ক্ষমতাসীনদের মঞ্চ ভাঙে ভারে। বিরোধীদের মঞ্চ ভাঙে ধাক্কাধাক্কিতে। পার্থক্য এটুকুই। সাদৃশ্য হচ্ছে উভয়ক্ষেত্রে নেতাদের আধিক্য রয়েছে মঞ্চে। কোনোটাতে একটু বেশি, কোনোটাতে একটু কম।
Published : 27 Mar 2023, 01:51 PM
গত বছর যখন দেশে ছিলাম, তখন গিয়েছিলাম ঢাকার বাইরে একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে যোগ দিতে। আন্তর্জাতিক ফ্যাকাল্টি সদস্য হিসেবে সেখানে আমার একটি উপস্থাপনা ছিল। তিন দিনের সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। শুরু হলো দু-ঘণ্টা দেরিতে। দু-ঘণ্টার কর্মসূচি। তবে অনুষ্ঠান যখন শেষ হলো, রাত তখন একটা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরুর বক্তৃতাপর্ব যেন আর শেষ হয় না। উদ্বোধক মন্ত্রী ঢাকায়, ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করবেন। তবুও মঞ্চভর্তি বক্তা। মঞ্চের এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত সারি সারি পাতানো চেয়ারে সবাই বসা। সবাই বক্তৃতা করলেন। একটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সবাইকে কেন বক্তৃতা করতে হবে? বক্তৃতার বিষয়বস্তু বিজ্ঞানসম্মত হলেও কথা ছিল। অধিকাংশ কথাবার্তা রাজনৈতিক।
বিদেশে যত বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে গিয়েছি কোথাও মঞ্চভর্তি বক্তা থাকে না। হাতে গোনা দু-চারজন বক্তব্য রাখেন। তারা নিতান্তই আয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত প্রথমসারির মানুষজন। কোভিড পূর্ববর্তী সময়ে বেইজিং গিয়েছিলাম একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে যোগ দিতে। চোখ ধাঁধানো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। যে মিলনায়তনে সম্মেলনটি উদ্বোধন হলো সেখানে একত্রে বসতে পারে তিনহাজার দর্শক-শ্রোতা। মঞ্চের কথা আর কি বলব! শ' খানেক চেয়ার বসানো যাবে ওই মঞ্চে। অথচ বক্তার জন্য কোনো চেয়ার নেই। সবাই দর্শক সারির সামনের কাতারে বসা। মঞ্চ থেকে ডাকা হচ্ছে। যাচ্ছেন। দু-তিন মিনিট কথা বলে চলে আসছেন। তাও আবার তিন-চারজনের বেশি নয়। মঞ্চ বিশাল, বক্তা কম। মঞ্চ ভেঙে পড়ার কোনো অবকাশ নেই।
দেশে ইদানীং মঞ্চ ভেঙে পড়ার আতঙ্কে আছেন নেতারা। আজকাল নেতা বাড়ছে, কর্মী কমছে, মঞ্চ ভাঙছে অহরহ। সাম্প্রতিক সময়ে মঞ্চ ভেঙে নেতাদের ধরাশায়ী হওয়ার আলোচিত ঘটনাটি ঘটেছে ছাত্রলীগের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে। এ বছরের ৬ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘটনাটি ঘটে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বক্তব্য দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই বিকট শব্দে মঞ্চ ভেঙে পড়ে। আহত হন ৯ নেতাকর্মী। গুরুতর আহত হন যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শারমিন সুলতানা লিলি। তার পায়ে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়েছিল। আহতদের তালিকা দেখলে বুঝতে পারবেন, ওই মঞ্চে তাদের সবার কি থাকার দরকার ছিল? সবচেয়ে দৃষ্টিকটু লেগেছে একটি ছবিতে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে সত্যিকারের নেতাদের পাশাপাশি তথাকথিত নেতারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন। আর কিছু নৃত্যশিল্পী মূল মঞ্চের সামনে নেচে যাচ্ছেন। তথাকথিত নেতাদের আধিক্য মঞ্চ ভেঙে সত্যিকারের নেতাদের শুধু ধরাশায়ী করেনি, শিল্পীদেরও মঞ্চ থেকে নিচে নামিয়ে দিয়েছে।
মঞ্চ ভেঙে পড়ার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের উঠে দাঁড়িয়ে পুনরায় বক্তব্য শুরু করেন। আক্ষেপ করে বলেন, ‘একটু আগে মঞ্চ ভেঙে গেছে। কিন্তু নেতাদের মঞ্চে ওঠা, এত নেতা আমার দরকার নেই। আমরা কর্মী উৎপাদনের কারখানা চাই। যে কোনো অনুষ্ঠানে গেলে সামনের লোকের চেয়ে মঞ্চে লোক বেশি।’ মঞ্চ ভাঙার ব্যাপারে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, 'আমাদের স্টেজের গাঁথুনি যে পরিমাণ মজবুত করার কথা ছিল সেটা না করার কারণে এ ঘটনা ঘটল।' ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান বলেন, 'আমরা চেষ্টা করেছি মঞ্চটি যেন যথাযথ ও মজবুত হয়। কয়েক শ’ লোকের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন মঞ্চ করেছিলাম। এরপরও এ দুর্ঘটনা দুঃখজনক।’ ছাত্রলীগের নেতাদের কেউ মঞ্চের নেতাকর্মী কমানোর ব্যাপারে কিছু বলেননি। তারা মঞ্চের গাঁথুনি মজবুতকরণে গুরুত্ব দিয়েছেন। অথচ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যিনি ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক; বলেছেন, এত নেতা আমার দরকার নেই। কর্মী দরকার। তিনি প্রকারান্তরে মঞ্চে নেতা কমানোর কথা বলেছেন। আর ছাত্রলীগ ভাবছে মঞ্চ মজবুত করার কথা। সাবেক বর্তমানদের চিন্তা চেতনায় কত ফারাক?
ইতোপূর্বে মঞ্চ ভেঙেছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে। ২০১৮ সালের ২১ ডিসেম্বরের ঘটনা। মঞ্চে নেতাকর্মীদের উপচে পড়া ভিড়ের কারণে সেবার এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যানসহ অন্তত ১০ নেতাকর্মী আহত হন। সত্যিই কি নেতা বেশি হয়ে গেছে? কর্মী কমে যাচ্ছে? কেউ কেউ বলছেন, বর্তমানে দেশে অর্থ উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম হলো ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি করা। গুড় থাকলে নাকি সেখানে পিঁপড়ার আনাগোনা বাড়ে। কিন্তু বিএনপিতে এখন কোনো গুড় নেই। কিন্তু সেখানেও মঞ্চ ভাঙে। মঞ্চে দাঁড়ানো নিয়ে হাতাহাতি হয়। গত বছর ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি কর্তৃক আয়োজিত সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্য চলাকালে মঞ্চে দাঁড়ানো নিয়ে হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কিতে জড়িয়ে পড়ে দু-পক্ষ। এসময় মঞ্চ ভেঙে পড়ে যান নেতাকর্মীরা। তবে এ ঘটনায় কেউ গুরুতর আহত হননি।
গত বছরের ১২ নভেম্বর বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সমাবেশে যোগ দিতে আসা নেতাকর্মীদের হুলুস্থুলের কারণেই মঞ্চ ভেঙে পড়ে। আহত হন দুজন সাংবাদিক। ক্ষমতাসীনদের মঞ্চ ভাঙে ভারে। বিরোধীদের মঞ্চ ভাঙে ধাক্কাধাক্কিতে। পার্থক্য এটুকুই। সাদৃশ্য হচ্ছে উভয়ক্ষেত্রে নেতাদের আধিক্য রয়েছে মঞ্চে। কোনোটাতে একটু বেশি, কোনোটাতে একটু কম। ২০১৯ সালের ১৪ জুন রাজধানীর একটি কনভেনশন সেন্টারে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের মঞ্চ ভেঙে পড়ে আহত হন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির বেশ কয়েকজন নেতা। বিয়ের মঞ্চে মির্জা ফখরুলকে দেখে সেলফি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় হঠাৎ মঞ্চ ভেঙে পড়ে যায়।
সিলেটের ওসমানীনগরে মঞ্চ ভেঙে পড়ে ২০১৯ সালের ৩ এপ্রিল। ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে মঞ্চ ভেঙে চার চেয়ারম্যানসহ কমপক্ষে ২০ জন আহত হন। খেলার শুরুতেই মঞ্চে থাকা প্রায় ৫০-৬০ জন অতিথির ভারে হঠাৎ করে মঞ্চটি ভেঙে যায়। এ সময় মানুষের হুড়োহুড়িতে প্রায় ২০ জন আহত হন। সবশেষ মঞ্চ ভেঙেছে মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়িতে। ঘটনা ঘটে এ মাসের ১৯ তারিখে। উপজেলার সোনারং মাঠে ফুটবল খেলা দেখতে এসে খেলা শেষে মঞ্চে বক্তব্য রাখছিলেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। এসময় উৎসুক জনতার একাংশ হঠাৎ মঞ্চে উঠে গেলে মঞ্চটি ভেঙে পড়ে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
মঞ্চ ভাঙা আতঙ্ক এখন সবার মাঝে। তবে সম্প্রতি নানা কারণে আলোচিত ও সমালোচিত হিরো আলম বেশ সাবধানী। মঞ্চে উঠেই সবাইকে নামিয়ে দিলেন হিরো আলম। বললেন, ‘সবাই নেমে যান। আমরা এর আগে মঞ্চ ভেঙে পড়ার ভিডিও দেখেছি। তাই আমাদেরও যাতে সে রকম না হয়, সে জন্য অতিরিক্ত মানুষকে মঞ্চ থেকে নামতে হবে।’ হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার নরপতি গ্রামের প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে উপহারের গাড়ি আনতে গিয়ে হিরো আলম এসব কথা বলেন।
নেতাকর্মীদের ভারে অথবা ধাক্কাধাক্কিতে মঞ্চ ভেঙে পড়া রোধ করতে দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক, মঞ্চে নেতাকর্মী কমাতে হবে। মঞ্চে উঠে সবাইকে নামিয়ে দিতে হবে। মঞ্চের প্রধান নেতাদেরকেই এ আহবানটি জানাতে হবে এবং তা বাস্তবায়নও করতে হবে। দুই, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের চিন্তামতে মঞ্চ মজবুত করতে হবে। প্রয়োজনে সারা দেশের বহুল ব্যবহৃত মঞ্চগুলো ভালোমতো ঢালাই করে পাকা করার ব্যবস্থা করতে হবে। যে পদ্ধতিই প্রয়োগ করুন না কেন, নেতাকর্মীদের ভারে বা হুড়োহুড়িতে মঞ্চ ভেঙে আমরা আর জাতীয় নেতাদের মঞ্চে ধরাশায়ী হওয়ার দৃশ্য দেখতে চাই না।