েকজন নেতার হাতে আটকে থাকার কথা নয়। আর যদি সত্যি না হয়, তাহলে স্বীকার করাই ভালো, আমরা এখনও সেই পুরোনো রাজনীতির মধ্যেই আছি।
কারণ বাংলাদেশে নেতা কম নেই। বিকল্পেরও অভাব নেই। অভাব সম্ভবত এমন একটি রাজনৈতিক বিকল্পের, যে ক্ষমতায় গিয়ে নিজেকেই আর ‘বিকল্পহীন’ ঘোষণা করবে না।
চিররঞ্জন সরকার লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল:chiros234@gmail.com
