২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

এআই নিজেই বিচারক নাকি আদালতে বিচারকের সহযোগী?

রায় লিখবে এআই, নাকি কেবল নথি সাজাতে সহায়তা করবে? বিচারিক প্রজ্ঞা ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?

এআই নিজেই বিচারক নাকি আদালতে বিচারকের সহযোগী?
তথ্যের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার রক্ষায় বিচার বিভাগে এআই ব্যবহারের স্পষ্ট সীমানা নির্ধারণ এখন সময়ের দাবি। ছবি: এআই

Published : 08 Sep 2026, 08:07 PM

Updated : 19 Sep 2026, 02:25 PM

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন ভবিষ্যতের কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। অফিসের নথি তৈরি, ব্যবসা, পড়াশোনা—সবক্ষেত্রেই এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিচারব্যবস্থাও এই পরিবর্তনের বাইরে থাকতে পারছে না। বিশেষ করে পাহাড়সম মামলাজট, দীর্ঘ নথি, অসংখ্য আইন আর পুরোনো নজিরের ভিড় থেকে মূল তথ্যটি দ্রুত বের করে আনতে এআই দারুণ কাজে আসতে পারে। এতে আদালত ও আইনজীবীদের কাজের গতি ও দক্ষতা দুটোই বাড়বে। কিন্তু এআইয়ের ব্যবহার আদালতের বিচারিক বিবেচনার অংশীদার হবে, নাকি কেবল বিচারকের সহায়ক থাকবে—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

বাংলাদেশে এই প্রশ্নটি এখন আর নিছক তাত্ত্বিক বিতর্কের জায়গায় আটকে নেই। সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এআই দিয়ে আদালতের রায় লেখা অনুচিত। তার এই সতর্কবার্তার মূল সুরটি অত্যন্ত স্পষ্ট—মামলার প্রতিটি ঘটনা, সাক্ষ্য-প্রমাণ, আইনের সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা আর বিচারকের নিজস্ব মানবিক বোধের জটিল মেলবন্ধনেই একটি চূড়ান্ত রায় তৈরি হয়; কোনো যান্ত্রিক প্রযুক্তি বিচারকের সেই প্রজ্ঞা ও বিবেচনার বিকল্প হতে পারে না।

অন্যদিকে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিচারকদের এআই ব্যবহারের সম্ভাবনাকে একেবারে নাকচ না করে সতর্কতার ওপর জোর দিয়েছেন। আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এআই বিচারককে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু তার ওপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—এআই ব্যবহার করে কাউকে বিভ্রান্ত বা প্রভাবিত করার চেষ্টা বিচারিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে; তাই বিচারকদের এআই-উৎপাদিত তথ্য ও উপকরণ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দুজন ব্যক্তির বক্তব্য মিলিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বার্তা পাওয়া যায়। বার্তাটি হলো— এআইকে আদালত থেকে দূরে রাখা নয়; আদালতের সীমানায় এর প্রবেশ কতটুকু এবং কী শর্তে ঘটবে—সেই সীমারেখাটি এখনই টেনে দেওয়া জরুরি।

আদালতে এআই ব্যবহারের ঝুঁকি অন্য যেকোনো কর্মক্ষেত্রের চেয়ে বেশি। একজন কর্মকর্তা এআই দিয়ে ভুল চিঠি লিখলে তা সংশোধন করা যায়; একজন শিক্ষার্থী ভুল উত্তর লিখলে পরীক্ষায় নম্বর কম পেতে পারেন। কিন্তু আদালতে এআইয়ের ভুল তথ্য কোনো রায়ে ঢুকে গেলে তার পরিণতি হতে পারে মানুষের স্বাধীনতা, সম্পদ, অধিকার ও সামাজিক মর্যাদার ওপর দীর্ঘস্থায়ী ও অপূরণীয় আঘাত।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ‘এআই হেলুসিনেশন’ নিয়ে। এআই কখনো কখনো অস্তিত্বহীন মামলা, ভুল আইন এবং বানানো উদ্ধৃতি এমন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করে যে সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে ভুল শনাক্ত করা কঠিন।

তবে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার অস্বীকার না করে এর যথাযথ প্রয়োগ করতে পারলে তা হয়তো বিচার বিভাগকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে। সে কারণেই বিচারকদের জন্য গাইডলাইনে অন্তত আবশ্যকীয় কিছু নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।

যেমন—

  • প্রথমত, রায়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এআইয়ের কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না। এআই তথ্য খুঁজতে, নথি সাজাতে এবং ভাষাগত সহায়তা দিতে পারে; কিন্তু বিচারকের নিজস্ব বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত অপরিহার্য।
  • দ্বিতীয়ত, এআইয়ের দেওয়া প্রতিটি আইনি উদ্ধৃতি মূল উৎস থেকে যাচাই করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ‘এআই বলেছে’—এটি কোনো আইনি ভিত্তি হতে পারে না।
  • তৃতীয়ত, গোপনীয় মামলার তথ্য নিরাপত্তাহীন পাবলিক এআই প্ল্যাটফর্মে দেওয়া নিষিদ্ধ করতে হবে। মামলার পক্ষ, সাক্ষী, শিশুর পরিচয়, মেডিকেল তথ্য, তদন্ত-সংক্রান্ত গোপন তথ্য—সবই বিশেষ সুরক্ষার আওতায় থাকতে হবে।
  • চতুর্থত, এআই-নির্ভর প্রমাণের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। ছবি, অডিও, ভিডিও ও নথি এখন সহজেই কৃত্রিমভাবে পরিবর্তন করা যায়, এমনকি নতুন করে তৈরি করাও সম্ভব। ফলে ‘দেখতে সত্যি’ হলেই তা সত্যি—এই ধারণা আদালতে বিপজ্জনক।
  • পঞ্চমত, বিচারকদের নিয়মিত ও যুগোপযোগী প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যে বিচারক এআই কীভাবে ভুল করতে পারে তা জানেন না, তিনি এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন।

শুধু বিচারকদের নয়, আইনজীবীদেরও এই প্রযুক্তির ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিবেচনায় রাখা দরকার। তাদের জন্যও একই রকম নির্দেশনা নির্ধারণ করা যেতে পারে। আইনজীবীরা এআই ব্যবহার করে গবেষণা, খসড়া প্রস্তুত এবং নথি বিশ্লেষণ করতে পারেন। কিন্তু আদালতে কোনো ‘এআই জেনারেটেড’ বক্তব্য, নজির বা তথ্য দাখিল করলে তার যথার্থতার দায় আইনজীবীর ওপরেই বর্তায়।

বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রব্যবস্থায় এআইকে ভয় পেয়ে দরজা বন্ধ করে রাখা হয়নি, আবার চোখ বন্ধ করেও তা গ্রহণ করা হয়নি। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু আদালত বিষয়টি নিয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম করেছে। উদাহরণ হিসেবে, কলোরাডোর ফেডারেল আদালত ২০২৫ সালে এমন একটি সাধারণ আদেশ জারি করেছে, যা আদালতে দাখিল করা আরজি, লিখিত জবাব ও অন্যান্য আবেদনের নথিতে ‘এআই জেনারেটেড’ বক্তব্য ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে এবং ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর হয়েছে।

ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ শহরে অবস্থিত ‘কাউন্সিল অব ইউরোপ’-এর ‘ইউরোপিয়ান কমিশন ফর দ্য এফিশিয়েন্সি অব জাস্টিস’ (সিইপিইজে) ২০১৮ সালেই বিচারব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের জন্য ‘ইউরোপিয়ান এথিক্যাল চার্টার’ নামক সনদ গ্রহণ করেছে। সেখানে এআই ব্যবহারের মৌলিক অধিকার, বৈষম্যহীনতা, স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা এবং ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণকে মূলনীতি হিসেবে ধরা হয়েছে। সিইপিইজে এখন বিচারব্যবস্থায় ব্যবহৃত এআই টুলগুলোর জন্য সার্টিফিকেট ব্যবস্থার সম্ভাবনাও পরীক্ষা করছে।

যুক্তরাজ্যের বিচার বিভাগীয় দপ্তর ২০২৫ সালের অক্টোবরে বিচারকদের জন্য এআই ব্যবহারের হালনাগাদ নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে এআই ব্যবহারের সম্ভাবনার পাশাপাশি এর ফলাফল যাচাই, গোপনীয়তা এবং বিচারিক দায়িত্বের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, যুক্তরাজ্যের ‘মাস্টার অব দ্য রোলস’-এর বক্তব্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান দেখা যায়—আইনগত গবেষণা ও খসড়া তৈরিতে এআই ব্যবহার করা সম্ভব, তবে আইনজীবী ও বিচারককে এর ফলাফল সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করতে বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল জুডিশিয়ারিও ২০২৫ সালে একটি ‘এআই টাস্ক ফোর্স’ গঠন করেছে। তাদের আলোচনায় বিচারিক মতামতের অখণ্ডতা, সংবেদনশীল তথ্যের নিরাপত্তা, নৈতিক মান এবং আদালতের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে উন্নত রাষ্ট্রগুলো এআই ব্যবহারের মূলনীতি হিসেবে ‘বিচারককে প্রতিস্থাপন নয়, বিচারককে সক্ষম করা’র নীতি গ্রহণ করেছে।

ফলে অপ্রতুল বিচারক সংখ্যার বিপরীতে বাংলাদেশের আদালতসমূহের ৪৬ লাখ মামলাজট নিরসনে এখনই বিচার বিভাগের জন্য একটি পৃথক ‘জুডিশিয়াল এআই গাইডলাইন’ প্রণয়ন করা উচিত। একই সঙ্গে আইনজীবীদের জন্য বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের মাধ্যমে পৃথক পেশাগত নির্দেশিকা করা যেতে পারে।

এই গাইডলাইনে নির্ধারণ করা যেতে পারে—কোন কাজে এআই ব্যবহার করা যাবে, কোন কাজে যাবে না; কোন তথ্য এআই প্ল্যাটফর্মে দেওয়া নিষিদ্ধ; ‘এআই জেনারেটেড’ আইনি উদ্ধৃতি কীভাবে যাচাই হবে; আদালতে ‘এআই জেনারেটেড’ নথি দাখিলের ক্ষেত্রে আইনজীবীর কী দায়িত্ব থাকবে এবং ভুল তথ্য ও ভুয়া নজির ব্যবহারের ক্ষেত্রে দায় কার এবং কী হবে।

মনে রাখতে হবে—এটি কেবল প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়, বিচারের প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্ন। কারণ মানুষ আদালতের কাছে শুধু একটি ‘সঠিক উত্তর’ চায় না। মানুষ চায়—তার কথা একজন মানুষ শুনেছেন, তার প্রমাণ একজন বিচারক মূল্যায়ন করেছেন এবং তার ভাগ্য নির্ধারণের আগে একজন স্বাধীন বিচারক নিজের বিবেক দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এআই হয়তো হাজার পৃষ্ঠার নথি কয়েক সেকেন্ডে পড়ে ফেলবে, হাজারটি নজিরের মধ্যে সম্ভাব্য প্রাসঙ্গিক নজিরও খুঁজে দিতে পারবে; কিন্তু একজন নির্দোষ মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার নৈতিক দায় সে নিতে পারবে না।

তাই এ-সম্পর্কিত কোনো গাইডলাইন প্রণয়নে আমাদের এই নীতিটি মনে রাখা উচিত হবে যে, আদালতে এআই থাকবে—কিন্তু বিচার করবেন মানুষ; এআই তথ্য খুঁজবে—কিন্তু সত্যতা যাচাই করবেন আইনজীবী ও বিচারক; এবং এআই সময় বাঁচাবে—কিন্তু ন্যায়বিচারের দায়িত্ব থাকবে মানুষের কাছেই।

বাংলাদেশ যদি এখনই সেই সতর্কসংকেতকে নীতিতে পরিণত করতে পারে, তাহলে এআই বিচারব্যবস্থার জন্য হুমকি নয়—হয়ে উঠতে পারে ন্যায়বিচারকে আরও দ্রুত, দক্ষ ও মানুষের কাছে সহজলভ্য করার শক্তিশালী হাতিয়ার, যা মামলাজট নিরসন ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতে সহায়ক হবে।

মো. বাহাউদ্দিন আল ইমরান আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। ই-মেইল: emran.bae71@gmail.com