সোশ্যাল মিডিয়ায় এই কোন ‘আমি’?
সোশ্যাল মিডিয়া শেষ পর্যন্ত একটা ক্যানভাস, এটি আয়না নয়। আয়না যা আছে তাই দেখায়, আর ক্যানভাসে আমরা যা আঁকি তা ফুটে ওঠে। সমস্যা হলো, আমরা আয়না ভেবে ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
আমি কে? এই দার্শনিক প্রশ্ন তো বহুকাল ধরেই চলে আসছে। তবে সোশ্যাল মিডিয়া-প্রভাবিত এই সময়ে এসে ওই প্রশ্ন বহাল থাকলেও একটু বদলে গেছে। এখন প্রশ্ন, অনলাইনে আমি কে? যিনি নিজেকে তুলে ধরছেন, তিনি নিরন্তর ভাবছেন, আমি কে? আবার যারা দেখছেন বা পড়ছেন, তারাও ভাবছেন, এই ‘আমি’টা কে?
নিজেকে উপস্থাপন করা হচ্ছে, নাকি নির্মাণ করা হচ্ছে? এই যে সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা দিনভর নিজেদের তুলে ধরছি, সেটা কি আসল আমি? আমি যা, তাই কি উপস্থাপন করি? নাকি নিজেকে নির্মাণ করি?
এটা সবাই মোটামুটি বুঝে গেছেন, ফেইসবুকের প্রোফাইলটা আমাদের বায়োডাটা নয়; ওটা একটা প্রদর্শনী। কানাডিয়ান সমাজবিজ্ঞানী আর্ভিং গফম্যান বহু আগেই বলেছিলেন, জীবনটা একটা মঞ্চ। আমরা সবাই অভিনেতা। সামনে যখন দর্শক থাকে, আমরা ভূমিকা অনুযায়ী আচরণ করি। এখানে একটা ফ্রন্ট স্টেজ ও একটা ব্যাক স্টেজ থাকে। ফ্রন্ট স্টেজে আমরা নিজেদের একটা ভাবমূর্তি তুলে ধরি। আর ব্যাক স্টেজে থাকি অপেক্ষাকৃত ব্যক্তিগত, অনাবৃত ‘আমি’।
সোশ্যাল মিডিয়া ফ্রন্ট আর ব্যাক স্টেজের সীমানা অনেকটাই মুছে দিয়েছে। এখানে যেন একটাই মঞ্চ, আর সেখানে পর্দা কখনো নামে না। দর্শক সবসময়ই আছে। লাইক, কমেন্ট, শেয়ার, ভিউ; এই চার ধরনের হাততালির অপেক্ষায় সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা প্রতিদিন নিজেদের সাজাই। আর এখানেই সেই বড় প্রশ্ন: আমরা নিজেদের উপস্থাপন করছি, নাকি নির্মাণ করছি?
উপস্থাপন আর নির্মাণের মধ্যে সূক্ষ্ম একটা ফারাক আছে, যা অবশ্যই গভীর একটি দূরত্বকে নির্দেশ করে। উপস্থাপন মানে যা আছে, তাকে গুছিয়ে দেখানো। যেমন, ঘর গোছানো। ঘরটা আপনারই, জিনিসপত্র আপনারই, শুধু অতিথি আসবে বলে একটু পরিপাটি করলেন। আর নির্মাণ মানে যা নেই, তা বানানো। যেমন, শোরুম সাজানো বা সিনেমার সেট তৈরি করা। কল্পনায় প্রাথমিক নির্মাণের পর, সেখানে যা নেই কিন্তু লাগবে, তা কিনে এনে, ভাড়া করে বা ধার করে এনে এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে মনে হয় এটিই বাস্তব।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা কোনটা করি? শুরুটা হয় উপস্থাপন দিয়ে। আমরা আমাদের জীবনের সেরা ছবিটা দিই। অনেক ছবি তুলে যে ছবিতে ফ্রেমটা ভালো হয়েছে, আলো ভালো এসেছে, হাসিটা নিখুঁত লেগেছে, সেটাই পোস্ট করি। এটা স্বাভাবিক; মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি নিজেকে একটু ভালোভাবে দেখানো। এতে দোষের কিছু নেই। সমস্যা শুরু হয় যখন উপস্থাপনটা ধীরে ধীরে নির্মাণ হয়ে যায়।
আমরা এখন ছবি তুলি না, ছবির জন্য বাঁচি। সকালে ঘুম থেকে উঠে চা খাওয়াটা আর শুধু চা খাওয়া থাকে না, ওটা ‘মর্নিং ভাইবস’ হয়ে যায়। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাটা আর আড্ডা থাকে না, ওটা ‘স্টোরি’ হয়ে যায়। আমরা মুহূর্ত যাপন করি না, মুহূর্ত উৎপাদন করি। প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে আমরা কনটেন্টে রূপান্তরিত করি। এখানেই ঘটে আরেকটি বড় ঘটনা; অ্যালগরিদম হয়ে ওঠে বড় নিয়ন্ত্রক। তার অনুকম্পা পাওয়ার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারকারীরা জীবনটাকেও অ্যালগরিদমের ছন্দে সাজাতে শুরু করেন। আগে আমরা নিজেদের দর্শকের জন্য সাজাতাম; এখন আমরা অ্যালগরিদমের জন্য নিজেদের নির্মাণ করি।
আমরা জানি, কোন ধরনের কনটেন্টে লাইক বেশি আসে, কোন ধরনের কনটেন্টে রিচ কমে যায়। আমরা জানি, ভ্রমণের আলোকচিত্র, সফলতার গল্প, জিমের ভিডিও, এসবের বাজারদর বেশি। তাই আমরা অজান্তেই ওই ‘আমি’টাকে তৈরি করতে শুরু করি, যেটা বেশি বিক্রি হয়। যে ‘আমি’টা রাগ করে না, ব্যর্থ হয় না, যার জীবনে কোনো অনিশ্চয়তা নেই, যে সবসময় প্রোডাক্টিভ, সবসময় হ্যাপি, সবসময় ট্রাভেল করছে। আবার যদি দেখানো হয় কেউ রাগ করছে, মারামারি করছে, অনিশ্চয়তায় ভুগছে কিংবা দুঃখে ভেঙে পড়ছে, সেটাও চিত্রনাট্য অনুযায়ী। অর্থাৎ এটাও আর নিছক উপস্থাপন থাকে না; হয়ে ওঠে নির্মাণ, একটি আদর্শ চরিত্র নির্মাণ। অথবা মাপঝোঁক দিয়ে বানানো কোনো ‘অ্যান্টি-হিরো’, যে শেষ পর্যন্ত সবার সহানুভূতি পাবে, আইকন হয়ে উঠবে।
এর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, আমরা একসময় নিজের নির্মিত চরিত্রটাকেই সত্যি ভাবতে শুরু করি এবং ওই চরিত্রের প্রেমে পড়ে যাই। বাস্তবের ‘আমি’, যে ভুল করে, ব্যর্থ হয়, ক্লান্ত হয়, ঈর্ষা করে, আটপৌরে পোশাক পরে থাকে, তাকে আমাদের অসহ্য লাগতে শুরু করে। নির্মিত আমি আর বাস্তবের আমির মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়, সেটিই একসময় অস্বস্তি, উদ্বেগ ও একাকীত্বের উৎস হয়ে উঠতে পারে। ডিজিটাল জীবনের সঙ্গে বাস্তব জীবনের এই অসামঞ্জস্য আমাদের জীবনযাপনের স্বাভাবিকতাকেও ধীরে ধীরে বদলে দেয়।
আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের নির্মিত জীবন দেখে নিজের যাপিত জীবনকে বিচার করি। ওর চাকরিটা কত সুন্দর, ওর সম্পর্কটা কত নিখুঁত, ও কত ঘুরছে! আমাদের মন খারাপ হয়, হতাশা বাড়ে; অসম্ভব এক প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ি আমরা। আমরা দ্বিমুখী এক সংকটের মুখোমুখি হই। একদিকে নিজের নির্মিত চিত্রকে বাস্তব বলে ভাবতে শুরু করি, যা বিভ্রমের জন্ম দেয়; অন্যদিকে অন্যের নির্মিত চিত্রকেও সত্যি ভেবে তার সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে হতাশার জন্ম দিই।
আমরা ভুলে যাই, আমরা অন্যের হাইলাইটস, রিল বা স্টোরি দেখি; অর্থাৎ নির্মিত, নির্বাচিত মুহূর্তগুলো দেখি। তাদের গোটা জীবনটা আমরা দেখি না। নিজেকে একটু গুছিয়ে, একটু বড় করে, একটু সুন্দর করে বলার ইচ্ছে মানবিক। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া ওই ইচ্ছেটাকে একটা সহজলভ্য, সর্বগ্রাসী রূপ দিয়েছে। তাই আমাদের উপস্থাপন আর নির্মাণের পার্থক্যটা বুঝতে পারা জরুরি।
আমি যদি জানি যে আমি একটা চরিত্রে অভিনয় করছি, তাহলে আমি নিরাপদ। ভয় তখনই, যখন আমি বিশ্বাস করতে শুরু করি যে মুখোশটাই আমার মুখ। আবার অন্যের মুখোশটাও বুঝতে হবে, নিজেকে বিপন্নতা থেকে মুক্ত রাখতে। এ জন্য হয়তো আমাদের তিনটি অভ্যাস ফিরিয়ে আনা দরকার।
প্রথমত, অসম্পূর্ণকে দেখানোর সাহস। মাঝে মাঝে ব্যর্থতার গল্প, না-পারার গল্প, সাধারণ দিনের গল্প বলা। নিখুঁত হওয়ার চাপ থেকে নিজেকে এবং অন্যকে মুক্তি দেওয়া।
দ্বিতীয়ত, না দেখানোর আনন্দ উপভোগ করতে হবে। কিছু মুহূর্ত শুধু নিজের জন্য বাঁচা। যে বিকেলটার কোনো ছবি নেই, যে আড্ডাটার কোনো প্রমাণ নেই, ওই মুহূর্তগুলোই আমাদের সবচেয়ে নিজস্ব। সবকিছুকে কনটেন্ট বানানো ঠিক হবে না।
তৃতীয়ত, নিজেকে প্রশ্ন করা: এই পোস্টটা আমি কেন করছি? এই কনটেন্ট আমি কেন করছি? এটা কি আমার আনন্দ ভাগ করছি, নাকি অন্যের স্বীকৃতি ভিক্ষা করছি? আমি কি আমার জীবন দেখাচ্ছি, নাকি অন্যের জীবনের মতো একটা জীবন বানাচ্ছি?
আসলে আমরা উপস্থাপন করছি ভেবে নির্মাণ করে চলেছি। আর ওই নির্মাণের ভেতরেই আস্তে আস্তে নিজেকে হারিয়ে ফেলছি। মনে রাখা দরকার, সবচেয়ে বেশি লাইক পাওয়া মানুষটাও দিনশেষে অফলাইনে ফিরে আসে। সেখানে কোনো ফিল্টার নেই, কোনো অ্যাপ সেখানে সব সাজিয়ে-গুছিয়ে দেয় না। সেখানে নিজের মুখোমুখি হতে হয়, নিজস্বতার মুখোমুখি হতে হয়।
সোশ্যাল মিডিয়া শেষ পর্যন্ত একটা ক্যানভাস, এটি আয়না নয়। আয়না যা আছে তাই দেখায়, আর ক্যানভাসে আমরা যা আঁকি তা ফুটে ওঠে। সমস্যা হলো, আমরা আয়না ভেবে ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
জয় প্রকাশ সরকার লেখক ও সাংবাদিক। ইমেইল: jps.news.bd@gmail.com
